📄 বিচারপ্রার্থী থেকে অদ্ভুত কিছু শুনলে মুচকি হাসতেন
ইকরামা (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রিফাআ (রা) তার স্ত্রীকে তালাক দিলেন। অতঃপর আব্দুর রহমান বিন জুবাইর আল-কুরাজি (রা) তাকে বিয়ে করলেন।' আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন, 'তখন তিনি (রিফাআর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী) সবুজ রঙের একটি ওড়না পরে তাঁর (আয়িশা রা) নিকট আসলেন। অতঃপর তাঁর কাছে স্বামীর অত্যাচারের অভিযোগ করলেন এবং তাঁকে নিজের গায়ের চামড়ার ওপর (প্রহারের) সবুজ দাগ দেখালেন। মহিলারা সাধারণত একে অন্যের সহযোগিতা করে থাকে। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আসলেন, তখন আয়িশা (রা) বললেন, "কোনো মুমিন মহিলাকে এমনভাবে প্রহার করতে আমি দেখিনি। প্রহারের চোটে তার শরীর তার কাপড়ের চেয়ে সবুজ হয়ে গেছে!"'
আয়িশা (রা) বলেন, 'অতঃপর রিফাআর (রা) স্ত্রী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। আমি ও আবু বকর (রা) তখন তাঁর পাশে বসা ছিলাম। মহিলাটি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি রিফাআর (রা) স্ত্রী ছিলাম। তারপর সে আমাকে তালাক দিয়েছে। তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর আমি আব্দুর রহমান বিন জুবাইরকে (রা) বিয়ে করেছি। কিন্তু ইয়া রাসুলাল্লাহ, তার সাথে যা আছে, (তার পুরুষাঙ্গ) সেটা ঠিক কাপড়ের এই অংশের মতো (অর্থাৎ তার পুরুষাঙ্গ এই কাপড়ের মতো নির্জীব)।” এই বলে তিনি তার জিলবাবের একটি অংশ ধরে দেখালেন। সে সময় খালিদ বিন সাইদ বিন আস (রা) দরোজার পাশে অনুমতির অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বললেন, "হে আবু বকর, এই মেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে বড় গলায় কী সব বাজে কথা বলছে, তা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন না?" কিন্তু আল্লাহর কসম, তার কথায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মুচকি মুচকি হাসছিলেন (রাগ করছিলেন না)। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সম্ভবত, তুমি রিফাআর (রা) কাছে ফিরে যেতে চাও? কিন্তু তা তো ততক্ষণ সম্ভব হবে না, যতক্ষণ না সে (আব্দুর রহমান রা) তোমার সুধা পান করবে এবং তুমি তার সুধা পান করবে (অর্থাৎ যতক্ষণ তোমরা সহবাস করবে না, ততক্ষণ তুমি প্রথম স্বামীর নিকট ফিরে যেতে পারবে না)।" বর্ণনাকারী বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে স্ত্রীর আগমনের খবর পেয়ে তার স্বামী অন্য স্ত্রী থেকে তার দুই সন্তানকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, সে মিথ্যা বলেছে। আমার নিকট পরিপূর্ণ যৌনশক্তি রয়েছে। কিন্তু দুশ্চরিত্রা নারী, সে এখনও রিফাআকে (রা) চায়।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এরা কি তোমারই সন্তান?" তিনি বললেন, "হাঁ।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে এ-ই ব্যাপার, যার কারণে মেয়েটি এরূপ করছে! আর আল্লাহর কসম, কাকের সাথে কাকের সন্তানের যেমন সাদৃশ্য থাকে, ওর (আব্দুর রহমানের রা) সাথে এদের তার চেয়ে বেশি সাদৃশ্য রয়েছে।"'¹
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৫৮২৫, সহিহু মুসলিম: ১৪৩৩।
📄 উভয়পক্ষের কথা মন দিয়ে শুনতেন, যদিও একপক্ষ কাফির হোক
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একদা এক ইহুদি বিক্রির জন্য কিছু পণ্য উপস্থাপন করল। তার বিনিময়ে তাকে যে মূল্য দেওয়া হলো, তা তার পছন্দ হয়নি অথবা এর ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তখন সে বলল, "না, সেই সত্তার শপথ-যিনি মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে লোকদের জন্য মনোনীত করেছেন।" তার এই কথা এক আনসারি (মুসলমান) (রা) শুনতে পেয়ে তার মুখের ওপর একটি থাপ্পড় মারলেন এবং বললেন, "তুই বলছিস, সেই সত্তার শপথ-যিনি মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে লোকদের জন্য মনোনীত করেছেন; অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে বিদ্যমান আছেন।" তখন ইহুদি লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে অভিযোগ করল, "হে আবুল কাসিম, আমি জিম্মি এবং ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ। অমুক ব্যক্তি আমার মুখের ওপর থাপ্পড় মেরেছে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তাকে থাপ্পড় মেরেছ কেন?" তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, সে বলেছে, সেই সত্তার শপথ-যিনি মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে লোকদের জন্য মনোনীত করেছেন; অথচ আপনি আমাদের মাঝে বিদ্যমান আছেন।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলেন, এমনকি তাঁর চেহারায় রাগের ছাপ ফুটে উঠল। অতঃপর বললেন:
