📄 স্বীকারোক্তি বা প্রমাণ ব্যতিত বিবাদীর বিরুদ্ধে ফয়সালা করতেন না
ওয়াইল বিন হুজর (রা) বলেন, 'আমি একদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে চামড়ার রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে এল এবং বলল, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এই ব্যক্তি আমার ভাইকে হত্যা করেছে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি তাকে হত্যা করেছ?” তখন লোকটি (বাদী) বলল, "যদি সে তা স্বীকার না করে, তবে আমি তার বিপক্ষে সাক্ষী দাঁড় করাব।” আর বিবাদী বলল, "হাঁ, আমি তাকে হত্যা করেছি।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করেছ?" হত্যাকারী লোকটি বলল, "আমি এবং সে গাছের পাতা সংগ্রহ করছিলাম। এমন সময় সে আমাকে গালি দিলে আমার রাগ চড়ে গেল। তখন আমি কুঠার দ্বারা তার মাথায় আঘাত করলাম। এভাবে আমি তাকে হত্যা করেছি।” তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তোমার কি এমন কোনো সম্পদ আছে, যার দ্বারা দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করতে পারবে?" তিনি বললেন, "আমার কাছে একটি কম্বল ও কুঠার ব্যতীত আর কিছুই নেই।” তখন তিনি বললেন, "তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা কি তোমাকে ক্রয় করবে (মুক্ত করিয়ে নেবে)?" সে উত্তর দিল, "আমার সম্প্রদায়ের কাছে আমার এতখানি মর্যাদা নেই।” তখন তিনি তার বন্ধনের দড়ি নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশের দিকে নিক্ষেপ করে দিলেন এবং বললেন, "তোমার বিবাদীর ব্যাপারে তুমিই বুঝে নাও।” সে তাকে নিয়ে যেতে উদ্যত হলো। যখন সে ফিরে যেতে লাগল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি সে তাকে হত্যা করে, তবে সেও তার সমকক্ষ হয়ে যাবে।” এ কথা শুনে সে ফিরে আসলো এবং বলল, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি শুনতে পেয়েছি যে, আপনি বলেছেন, "যদি সে তাকে হত্যা করে, তবে সে তার সমকক্ষ হয়ে যাবে।" আমি তো তাকে আপনার নির্দেশেই ধরেছি।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি চাও না যে, সে তোমার এবং তোমার ভাইয়ের পাপের বোঝা গ্রহণ করুক।" তিনি বললেন, "জি, হাঁ। অবশ্যই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে এমনই হবে।" বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন সে হত্যাকারীর বন্ধনের দড়ি ছুড়ে ফেলল এবং তাকে মুক্ত করে দিল।'¹
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৬৮০।
📄 শরিয়তবিরোধী ফয়সালা বাতিল করে দিতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'দুব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করতে আসলেন। তাদের একজন বললেন, "আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করুন।” দ্বিতীয়জন বললেন-যিনি প্রথমজনের তুলনায় অধিক জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন- "জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করুন আর অনুমতি দিন, যেন আমরা কথা শুরু করতে পারি।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ, কথা শুরু করো।” তিনি বললেন, "আমার ছেলে এ লোকের বাড়িতে মজুর ছিল। অতঃপর তার স্ত্রীর সঙ্গে সে ব্যভিচার করে। লোকেরা আমাকে বলল, "তোমার ছেলের ওপর রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) ওয়াজিব হয়েছে।" তখন আমার ছেলেকে একশ ছাগল এবং একটি বাঁদির বিনিময়ে এর নিকট হতে মুক্ত করে এনেছি। পরে আমি আলিমদের নিকট জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন, "তোমার ছেলের ওপর একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে। আর ওই নারীকে রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা) করতে হবে।" সব শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'সেই সত্তার কসম-যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করব। বাঁদি ও বকরিসমূহ তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে, আর তোমার ছেলেকে একশ বেত্রাঘাতসহ এক বছরের নির্বাসন দেওয়া হবে।'
