📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 জাইদ বিন সাবিতকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন

📄 জাইদ বিন সাবিতকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন


খারিজা বিন জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'তার পিতা জাইদ বিন সাবিত (রা) তাকে বলেছেন, "যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করলেন, তখন আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাকে দেখে তাঁর বেশ পছন্দ হলো। লোকেরা বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এ হচ্ছে বনু নাজ্জারের এক বালক। সে আপনার ওপর অবতীর্ণ কুরআন থেকে দশটির অধিক সুরা মুখস্থ করেছে।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কুরআন পড়তে বললেন। আমি সুরা কাফ তিলাওয়াত করলাম। আমার তিলাওয়াত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পছন্দ হলো। তিনি বললেন, "আমার জন্য ইহুদিদের ভাষা শেখো। কারণ, আমি আমার চিঠিপত্রের ব্যাপারে ইহুদিদের ওপর ভরসা করতে পারি না।"'
জাইদ (রা) বলেন, 'তারপর মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে আমি তাদের ভাষা দক্ষতার সাথে শিখে ফেলি। এরপর থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো চিঠি লিখতে চাইলে আমি লিখে দিতাম এবং তাঁর নিকট কোনো চিঠি আসলে আমি তা পড়ে শোনাতাম।'¹
এত অল্প সময়ে ইহুদিদের ভাষা শিখে নেওয়া থেকে সহজেই প্রমাণিত হয়, তিনি ছোটবেলা থেকে কতটা মেধাবী ও স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ছিলেন!
ইমাম জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ব্যাপারে লেখেন, '... তাঁর পিতা হিজরতের পূর্বে সংঘটিত বুআসের যুদ্ধে নিহত হন। ফলে জাইদ (রা) এতিম হয়ে লালিতপালিত হন। আর তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী।'²
ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'জাইদ বিন সাবিত (রা) সীমাহীন মেধাবী ছিলেন। তিনি মাত্র পনেরো দিনে ইহুদিদের ভাষা ও লেখা রপ্ত করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি কিসরার দূত থেকে মাত্র আঠারো দিনে ফারসি ভাষা শিখেছিলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিভিন্ন খাদিমের কাছ থেকে হাবশি ভাষা, রোমানিক ভাষা ও কিবতি ভাষা শিক্ষা করেছিলেন।'³
তার তীক্ষ্ণ মেধাশক্তি ও প্রতিভার কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ওহি লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন।
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'যখন (لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ) "মুমিনদের মধ্যে যারা (জিহাদ না করে) বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, তারা সমান নয়।"-এ আয়াত নাজিল হলো, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমার কাছে জাইদকে (রা) ডেকে আনো আর তাকে স্লেট, দাওয়াত ও কাঁধের হাড্ডি অথবা দোয়াত ও কাঁধের হাড্ডি আনতে বলো।'
অতঃপর বললেন, "লেখো ....لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে অন্ধ সাহাবি আমর বিন উম্মে মাকতুম (রা) ছিলেন। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি তো অন্ধ মানুষ। আমার কী হবে?" তখন ওই আয়াতের স্থলে নাজিল হলো:
'গৃহে উপবিষ্ট মুসলমান যাদের কোনো সংগত ওজর নেই এবং ওই মুসলমান যারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা সমান নয়।'⁴-⁵