'নবিদের মধ্যে একজনের ওপর আরেকজনকে মর্যাদা দিয়ো না। কেননা, কিয়ামতের দিন যখন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন আল্লাহ যাদের চাইবেন, তারা ছাড়া ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। অতঃপর দ্বিতীয়বার যখন ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন আমিই প্রথম পুনরুত্থিত হব। উত্থিত হওয়ার পরেই আমি দেখতে পাব, মুসা (আলাইহিস সালাম) আরশ আঁকড়ে ধরে আছেন। আমার জানা থাকবে না, তুর পাহাড়ে বেহুঁশ হওয়ার কারণে তাঁকে এবারে বেহুঁশ হওয়া থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, নাকি আমার আগেই তাঁকে হুঁশ দান করা হয়েছে? আর আমি এ কথাও বলি না যে, কোনো নবি ইউনুস বিন মাত্তা (আলাইহিস সালাম)-এর চেয়ে বেশি মর্যাদাবান।'¹
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৪১১, সহিহু মুসলিম: ২৩৭৩।
📄 রাসূল ﷺ-এর কতিপয় ফয়সালা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনেক ফয়সালা হাদিসের কিতাবসমূহে সংরক্ষিত আছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
তিনি ফয়সালা করেছেন, রিকাজ (গুপ্তধন)-এর এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দিতে হবে।¹
তিনি ফয়সালা করেছেন, পরাগায়ণের পর খেজুর গাছ বিক্রি করলে খেজুর পরাগায়ণকারী পাবে, কিন্তু যদি ক্রয় করার সময় ক্রেতা ফলসহ কেনার শর্ত দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা।²
তিনি ফয়সালা করেছেন, কৃতদাসের সম্পদের মালিক বিক্রেতা, তবে ক্রয়ের সময় ক্রেতা শর্তারোপ করলে তার মালিক ক্রেতা হবে।³
তিনি ফয়সালা করেছেন, স্ত্রী থেকে ভূমিষ্ট সন্তানের আইনগত পিতৃত্ব স্বামীর, ব্যভিচারকারীর নয়।⁴
তিনি ফয়সালা করেছেন, যৌথ-মালিকানার সম্পদ ভাগ করার পূর্বে কেউ নিজের অংশ বিক্রি করলে, তাতে সকল শরিকদার শুফার অধিকারপ্রাপ্ত হবে।⁵
তিনি হামল বিন মালিকের (রা) জন্য তার স্ত্রী থেকে মিরাস পাওয়ার ফয়সালা করেছেন, যাকে তার আরেক স্ত্রী হত্যা করেছিল।⁶
তিনি ফয়সালা করেছেন, মায়ের পেটের ভেতর সন্তান হত্যা করলে, তার জরিমানাস্বরূপ একটি পূর্ণ দাস অথবা একটি পূর্ণ দাসী দিতে হবে।⁷
কারও জমির মাঝখানে রাস্তা পড়লে এবং সেখানে ঘর বাঁধার ইচ্ছা না থাকলে রাস্তার জন্য সাত হাত জমি ছেড়ে দেওয়ার ফয়সালা করেছেন।⁸
তিনি ফয়সালা করেছেন, মৃতের দাদি ও নানি দুজনই মিরাস থেকে অংশ পেলে মিরাসের এক-ষষ্ঠাংশ উভয়ের মাঝে সমানভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে।⁹
তিনি ফয়সালা করেছেন, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্বামীর বাড়ি থেকে কোনো কিছু দান করবে না।¹⁰
তিনি ফয়সালা করেছেন, যদি কোনো জালিম জোরপূর্বক অপরের মালিকানাধীন জমিতে গাছ লাগায় বা ঘর ইত্যাদি নির্মাণ করে, সেটাতে তার অধিকার সাব্যস্ত হবে না। বরং তা উপড়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হবে।¹¹
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৪৯৯, সহিহু মুসলিম: ১৭১০। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত।
২. সহিহুল বুখারি: ২৩৭৯, সহিহু মুসলিম: ১৫৪২। ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত।
৩. সহিহুল বুখারি: ২৩৭৯, সহিহু মুসলিম: ১৫৪২। ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত।
৪. সহিহুল বুখারি: ২০৫৩, সহিহু মুসলিম: ১৪৫৭। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত।
৫. সহিহুল বুখারি: ২২১৪, সহিহু মুসলিম: ১৬০৮। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত।
৬. সহিহুল বুখারি: ৬৭৪০, সহিহু মুসলিম: ১৬৮১। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত।
৭. সহিহুল বুখারি: ৬৭৪০, সহিহু মুসলিম: ১৬৮১। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত।
৮. সহিহুল বুখারি: ২৪৭৩, সহিহু মুসলিম: ১৬১৩। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত।
৯. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ কৃত মুসনাদু আহমাদের বর্ধিত সংস্করণ: ২২২৭২।
১০. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৬৫, সুনানুত তিরমিজি: ৬৭০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৯৫। আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত।
১১. সুনানু আবি দাউদ: ৩০৭৩, সুনানুত তিরমিজি: ১৩৭৮। সাইদ বিন জাইদ (রা) থেকে বর্ণিত।