📄 তারা সুন্দর কিছু উদ্ভাবন করলে তার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করতেন
হানশ বিন মুতামির (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আলি (রা) ইয়ামানে থাকা অবস্থায় কিছু লোক সিংহ ধরার জন্য গর্ত খনন করল। অতঃপর সেখানে একটি সিংহ পতিত হলো। লোকজন কৌতূহলী হয়ে সিংহটিকে দেখতে লাগল, তখন সেখানে একজন ব্যক্তি পড়ে গেল। পতিত লোকটি (পড়ে যাওয়ার সময়) এক ব্যক্তিকে টেনে ধরল, সে আরেকজনকে এবং সে আরেকজনকে টেনে ধরলে তারা চারজনই গর্তে পতিত হলো। তখন সিংহটি তাদের আহত করল। তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি বর্শা নিয়ে সিংহের মুখোমুখি হলো এবং তাকে মেরে ফেলল। কিন্তু ততক্ষণে সিংহের আঘাতে চার ব্যক্তিই মারা গেল।'
বর্ণনাকারী বলেন, 'এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে ঝগড়া বেধে গেল এবং একপর্যায়ে তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিল। সেই মুহূর্তে আলি (রা) তাদের নিকট গিয়ে বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই তোমরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাও? আমি তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিচ্ছি, সেটা তোমাদের মনঃপূত হলে তো ভালো কথা, নতুবা তোমরা লড়াই থেকে বিরত থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও। তিনিই তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেবেন। এরপরেও যদি কেউ বাড়াবাড়ি করে, তাহলে তার কোনো অধিকার নেই। (আমার ফয়সালা হলো) যে সকল গোত্রের লোক গর্তটি খনন করেছে, তাদের নিকট থেকে এক দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ, আরেক দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ, আরেক দিয়াতের অর্ধাংশ এবং আরেকটি পূর্ণ দিয়াত একত্র করো। তারপর প্রথমজনকে এক-চতুর্থাংশ, দ্বিতীয়জনকে এক-চতুর্থাংশ, তৃতীয়জনকে অর্ধেক এবং চতুর্থজনকে পূর্ণ দিয়াত দান করো।"'
বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন কিছু লোক তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হলো এবং কিছু লোক সন্তুষ্ট হতে পারল না। তারা বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেশ করার জন্য তাঁর কাছে গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাকামে ইবরাহিমের পাশে ছিলেন। তারা তাঁকে ঘটনার বিবরণ শোনাল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "আমি তোমাদের বিবাদ মিটিয়ে দিচ্ছি" বলে ঠেস দিয়ে বসলেন। তখন আগন্তুকদের একজন বললেন, "আলি (রা) আমাদের এই বিবাদের ফয়সালা করেছেন।” এই বলে লোকটি আলি (রা)-এর ফয়সালার বিবরণ শোনাল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি (রা)-এর ফয়সালাকে যথার্থ বলে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।'¹
আলি (রা)-এর ফয়সালা যথার্থ হওয়ার কারণ হলো, নিহত চারজনই উপস্থিত লোকদের অনিচ্ছাকৃত ধাক্কাধাক্কির ফলে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে। তাই উপস্থিত সবার ওপর অনিচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত ওয়াজিব হলো। প্রথমজন অনিচ্ছাকৃত ধাক্কাধাক্কির কারণে নিহত, আবার সে টেনে ধরার কারণে বাকি তিনজনের হত্যাকারী। তাই সে নিহত হওয়ার কারণে দিয়াত পাবে, কিন্তু বাকি তিনজনকে হত্যা করার কারণে তিন-চতুর্থাংশ সেখান থেকে বাদ যাবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ পাওয়ার কারণ হলো, বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বাকি দুজনকে হত্যা করার কারণে বাদ যাবে। তৃতীয় ব্যক্তি অর্ধেক পাওয়ার কারণ হলো, বাকি অর্ধেক একজনকে হত্যা করার কারণে বাদ যাবে। আর চতুর্থ ব্যক্তি পূর্ণ দিয়াত পাবে। কারণ, সে কাউকে হত্যা করেনি। ইবনুল আরাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী ফয়সালা।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)-এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। কারণ, তিনি তার মাঝে এমন কিছু গুণ দেখতে পেয়েছিলেন, যা তার মেধা ও প্রতিভার পরিচয় বহন করে। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর বক্ষের সাথে লাগালেন এবং বললেন:
'হে আল্লাহ, একে হিকমত (দ্বীনি প্রজ্ঞা বা ইলমে ফিকহ) দান করুন।'²