তার এসব গুণাবলির কারণেই আবু বকর সিদ্দিক (রা) কুরআন সংকলনের দায়িত্ব তার ওপরই ন্যস্ত করেছিলেন। এ সম্পর্কে জাইদ (রা) বর্ণনা করেন, 'আবু বকর (রা) (তাঁর খিলাফতের সময়) এক ব্যক্তিকে আমার কাছে পাঠালেন। এ সময় ইয়ামামার যুদ্ধ চলছিল। (আমি এলাম) তখন তাঁর কাছে উমর (রা) বসা ছিলেন। তিনি বললেন, "উমর (রা) আমাকে বললেন যে, "ইয়ামামার যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, আমার ভয় হচ্ছে, কুরআন বিশেষজ্ঞ (হাফিজগণ) ইয়ামামার যুদ্ধে শহিদ হয়ে যান নাকি! যদি আপনারা তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করেন, তবে কুরআনের অনেক অংশ বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই কুরআনকে একত্র করে সংরক্ষণ করা ভালো মনে করি।" আমি (আবু বকর রা) তাঁকে বললাম, "আমি এ কাজ কীভাবে করতে পারি, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করে যাননি।" কিন্তু উমর (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, এটা কল্যাণকর হবে।” উমর (রা) তাঁর এ কথার পুনরুক্তি করতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এ কাজ করার জন্য আমার বক্ষকে উন্মুক্ত করে দেন। (অর্থাৎ এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই) এবং শেষ পর্যন্ত (এ ব্যাপারে) আমার অভিমত উমর (রা)-এর মতোই হয়ে যায়।'
জাইদ বিন সাবিত (রা) বলেন, 'উমর (রা) সেখানে নীরবে বসা ছিলেন, কোনো কথা বলছিলেন না। এরপর আবু বকর (রা) আমাকে বললেন, "দেখো, তুমি যুবক এবং জ্ঞানী ব্যক্তি। আমরা তোমার প্রতি কোনোরূপ বিরূপ ধারণা পোষণ করি না। কেননা, তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে ওহি লিপিবদ্ধ করতে। সুতরাং তুমি কুরআনের আয়াত সংগ্রহ করে একত্র করো।" জাইদ (রা) বলেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি কুরআন একত্র করার যে নির্দেশ আমাকে দিলেন, সেটি আমার কাছে এত ভারী মনে হলো যে, তিনি যদি কোনো একটি পাহাড় স্থানান্তরিত করতে নির্দেশ দিতেন, তাও আমার কাছে এরূপ ভারী মনে হতো না।' আমি বললাম, 'যে কাজ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করে যাননি, সে কাজটি আপনারা কীভাবে করবেন?' এরপর আবু বকর (রা) বললেন, 'আল্লাহর কসম, এ কাজ করাটাই কল্যাণকর হবে।' আমি আমার কথায় অটল থেকে বারবার জোর দিতে লাগলাম। পরিশেষে আল্লাহ যেটা উপলব্ধি করার জন্য আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর বক্ষকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, আমার বক্ষকেও তা উপলব্ধি করার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন (অর্থাৎ এর প্রয়োজনীয়তা তাদের ন্যায় আমিও অনুভব করলাম)। এরপর আমি কুরআন সংগ্রহে লেগে গেলাম এবং হাড়, চামড়া, খেজুরের ডাল ও বাকল এবং মানুষের বক্ষস্থল (অর্থাৎ মানুষের কাছে যা মুখস্থ ছিল, তা) থেকে তা সংগ্রহ করলাম...।⁶
আলি বিন আবি তালিব (রা) বলেন:
'কুরআন সংকলনের কারণে সবচেয়ে বেশি সাওয়াব ও প্রতিদান পাবেন আবু বকর (রা)। আল্লাহ তাআলা আবু বকর (রা)-এর ওপর রহম করুন। তিনিই সর্বপ্রথম কুরআনকে মলাটবদ্ধ করেছেন।'⁷
আলি (রা)-এর এই উক্তি আবু বকর (রা)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সম্মানবোধ ও তাঁর খিলাফতের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপনের প্রমাণ বহন করে। এ ছাড়াও তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে মিথ্যাবাদী রাফিজি সম্প্রদায়ের বাতিল ধারণার অসারতা প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৭১৫, সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৪৫।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪২৭।
৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/৩৩।
৪. সুরা আন-নিসা, ৪: ৯৫।
৫. সহিহুল বুখারি: ৪৯৯০, সহিহু মুসলিম: ১৮৯৮।
৬. সহিহুল বুখারি: ৪৬৭৯।
৭. আবু বকর বিন আবু দাউদ রচিত আল-মাসাহিফ: ১/৪৯। ফাতহুল বারি (৯/১২)-তে ইবনে হাজার হাদিসটাকে হাসান বলেছেন।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুআজ বিন জাবালকে ইয়ামানের বিচারপতির দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন

📄 মুআজ বিন জাবালকে ইয়ামানের বিচারপতির দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন


হালাল-হারাম চেনার ক্ষেত্রে মুআজ বিন জাবাল (রা)-এর অসাধারণ প্রতিভা ছিল। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়ামানের বিচারপতি নিয়োগ করেছিলেন।
আসওয়াদ বিন ইয়াজিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইয়ামানে আমাদের শিক্ষক ও আমির হিসেবে মুআজ বিন জাবাল (রা) আসলেন। তখন আমরা তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, "এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময় ওয়ারিশ হিসেবে একটি বোন ও একটি কন্যা-সন্তান রেখে গেছে, তার মিরাসের বণ্টন কীভাবে হবে?" তখন তিনি মৃতের সম্পদের অর্ধেক মেয়েকে এবং বাকি অর্ধেক বোনকে প্রদান করলেন।'¹
মুআজ বিন জাবাল (রা)-এর হিমসবাসী কতিপয় ছাত্র বর্ণনা করেন, 'মুআজ (রা)-কে ইয়ামানের প্রশাসক হিসেবে পাঠানোর প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নিকট কোনো মোকদ্দমা পেশ করা হলে তুমি কীভাবে তার ফয়সালা করবে?" তিনি উত্তর দিলেন, "আমি আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করব।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তুমি আল্লাহর কিতাবে তার স্পষ্ট কোনো সমাধান না পাও?” তিনি বললেন, "তখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ফয়সালা করব।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ও আল্লাহর কিতাবে তার কোনো সমাধান না পাও?" তিনি বললেন, "তখন আমি নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ করব এবং এ ক্ষেত্রে কোনোরূপ শিথিলতা করব না।” এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ বিন জাবাল (রা)-এর বুকে হাত মেরে বললেন:
'সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফিক দিয়েছেন, যার ওপর আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্ট।'²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৬৭৩৪।
২. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৯২, সুনানুত তিরমিজি: ১৩২৭; ইবনুল কাইয়িম হাদিসটাকে সহিহ বলেছেন।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুসআব বিন উমাইর -কে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন

📄 মুসআব বিন উমাইর -কে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসআব বিন উমাইর (রা)-কে তাঁর প্রথম দূত ও শিক্ষক মনোনীত করলেন। যেন তিনি মুসলমানদের দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহ, ইসলামের বিধিবিধান ও কুরআন মাজিদ শিক্ষা দিতে পারেন এবং মদিনাবাসীকে আল্লাহর সরল পথে আহ্বান করতে পারেন। এ কারণেই মদিনাবাসী তাকে 'মুকরি' (কুরআন পাঠকারী) অভিধায় ভূষিত করেছিলেন।¹
এ থেকে প্রমাণিত হয়, মদিনা বিজিত হয়েছিল কুরআনের মাধ্যমে, তরবারির জোরে নয়।
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'আমাদের নিকট সর্বপ্রথম আগমন করেছিলেন মুসআব বিন উমাইর (রা) ও আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা)। তারা দুজন লোকদের কুরআন শেখাতেন।'...²

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ১/৪৩৪।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৯২৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 কঠিন দায়িত্বসমূহ উচ্চ ও অভিজাত বংশীয় লোকদের কাঁধে ন্যস্ত করতেন

