📄 মিথ্যা শপথ করার ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন করতেন
ওয়াইল বিন হুজর (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। ইত্যবসরে দুব্যক্তি তাঁর কাছে এসে একটি ভূমি সম্পর্কে বিচার প্রার্থনা করলেন। তন্মধ্যে একজন বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, জাহিলিয়্যাতের যুগে এ ব্যক্তি আমার ভূমি জবরদখল করে নিয়েছিল।" বর্ণনাকারী বলেন, 'বিচার প্রার্থনাকারী ছিল ইমরুল কাইস বিন আবিস আল-কিনদি, আর তার বিবাদী ছিল রাবিআ বিন আবদান।' 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার সাক্ষী পেশ করো।” লোকটি বললেন, "আমার কোনো সাক্ষী নেই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে বিবাদী থেকে কসম নেওয়া হবে।” লোকটি বললেন, "তবে তো সে মিথ্যা কসম করে সম্পত্তি গ্রাস করে ফেলবে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তার কাছ থেকে তোমার এতটুকুই প্রাপ্য।" বর্ণনাকারী বলেন, 'এরপর বাদী যখন শপথ করার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সম্পত্তি গ্রাস করবে, সে আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবেন।'¹
রজা বিন হাইওয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং উরস বিন আমিরা (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা আদি (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, 'কিন্দা এলাকার ইমরুল কাইস বিন আবিস নামক এক ব্যক্তি এবং হাজরামাওত এলাকার এক ব্যক্তি একটি জমির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরামাওতের লোকটির কাছে সাক্ষী তলব করলেন। কিন্তু তার কাছে সাক্ষী ছিল না। তখন তিনি কিন্দার লোকটিকে কসম করতে বললেন। এতে হাজরামাওতের লোকটি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, তাকে শপথ করার সুযোগ দেওয়া হলে সে মিথ্যা শপথ করে আমার জমি নিয়ে নেবে।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য মিথ্যা শপথ করবে, সে আল্লাহ তাআলার সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবেন।'
রজা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন:
'যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রয় করে, আখিরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর তাদের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না। তাদের প্রতি (করুণার) দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না। বস্তুত, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।'²
ইমরুল কাইস (রা) বললেন, "যে ব্যক্তি এই জমির দাবি ছেড়ে দেবে, সে কী পুরস্কার পাবে?" তিনি বললেন, "জান্নাত।” তখন ইমরুল কাইস (রা) বললেন, "তাহলে সাক্ষী থাকুন, আমি এই জমির পুরোটা তার জন্য ছেড়ে দিয়েছি।"'³
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
মিথ্যা শপথ করে মুসলমানের হক গ্রাস করলে কঠোর শাস্তি রয়েছে।
বিচারপ্রার্থী থেকে মিথ্যা শপথ করার আশঙ্কা থাকলে বিচারক তাকে মিথ্যা শপথ করার ভয়াবহতা জানিয়ে উপদেশ প্রদান করবেন।⁴
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৩৯।
২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ৭৭।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১৭২৬৩।
৪. ফাতহুল বারি: ১১/৫৬৩।
📄 প্রকাশ্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ফয়সালা করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরের দরোজার সামনে একটি ঝগড়া শুনতে পেলেন। তখন তিনি তাদের নিকট এসে বললেন:
'আমি একজন মানুষ। আর আমার কাছে মানুষ বিচার প্রার্থনা করতে আসে। তখন এমনও হওয়া সম্ভব যে, তাদের মধ্যে একপক্ষ খুব সুন্দর ও গোছালোভাবে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করে; ফলে আমি তাকে সত্য মনে করে তার পক্ষে ফয়সালা দিয়ে দিই। এখন আমি যদি তার জন্য কোনো মুসলমানের হকের ফয়সালা করে থাকি, সেটা তার জন্য জাহান্নামের অংশ। এবার তা গ্রহণ করা, না করা তার ইচ্ছাধীন।'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে মানুষ বলে তাঁর ভেতরে মানবিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা থাকার কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষের কাছে অদৃশ্য ও গোপন বিষয়ের জ্ঞান নেই। অদৃশ্যের জ্ঞান থেকে যে পরিমাণ আল্লাহ তাদের জানিয়ে দেন, তারা কেবল তা-ই জানতে পারে। তিনি এটাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ থেকে যে রকম ভুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনই তাঁর থেকেও ভুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, তিনি বাহ্যিক ও প্রকাশ্য দলিল-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা করেন এবং গোপনীয়তা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেন। সুতরাং তিনি নিয়ম অনুযায়ী সাক্ষী-প্রমাণ ও শপথের ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা দিয়ে দেন। এ ফয়সালা বাস্তবতাবিরোধী হলেও, এতে তাঁর কোনো দোষ নেই। কেননা, তিনি শুধু বাহ্যিক দলিল-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা করতে আদিষ্ট। গোপনীয়তা অনুসন্ধান করা তাঁর দায়িত্ব নয়।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৪৫৮, সহিহু মুসলিম: ১৭১৩।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/৫।
📄 বাহ্যিক দলিলের কারণে কারও হক কারও জন্য হালাল হয় না