আর অপরজনের ব্যাপারে বললেন:
'আর তুমি হে উনাইস (আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে), তুমি আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর নিকট যাবে, সে যদি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে, তাহলে তাকে রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা) করবে।'
বর্ণনাকারী বললেন, 'পরদিন সকালে উনাইস (রা) মহিলাটির কাছে গেলেন এবং মহিলাটি ব্যভিচার করার কথা স্বীকার করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ অনুযায়ী তাকে রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করা হলো।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
শরয়ি বিধানের বিপরীত মনগড়া মীমাংসা করলে তা বাতিলযোগ্য এবং এতে যে মাল-সম্পদ দেওয়া হয়েছে, তা ফেরত নেওয়া হবে।
ইবনে দাকিকুল ইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এখান থেকে কিছু ফকিহ কর্তৃক বর্ণিত একটি মাসআলার দুর্বলতা প্রমাণিত হয়। তারা বলেছেন, "ক্রেতা-বিক্রেতা পরস্পর রাজি থাকলে এবং পণ্যে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দিলে ফাসিদ ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেও পণ্যে হস্তক্ষেপ করার অধিকার সাব্যস্ত হবে।" অথচ সঠিক মাসআলা হলো, পণ্যে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য ক্রয়-বিক্রয় সহিহ হওয়া শর্ত।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৬৯৫, সহিহু মুসলিম: ১৬৯৮।
২. ফাতহুল বারি: ১২/১৪২।
📄 মিথ্যা মামলা দায়ের করার ব্যাপারে সতর্ক করতেন
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সুপারিশ করে, সে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যে ব্যক্তি জেনেশুনে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে, সে মামলা প্রত্যাহার করা পর্যন্ত আল্লাহর ক্রোধের মধ্যে থাকে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের ওপর এমন অপবাদ আরোপ করে, যা থেকে সে পবিত্র, যতক্ষণ না সে তা থেকে তাওবা করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাকে দোজখের কাদার মধ্যে আবদ্ধ রাখবেন।'¹
ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনো ব্যক্তি যদি মামলা-মোকদ্দমা সম্পর্কে পারদর্শী হয়-চাই দ্বীনি বিষয়ে হোক, বা দুনিয়াবি বিষয়ে-সে যদি যেকোনো উপায়ে বাতিল পক্ষকে বিজয়ী করে নেয় অর্থাৎ দলিল-প্রমাণ সুন্দর ও গোছালোভাবে উপস্থাপন করে বিচারককে বিভ্রান্ত করে বাতিলের পক্ষে ফয়সালা আদায় করে নেয়, তার এই কাজ চরম পর্যায়ের হারাম এবং তা মুনাফিকদের অন্যতম খারাপ চরিত্র।'²
টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৯৭।
২. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম ২/৪৮৬।
📄 বিবাদ নিরসনে নিজের পক্ষ থেকে অর্থ ব্যয় করতেন
সাহল বিন আবু হাসমা (রা) থেকে বর্ণিত, 'মুহাইয়িসা বিন মাসউদ (রা) ও আব্দুল্লাহ বিন সাহল (রা) অনটনগ্রস্ত হয়ে খাইবারের দিকে গমন করলেন। অতঃপর খাইবারের খেজুর বাগানের নিকট এসে তারা পরস্পর পৃথক হয়ে গেলেন। সে সুযোগে আব্দুল্লাহ বিন সাহলের (রা) ওপর দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করে বসল। তখন তার ঘাড় মটকে গিয়ে তিনি মারা গেলেন। অতঃপর তাকে একটি কূপে ফেলে দেওয়া হয়। এদিকে তার সঙ্গীরা তাকে খুঁজে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হলেন। তখন তারা তাকে একটি কূপের মধ্যে খুঁজে পেলেন এবং সেখান থেকে বের করে এনে তাকে দাফন করলেন। অতঃপর তার ভাই আব্দুর রহমান (রা) এবং দুই চাচাতো ভাই হুয়াইয়িসা (রা) ও মুহাইয়িসা (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। তাদের মধ্যে আব্দুর