📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 হাসসান বিন সাবিত -কে কবিতার মাধ্যমে জবাব দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন

📄 হাসসান বিন সাবিত -কে কবিতার মাধ্যমে জবাব দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মধ্যে অনেকেই নির্দিষ্ট বিষয়ে অন্যদের তুলনায় অধিক পারদর্শী ও প্রতিভাবান ছিলেন। সুতরাং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কাব্যিক প্রতিভায় অন্যদের তুলনায় সেরা ছিলেন। যেমন: হাসসান বিন সাবিত (রা)। কেউ কেউ ফিকহ ও জ্ঞান-গরিমায় অধিক পারদর্শী ছিলেন। যেমন: আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)। অনেকেই বিচারকার্য ও ফয়সালা প্রদানে অন্যদের তুলনায় বেশি পারদর্শী ছিলেন। যেমন: আলি (রা) ও মুআজ বিন জাবাল (রা)। কেউ কেউ শিক্ষকতা ও যোগ্যতা অর্জনে পারদর্শী ছিলেন। যেমন: জাইদ বিন সাবিত (রা)। কেউ কেউ স্মরণশক্তির দিক দিয়ে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন। যেমন : আবু হুরাইরা (রা)। কেউ কেউ সমরবিদ্যা ও যুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে অধিক পারদর্শী ছিলেন। যেমন: খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মধ্যে থাকা এসব আল্লাহ-প্রদত্ত যোগ্যতা ও গুণাবলির মূল্যায়ন করতেন। তিনি প্রত্যেকের প্রতিভা ও শক্তিমত্তা অনুযায়ী তাঁদের সাথে আচরণ করতেন। সুতরাং যে সাহাবি যে কাজে অধিক পারদর্শী, তাকে সে কাজের দায়িত্ব দিতেন।
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কুরাইশদের বিরুদ্ধে তোমরা ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করো। কেননা, তা তাদের বিরুদ্ধে তির নিক্ষেপের চাইতে অধিকতর শক্তিশালী।' এরপর তিনি আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহ (রা)-এর কাছে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করলেন। তিনি তাকে বললেন, 'ওদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করো।' তিনি ব্যঙ্গ কবিতা আবৃত্তি করলেন, কিন্তু তিনি তাতে খুশি হলেন না। তখন তিনি কাব বিন মালিক (রা)-কে ডেকে পাঠালেন। এরপর তিনি হাসসান বিন সাবিত (রা)-এর কাছে লোক পাঠালেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেরিত লোক যখন তার কাছে গেলেন, তখন হাসসান (রা) বললেন, 'তোমাদের জন্য সঠিক সময় এসেছে যে, তোমরা সেই পশুরাজ সিংহকে ডেকে পাঠিয়েছ, যে তার লেজ দ্বারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে।' এরপর তিনি তার জিহ্বা বের করে নাড়াতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, 'সেই মহান সত্তার কসম-যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আমার জিহবা দ্বারা ওদের ফেঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেবো, যেমনিভাবে হিংস্র বাঘ তার থাবা দিয়ে চামড়া খসিয়ে ফেলে।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে হাসসান, তুমি তড়িঘড়ি করো না। কেননা, আবু বকর (রা) কুরাইশদের বংশতালিকা সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত আছেন। আর তাদের মধ্যে আমার বংশও রয়েছে। (তাই এখনই ব্যঙ্গ করা শুরু করলে আমার বংশের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ হতে পারে,) সুতরাং আবু বকর (রা) এসে আমার বংশ তোমাকে পৃথক করে বাতলে দেবেন।' এরপর হাসসান (রা) আবু বকর (রা)-এর কাছে গেলেন এবং (বংশতালিকা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে) ফিরে এলেন। তারপর বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, তিনি আপনার বংশপঞ্জি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করেছেন। সেই মহান সত্তার কসম- যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আপনাকে তাদের মধ্য থেকে এমন সুকৌশলে বের করে আনব, যেমনিভাবে আটার মণ্ড থেকে