📄 বাহ্যিক দলিলের কারণে কারও হক কারও জন্য হালাল হয় না
উম্মে সালামা (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে দুজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু অনাবাদি জমির ব্যাপারে বিচার প্রার্থনা করতে আসলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমি একজন মানুষ। আর তোমরা আমার কাছে বিচার প্রার্থনা করতে আসো। তখন এমনও হওয়া সম্ভব যে, তোমাদের একজন তার দলিল-প্রমাণকে অন্যের তুলনায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে, ফলে আমি শোনার ওপর ভিত্তি করে তার পক্ষে ফয়সালা দিয়ে দিই। সুতরাং আমি যদি কারও পক্ষে তার ভাইয়ের হকের ফয়সালা করে থাকি, সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা, তখন আমি আসলে তার জন্য জাহান্নামেরই একটি অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছি।'
তা শুনে তারা উভয়ে কেঁদে দিলেন এবং একযোগে বললেন, "যে হক আমি তলব করছি, তা আমার এই বন্ধুর।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন:
'তোমরা দুজন যা করার তা করেছ, এখন তোমরা উভয়ের মধ্যে তা সমানভাবে বণ্টন করে নাও। বণ্টন করার ক্ষেত্রে হকপন্থা অবলম্বন করবে এবং লটারির মাধ্যমে অংশ বেছে নেবে। অতঃপর তোমরা একে অপরকে নিজের প্রাপ্ত অংশ থেকে ক্ষমা করে দেবে।'¹
খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিস থেকে কয়েকটি ফিকহি মাসআলা বের হয়: প্রকাশ্য দলিল-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা করা ওয়াজিব। বিচারকের রায় কোনো হারামকে হালাল করে না এবং কোনো হালালকে হারাম করে না। বিচারক কোনো ভুল ফয়সালা করলে সেটা কেবল বাহ্যিকভাবেই কার্যকর হবে। অভ্যন্তরীণভাবে ও আখিরাতের বিবেচনায় তা কার্যকর হবে না।'²
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসটি ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাফিয়ি (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ও তাবিয়িনের (রাহিমাহুল্লাহ) অধিকাংশ উলামা ও ফুকাহার মতের সপক্ষে দলিল। কারণ, তাদের মত হলো, "বিচারকের ফয়সালা অভ্যন্তরীণভাবে বিধানকে কার্যকর করে না এবং কোনো হারামকে হালাল করে না। সুতরাং দুজন ব্যক্তি যদি কারও পক্ষে কোনো সম্পদের ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় আর বিচারক তাদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তার পক্ষে ফয়সালা দিয়ে দেন, তখন তার জন্য সে সম্পদ হালাল হবে না। অনুরূপভাবে দুজন ব্যক্তি যদি কারও বিপক্ষে কাউকে হত্যা করার ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, তখন নিহতের অভিভাবক যদি তাদের মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে জানে, তাহলে সে তার থেকে কিসাস ও দিয়াত-কোনোটিই নিতে পারবে না। আর যদি দুজন ব্যক্তি কোনো মহিলার ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে, আর তাদের কথার ওপর ভিত্তি করে বিচারক তালাকের ফয়সালা দিয়ে দেন-তখন যে ব্যক্তি তাদের মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে জানে, তার জন্য ওই মহিলাকে বিয়ে করা বৈধ হবে না।'³
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ ২৬৭৬০, সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৮৩।
২. আওনুল মাবুদ: ৯/৩৬২।
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/৬।
📄 স্বীকারোক্তি বা প্রমাণ ব্যতিত বিবাদীর বিরুদ্ধে ফয়সালা করতেন না
ওয়াইল বিন হুজর (রা) বলেন, 'আমি একদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে চামড়ার রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে এল এবং বলল, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এই ব্যক্তি আমার ভাইকে হত্যা করেছে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি তাকে হত্যা করেছ?” তখন লোকটি (বাদী) বলল, "যদি সে তা স্বীকার না করে, তবে আমি তার বিপক্ষে সাক্ষী দাঁড় করাব।” আর বিবাদী বলল, "হাঁ, আমি তাকে হত্যা করেছি।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করেছ?" হত্যাকারী লোকটি বলল, "আমি এবং সে গাছের পাতা সংগ্রহ করছিলাম। এমন সময় সে আমাকে গালি দিলে আমার রাগ চড়ে গেল। তখন আমি কুঠার দ্বারা তার মাথায় আঘাত করলাম। এভাবে আমি তাকে হত্যা করেছি।” তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তোমার কি এমন কোনো সম্পদ আছে, যার দ্বারা দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করতে পারবে?" তিনি বললেন, "আমার কাছে একটি কম্বল ও কুঠার ব্যতীত আর কিছুই নেই।” তখন তিনি বললেন, "তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা কি তোমাকে ক্রয় করবে (মুক্ত করিয়ে নেবে)?" সে উত্তর দিল, "আমার সম্প্রদায়ের কাছে আমার এতখানি মর্যাদা নেই।” তখন তিনি তার বন্ধনের দড়ি নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশের দিকে নিক্ষেপ করে দিলেন এবং বললেন, "তোমার বিবাদীর ব্যাপারে তুমিই বুঝে নাও।” সে তাকে নিয়ে যেতে উদ্যত হলো। যখন সে ফিরে যেতে লাগল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি সে তাকে হত্যা করে, তবে সেও তার সমকক্ষ হয়ে যাবে।” এ কথা শুনে সে ফিরে আসলো এবং বলল, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি শুনতে পেয়েছি যে, আপনি বলেছেন, "যদি সে তাকে হত্যা করে, তবে সে তার সমকক্ষ হয়ে যাবে।" আমি তো তাকে আপনার নির্দেশেই ধরেছি।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি চাও না যে, সে তোমার এবং তোমার ভাইয়ের পাপের বোঝা গ্রহণ করুক।" তিনি বললেন, "জি, হাঁ। অবশ্যই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে এমনই হবে।" বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন সে হত্যাকারীর বন্ধনের দড়ি ছুড়ে ফেলল এবং তাকে মুক্ত করে দিল।'¹