রহমান (রা) বয়সে সবার ছোট ছিলেন এবং তিনিই রক্তপণের হকদার ছিলেন। তাই তিনি ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বয়সে যে বড়, সেই প্রথমে কথা বলো।" তখন আব্দুর রহমান (রা) পেছনে চলে আসলেন এবং হুয়াইয়িসা (রা) কথা বললেন। তার কথা শেষ হলে মুহাইয়িসা (রা) কথা বললেন। অতঃপর তাদের সঙ্গীর ব্যাপারে আব্দুর রহমান (রা) কথা বললেন। তারা সবাই বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, খাইবারের একটি কূপে আমরা আব্দুল্লাহ বিন সাহলকে (রা) নিহত অবস্থায় পেয়েছি। আর খাইবারের ইহুদিরা ছাড়া আমাদের আর কোনো শত্রু নেই।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কাকে সন্দেহ করছ?” তারা জানালেন, "আমাদের সন্দেহ, ইহুদিরাই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে পত্র মারফত ইহুদিদের নিকট জানতে চাইলে তারা প্রত্যুত্তর দিল, "আমরা তাকে হত্যা করিনি।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে তোমরা পঞ্চাশবার শপথ করে বলো যে, তাকে ইহুদিরাই হত্যা করেছে।" মুসলিমের (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনায় এসেছে, 'তাদের কোনো একজনকে অভিযুক্ত করে তোমাদের পঞ্চাশজন লোক কসম করো, তাহলে তার দিয়াত দেওয়া হবে।' মুসনাদে আহমাদের (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনায় (হাদিস: ১৫৬৬৪) এসেছে, 'তোমরা হত্যাকারীর নাম বলো, অতঃপর তার বিরুদ্ধে পঞ্চাশবার শপথ করো, তখন আমি ওই ব্যক্তিকে তোমাদের সোপর্দ করে দেবো।' বাইহাকির (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনায় (হাদিস: ১৬৮৬৮) এসেছে, 'তোমরা কি পঞ্চাশবার শপথ করে হত্যাকারীকে কিসাসের যোগ্য করতে পারবে?' 'তারা বললেন, "আমরা যা দেখিনি, তার ওপর কী করে শপথ করব? যা সম্পর্কে আমরা দৃঢ়ভাবে জানি না, সে সম্পর্কে শপথ করতে পারব না। কেননা, আমরা জানি না, তাকে কে হত্যা করেছে? তবে ইহুদিরা যেহেতু আমাদের শত্রু আর হত্যা তাদের এলাকাতেই হয়েছে (তাই তাদেরকেই আমরা সন্দেহ করি)।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে ইহুদিরা এ কথার ওপর পঞ্চাশবার শপথ করুক যে, তাকে তারা হত্যা করেনি। ফলে তারা তোমাদের সঙ্গীর রক্তপণ থেকে মুক্তি পাবে।” তারা বললেন, "আমরা ইহুদিদের শপথ বিশ্বাস করব না। কেননা, যেখানে তারা কুফরের মতো সবচেয়ে মারাত্মক পাপে লিপ্ত, সেখানে অপরাধ না করার ওপর তারা মিথ্যা শপথ করবে না, এর নিশ্চয়তা কী?" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রক্ত বৃথা যাওয়াকে অপছন্দ করলেন। ফলে নিজের পক্ষ থেকে একশটি উট দিয়াত হিসেবে তাদের দান করলেন। সাহল (রা) বলেন, "আল্লাহর কসম, সেগুলোর মধ্য থেকে একটি লাল উষ্ট্রীর কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি, যে আমাকে উটগুলো একত্র করার সময় লাথি মেরেছিল।"'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাদ নিরসন করার জন্য এবং দুপক্ষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্যই নিজের পক্ষ থেকে দিয়াত আদায় করলেন। কারণ, নিহতের স্বজনরা কিসাস বা দিয়াতের অধিকার তখনই লাভ করে, যখন তারা শপথ করে অথবা বিবাদীদের শপথ করতে বলে (আর তারা শপথ করতে অস্বীকার করে)। কিন্তু এখানে কোনোটাই সম্ভব হয়নি। এতে সঙ্গীর দিয়াত না পেয়ে তাদের মন ভেঙে গেল। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়াত প্রদান করে তাদের ক্ষতে প্রলেপ দিলেন এবং নিজের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষের মাঝে মীমাংসা করে বিবাদ মিটিয়ে ফেলার ইচ্ছা করলেন। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্রনায়কের জন্য সর্বস্তরের লোকদের উপকারিতার দিকে লক্ষ রাখা এবং তাদের পারস্পরিক বিবাধ মিটিয়ে দেওয়া জরুরি।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৭০২, সহিহ মুসলিম: ১৬৬৯।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৪৭।