সূক্ষ্ম কেশাগ্র বের করা হয়।' আয়িশা (রা) বলেন, 'এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাসসান (রা) সম্পর্কে বলতে শুনেছি যে, "যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে কাফিরদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত "রুহুল কুদস" অর্থাৎ জিবরিল (আলাইহিস সালাম) সারাক্ষণ তোমাকে সাহায্য করতে থাকবেন।' আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরও বলতে শুনেছি যে, "হাসসান (রা) তাদের নিন্দাবাদ করল। সে মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি এনে দিল এবং নিজেও প্রশান্তি লাভ করল।" হাসসান (রা)-এর কবিতাটি নিম্নরূপ:
'তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিন্দাবাদ করছ আর আমি তাঁর পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছি এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছেই প্রতিদানের আশা করছি। তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ব্যঙ্গ করছ! যিনি পুণ্যবান-ভ্রান্তি থেকে বহু দূরে তাঁর অবস্থান। তিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ওয়াফাদারি তাঁর চরিত্রের ভূষণ।'
'আমার পিতা, পিতামহ ও আমার ইজ্জত-আবরু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মান ও মর্যাদার অতন্দ্র প্রহরী। কাদা ঘাঁটির দুই প্রান্তে (মুসলিম বাহিনীর) বিজয়ধূলি উড়ছে-এই দৃশ্য যদি তোমরা না দেখো, তবে আমি জীবন দিয়ে দেবো।'
'আমাদের উটগুলো প্রবল শক্তিতে তোমাদের দিকে ছুটতে গিয়ে লাগাম ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করে আর কাঁধে বহন করে রক্তপিপাসু তৃষ্ণাকাতর চকচকে বর্শা। দুর্বার গতিতে পরস্পরকে ডিঙিয়ে ছুটে চলে আমাদের ঘোড়াগুলো-তাদের মুখগুলো সযত্নে ওড়না দিয়ে মুছে দেয় আমাদের নারীরা।'
'তোমরা যদি আমাদের (ইসলাম) থেকে বিমুখ হও, তবে আমরা তোমাদের দিকে অগ্রসর হব। আর বিজয় আমাদেরই পদচুম্বন করবে। সেদিন খুলে যাবে তোমাদের ভ্রান্তির মুখোশ। কিংবা অপেক্ষা করো সেই লড়াইয়ের, যেদিন আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করবেন।'
'আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দাকে প্রেরণ করেছি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিসেবে-তিনি আহ্বান করেন সত্যের পথে, যাতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, আমি এমন এক বাহিনী প্রস্তুত করেছি, যাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো শত্রুর মোকাবেলা করা। সবকিছুর মোকাবেলায় প্রতিদিন আমরা প্রস্তুত থাকি-আক্রমণ গালি দিয়ে হোক বা লড়াইয়ের মাধ্যমে কিংবা নিন্দাবাদের দ্বারা।'
'তোমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিন্দা করো কিংবা প্রশংসা কিংবা সাহায্য করো-সবই তাঁর জন্য এক বরাবর। কারণ, আমাদের মাঝে আছেন আল্লাহর দূত জিবরিল (আলাইহিস সালাম)-যিনি রুহুল কুদস, তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।'¹
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসসান (রা)-কে বললেন-
'তাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করো, জিবরিল (আলাইহিস সালাম) তোমার সাথে রয়েছেন।'²
সাইদ বিন মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উমর (রা) মসজিদে গেলেন। তখন সেখানে হাসসান (রা) কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। তিনি (হাসসান রা) বললেন, "আমি এখানে সে সময়েও কবিতা আবৃত্তি করতাম, যখন এখানে আপনার চেয়েও উত্তম ব্যক্তি ছিলেন।” অতঃপর তিনি আবু হুরাইরা (রা)-এর দিকে ফিরে বললেন, "তুমি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছ-
'আমার পক্ষ হতে (কাফিরদের জবাব দাও)। হে আল্লাহ, তাকে রুহুল কুদস (জিবরিল আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে শক্তিশালী করুন?'