অপর বর্ণনায় আছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৌচাগারে প্রবেশ করলেন, তখন আমি তাঁর জন্য অজুর পানি রাখলাম। তিনি বললেন, "পানি কে রেখেছে?” কে রেখেছে তা জানতে পেরে তিনি বললেন:
'হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের ফিকহ বা প্রজ্ঞা দান করুন।'³
অপর বর্ণনায় এসেছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাইমুনা (রা)-এর গৃহে ছিলেন। তখন রাতে আমি তাঁর জন্য অজুর পানি রাখলাম। তখন মাইমুনা (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) আপনার জন্য অজুর পানি রেখেছে।” তখন তিনি বললেন:
'হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের ফিকহ ও প্রজ্ঞা এবং তাফসিরের ইলম দান করুন।'⁴
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে ইলমে ফিকহের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এবং এও বর্ণিত হয়েছে যে, কেউ কোনো উপকার করলে তার জন্য দোয়া করা মুসতাহাব।' তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দোয়া করেছিলেন, তা কবুল হয়েছিল, ফলে তিনি ইলমে ফিকহে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।⁵
ইবনে মুনির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'পানি রাখার কারণে দ্বীনের ফিকহ অর্জনের দোয়া করার মাঝে সামঞ্জস্য হলো, এমন অবস্থায় সাধারণত তিন ধরনের কাজ করা সম্ভব ছিল: ১. পানি শৌচাগারে রেখে আসা। ২. দরোজায় পানি রাখা, যেন তিনি সহজে পানি পেয়ে যান। ৩. কিছু না করা। তিনি দ্বিতীয়টা বেছে নিলেন। কারণ, প্রথমটি করলে পানির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতো। তৃতীয়টি করলে তাঁর পানি পেতে কষ্ট হতো। তাই তিনি দ্বিতীয়টিই বেছে নিলেন। এতে তার মেধা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দ্বীনি ফিকহ অর্জনের দোয়া করেছেন, যাতে তার মাধ্যমে তিনি উপকৃত হতে পারেন। আর ঠিক তা-ই হয়েছে।'⁶
ফলে ইবনে আব্বাস (রা) হয়ে উঠলেন সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুফাসসির, অথচ তিনি বয়সে ছোট ছিলেন। হিজরতের মাত্র তিন বছর পূর্বেই তার জন্ম হয়। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সহধর্মিণী মাইমুনা (রা)-এর নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাদে খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি নিয়মিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যে থাকার সৌভাগ্য লাভ করেন। তার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছেন। এসব কারণে তিনি প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন হয়ে ওঠেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, তখন ইবনে আব্বাস (রা)-এর বয়স ছিল তেরো বছর। ইবনে মাসউদ (রা) বলতেন, 'কুরআনের উত্তম ভাষ্যকার হলেন ইবনে আব্বাস (রা)।'⁷
ইবনে উমর (রা) বলেন, 'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর নাজিলকৃত বিষয় সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি হলেন ইবনে আব্বাস (রা)।'⁸
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ৫৭৪।
২. সহিহুল বুখারি: ২৩৫৬।
৩. সহিহুল বুখারি: ১৪৩, সহিহু মুসলিম: ২৪৭৭।
৪. মুসনাদু আহমাদ: ৩০২৪।
৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/৩৭।
৬. ফাতহুল বারি: ১/২৩২।
৭. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৬২৯১।
৮. আজুরি কৃত আশ-শারিআহ ৫/২২৭১।
📄 রাসূল ﷺ তাকে (ইবনে আব্বাস ) আপন সওয়ারির ওপর নিজের পেছনে বসালেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে ছিলাম। তিনি বললেন:
'হে বালক, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি: আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাজত করো, তিনি তোমার হিফাজত করবেন। আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাজত করো, তাঁকে তোমার পাশে পাবে। [সচ্ছলতার সময় তাঁর সাথে পরিচিত হও, অসচ্ছলতার সময় তিনি তোমাকে চিনবেন।] কিছু চাইতে হলে একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাও এবং সাহায্য কামনা করতে হলে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য কামনা করো। আর জেনে রাখো, সকল মানুষ যদি একত্রিত হয়ে তোমার উপকার করতে চায়, তবে আল্লাহ তাআলা যা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন, সেটা ছাড়া কোনো উপকার করতে পারবে না; আর যদি সকল মানুষ একত্রিত হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবে আল্লাহ তাআলা যা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন, সেটা ছাড়া কোনো ক্ষতি পারবে না। (তাকদির লেখার) কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে। [অপছন্দনীয় বিষয়ের (বিপদাপদের) ওপর ধৈর্যধারণ করলে অনেক কল্যাণ অর্জিত হয়। আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যের মাঝে নিহিত, সচ্ছলতা কষ্ট-মেহনতের মাঝে নিহিত। আর নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।]'¹