📄 কঠিন দায়িত্বসমূহ উচ্চ ও অভিজাত বংশীয় লোকদের কাঁধে ন্যস্ত করতেন


হিজরতের রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তাঁর বিছানায় শোয়ার কঠিন সে দায়িত্ব আলি (রা)-কেই দিয়েছিলেন। যখন কুরাইশরা দারুন নাদওয়ার গোপন বৈঠকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, তখন আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি (রা)-কে সেই রাতে তাঁর বিছানায় শয়ন করার নির্দেশ দিলেন। এদিকে শত্রুরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যার উদ্দেশ্যে বাড়ির চতুর্দিক ঘিরে ফেলল। এমন সংকটময় মুহূর্তে আলি (রা) নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিছানায় শুয়ে পড়লেন। অথচ তিনি পূর্ণরূপে জানতেন যে, আজ রাতে এই বিছানায় শোয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, শত্রুরা বিছানায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আলি (রা)-কে পার্থক্য করতে পারবে না। ফলে এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করে তাকে হত্যা করে ফেলবে।¹
এমন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রয়োজন ছিল সর্বাধিক সাহসী ও বাহাদুর পুরুষের। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি (রা)-এর সাহসিকতা ও শক্তিমত্তা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। এ জন্য এই কঠিন দায়িত্বটি তার কাঁধে ন্যস্ত করলেন।
অনুরূপভাবে খাইবার যুদ্ধে পতাকা বহন করার গুরুদায়িত্ব দেওয়ার জন্য আলি (রা)-কেই মনোনীত করেছিলেন।
আর খন্দকের যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর ভেতর প্রবেশ করে তাদের সংবাদ সংগ্রহ করার কঠিন ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন হুজাইফা বিন ইয়ামান (রা)-কে। ইবরাহিম তাইমি (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একবার আমরা হুজাইফা (রা)-এর সাথে ছিলাম, এমন সময় এক ব্যক্তি বলে উঠলেন, "হে আবু আব্দুল্লাহ, আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছেন এবং তাঁর সাহচর্য গ্রহণে ধন্য হয়েছেন?" তিনি বললেন, "হাঁ, আমার ভাতিজা।" লোকটি বললেন, "আল্লাহর কসম, আমরা যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পেতাম, তবে তাঁর সঙ্গে পথ চলার সময় সময় তাঁকে আমাদের কাঁধে তুলে নিতাম। তাঁর সঙ্গে মিলে একত্রে যুদ্ধ করতাম এবং এতে কোনোরূপ পিছপা হতাম না।" হুজাইফা (রা) বললেন, 'তুমি তা-ই করতে? কিন্তু আমি তো খন্দক যুদ্ধের রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। (সে রাতে) প্রচণ্ড বায়ু ও তীব্র শীত আমাদের কাবু করে ফেলেছিল। এমনই সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করলেন:
'ওহে, এমন কেউ আছে কি, যে আমাকে শত্রুশিবিরের খবর এনে দেবে; আল্লাহর তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন আমার সঙ্গে রাখবেন?'
আমরা তখন চুপ করে রইলাম এবং আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের একটি অংশ পর্যন্ত নামাজ পড়লেন। তারপর আমাদের নিকট এসে আবার বললেন:
'ওহে, এমন কেউ আছে কি, যে আমাকে শত্রুশিবিরের খবর এনে দেবে; আল্লাহর তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন আমার সঙ্গে রাখবেন?'
এবারও আমরা চুপ রইলাম এবং আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তিনি আবার ঘোষণা করলেন:
'ওহে, এমন কেউ আছে কি, যে আমাকে শত্রুশিবিরের খবর এনে দেবে; আল্লাহর তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন আমার সঙ্গে রাখবেন?'
এবারও আমরা চুপ করে রইলাম এবং আমাদের কেউ তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। আসলে আমরা সবাই চরম ঝুঁকি, অসহ্য ক্ষুধাযন্ত্রণা ও প্রচণ্ড শীতের কারণে সাড়া দিচ্ছিলাম না। এবার তিনি বললেন, "হে হুজাইফা, ওঠো এবং আমাদের নিকট শত্রুপক্ষের খবর নিয়ে এসো।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এবার আমার নাম ধরেই ডাক দিলেন, তাই ওঠা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি আরও বললেন:
'হে হুজাইফা, তুমি গিয়ে শত্রুশিবিরের মাঝে ঢুকে পড়বে, তারপর তাদের গতিবিধি লক্ষ করবে। কিন্তু খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের কাছে আসা পর্যন্ত নতুন কোনো সমস্যা সৃষ্টি কোরো না।'