আবু হুরাইরা (রা) বললেন, "হাঁ।”'³
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
বৈধ কবিতা মসজিদের ভেতর আবৃত্তি করা জায়িজ। আর যে কবিতায় ইসলাম ও মুসলমানদের গুণগান বিবৃত হয়েছে, অথবা কাফিরদের ব্যঙ্গ করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে, ওই কবিতা মসজিদের ভেতর আবৃত্তি করা মুসতাহাব। হাসসান (রা)-এর কবিতা এমন ছিল।
এ ধরনের কবিতা যারা রচনা করে, তাদের জন্য দোয়া করা মুসতাহাব।
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, 'উমরাতুল কাজা করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করলেন। তখন আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) তাঁর সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলেন:
'হে কাফিরের বাচ্চারা, তাঁর পথ ছেড়ে দাও। আজ তাঁকে বাধা দিলে কুরআনের নির্দেশে তোমাদের এমন মার দেবো, তোদের মস্তক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে আর বন্ধু ভুলে যাবে বন্ধুর কথা।'
উমর (রা) বললেন, "হে ইবনে রাওয়াহা, এই হারাম শরিফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে কবিতা আবৃত্তি করছ?" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে তার কাজ করতে দাও, হে উমর, তার কবিতা তাদের অন্তরে তিরের চেয়ে দ্রুতগতিতে বিদ্ধ হচ্ছে।'⁴

টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২৪৯০।
২. সহিহুল বুখারি: ৩২১৩, সহিহু মুসলিম: ২৪৮৬।
৩. সহিহুল বুখারি: ৩২১২, সহিহু মুসলিম: ২৪৮৫।
৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৮৪৭, সুনানুন নাসায়ি: ২৮৭৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 জাইদ বিন সাবিতকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন

📄 জাইদ বিন সাবিতকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন


খারিজা বিন জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'তার পিতা জাইদ বিন সাবিত (রা) তাকে বলেছেন, "যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করলেন, তখন আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাকে দেখে তাঁর বেশ পছন্দ হলো। লোকেরা বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এ হচ্ছে বনু নাজ্জারের এক বালক। সে আপনার ওপর অবতীর্ণ কুরআন থেকে দশটির অধিক সুরা মুখস্থ করেছে।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কুরআন পড়তে বললেন। আমি সুরা কাফ তিলাওয়াত করলাম। আমার তিলাওয়াত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পছন্দ হলো। তিনি বললেন, "আমার জন্য ইহুদিদের ভাষা শেখো। কারণ, আমি আমার চিঠিপত্রের ব্যাপারে ইহুদিদের ওপর ভরসা করতে পারি না।"'
জাইদ (রা) বলেন, 'তারপর মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে আমি তাদের ভাষা দক্ষতার সাথে শিখে ফেলি। এরপর থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো চিঠি লিখতে চাইলে আমি লিখে দিতাম এবং তাঁর নিকট কোনো চিঠি আসলে আমি তা পড়ে শোনাতাম।'¹
এত অল্প সময়ে ইহুদিদের ভাষা শিখে নেওয়া থেকে সহজেই প্রমাণিত হয়, তিনি ছোটবেলা থেকে কতটা মেধাবী ও স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ছিলেন!
ইমাম জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ব্যাপারে লেখেন, '... তাঁর পিতা হিজরতের পূর্বে সংঘটিত বুআসের যুদ্ধে নিহত হন। ফলে জাইদ (রা) এতিম হয়ে লালিতপালিত হন। আর তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী।'²
ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'জাইদ বিন সাবিত (রা) সীমাহীন মেধাবী ছিলেন। তিনি মাত্র পনেরো দিনে ইহুদিদের ভাষা ও লেখা রপ্ত করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি কিসরার দূত থেকে মাত্র আঠারো দিনে ফারসি ভাষা শিখেছিলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিভিন্ন খাদিমের কাছ থেকে হাবশি ভাষা, রোমানিক ভাষা ও কিবতি ভাষা শিক্ষা করেছিলেন।'³
তার তীক্ষ্ণ মেধাশক্তি ও প্রতিভার কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ওহি লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন।
