📄 তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহের কারণে তাদের প্রশংসা করতেন
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'আমার উম্মাহর প্রতি সর্বাধিক দয়ালু ব্যক্তি হলো আবু বকর (রা)। আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সর্বাধিক কঠোর ব্যক্তি হলো উমর (রা)। সর্বাধিক লজ্জাশীল ব্যক্তি উসমান (রা)। সবচেয়ে বিচক্ষণ বিচারক আলি বিন আবু তালিব (রা)। সর্বোত্তম কুরআন পাঠকারী উবাই বিন কাব (রা)। হালাল-হারাম সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি হলো মুআজ বিন জাবাল (রা)। ফারায়িজ-সম্পর্কিত বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি হলো জাইদ বিন সাবিত (রা)। আর শুনে রাখো, প্রত্যেক উম্মাহর একজন বিশ্বস্ত মানুষ থাকে, আর এই উম্মাহর বিশ্বস্ত ব্যক্তি হলো আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রা)।'¹
অনুরূপভাবে সালামা বিন আকওয়া (রা)-এর গুণের কারণে তার প্রশংসা করেছিলেন।
সালামা বিন আকওয়া (রা) বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হুদাইবিয়ায় পৌঁছালাম। সংখ্যায় আমরা চোদ্দো-শ জন ছিলাম। এ ছাড়াও আমাদের সাথে ছিল পঞ্চাশটি ছাগল- যেগুলোকে পানি পান করাবার জন্য পর্যাপ্ত পানি ছিল না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুয়ার কিনারায় বসলেন এবং দোয়া করলেন অথবা তাতে থুথু দিলেন। তখন সাথে সাথে কুয়ার পানি উথলে উঠল। তখন আমরাও পানি পান করলাম এবং (পশুদেরকেও) পানি পান করালাম। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাইআত করানোর জন্য গাছতলায় ডাকলেন। অতঃপর লোকদের মধ্যে আমি সবার আগে বাইআত হলাম। তারপর একে একে অন্যান্য লোকও বাইআত হলো। তিনি যখন অর্ধেক লোক থেকে বাইআত গ্রহণ সম্পন্ন করলেন, তখন বললেন, "হে সালামা, তুমি বাইআত হও।” আমি বললাম, "লোকদের মধ্যে প্রথমেই আমি বাইআত হয়েছি ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তিনি বললেন, "আবারও হও না!" বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অস্ত্রহীন অবস্থায় দেখতে পেলেন। তাই তিনি আমাকে একটি ঢাল দান করলেন।'
'তিনি সকল মানুষ থেকে বাইআত গ্রহণ সম্পন্ন করার পর আমাকে বললেন, "তুমি কি আমার কাছে বাইআত হবে না, হে সালামা?" আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি তো লোকদের মধ্যে প্রথমভাগে এবং মধ্যভাগে (দুই-দুবার) আপনার কাছে বাইআত হয়েছি।” তিনি বললেন, "আবারও হও না!" তখন আমি তৃতীয়বার বাইআত হলাম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, "হে সালামা, তোমার সেই ঢালটি কোথায়, যা আমি তোমাকে দিয়েছিলাম?" আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার সাথে আমার চাচা আমিরের (রা) অস্ত্রবিহীন অবস্থায় দেখা হলে আমি তাকে তা দিয়ে দিয়েছি।” এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন এবং বললেন:
"তুমি তো দেখছি সেই লোকের মতো, যে বলে, "হে আল্লাহ, আমি এমন একজন বন্ধু চাই, যে আমার প্রাণের চাইতেও আমার নিকট অধিক প্রিয় হবে।"'
এরপর মুশরিকরা আমাদের কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠাল। আমাদের একপক্ষের লোকজন অন্যপক্ষের শিবিরে যাতায়াত করতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত আমরা উভয়পক্ষ পরস্পর সন্ধিবদ্ধ হলাম।'
সালামা (রা) বলেন, 'তারপর যখন আমরা ও মক্কাবাসীরা সন্ধিতে আবদ্ধ হলাম এবং আমাদের একপক্ষ অপরপক্ষের সাথে মেলামেশা করতে লাগলাম, তখন আমি একটি গাছতলায় গিয়ে তার নিচের কাঁটা প্রভৃতি পরিষ্কার করে তার গোড়ায় বিশ্রাম নিতে লাগলাম। এমন সময় মক্কাবাসী চারজন মুশরিক এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অপ্রীতিকর কথা বলতে লাগল। তাদের প্রতি আমার খুব ঘৃণা জন্মাল, তাই আমি স্থান পরিবর্তন করে আর একটি গাছের তলায় চলে গেলাম। তারা তাদের অস্ত্র গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে শুয়ে পড়ল। এমন সময় প্রান্তরের নিম্নাঞ্চল থেকে কে যেন চিৎকার করে বলল, "হে মুহাজিরগণ, সাহায্য!... ইবনে জুনাইম নিহত হয়েছে।" আমি তৎক্ষণাৎ আমার তরবারি উঠিয়ে ধরলাম এবং ওই চারজনের ওপর আক্রমণ চালালাম। তখন তারা ঘুমিয়ে ছিল। আমি তাদের অস্ত্রগুলি হস্তগত করলাম এবং তা আঁটি বেঁধে আমার হাতে নিলাম। অতঃপর আমি বললাম, "যে মহান সত্তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মানিত করেছেন-তাঁর