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৬৮০।
📄 শরিয়তবিরোধী ফয়সালা বাতিল করে দিতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'দুব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করতে আসলেন। তাদের একজন বললেন, "আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করুন।” দ্বিতীয়জন বললেন-যিনি প্রথমজনের তুলনায় অধিক জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন- "জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করুন আর অনুমতি দিন, যেন আমরা কথা শুরু করতে পারি।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ, কথা শুরু করো।” তিনি বললেন, "আমার ছেলে এ লোকের বাড়িতে মজুর ছিল। অতঃপর তার স্ত্রীর সঙ্গে সে ব্যভিচার করে। লোকেরা আমাকে বলল, "তোমার ছেলের ওপর রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) ওয়াজিব হয়েছে।" তখন আমার ছেলেকে একশ ছাগল এবং একটি বাঁদির বিনিময়ে এর নিকট হতে মুক্ত করে এনেছি। পরে আমি আলিমদের নিকট জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন, "তোমার ছেলের ওপর একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে। আর ওই নারীকে রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা) করতে হবে।" সব শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'সেই সত্তার কসম-যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করব। বাঁদি ও বকরিসমূহ তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে, আর তোমার ছেলেকে একশ বেত্রাঘাতসহ এক বছরের নির্বাসন দেওয়া হবে।'
আর অপরজনের ব্যাপারে বললেন:
'আর তুমি হে উনাইস (আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে), তুমি আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর নিকট যাবে, সে যদি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে, তাহলে তাকে রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা) করবে।'
বর্ণনাকারী বললেন, 'পরদিন সকালে উনাইস (রা) মহিলাটির কাছে গেলেন এবং মহিলাটি ব্যভিচার করার কথা স্বীকার করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ অনুযায়ী তাকে রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করা হলো।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
শরয়ি বিধানের বিপরীত মনগড়া মীমাংসা করলে তা বাতিলযোগ্য এবং এতে যে মাল-সম্পদ দেওয়া হয়েছে, তা ফেরত নেওয়া হবে।
ইবনে দাকিকুল ইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এখান থেকে কিছু ফকিহ কর্তৃক বর্ণিত একটি মাসআলার দুর্বলতা প্রমাণিত হয়। তারা বলেছেন, "ক্রেতা-বিক্রেতা পরস্পর রাজি থাকলে এবং পণ্যে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দিলে ফাসিদ ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেও পণ্যে হস্তক্ষেপ করার অধিকার সাব্যস্ত হবে।" অথচ সঠিক মাসআলা হলো, পণ্যে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য ক্রয়-বিক্রয় সহিহ হওয়া শর্ত।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৬৯৫, সহিহু মুসলিম: ১৬৯৮।
২. ফাতহুল বারি: ১২/১৪২।
📄 মিথ্যা মামলা দায়ের করার ব্যাপারে সতর্ক করতেন
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সুপারিশ করে, সে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যে ব্যক্তি জেনেশুনে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে, সে মামলা প্রত্যাহার করা পর্যন্ত আল্লাহর ক্রোধের মধ্যে থাকে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের ওপর এমন অপবাদ আরোপ করে, যা থেকে সে পবিত্র, যতক্ষণ না সে তা থেকে তাওবা করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাকে দোজখের কাদার মধ্যে আবদ্ধ রাখবেন।'¹
ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনো ব্যক্তি যদি মামলা-মোকদ্দমা সম্পর্কে পারদর্শী হয়-চাই দ্বীনি বিষয়ে হোক, বা দুনিয়াবি বিষয়ে-সে যদি যেকোনো উপায়ে বাতিল পক্ষকে বিজয়ী করে নেয় অর্থাৎ দলিল-প্রমাণ সুন্দর ও গোছালোভাবে উপস্থাপন করে বিচারককে বিভ্রান্ত করে বাতিলের পক্ষে ফয়সালা আদায় করে নেয়, তার এই কাজ চরম পর্যায়ের হারাম এবং তা মুনাফিকদের অন্যতম খারাপ চরিত্র।'²
টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৯৭।
২. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম ২/৪৮৬।