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'যখন (لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ) "মুমিনদের মধ্যে যারা (জিহাদ না করে) বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, তারা সমান নয়।"-এ আয়াত নাজিল হলো, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমার কাছে জাইদকে (রা) ডেকে আনো আর তাকে স্লেট, দাওয়াত ও কাঁধের হাড্ডি অথবা দোয়াত ও কাঁধের হাড্ডি আনতে বলো।'
অতঃপর বললেন, "লেখো ....لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে অন্ধ সাহাবি আমর বিন উম্মে মাকতুম (রা) ছিলেন। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি তো অন্ধ মানুষ। আমার কী হবে?" তখন ওই আয়াতের স্থলে নাজিল হলো:
'গৃহে উপবিষ্ট মুসলমান যাদের কোনো সংগত ওজর নেই এবং ওই মুসলমান যারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা সমান নয়।'⁴-⁵
তার এসব গুণাবলির কারণেই আবু বকর সিদ্দিক (রা) কুরআন সংকলনের দায়িত্ব তার ওপরই ন্যস্ত করেছিলেন। এ সম্পর্কে জাইদ (রা) বর্ণনা করেন, 'আবু বকর (রা) (তাঁর খিলাফতের সময়) এক ব্যক্তিকে আমার কাছে পাঠালেন। এ সময় ইয়ামামার যুদ্ধ চলছিল। (আমি এলাম) তখন তাঁর কাছে উমর (রা) বসা ছিলেন। তিনি বললেন, "উমর (রা) আমাকে বললেন যে, "ইয়ামামার যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, আমার ভয় হচ্ছে, কুরআন বিশেষজ্ঞ (হাফিজগণ) ইয়ামামার যুদ্ধে শহিদ হয়ে যান নাকি! যদি আপনারা তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করেন, তবে কুরআনের অনেক অংশ বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই কুরআনকে একত্র করে সংরক্ষণ করা ভালো মনে করি।" আমি (আবু বকর রা) তাঁকে বললাম, "আমি এ কাজ কীভাবে করতে পারি, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করে যাননি।" কিন্তু উমর (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, এটা কল্যাণকর হবে।” উমর (রা) তাঁর এ কথার পুনরুক্তি করতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এ কাজ করার জন্য আমার বক্ষকে উন্মুক্ত করে দেন। (অর্থাৎ এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই) এবং শেষ পর্যন্ত (এ ব্যাপারে) আমার অভিমত উমর (রা)-এর মতোই হয়ে যায়।'
জাইদ বিন সাবিত (রা) বলেন, 'উমর (রা) সেখানে নীরবে বসা ছিলেন, কোনো কথা বলছিলেন না। এরপর আবু বকর (রা) আমাকে বললেন, "দেখো, তুমি যুবক এবং জ্ঞানী ব্যক্তি। আমরা তোমার প্রতি কোনোরূপ বিরূপ ধারণা পোষণ করি না। কেননা, তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে ওহি লিপিবদ্ধ করতে। সুতরাং তুমি কুরআনের আয়াত সংগ্রহ করে একত্র করো।" জাইদ (রা) বলেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি কুরআন একত্র করার যে নির্দেশ আমাকে দিলেন, সেটি আমার কাছে এত ভারী মনে হলো যে, তিনি যদি কোনো একটি পাহাড় স্থানান্তরিত করতে নির্দেশ দিতেন, তাও আমার কাছে এরূপ ভারী মনে হতো না।' আমি বললাম, 'যে কাজ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করে যাননি, সে কাজটি আপনারা কীভাবে করবেন?' এরপর আবু বকর (রা) বললেন, 'আল্লাহর কসম, এ কাজ করাটাই কল্যাণকর হবে।' আমি আমার কথায় অটল থেকে বারবার জোর দিতে লাগলাম। পরিশেষে আল্লাহ যেটা উপলব্ধি করার জন্য আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর বক্ষকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, আমার বক্ষকেও তা উপলব্ধি করার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন (অর্থাৎ এর প্রয়োজনীয়তা তাদের ন্যায় আমিও অনুভব করলাম)। এরপর আমি কুরআন সংগ্রহে লেগে গেলাম এবং হাড়, চামড়া, খেজুরের ডাল ও বাকল এবং মানুষের বক্ষস্থল (অর্থাৎ মানুষের কাছে যা মুখস্থ ছিল, তা) থেকে তা সংগ্রহ করলাম...।⁶
আলি বিন আবি তালিব (রা) বলেন:
'কুরআন সংকলনের কারণে সবচেয়ে বেশি সাওয়াব ও প্রতিদান পাবেন আবু বকর (রা)। আল্লাহ তাআলা আবু বকর (রা)-এর ওপর রহম করুন। তিনিই সর্বপ্রথম কুরআনকে মলাটবদ্ধ করেছেন।'⁷