উম্মে সালামা (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে দুজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু অনাবাদি জমির ব্যাপারে বিচার প্রার্থনা করতে আসলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমি একজন মানুষ। আর তোমরা আমার কাছে বিচার প্রার্থনা করতে আসো। তখন এমনও হওয়া সম্ভব যে, তোমাদের একজন তার দলিল-প্রমাণকে অন্যের তুলনায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে, ফলে আমি শোনার ওপর ভিত্তি করে তার পক্ষে ফয়সালা দিয়ে দিই। সুতরাং আমি যদি কারও পক্ষে তার ভাইয়ের হকের ফয়সালা করে থাকি, সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা, তখন আমি আসলে তার জন্য জাহান্নামেরই একটি অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছি।'
তা শুনে তারা উভয়ে কেঁদে দিলেন এবং একযোগে বললেন, "যে হক আমি তলব করছি, তা আমার এই বন্ধুর।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন:
'তোমরা দুজন যা করার তা করেছ, এখন তোমরা উভয়ের মধ্যে তা সমানভাবে বণ্টন করে নাও। বণ্টন করার ক্ষেত্রে হকপন্থা অবলম্বন করবে এবং লটারির মাধ্যমে অংশ বেছে নেবে। অতঃপর তোমরা একে অপরকে নিজের প্রাপ্ত অংশ থেকে ক্ষমা করে দেবে।'¹
খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিস থেকে কয়েকটি ফিকহি মাসআলা বের হয়: প্রকাশ্য দলিল-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা করা ওয়াজিব। বিচারকের রায় কোনো হারামকে হালাল করে না এবং কোনো হালালকে হারাম করে না। বিচারক কোনো ভুল ফয়সালা করলে সেটা কেবল বাহ্যিকভাবেই কার্যকর হবে। অভ্যন্তরীণভাবে ও আখিরাতের বিবেচনায় তা কার্যকর হবে না।'²
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসটি ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাফিয়ি (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ও তাবিয়িনের (রাহিমাহুল্লাহ) অধিকাংশ উলামা ও ফুকাহার মতের সপক্ষে দলিল। কারণ, তাদের মত হলো, "বিচারকের ফয়সালা অভ্যন্তরীণভাবে বিধানকে কার্যকর করে না এবং কোনো হারামকে হালাল করে না। সুতরাং দুজন ব্যক্তি যদি কারও পক্ষে কোনো সম্পদের ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় আর বিচারক তাদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তার পক্ষে ফয়সালা দিয়ে দেন, তখন তার জন্য সে সম্পদ হালাল হবে না। অনুরূপভাবে দুজন ব্যক্তি যদি কারও বিপক্ষে কাউকে হত্যা করার ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, তখন নিহতের অভিভাবক যদি তাদের মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে জানে, তাহলে সে তার থেকে কিসাস ও দিয়াত-কোনোটিই নিতে পারবে না। আর যদি দুজন ব্যক্তি কোনো মহিলার ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে, আর তাদের কথার ওপর ভিত্তি করে বিচারক তালাকের ফয়সালা দিয়ে দেন-তখন যে ব্যক্তি তাদের মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে জানে, তার জন্য ওই মহিলাকে বিয়ে করা বৈধ হবে না।'³
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ ২৬৭৬০, সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৮৩।
২. আওনুল মাবুদ: ৯/৩৬২।
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/৬।
📄 স্বীকারোক্তি বা প্রমাণ ব্যতিত বিবাদীর বিরুদ্ধে ফয়সালা করতেন না
ওয়াইল বিন হুজর (রা) বলেন, 'আমি একদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে চামড়ার রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে এল এবং বলল, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এই ব্যক্তি আমার ভাইকে হত্যা করেছে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি তাকে হত্যা করেছ?” তখন লোকটি (বাদী) বলল, "যদি সে তা স্বীকার না করে, তবে আমি তার বিপক্ষে সাক্ষী দাঁড় করাব।” আর বিবাদী বলল, "হাঁ, আমি তাকে হত্যা করেছি।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করেছ?" হত্যাকারী লোকটি বলল, "আমি এবং সে গাছের পাতা সংগ্রহ করছিলাম। এমন সময় সে আমাকে গালি দিলে আমার রাগ চড়ে গেল। তখন আমি কুঠার দ্বারা তার মাথায় আঘাত করলাম। এভাবে আমি তাকে হত্যা করেছি।” তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তোমার কি এমন কোনো সম্পদ আছে, যার দ্বারা দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করতে পারবে?" তিনি বললেন, "আমার কাছে একটি কম্বল ও কুঠার ব্যতীত আর কিছুই নেই।” তখন তিনি বললেন, "তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা কি তোমাকে ক্রয় করবে (মুক্ত করিয়ে নেবে)?" সে উত্তর দিল, "আমার সম্প্রদায়ের কাছে আমার এতখানি মর্যাদা নেই।” তখন তিনি তার বন্ধনের দড়ি নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশের দিকে নিক্ষেপ করে দিলেন এবং বললেন, "তোমার বিবাদীর ব্যাপারে তুমিই বুঝে নাও।” সে তাকে নিয়ে যেতে উদ্যত হলো। যখন সে ফিরে যেতে লাগল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি সে তাকে হত্যা করে, তবে সেও তার সমকক্ষ হয়ে যাবে।” এ কথা শুনে সে ফিরে আসলো এবং বলল, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি শুনতে পেয়েছি যে, আপনি বলেছেন, "যদি সে তাকে হত্যা করে, তবে সে তার সমকক্ষ হয়ে যাবে।" আমি তো তাকে আপনার নির্দেশেই ধরেছি।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি চাও না যে, সে তোমার এবং তোমার ভাইয়ের পাপের বোঝা গ্রহণ করুক।" তিনি বললেন, "জি, হাঁ। অবশ্যই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে এমনই হবে।" বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন সে হত্যাকারীর বন্ধনের দড়ি ছুড়ে ফেলল এবং তাকে মুক্ত করে দিল।'¹
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৬৮০।