তারপর আমি যখন তাঁর নিকট থেকে প্রস্থান করলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি যেন উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে চলছি। এভাবে আমি তাদের (শত্রুপক্ষের) নিকট পৌঁছে গেলাম। তারপর আমি তাদের মাঝে প্রবেশ করলাম। সেখানে দেখতে পেলাম, ঘূর্ণিঝড় আর আল্লাহর সৈন্যরা যথেষ্ট কাজ করেছে। কাফিরদের ডেক-পাতিলগুলো এলোমেলো পড়ে আছে (সেগুলোতে কোনো খাবার নেই) আর না তাদের চুলায় আগুন আছে। তাদের তাঁবুগুলোও ঠিক নেই। তখন আবু সুফইয়ান বিন হারব (রা) দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, "হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমাদের প্রত্যেকে নিজের পাশের জনকে শনাক্ত করে নাও (যেন কোনো গুপ্তচর থাকলে ধরা পড়ে যায়)।" তখন আমি আমার পাশে থাকা লোকটির হাত ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি কে?" সে বলল, "আমি অমুকের ছেলে অমুক।" অতঃপর আবু সুফইয়ান (রা) বললেন, "হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আল্লাহর কসম, তোমরা অবস্থান করার মতো জায়গায় নেই। আমাদের রসদপাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। ওদিকে বনু কুরাইজা আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। এখন পর্যন্ত তাদের থেকে অসন্তোষজনক খবরই শুনতে পাচ্ছি আমরা। আর তোমরা তো দেখতেই পাচ্ছ, আমরা এখন ঘূর্ণিঝড়ের কবলে। আল্লাহর কসম, না আমরা রান্না চড়াতে পারছি, না আগুন ধরাতে পারছি। তার ওপর তাঁবুও স্থাপন করা যাচ্ছে না। তাই তোমরা ফিরে চলো। কারণ আমি ফিরে যাব।” অতঃপর তিনি তার উটের কাছে দাঁড়ালেন। উটটি বাঁধা ছিল। উটের ওপর বসে তিনি সেটার ওপর আঘাত করলেন। উটটি তিন-চারবার লাফিয়ে উঠল। অতঃপর রশি খুলে দিলে সেটি দাঁড়িয়ে গেল। তখন আমি একটি তির তুলে ধনুকে সংযোজন করলাম। যেই আবু সুফইয়ানের (রা) প্রতি তির ছুড়তে যাব, তখনিই মনে পড়ে গেল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাবধানবাণী-"ওখানে নতুন কোনো সমস্যা সৃষ্টি কোরো না।" আমি নিশ্চিত, যদি আমি তখন তির নিক্ষেপ করতাম, তবে তির নির্ঘাত লক্ষ্যভেদ করত।'
অতঃপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে আসলাম। আসার সময় মনে হচ্ছিল, যেন আমি উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই পথ চলছি। তারপর যখন ফিরে এসে শত্রুদের খবর তাঁকে দিলাম এবং আমার দায়িত্ব থেকে অবসর হলাম, তখন আবার আমি শীতের তীব্রতা অনুভব করতে শুরু করলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত একটি কম্বল দ্বারা আমাকে আবৃত করে দিলেন, যা তিনি সালাত আদায়ের সময় গায়ে দিতেন। তারপর আমি ভোর পর্যন্ত একটানা নিদ্রায় আচ্ছন্ন রইলাম। যখন ভোর হলো, তখন তিনি বললেন, "হে ঘুমকাতুরে! এখন উঠে পড়ো।”²
'তখন মনে হচ্ছিল আমি যেন উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে চলছি'-অর্থাৎ ওই সময় অন্যান্য মানুষ শীতের যে তীব্রতা অনুভব করছিল, তা তিনি অনুভব করছিলেন না। এ ছাড়াও তখন যে ঘূর্ণিঝড় প্রবাহিত হচ্ছিল, তার তীব্র ঠান্ডাও তার অনুভূত হচ্ছিল না। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ মান্য করার বরকত ও তাঁর দোয়ার বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করছিলেন। তার প্রতি আল্লাহ তাআলা এই বিশেষ অনুগ্রহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে আসা পর্যন্ত জারি ছিল। যখন তিনি দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করলেন, তখন আবার তিনি সেই ঠান্ডা অনুভব করতে শুরু করলেন, যা অন্যরা পূর্ব থেকেই অনুভব করছিল। এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম মুজিজা।³
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে এমন একটি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য হুজাইফা (রা)-কেই বেছে নিয়েছেন। এর কারণ হলো, তিনি তার আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তি, বুদ্ধি ও সাহস সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তার মাঝে একজন আত্মত্যাগী ও দুঃসাহসী সৈনিকের সবটুকু গুণ বিদ্যমান ছিল। ঝুঁকি ও শঙ্কার মধ্যে থেকে কীভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়, তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন। এ জন্যই তো, গভীর অন্ধকার ও ঠান্ডার তীব্রতা উপেক্ষা করে বিশাল সৈন্যবাহিনীর শিবিরে অকুতোভয় সৈনিকের মতো ঢুকে পড়তে এতটুকু বুক কাঁপেনি তাঁর। এই ঘটনা তার সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি তার ইমান ও বিশ্বাসের দৃঢ়তাকেও স্পষ্ট করে তোলে।⁴

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ১/৪৮২।
২. সহিহু মুসলিম: ১৭৮৮, মুসনাদু আহমাদ: ২২৮২৩ (এখানে উভয়ের রিওয়ায়াতের সমন্বিত রূপ উপস্থাপন করা হয়েছে।)
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/১৪৬।
৪. মুহাম্মাদ সাদিক আরজুন কৃত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ: ৪/১৯৭। (কিছুটা পরিবর্তন করে উপস্থাপিত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00