আলি (রা)-এর এই উক্তি আবু বকর (রা)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সম্মানবোধ ও তাঁর খিলাফতের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপনের প্রমাণ বহন করে। এ ছাড়াও তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে মিথ্যাবাদী রাফিজি সম্প্রদায়ের বাতিল ধারণার অসারতা প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৭১৫, সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৪৫।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৪২৭।
৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/৩৩।
৪. সুরা আন-নিসা, ৪: ৯৫।
৫. সহিহুল বুখারি: ৪৯৯০, সহিহু মুসলিম: ১৮৯৮।
৬. সহিহুল বুখারি: ৪৬৭৯।
৭. আবু বকর বিন আবু দাউদ রচিত আল-মাসাহিফ: ১/৪৯। ফাতহুল বারি (৯/১২)-তে ইবনে হাজার হাদিসটাকে হাসান বলেছেন।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুআজ বিন জাবালকে ইয়ামানের বিচারপতির দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন

📄 মুআজ বিন জাবালকে ইয়ামানের বিচারপতির দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন


হালাল-হারাম চেনার ক্ষেত্রে মুআজ বিন জাবাল (রা)-এর অসাধারণ প্রতিভা ছিল। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়ামানের বিচারপতি নিয়োগ করেছিলেন।
আসওয়াদ বিন ইয়াজিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইয়ামানে আমাদের শিক্ষক ও আমির হিসেবে মুআজ বিন জাবাল (রা) আসলেন। তখন আমরা তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, "এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময় ওয়ারিশ হিসেবে একটি বোন ও একটি কন্যা-সন্তান রেখে গেছে, তার মিরাসের বণ্টন কীভাবে হবে?" তখন তিনি মৃতের সম্পদের অর্ধেক মেয়েকে এবং বাকি অর্ধেক বোনকে প্রদান করলেন।'¹
মুআজ বিন জাবাল (রা)-এর হিমসবাসী কতিপয় ছাত্র বর্ণনা করেন, 'মুআজ (রা)-কে ইয়ামানের প্রশাসক হিসেবে পাঠানোর প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নিকট কোনো মোকদ্দমা পেশ করা হলে তুমি কীভাবে তার ফয়সালা করবে?" তিনি উত্তর দিলেন, "আমি আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করব।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তুমি আল্লাহর কিতাবে তার স্পষ্ট কোনো সমাধান না পাও?” তিনি বললেন, "তখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ফয়সালা করব।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ও আল্লাহর কিতাবে তার কোনো সমাধান না পাও?" তিনি বললেন, "তখন আমি নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ করব এবং এ ক্ষেত্রে কোনোরূপ শিথিলতা করব না।” এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ বিন জাবাল (রা)-এর বুকে হাত মেরে বললেন:
'সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফিক দিয়েছেন, যার ওপর আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্ট।'²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৬৭৩৪।
২. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৯২, সুনানুত তিরমিজি: ১৩২৭; ইবনুল কাইয়িম হাদিসটাকে সহিহ বলেছেন।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুসআব বিন উমাইর -কে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন

📄 মুসআব বিন উমাইর -কে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসআব বিন উমাইর (রা)-কে তাঁর প্রথম দূত ও শিক্ষক মনোনীত করলেন। যেন তিনি মুসলমানদের দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহ, ইসলামের বিধিবিধান ও কুরআন মাজিদ শিক্ষা দিতে পারেন এবং মদিনাবাসীকে আল্লাহর সরল পথে আহ্বান করতে পারেন। এ কারণেই মদিনাবাসী তাকে 'মুকরি' (কুরআন পাঠকারী) অভিধায় ভূষিত করেছিলেন।¹
এ থেকে প্রমাণিত হয়, মদিনা বিজিত হয়েছিল কুরআনের মাধ্যমে, তরবারির জোরে নয়।
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'আমাদের নিকট সর্বপ্রথম আগমন করেছিলেন মুসআব বিন উমাইর (রা) ও আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা)। তারা দুজন লোকদের কুরআন শেখাতেন।'...²

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ১/৪৩৪।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৯২৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00