কসম, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি মাথা তোলে, তবে তার সেই অঙ্গে আঘাত (করে বিচ্ছিন্ন) করব, যেখানে তার দুচোখ রয়েছে (অর্থাৎ ঘাড়ে)।" তারপর তাদের আমি হাঁকিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে গেলাম। ইত্যবসরে আমার চাচা আমিরও (রা) "আবালাত” গোত্রের মিকরাজ নামক এক ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে আসলেন। লোকটি আঘাতনিরোধক বস্ত্রাবৃত একটি ঘোড়ায় আসীন ছিল। তার সাথে সত্তরজন মুশরিক ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দিকে তাকালেন এবং বললেন, "ওদের ছেড়ে দাও, যাতে অপকর্মের সূচনা ওদের পক্ষ থেকেই হয় এবং পুনরাবৃত্তিও তারাই করে।" এ কথা বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ক্ষমা করে দিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন:
'তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন, তাদের ওপর তোমাদের বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা দেখেন।'²
অতঃপর আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তনের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। পথে এমন একটি মনজিলে আমরা অবতরণ করলাম, যেখানে আমাদের ও লিহয়ান গোত্রের মধ্যে কেবল একটি পাহাড়ের ব্যবধান ছিল। আর তারা ছিল মুশরিক। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, যে ব্যক্তি রাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) পক্ষ থেকে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য পাহাড়ের ওপরে আরোহণ করবে।'
সালামা (রা) বলেন, 'সে রাতে আমি দুই কি তিনবার ওই পাহাড়ে আরোহণ করেছিলাম। তারপর আমরা মদিনায় ফিরে এলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গোলাম রাবাহকে দিয়ে তাঁর উটগুলো পাঠালেন। আর আমিও তালহা (রা)-এর ঘোড়ায় চেপে তাঁর সাথে সাথে উটগুলো চারণভূমির দিকে নিয়ে গেলাম ঘাস-পানি খাওয়ানোর জন্য। পরদিন ভোরে আব্দুর রহমান ফাজারি চড়াও হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমস্ত উট ছিনিয়ে নিয়ে গেল এবং তাঁর রাখালকে হত্যা করল। আমি তখন রাবাহকে বললাম, "হে রাবাহ, লও এই ঘোড়া নিয়ে তুমি তালহা বিন উবাইদুল্লাহর (রা) কাছে পৌঁছে দেবে আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সংবাদ দেবে যে, মুশরিকরা তাঁর চারণভূমির উটগুলো লুটে নিয়ে গেছে।" অতঃপর আমি একটি টিলার ওপর দাঁড়ালাম। তারপর মদিনার দিকে মুখ করে তিনবার হাক দিলাম, "ইয়া সাবাহাহ!” (অর্থাৎ আজ সকালে আক্রমণ হয়েছে।) তারপর আমি লুটেরাদের পিছু ধাওয়া করলাম এবং তাদের ওপর তির নিক্ষেপ করতে লাগলাম। তখন আমি আবৃত্তি করছিলাম:
'আমি আকওয়ার পুত্র। আজ নিকৃষ্ট লোকদের ধ্বংসের দিন।'
তখন আমি তাদের যে কাউকে পেয়েছি, তার ওপর এমনভাবে তির নিক্ষেপ করেছি যে, তিরের অগ্রভাগ তাঁর কাঁধের কোমল হাড় ছেদ করে বেরিয়ে গেছে। আর আমি বলতে লাগলাম:
'এ আঘাত নাও! আমি আকওয়ার পুত্র, আজ ইতর লোকদের ধ্বংসের দিন।'
আল্লাহর কসম, আমি তির নিক্ষেপ করতে থাকলাম এবং ঘায়েল করতে লাগলাম এবং যখনই কোনো ঘোড়সওয়ার আমার দিকে ফিরত, তখনই আমি গাছের আড়ালে এসে তার গোড়ায় বসে তাঁর প্রতি তির নিক্ষেপ করতাম আর তাকে জখম করে ফেলতাম। অবশেষে যখন তারা পাহাড়ের সংকীর্ণ পথে আসলো এবং সে সংকীর্ণ পথে প্রবেশ করল, আমি তখন পাহাড়ের ওপর উঠে সেখান থেকে (অবিরাম) তাদের ওপর পাথর গড়িয়ে দিতে থাকলাম। এভাবে আমি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে থাকলাম, যে পর্যন্ত না আল্লাহর সৃষ্ট উটগুলোর প্রতিটি উট, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভারবাহীরূপে ছিল, তা আমার পেছনে রেখে না যায়। তারা উটগুলো আমার জন্য ছেড়ে চলে গেল। তারপরও আমি তাদের টার্গেট করে, তাদের দিকে তির নিক্ষেপ করতে থাকলাম। এমনকি তারা ত্রিশটির বেশি চাদর এবং ত্রিশটি বল্লম নিজেদের বোঝা হালকা করার উদ্দেশ্যে ফেলে গেল। তারা যেসব বস্তু ফেলে যাচ্ছিল, আমি তার প্রত্যেকটিকে পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে যাচ্ছিলাম, যাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তা চিনতে পারেন। অবশেষে তারা পাহাড়ের একটি সংকীর্ণ স্থানে গিয়ে পৌঁছাল। এমন সময় বদর ফাজারির অমুক পুত্র এসে তাদের সাথে মিলিত হলো। এবার তারা সকলে মিলে সকালের খাবার খেতে বসল। আমি পাহাড়ের একটি শৃঙ্গে বসে পড়লাম। তখন