আমিরুল মুমিনিন উমর (রা)-ও তার প্রতিভার মূল্যায়ন করতেন। তাকে নিজের পাশে রাখতেন। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, 'আমাকে উমর (রা) বড় বড় বদরি সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সাথে বসাতেন। একদিন তাঁদের একজন অস্বস্তি প্রকাশ করে বললেন, "ও আমাদের সাথে বসে কেন, ও তো আমাদের ছেলেদের সমবয়সী?” তখন উমর (রা) বললেন, "সে কে, তা নিশ্চয় আপনারা জানেন।” অতঃপর একদিন তাঁদের ডাকলেন এবং আমাকেও তাঁদের সাথে ডাকলেন। আমার ধারণা, আসলে তাঁদেরকে আমার প্রতিভা দেখানোর জন্যই তিনি আমাকে তাঁদের সাথে ডেকেছিলেন। তখন তিনি সুরা আন-নাসর পড়ে বললেন, "এই সুরা সম্পর্কে আপনারা কী বলেন?" তাঁদের একজন বললেন, "এই সুরায় আমাদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, যখন আমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসবে এবং আমাদের বিজয় দান করা হবে, তখন যেন আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।” অপর এক বর্ণনায় আছে, 'তাঁরা বললেন, "এখানে শহর ও অট্টালিকাসমূহ বিজয় করার ব্যাপারে বলা হয়েছে।" তখন উমর (রা) আমাকে বললেন, "হে ইবনে আব্বাস, তুমিও কি তা-ই মনে করো?" আমি বললাম, "না।” তিনি বললেন, "তাহলে তোমার অভিমত কী?" আমি বললাম, "এই সুরার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এখানে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, "যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে-অর্থাৎ মক্কা-বিজয়। সেটাই হবে আপনার মৃত্যুর পূর্বাভাস। সুতরাং এ সময়ে আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করবেন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। অবশ্যই তিনি তাওবা কবুলকারী।" তখন উমর (রা) বললেন, "এ সুরার ব্যাপারে তোমার যে অভিমত, আমার অভিমতও ঠিক তা-ই।"'²
এই হাদিসের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস (রা)-এর ফজিলত প্রমাণিত হয়। আরও প্রমাণিত হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তার জন্য তাফসির ও ফিকহ জানার দোয়া করেছিলেন, তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে।³
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে আব্বাস (রা)-এর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও দ্বীনি পাণ্ডিত্য প্রসিদ্ধ ছিল। তদুপরি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিভিন্ন অবস্থা তিনি যেভাবে অনুসন্ধানি দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন এবং তা সংরক্ষণ করেছেন, সেভাবে অন্য কেউ করেনি। এ ছাড়াও তিনি বড় বড় সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জ্ঞান সংগ্রহ করেছেন।'⁴
তার ইলম-জ্ঞান এত বিস্তৃত ছিল যে, তিনি ভিন্ন ভিন্ন দিন ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের আসর করতেন। কোনো দিন শুধু ফিকহ সম্পর্কে আলোচনা করতেন। কোনো দিন কুরআনের তাফসির করতেন। কোনো দিন জিহাদসমূহের বৃত্তান্ত শোনাতেন। কোনো দিন কবিতার আসর বসাতেন। আবার কোনো দিন আরবের উপাখ্যান বর্ণনা করতেন।⁵
ইয়াকুব (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ সনদে ওয়াইল বিন হুজর (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একদা ইবনে আব্বাস (রা) সুরা আন-নুর পাঠ করার পর তার তাফসির করতে লাগলেন। তা শুনে এক ব্যক্তি মন্তব্য করল, "এমন তাফসির যদি দাইলাম গোত্রের লোকেরা শুনতে পেত, তবে তারা মুসলমান হয়ে যেত।"'⁶
তার স্মৃতিশক্তি খুবই তীক্ষ্ণ ছিল। একবার ইবনে আবি রাবিআ (রাহিমাহুল্লাহ) আশি শ্লোকবিশিষ্ট একটি কবিতা পাঠ করলেন। একবার শুনেই সেটা তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।⁷
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৫১৬, মুসনাদু আহমাদ: ২৮০০ (তৃতীয় বন্ধনীর ভেতরের অংশ মুসনাদ আহমাদে অতিরিক্ত এসেছে)।