ফাজারি বলল, "ওই যে লোকটাকে দেখতে পাচ্ছি, সে কে?" তারা বলল, "লোকটির হাতে আমাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। আল্লাহর কসম, সেই রাতের অন্ধকার থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত লোকটা আমাদের পেছন থেকে সরছে না। সে আমাদের প্রতি (অবিরাম) তির নিক্ষেপ করেছে, এমনকি আমাদের সর্বস্ব সে কেড়ে নিয়েছে।” তখন সে বলল, "তোমাদের মধ্য থেকে চারজন গিয়ে তাঁর ওপর চড়াও হও।” তখন তাদের চার ব্যক্তি পাহাড়ে উঠে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তারপর তারা যখন আমার কথা শোনার মতো নিকটবর্তী স্থানে এসে পৌঁছাল, তখন আমি বললাম, "তোমরা কি আমাকে চেনো?" তারা বলল, "না, তুমি কে?” আমি বললাম, "আমি সালামা বিন আকওয়া (রা)। কসম সেই পবিত্র সত্তার-যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মানিত করেছেন, আমি তোমাদের যাকেই পেতে চাইব, (লক্ষ্য বানাব) তাকে ধরে ফেলব। কিন্তু তোমাদের কেউ চাইলেই আমাকে ধরতে পারবে না।” তখন তাদের একজন বলল, "আমিও তা-ই মনে করি।" তারপর তারা ফিরে গেল। আর আমি সেই স্থানেই বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পর আমি গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অশ্বারোহীদের অগ্রসর হতে দেখলাম। তাদের মধ্যে সবার আগে ছিলেন আখরাম আসাদি (রা), তার পেছনে আবু কাতাদা আনসারি (রা)। তার পেছনে মিকদাদ বিন আসওয়াদ কিনদি (রা)। তাঁরা এসে পৌঁছালে আমি আখরামের (রা) ঘোড়ার লাগাম ধরলাম। ততক্ষণে শত্রুরাও পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়ে গেল। আমি বললাম, "হে আখরাম, ওদের থেকে সতর্ক থাকবে। তারা যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এসে মিলিত হওয়ার পূর্বেই তোমাদের বিচ্ছিন্ন করে না ফেলে।” আখরাম (রা) বললেন, "হে সালামা, তুমি যদি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হও এবং জান্নাত ও জাহান্নামকে সত্য মনে করো, তবে আমার এবং শাহাদতের মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করো না।” তখন আমি তাঁর পথ ছেড়ে দিলাম। তখন তিনি আবদুর রহমানের সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হলেন। আখরাম (রা) আবদুর রহমানের ঘোড়াকে আহত করলেন আর আব্দুর রহমান বর্শার আঘাতে তাকে শহিদ করে দিল এবং আখরামের ঘোড়ার ওপর চড়ে বসল। ইতিমধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোড়সাওয়ার আবু কাতাদা (রা) এসে পৌঁছালেন। তিনি আব্দুর রহমানকে বর্শার আঘাতে হত্যা করলেন। সেই পবিত্র সত্তার কসম-যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন, আমি তখন এতই দ্রুতগতিতে তাদের পিছু ধাওয়া করে যাচ্ছিলাম যে, আমার পেছনে (অনেক দূর পর্যন্ত) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো সাহাবিকেই (রা) দেখতে পাচ্ছিলাম না, এমনকি তাদের ঘোড়ার খুরের ধুলিও আমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। এভাবে চলতে চলতে সূর্যাস্তের প্রাক্কালে তারা এমন একটি গিরিপথে উপনীত হলো, যেখানে জু-কারাদ নামক একটি প্রস্রবণ রয়েছে। অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তারা পানি পান করতে অবতরণ করল। তখন তারা আমাকে তাদের পিছু ধাওয়া করে দৌড়ে আসতে দেখতে পেল। আমাকে দেখে তারা পালিয়ে গেল। এভাবে এক জায়গায় পানি পান করার পূর্বেই আমি সেখান থেকে তাদের তাড়িয়ে দিলাম। তখন তারা পাহাড়ের একটি ঢালু উপত্যকার দিকে দৌড়াতে লাগল আর আমিও তাদের পিছু ধাওয়া করতে লাগলাম। আমি তাদের একজনের নিকটবর্তী হলে তাঁর কাঁধের অস্থিতে তির নিক্ষেপ করে বললাম:
'এ আঘাত নাও! আমি আকওয়ার পুত্র, আজ ইতর লোকদের ধ্বংসের দিন।'
সে তখন বলল, "তোমার মা সন্তানহারা হোক! তুমি কি সেই আকওয়া, যে আমাদের ভোর থেকে অতিষ্ঠ করে রেখেছে?” আমি বললাম, "হাঁ, আমার জানের দুশমন, আমি সেই ভোরবেলার আকওয়া-ই।" অতঃপর তারা দুটি ক্লান্ত ঘোড়া উপত্যকায় ছেড়ে চলে গেল। তখন আমি ঘোড়াদুটিকে হাঁকিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে এলাম। সেখানে আমির (রা) একটি অল্প দুধভর্তি পাত্র এবং একটি পানিভর্তি পাত্র নিয়ে আমার সাথে মিলিত হলেন। আমি তখন অজু করলাম এবং দুধ পান করলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম। তখন তিনি ওই পানির কাছে ছিলেন, যে পানির কাছ থেকে আমি মুশরিকদের তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই সমস্ত উট ও মুশরিকদের নিকট থেকে আমার ছিনিয়ে আনা বর্শা ও চাদর প্রভৃতি হস্তগত করলেন। তখন বিলাল (রা) লোকদের কাছ থেকে আমার উদ্ধারকৃত একটি উট জবাই করলেন এবং তার কলিজা ও কুঁজ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ভুনছিলেন। আমি বললাম, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে অনুমতি দিন, যেন আমি আমাদের লোকদের থেকে একশ জনকে বাছাই করে নিয়ে সেই দুশমনদের পিছু ধাওয়া করতে পারি এবং তাদের সকলকে এমনভাবে হত্যা করতে পারি যে, তাদের খবর বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি লোকও অবশিষ্ট থাকবে না।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে হাসলেন যে, চুলার আগুনের আভায় তাঁর চোয়ালের দাঁতগুলি প্রকাশ পেল। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে সালামা, তুমি কি তা-ই করতে চাও?” আমি বললাম "হাঁ, সেই পবিত্র সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "এতক্ষণে তো তারা গাতফান পল্লীতে আতিথ্য ভোগ করছে।" পরে গাতফান গোত্রের একটি লোক এসে জানাল, "অমুক ব্যক্তি তাদের জন্য একটি উট জবাই করেছে। যখন তারা উটের চামড়া ছাড়াচ্ছিল, তখন তারা ধুলোরাশি উড়তে দেখতে পেল। তখন তারা বলে উঠল, "ওরা (আকওয়া ও তার বাহিনী) তোমাদের নিকট এসে পড়েছে।” এই বলে তারা পালিয়ে গেল।" সকালবেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমাদের আজকের সেরা অশ্বারোহী সৈন্য হচ্ছে, আবু কাতাদা (রা) আর আমাদের সেরা পদাতিক হচ্ছে সালামা (রা)।" তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অশ্বারোহী ও পদাতিক হিসেবে গনিমতের দুই অংশ দিলেন। আমাকে তিনি একত্রে দুই অংশ দিলেন। তারপর মদিনায় ফিরে আসার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর সাথে তাঁর উষ্ট্রী "আজবা"-এর পেছনে বসালেন। তারপর যখন আমরা পথ চলতে লাগলাম-এমন সময় আনসারের এমন এক ব্যক্তি যাকে দৌড়ে কেউ পরাজিত করতে পারত না, সে বলতে লাগল, "কেউ কি আছে, যে মদিনায় সবার পূর্বে পৌঁছার ব্যাপারে আমার সাথে প্রতিযোগিতা করবে?" এ কথাটি সে বারবার বলছিল। যখন আমি তার এ (চ্যালেঞ্জমূলক) কথাটি শুনলাম, তখন বললাম, "তুমি কি কোনো সম্মানিত লোককে সম্মান দিতে জানো না বা কোনো ভদ্রলোককেই পরোয়া করবে না?" সে বলল, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কাউকে আমি পরোয়া করি না।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আপনি আমাকে এই ব্যক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করার অনুমতি দিন।" তখন তিনি বললেন, "তোমার মন চাইলে করতে পারো।” তখন আমি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বললাম, "আমি তোমার নিকট আসছি।” এই বলে আমি লাফ দিয়ে দিলাম এক দৌড়। তারপর তাকে ধরতে এক বা দুই টিলা অতিক্রম করার দূরত্ব পর্যন্ত নিজের দম নিয়ন্ত্রণে রেখে তার পিছু পিছু দৌড়ালাম। আরও দুই এক টিলা পর্যন্ত নিজের মতো করে দৌড়ানোর পর গতি বাড়িয়ে দিলাম এবং তার নিকট পৌঁছে গেলাম। অতঃপর তার কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে একটি ঘুষি মেরে বললাম, "ওহে, আল্লাহর কসম, তোমাকে আজ হারাবই আমি।” তখন সে বলল, "আমিও তা-ই মনে করছি।” অতএব আমি তার পূর্বেই মদিনায় পৌঁছে গেলাম। আল্লাহর কসম, এরপর মাত্র তিন দিন মদিনায় অবস্থান করেই রাসulুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা খাইবারের দিকে বেরিয়ে পড়লাম। তখন আমার চাচা আমির (রা) প্রেরণামূলক কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন:
'আল্লাহর কসম, যদি আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমরা হিদায়াত পেতাম না এবং সাদাকা দেওয়া ও নামাজ পড়ার তাওফিক পেতাম না। আমরা আপনার অনুগ্রহ থেকে কখনো অমুখাপেক্ষী হতে পারি না. তাই আপনি আমাদের কদম দৃঢ় রাখুন, যখন আমরা শত্রুদের সম্মুখীন হই এবং আপনি আমাদের প্রতি প্রশান্তি বর্ষণ করুন।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ ব্যক্তি কে?” তিনি বললেন, "আমি আমির (রা)।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার রব তোমাকে ক্ষমা করুন।" বর্ণনাকারী বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারও জন্য বিশেষভাবে মাগফিরাতের দোয়া করতেন, সে শহিদ হতো। তখন নিজ উটের ওপর থেকে উমর বিন খাত্তাব (রা) ডেকে বললেন, "হে আল্লাহর নবি, আমিরকে (রা) দিয়ে যদি আমাদের আরও উপকার করতেন!"'