২. সহিহুল বুখারি: ৪২৯৪।
৩. ফাতহুল বারি: ৮/৭৩৬।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৪/২৯০।
৫. আল-আলাম: ৪/৯৫।
৬. ফাতহুল বারি: ৭/১০০।
৭. আল-আলাম: ৪/৯৫।
📄 আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর প্রতিভার মূল্যায়ন করতেন
জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অন্তর্ভুক্ত এবং উচ্চস্তরের জ্ঞানী ছিলেন।'¹
আরেক জায়গায় বলেন, 'তিনি অল্পসংখ্যক তুখোড় মেধাবী আলিমদের মধ্য থেকে একজন ছিলেন।'²
শাকিক বিন সালামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) আমাদের ওয়াজ করার সময় বললেন:
'আল্লাহর কসম, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে সত্তরটিরও অধিক সুরা মুখস্ত করেছি। আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) জানেন যে, আমি তাঁদের চাইতে আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত, অথচ আমি তাঁদের চাইতে উত্তম নই।'
শাকিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁর কথা শুনে কী বলেন, তা শোনার জন্য আমি মজলিসে বসে রইলাম। কিন্তু কাউকে তাঁর কথার প্রতিবাদ করতে শুনিনি।'³
একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে কুরআন শুনতে চেয়েছিলেন। তখন তিনি 'সুরা আন-নিসা'র শুরু থেকে তিলাওয়াত করেছিলেন। এ সম্পর্কে তার থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, 'আমাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনাকে কুরআন পড়ে শোনাব, অথচ কুরআন আপনার ওপরই নাজিল হয়েছে!?" তিনি বললেন, "হাঁ।” তখন আমি "সুরা আন-নিসা” পাঠ করা শুরু করলাম। পড়তে পড়তে যখন "(فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ، وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا) কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনব প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকব তাদের ওপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে?"-এ আয়াত পর্যন্ত আসলাম, তখন তিনি বললেন, "এবার থামো।” তখন আমি তাঁর দিকে ফিরে দেখতে পেলাম, তাঁর দুচোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।'⁴
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে কুরআন নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন:
'চার ব্যক্তি থেকে কুরআন গ্রহণ করো-উম্মে আবদের ছেলে (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা) থেকে (ইবনে মাসউদের নাম সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন), মুআজ বিন জাবাল (রা) থেকে, উবাই বিন কাব (রা) থেকে এবং আবু হুজাইফার (রা) আজাদকৃত গোলাম সালিম (রা) থেকে।'⁵
অর্থাৎ তাঁদের থেকে কুরআন শিক্ষা করো। উল্লেখিত চারজনের মধ্যে প্রথমোক্ত দুজন মুহাজির এবং শেষোক্ত দুজন আনসার। আর সালিম (রা) হচ্ছেন আবু হুজাইফার (রা) আজাদকৃত গোলাম মাকিলের ছেলে। উলামায়ে কিরাম বলেন, 'বিশেষভাবে এই চারজন থেকে কুরআন শিক্ষা করার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হলো:
১. কুরআনের শব্দ এদের খুব ভালোভাবে মুখস্থ ছিল এবং খুব সুন্দরভাবে কুরআন পাঠ করতে পারতেন। যদিও এ চারজনের বাইরের অনেকে কুরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে এদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।
২. অথবা এই চারজন সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি কুরআন হাসিল করার জন্য নিজেদের সকল কাজকর্ম ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। যেখানে অন্যরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে সরাসরি না শুনে একে অপরের মুখ থেকে শোনাকে যথেষ্ট মনে করেছেন।
৩. অথবা এই চারজন লোক কুরআন শেখানোর জন্য অন্য সকল ব্যস্ততা থেকে মুক্ত ছিলেন।
৪. অথবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিতে চেয়েছেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর কুরআন বিষয়ে এই চারজনই সবার চেয়ে পারদর্শী হবেন এবং কুরআন প্রচারের ক্ষেত্রে এরাই সর্বাধিক ভূমিকা রাখবেন। তাই তাঁদের থেকে কুরআন শিক্ষা করা উচিত।'⁶
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) সুসংবাদ দেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, 'আবু বকর (রা) ও উমর (রা) তাকে বলেছেন:
'যে ব্যক্তি কুরআন মাজিদ উত্তমরূপে তিলাওয়াত করতে চায়, যেভাবে তা নাজিল হয়েছে, সে যেন ইবনে উম্মে আবদ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা)-এর পাঠ মোতাবেক তিলাওয়াত করে।'⁷
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৬১।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৬২।
৩. সহিহুল বুখারি: ৫০০০, সহিহু মুসলিম: ২৪৬২।
৪. সহিহুল বুখারি: ৫০৫০, সহিহু মুসলিম: ৮০০।
৫. সহিহুল বুখারি: ৩৮০৬, সহিহু মুসলিম: ২৪৬৪।
৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১৮।
৭. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৩৮।
📄 অলৌকিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী আবু হুরাইরা
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'তোমরা বলে থাকো, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আবু হুরাইরা (রা) বেশি বেশি হাদিস বর্ণনা করে থাকে এবং আরও বলে থাকো, মুহাজির ও আনসারদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কী হলো যে, তাঁরা আবু হুরাইরার (রা) মতো হাদিস বর্ণনা করে না? এর কারণ হলো, আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত থাকতেন আর আমি কোনো প্রকারে আমার পেটের চাহিদা মিটিয়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে পড়ে থাকতাম। তাঁরা যখন অনুপস্থিত থাকতেন, আমি তখন উপস্থিত থাকতাম। তাঁরা যা ভুলে যেতেন, আমি তা মুখস্থ করতাম। আর আমার আনসার ভাইয়েরা নিজেদের খেত-খামারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমি ছিলাম একজন সুফফাবাসী মিসকিন। তাঁরা যা ভুলে যেতেন, আমি তা মুখস্থ রাখতাম। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কথা বলার সময় বললেন:
'আমার এ কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে কেউ তার কাপড় বিছিয়ে দেবে এবং পরে নিজের শরীরের সাথে তা জড়িয়ে নেবে, তাহলে আমি যা বলছি, সে তা স্মরণ রাখতে পারবে।'
আমি আমার গায়ের চাদরখানা বিছিয়ে দিলাম। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা শেষ করলেন, তখন তা আমার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। ফলে আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই কথার কিছুই ভুলে যাইনি।'¹
জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবু হুরাইরা (রা)-এর স্মরণশক্তি অলৌকিক ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম মুজিজা ছিল।'²
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার নিকট থেকে শোনা অনেক হাদিস আমি ভুলে যাই।” তখন তিনি বললেন, "তোমার চাদর মেলে ধরো।” আমি মেলে ধরলাম। তারপর তিনি তা থেকে অঞ্জলি ভরে কিছু নিলেন। অতঃপর বললেন, "জড়িয়ে নাও।” আমি জড়িয়ে নিলাম। এর পর থেকে কোনো কিছুই আমি ভুলে যাইনি।'³
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অঞ্জলি ভরে কী নিয়েছেন, সেটা হাদিসে উল্লেখ করা হয়নি। সম্ভবত, তিনি কেবল অঞ্জলি ভরে নেওয়ার মতো ইশারা করেছিলেন।'⁴
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ দুই হাদিসে আবু হুরাইরা (রা)-এর ফজিলত এবং নবুওয়াতের একটি মুজিজা বর্ণিত হয়েছে। মুজিজা হওয়ার কারণ হলো, ভুলে যাওয়া মানুষের সহজাত একটি অভ্যাস। আবু হুরাইরা (রা)-ও স্বীকার করেছেন যে, যথারীতি তিনিও অনেক বিষয় ভুলে যেতেন। পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়ার বরকতে তিনি ভুলে যাওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তিলাভ করেন।'⁵
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইলম অর্জনের আগ্রহকে আরও উৎসাহিত করতেন। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভে কারা ধন্য হবে?" তিনি বললেন:
'আমি জানতাম, হে আবু হুরাইরা, তুমি ছাড়া এ প্রশ্ন আর কেউ করবে না। কেননা, হাদিস অর্জনের প্রতি তোমার প্রবল আগ্রহের ব্যাপারে আমি জানি। কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভে ওই ব্যক্তি ধন্য হবে, যে অন্তর থেকে একনিষ্ঠতার সাথে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই)" বলে।'⁶
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২০৪৭, সহিহু মুসলিম: ২৪৯২।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২৯৪।
৩. সহিহুল বুখারি: ১১৯।
৪. ফাতহুল বারি: ১/২১৫।
৫. ফাতহুল বারি: ১/২১৫।
৬. সহিহুল বুখারি: ৯৯।