'তারপর যখন আমরা খাইবারে উপস্থিত হলাম, তখন খাইবার অধিপতি মারহাব তরবারি দোলাতে দোলাতে বেরিয়ে এল এবং বলল:
"খাইবার জানে যে, আমি মারহাব, পূর্ণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অভিজ্ঞতাপূর্ণ এক বীরপুরুষ। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সে টগবগিয়ে ওঠে।"
বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন আমার চাচা আমির (রা) ছন্দে ছন্দে বললেন:
"খাইবার জানে যে, আমি আমির, অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত যুদ্ধে অবতীর্ণ এক বীর বাহাদুর ও নির্ভীক ব্যক্তি।"
অতঃপর তাদের দুজনের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়ে গেল। আমির (রা) নিচ থেকে যখন তাকে আঘাত করতে চাইলেন, তখন তা ফিরে এসে তাঁর নিজের ওপর লাগল। এতে তার পায়ের গোছার সংযোগ-শিরা কেটে গিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। তখন আমি বের হলাম। বাইরে শুনতে পেলাম, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকজন সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বলাবলি করছেন, "আমিরের (রা) আমল বরবাদ হয়ে গেছে। কারণ, সে আত্মহত্যা করেছে।” তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমিরের (রা) আমলগুলি কি বরবাদ হয়ে গেল?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ কথা কে বলেছে?” আমি বললাম, "আপনারই কয়েকজন সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।” তিনি বললেন, "যারা এরূপ বলেছে, তারা মিথ্যা বলেছে। সে দুবার প্রতিদান পাবে।" অতঃপর তিনি আমাকে আলি (রা)-এর নিকট পাঠালেন। তখন তিনি চক্ষুরোগে আক্রান্ত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
"আমি এমন এক ব্যক্তিকে (আজ) পতাকা সমর্পণ করব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে (অথবা বললেন) এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাকে ভালোবাসে।"
তিনি বলেন, "তারপর আমি আলি (রা)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম। তখনও তাঁর চোখ ব্যথা করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চোখে থুথু দিলেন আর তাতেই তার রোগ ভালো হয়ে গেল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (আলির রা) হাতে পতাকা তুলে দিলেন। তখন মারহাব বেরিয়ে এল এবং কবিতা আওড়াতে লাগল:
"খাইবার জানে যে, আমি মারহাব, যুদ্ধের অস্ত্রে সজ্জিত এক অভিজ্ঞতাপূর্ণ বীর বাহাদুর ব্যক্তি-যখন যুদ্ধ তাঁর লেলিহান শিখা নিয়ে অগ্রসর হয়।"
তখন আলি (রা) বললেন:
"আমি সেই ব্যক্তি যাকে আমার মা 'হাইদার' (সিংহ) নাম রেখেছেন, যাকে দেখতে বন্য সিংহের মতো ভয়ংকর লাগে। আমি তাদের (দুশমনদের) প্রতিদান দিই বড় বড় পাত্র দিয়ে (অর্থাৎ তাদের অবলীলায় হত্যা করি)।"
এরপর তিনি মারহাবের মাথায় তলোয়ার মারলেন এবং তাকে হত্যা করলেন। তারপর তারই হাতে (খাইবার) বিজয় হলো।'³
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চারটি মুজিজা বিবৃত হয়েছে:
১. হুদাইবিয়া কূপের পানি বৃদ্ধি পাওয়া।
২. আলি (রা)-এর চক্ষু ভালো হয়ে যাওয়া।
৩. ভবিষ্যদ্বাণী করা যে, তার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন।
৪. এই সংবাদ দেওয়া যে, তারা গাতফান গোত্রের মেহমান হয়েছে-যা সত্য প্রমাণিত হয়েছে।'⁴
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৯১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৫৫।
২. সুরা আল-ফাতহ, ৪৮: ২৪।
৩. সহিহু মুসলিম: ১৮০৭।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/১৮৬।
📄 তারা সুন্দর কিছু উদ্ভাবন করলে তার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করতেন
হানশ বিন মুতামির (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আলি (রা) ইয়ামানে থাকা অবস্থায় কিছু লোক সিংহ ধরার জন্য গর্ত খনন করল। অতঃপর সেখানে একটি সিংহ পতিত হলো। লোকজন কৌতূহলী হয়ে সিংহটিকে দেখতে লাগল, তখন সেখানে একজন ব্যক্তি পড়ে গেল। পতিত লোকটি (পড়ে যাওয়ার সময়) এক ব্যক্তিকে টেনে ধরল, সে আরেকজনকে এবং সে আরেকজনকে টেনে ধরলে তারা চারজনই গর্তে পতিত হলো। তখন সিংহটি তাদের আহত করল। তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি বর্শা নিয়ে সিংহের মুখোমুখি হলো এবং তাকে মেরে ফেলল। কিন্তু ততক্ষণে সিংহের আঘাতে চার ব্যক্তিই মারা গেল।'
বর্ণনাকারী বলেন, 'এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে ঝগড়া বেধে গেল এবং একপর্যায়ে তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিল। সেই মুহূর্তে আলি (রা) তাদের নিকট গিয়ে বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই তোমরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাও? আমি তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিচ্ছি, সেটা তোমাদের মনঃপূত হলে তো ভালো কথা, নতুবা তোমরা লড়াই থেকে বিরত থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও। তিনিই তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেবেন। এরপরেও যদি কেউ বাড়াবাড়ি করে, তাহলে তার কোনো অধিকার নেই। (আমার ফয়সালা হলো) যে সকল গোত্রের লোক গর্তটি খনন করেছে, তাদের নিকট থেকে এক দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ, আরেক দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ, আরেক দিয়াতের অর্ধাংশ এবং আরেকটি পূর্ণ দিয়াত একত্র করো। তারপর প্রথমজনকে এক-চতুর্থাংশ, দ্বিতীয়জনকে এক-চতুর্থাংশ, তৃতীয়জনকে অর্ধেক এবং চতুর্থজনকে পূর্ণ দিয়াত দান করো।"'
বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন কিছু লোক তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হলো এবং কিছু লোক সন্তুষ্ট হতে পারল না। তারা বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেশ করার জন্য তাঁর কাছে গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাকামে ইবরাহিমের পাশে ছিলেন। তারা তাঁকে ঘটনার বিবরণ শোনাল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "আমি তোমাদের বিবাদ মিটিয়ে দিচ্ছি" বলে ঠেস দিয়ে বসলেন। তখন আগন্তুকদের একজন বললেন, "আলি (রা) আমাদের এই বিবাদের ফয়সালা করেছেন।” এই বলে লোকটি আলি (রা)-এর ফয়সালার বিবরণ শোনাল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি (রা)-এর ফয়সালাকে যথার্থ বলে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।'¹
আলি (রা)-এর ফয়সালা যথার্থ হওয়ার কারণ হলো, নিহত চারজনই উপস্থিত লোকদের অনিচ্ছাকৃত ধাক্কাধাক্কির ফলে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে। তাই উপস্থিত সবার ওপর অনিচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াত ওয়াজিব হলো। প্রথমজন অনিচ্ছাকৃত ধাক্কাধাক্কির কারণে নিহত, আবার সে টেনে ধরার কারণে বাকি তিনজনের হত্যাকারী। তাই সে নিহত হওয়ার কারণে দিয়াত পাবে, কিন্তু বাকি তিনজনকে হত্যা করার কারণে তিন-চতুর্থাংশ সেখান থেকে বাদ যাবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ পাওয়ার কারণ হলো, বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বাকি দুজনকে হত্যা করার কারণে বাদ যাবে। তৃতীয় ব্যক্তি অর্ধেক পাওয়ার কারণ হলো, বাকি অর্ধেক একজনকে হত্যা করার কারণে বাদ যাবে। আর চতুর্থ ব্যক্তি পূর্ণ দিয়াত পাবে। কারণ, সে কাউকে হত্যা করেনি। ইবনুল আরাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী ফয়সালা।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)-এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। কারণ, তিনি তার মাঝে এমন কিছু গুণ দেখতে পেয়েছিলেন, যা তার মেধা ও প্রতিভার পরিচয় বহন করে। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর বক্ষের সাথে লাগালেন এবং বললেন:
'হে আল্লাহ, একে হিকমত (দ্বীনি প্রজ্ঞা বা ইলমে ফিকহ) দান করুন।'²
অপর বর্ণনায় আছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৌচাগারে প্রবেশ করলেন, তখন আমি তাঁর জন্য অজুর পানি রাখলাম। তিনি বললেন, "পানি কে রেখেছে?” কে রেখেছে তা জানতে পেরে তিনি বললেন:
'হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের ফিকহ বা প্রজ্ঞা দান করুন।'³
অপর বর্ণনায় এসেছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাইমুনা (রা)-এর গৃহে ছিলেন। তখন রাতে আমি তাঁর জন্য অজুর পানি রাখলাম। তখন মাইমুনা (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) আপনার জন্য অজুর পানি রেখেছে।” তখন তিনি বললেন:
'হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের ফিকহ ও প্রজ্ঞা এবং তাফসিরের ইলম দান করুন।'⁴
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে ইলমে ফিকহের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এবং এও বর্ণিত হয়েছে যে, কেউ কোনো উপকার করলে তার জন্য দোয়া করা মুসতাহাব।' তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দোয়া করেছিলেন, তা কবুল হয়েছিল, ফলে তিনি ইলমে ফিকহে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।⁵
ইবনে মুনির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'পানি রাখার কারণে দ্বীনের ফিকহ অর্জনের দোয়া করার মাঝে সামঞ্জস্য হলো, এমন অবস্থায় সাধারণত তিন ধরনের কাজ করা সম্ভব ছিল: ১. পানি শৌচাগারে রেখে আসা। ২. দরোজায় পানি রাখা, যেন তিনি সহজে পানি পেয়ে যান। ৩. কিছু না করা। তিনি দ্বিতীয়টা বেছে নিলেন। কারণ, প্রথমটি করলে পানির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতো। তৃতীয়টি করলে তাঁর পানি পেতে কষ্ট হতো। তাই তিনি দ্বিতীয়টিই বেছে নিলেন। এতে তার মেধা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দ্বীনি ফিকহ অর্জনের দোয়া করেছেন, যাতে তার মাধ্যমে তিনি উপকৃত হতে পারেন। আর ঠিক তা-ই হয়েছে।'⁶
ফলে ইবনে আব্বাস (রা) হয়ে উঠলেন সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুফাসসির, অথচ তিনি বয়সে ছোট ছিলেন। হিজরতের মাত্র তিন বছর পূর্বেই তার জন্ম হয়। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সহধর্মিণী মাইমুনা (রা)-এর নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাদে খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি নিয়মিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যে থাকার সৌভাগ্য লাভ করেন। তার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছেন। এসব কারণে তিনি প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন হয়ে ওঠেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, তখন ইবনে আব্বাস (রা)-এর বয়স ছিল তেরো বছর। ইবনে মাসউদ (রা) বলতেন, 'কুরআনের উত্তম ভাষ্যকার হলেন ইবনে আব্বাস (রা)।'⁷
ইবনে উমর (রা) বলেন, 'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর নাজিলকৃত বিষয় সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি হলেন ইবনে আব্বাস (রা)।'⁸
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ৫৭৪।
২. সহিহুল বুখারি: ২৩৫৬।
৩. সহিহুল বুখারি: ১৪৩, সহিহু মুসলিম: ২৪৭৭।
৪. মুসনাদু আহমাদ: ৩০২৪।
৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/৩৭।
৬. ফাতহুল বারি: ১/২৩২।
৭. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৬২৯১।
৮. আজুরি কৃত আশ-শারিআহ ৫/২২৭১।
📄 রাসূল ﷺ তাকে (ইবনে আব্বাস ) আপন সওয়ারির ওপর নিজের পেছনে বসালেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে ছিলাম। তিনি বললেন:
'হে বালক, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি: আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাজত করো, তিনি তোমার হিফাজত করবেন। আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাজত করো, তাঁকে তোমার পাশে পাবে। [সচ্ছলতার সময় তাঁর সাথে পরিচিত হও, অসচ্ছলতার সময় তিনি তোমাকে চিনবেন।] কিছু চাইতে হলে একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাও এবং সাহায্য কামনা করতে হলে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য কামনা করো। আর জেনে রাখো, সকল মানুষ যদি একত্রিত হয়ে তোমার উপকার করতে চায়, তবে আল্লাহ তাআলা যা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন, সেটা ছাড়া কোনো উপকার করতে পারবে না; আর যদি সকল মানুষ একত্রিত হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবে আল্লাহ তাআলা যা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন, সেটা ছাড়া কোনো ক্ষতি পারবে না। (তাকদির লেখার) কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে। [অপছন্দনীয় বিষয়ের (বিপদাপদের) ওপর ধৈর্যধারণ করলে অনেক কল্যাণ অর্জিত হয়। আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যের মাঝে নিহিত, সচ্ছলতা কষ্ট-মেহনতের মাঝে নিহিত। আর নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।]'¹
আমিরুল মুমিনিন উমর (রা)-ও তার প্রতিভার মূল্যায়ন করতেন। তাকে নিজের পাশে রাখতেন। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, 'আমাকে উমর (রা) বড় বড় বদরি সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সাথে বসাতেন। একদিন তাঁদের একজন অস্বস্তি প্রকাশ করে বললেন, "ও আমাদের সাথে বসে কেন, ও তো আমাদের ছেলেদের সমবয়সী?” তখন উমর (রা) বললেন, "সে কে, তা নিশ্চয় আপনারা জানেন।” অতঃপর একদিন তাঁদের ডাকলেন এবং আমাকেও তাঁদের সাথে ডাকলেন। আমার ধারণা, আসলে তাঁদেরকে আমার প্রতিভা দেখানোর জন্যই তিনি আমাকে তাঁদের সাথে ডেকেছিলেন। তখন তিনি সুরা আন-নাসর পড়ে বললেন, "এই সুরা সম্পর্কে আপনারা কী বলেন?" তাঁদের একজন বললেন, "এই সুরায় আমাদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, যখন আমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসবে এবং আমাদের বিজয় দান করা হবে, তখন যেন আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।” অপর এক বর্ণনায় আছে, 'তাঁরা বললেন, "এখানে শহর ও অট্টালিকাসমূহ বিজয় করার ব্যাপারে বলা হয়েছে।" তখন উমর (রা) আমাকে বললেন, "হে ইবনে আব্বাস, তুমিও কি তা-ই মনে করো?" আমি বললাম, "না।” তিনি বললেন, "তাহলে তোমার অভিমত কী?" আমি বললাম, "এই সুরার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এখানে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, "যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে-অর্থাৎ মক্কা-বিজয়। সেটাই হবে আপনার মৃত্যুর পূর্বাভাস। সুতরাং এ সময়ে আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করবেন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। অবশ্যই তিনি তাওবা কবুলকারী।" তখন উমর (রা) বললেন, "এ সুরার ব্যাপারে তোমার যে অভিমত, আমার অভিমতও ঠিক তা-ই।"'²
এই হাদিসের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস (রা)-এর ফজিলত প্রমাণিত হয়। আরও প্রমাণিত হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তার জন্য তাফসির ও ফিকহ জানার দোয়া করেছিলেন, তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে।³
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে আব্বাস (রা)-এর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও দ্বীনি পাণ্ডিত্য প্রসিদ্ধ ছিল। তদুপরি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিভিন্ন অবস্থা তিনি যেভাবে অনুসন্ধানি দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন এবং তা সংরক্ষণ করেছেন, সেভাবে অন্য কেউ করেনি। এ ছাড়াও তিনি বড় বড় সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জ্ঞান সংগ্রহ করেছেন।'⁴
তার ইলম-জ্ঞান এত বিস্তৃত ছিল যে, তিনি ভিন্ন ভিন্ন দিন ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের আসর করতেন। কোনো দিন শুধু ফিকহ সম্পর্কে আলোচনা করতেন। কোনো দিন কুরআনের তাফসির করতেন। কোনো দিন জিহাদসমূহের বৃত্তান্ত শোনাতেন। কোনো দিন কবিতার আসর বসাতেন। আবার কোনো দিন আরবের উপাখ্যান বর্ণনা করতেন।⁵
ইয়াকুব (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ সনদে ওয়াইল বিন হুজর (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একদা ইবনে আব্বাস (রা) সুরা আন-নুর পাঠ করার পর তার তাফসির করতে লাগলেন। তা শুনে এক ব্যক্তি মন্তব্য করল, "এমন তাফসির যদি দাইলাম গোত্রের লোকেরা শুনতে পেত, তবে তারা মুসলমান হয়ে যেত।"'⁶
তার স্মৃতিশক্তি খুবই তীক্ষ্ণ ছিল। একবার ইবনে আবি রাবিআ (রাহিমাহুল্লাহ) আশি শ্লোকবিশিষ্ট একটি কবিতা পাঠ করলেন। একবার শুনেই সেটা তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।⁷
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৫১৬, মুসনাদু আহমাদ: ২৮০০ (তৃতীয় বন্ধনীর ভেতরের অংশ মুসনাদ আহমাদে অতিরিক্ত এসেছে)।
২. সহিহুল বুখারি: ৪২৯৪।
৩. ফাতহুল বারি: ৮/৭৩৬।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৪/২৯০।
৫. আল-আলাম: ৪/৯৫।
৬. ফাতহুল বারি: ৭/১০০।
৭. আল-আলাম: ৪/৯৫।
📄 আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর প্রতিভার মূল্যায়ন করতেন
জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অন্তর্ভুক্ত এবং উচ্চস্তরের জ্ঞানী ছিলেন।'¹
আরেক জায়গায় বলেন, 'তিনি অল্পসংখ্যক তুখোড় মেধাবী আলিমদের মধ্য থেকে একজন ছিলেন।'²
শাকিক বিন সালামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) আমাদের ওয়াজ করার সময় বললেন:
'আল্লাহর কসম, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে সত্তরটিরও অধিক সুরা মুখস্ত করেছি। আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) জানেন যে, আমি তাঁদের চাইতে আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত, অথচ আমি তাঁদের চাইতে উত্তম নই।'
শাকিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁর কথা শুনে কী বলেন, তা শোনার জন্য আমি মজলিসে বসে রইলাম। কিন্তু কাউকে তাঁর কথার প্রতিবাদ করতে শুনিনি।'³
একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে কুরআন শুনতে চেয়েছিলেন। তখন তিনি 'সুরা আন-নিসা'র শুরু থেকে তিলাওয়াত করেছিলেন। এ সম্পর্কে তার থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, 'আমাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনাকে কুরআন পড়ে শোনাব, অথচ কুরআন আপনার ওপরই নাজিল হয়েছে!?" তিনি বললেন, "হাঁ।” তখন আমি "সুরা আন-নিসা” পাঠ করা শুরু করলাম। পড়তে পড়তে যখন "(فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ، وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا) কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনব প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকব তাদের ওপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে?"-এ আয়াত পর্যন্ত আসলাম, তখন তিনি বললেন, "এবার থামো।” তখন আমি তাঁর দিকে ফিরে দেখতে পেলাম, তাঁর দুচোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।'⁴
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে কুরআন নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন:
'চার ব্যক্তি থেকে কুরআন গ্রহণ করো-উম্মে আবদের ছেলে (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা) থেকে (ইবনে মাসউদের নাম সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন), মুআজ বিন জাবাল (রা) থেকে, উবাই বিন কাব (রা) থেকে এবং আবু হুজাইফার (রা) আজাদকৃত গোলাম সালিম (রা) থেকে।'⁵
অর্থাৎ তাঁদের থেকে কুরআন শিক্ষা করো। উল্লেখিত চারজনের মধ্যে প্রথমোক্ত দুজন মুহাজির এবং শেষোক্ত দুজন আনসার। আর সালিম (রা) হচ্ছেন আবু হুজাইফার (রা) আজাদকৃত গোলাম মাকিলের ছেলে। উলামায়ে কিরাম বলেন, 'বিশেষভাবে এই চারজন থেকে কুরআন শিক্ষা করার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হলো:
১. কুরআনের শব্দ এদের খুব ভালোভাবে মুখস্থ ছিল এবং খুব সুন্দরভাবে কুরআন পাঠ করতে পারতেন। যদিও এ চারজনের বাইরের অনেকে কুরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে এদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।
২. অথবা এই চারজন সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি কুরআন হাসিল করার জন্য নিজেদের সকল কাজকর্ম ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। যেখানে অন্যরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে সরাসরি না শুনে একে অপরের মুখ থেকে শোনাকে যথেষ্ট মনে করেছেন।
৩. অথবা এই চারজন লোক কুরআন শেখানোর জন্য অন্য সকল ব্যস্ততা থেকে মুক্ত ছিলেন।
৪. অথবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিতে চেয়েছেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর কুরআন বিষয়ে এই চারজনই সবার চেয়ে পারদর্শী হবেন এবং কুরআন প্রচারের ক্ষেত্রে এরাই সর্বাধিক ভূমিকা রাখবেন। তাই তাঁদের থেকে কুরআন শিক্ষা করা উচিত।'⁶
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) সুসংবাদ দেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, 'আবু বকর (রা) ও উমর (রা) তাকে বলেছেন:
'যে ব্যক্তি কুরআন মাজিদ উত্তমরূপে তিলাওয়াত করতে চায়, যেভাবে তা নাজিল হয়েছে, সে যেন ইবনে উম্মে আবদ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা)-এর পাঠ মোতাবেক তিলাওয়াত করে।'⁷
টিকাঃ
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৬১।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৬২।
৩. সহিহুল বুখারি: ৫০০০, সহিহু মুসলিম: ২৪৬২।
৪. সহিহুল বুখারি: ৫০৫০, সহিহু মুসলিম: ৮০০।
৫. সহিহুল বুখারি: ৩৮০৬, সহিহু মুসলিম: ২৪৬৪।
৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১৮।
৭. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৩৮।