📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নেতৃস্থানীয় লোক অপরাধ করলে অন্যদের তুলনায় কঠোর হতেন

📄 নেতৃস্থানীয় লোক অপরাধ করলে অন্যদের তুলনায় কঠোর হতেন


আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবার পাশে নামাজ পড়ছিলেন এবং কুরাইশের একটি দল সেখানে বৈঠক করছিল। তখন তাদের মধ্য থেকে একজন (আবু জাহেল) বলল, "এই রিয়াকারকে দেখতে পাচ্ছ? তোমাদের মধ্য থেকে কেউ কি অমুক গোত্রের উট জবাই করার স্থান থেকে গোবর, রক্ত ও গর্ভাশয় নিয়ে এসে অপেক্ষায় থাকবে, তারপর এই ব্যক্তি সিজদায় গেলে সেগুলো তার দুই কাঁধের মাঝখানে রেখে দেবে?" তখন এ কাজের জন্য চরম হতভাগ্য ব্যক্তি (উকবা বিন আবু মুআইত) উঠে দাঁড়াল। অতঃপর তা নিয়ে এসে অপেক্ষায় থাকল। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় গেলেন, তখন সে তাঁর পিঠের ওপর দুই কাঁধের মাঝখানে তা রাখল।'
ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, 'তখন আমার যদি প্রতিরোধ করার শক্তি থাকত, তখন আমি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিঠ থেকে তা ফেলে দিতাম। এ দৃশ্য দেখে তারা হাসাহাসি করতে লাগল এবং হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের ওপর লুটিয়ে পড়তে লাগল। এ অবস্থা দেখে এক ব্যক্তি ফাতিমা (রা)-এর কাছে গেলেন। তিনি তখন ছোট বালিকা ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও সিজদারত ছিলেন। ফাতিমা (রা) সেগুলো তাঁর কাঁধের ওপর থেকে ফেলে দিলেন এবং মুশরিকদের লক্ষ্য করে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। নামাজ শেষ করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদদোয়া করলেন:
"আল্লাহ, আপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন। আল্লাহ, আপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন। আল্লাহ, আপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বদদোয়া শুনে তারা ঘাবড়ে গেল। কারণ, তারা বিশ্বাস করত যে, এই শহরে দোয়া করলে তা কবুল করা হয়। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম নিয়ে বদদোয়া করলেন:
"হে আল্লাহ, কুরাইশের এই লোকদের ধ্বংস করুন-আবু জাহেল, উতবা বিন রাবিআ, শাইবা বিন রাবিআ, ওয়ালিদ বিন উতবা, উমাইয়া বিন খালাফ, উকবা বিন আবু মুআইত, উমরা বিন ওয়ালিদ-এদের ধ্বংস করুন।"
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'সেই সত্তার কসম-যাঁর হাতে আমার জীবন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের নাম নিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে আমি বদরের কূপের মধ্যে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। তবে উমাইয়া (রা) তাদের মধ্যে ছিল না। কেননা, সে বিশালদেহী ছিল। তাই সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) যখন তাকে ধরে টানলেন, তখন কূপে নিক্ষেপ করার পূর্বেই তার গ্রন্থিগুলো আলাদা হয়ে গেল।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহনশীলতা। তায়ালিসির (রাহিমাহুল্লাহ) রিওয়ায়াতে আছে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'ওই দিন ছাড়া আর কোনোদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাদের জন্য বদদোয়া করতে দেখিনি।'
ইবনে হাজার আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সেদিন তারা আল্লাহর ইবাদতরত অবস্থায় থাকা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে উপহাস ও বিদ্রুপ করে নিজেদের বদদোয়ার উপযুক্ত করে তুলেছিল।'
ফাতিমা (রা) ছোটবেলা থেকেই খুবই সাহসী ছিলেন। কারণ, গোত্র ও ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে তিনি খুবই সম্ভ্রান্ত ছিলেন। এ জন্যই তিনি কুরাইশ নেতাদের উচ্চস্বরে গালি দিলেও তারা কোনো প্রত্যুত্তর করেনি।
জালিমের জন্য বদদোয়া করা জায়িজ।
অপরাধকর্মের কলকাঠি নাড়া এবং তাতে সাহায্য করার চেয়ে সরাসরি অপরাধকর্ম করা অধিক মারাত্মক। এ জন্য উকবাকে 'চরম হতভাগ্য' বলে অভিহিত করা হয়েছে, অথচ তাদের দলে আবু জাহেল ছিল-যে কুফর এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কট্টর ছিল। তা সত্ত্বেও এই ঘটনায় 'চরম হতভাগ্য' বলা হয়েছে উকবাকে। কারণ, অন্যরা এই জঘন্য কর্মে নির্দেশ দিয়ে এবং সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শরিক ছিল, আর উকবা সরাসরি কাজটি আনজাম দিয়েছিল। ফলে সে-ই তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হতভাগা হলো। এ জন্যই অন্যরা সবাই যুদ্ধের মাঠে নিহত হলেও সে নিহত হয়েছে বন্দী অবস্থায়।²
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের ইসলামে দীক্ষিত করাকে পছন্দ করতেন। এ জন্য যাদের ব্যাপারে তিনি আশা করতেন যে, তারা পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করবে, তাদের জন্য বদদোয়া করতেন না। বরং তাদের জন্য হিদায়াতের দোয়া করতেন। কিন্তু যাদের ব্যাপারে ইসলাম গ্রহণ করার আশা থাকত না এবং তাদের অনিষ্ট ও ধৃষ্টতার আশঙ্কা করতেন, তাদের জন্য বদদোয়া করতেন। যেমন: তাদের জন্য ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর যুগের মতো কয়েক বছরের জন্য খরা আসার বদদোয়া করেছিলেন এবং কুরাইশ নেতাদের জন্য তাদের শত্রুতা ও কষ্টদানে অতিষ্ঠ হয়ে বদদোয়া করেছিলেন। তাদের ব্যাপারে তাঁর বদদোয়া কবুল করা হয়, ফলে বদর যুদ্ধে তারা নিহত হয়। যেভাবে তাঁর হিদায়াতের দোয়ার বরকতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করে।'³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৪০, সহিহু মুসলিম: ১৭৯৪।
২. ফাতহুল বারি: ১/৩৫২।
৩. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৯/১৪৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অনেক সময় তাদের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলতেন

📄 অনেক সময় তাদের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলতেন


উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা)-কে বললাম, "কুরাইশ কর্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে শত্রুতার সর্বোচ্চ প্রকাশ কী দেখতে পেয়েছেন আপনি?" তিনি বললেন, "একদিন কুরাইশ নেতৃবৃন্দ হাতিমে কাবার নিকট একত্রিত হলে আমি তাদের ওখানে উপস্থিত হলাম। সেখানে তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে আলোচনা করল। তারা বলল, "এই ব্যক্তির ব্যাপারে আমরা যে রকম সবর করছি, এমন সবর ইতিপূর্বে কখনো করিনি আমরা। সে আমাদের বিজ্ঞজনদের বোকা সাব্যস্ত করেছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের গালমন্দ করেছে, আমাদের দ্বীনের প্রতি দোষারোপ করেছে, আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করে দিয়েছে, আমাদের উপাস্যদের গালি দিয়েছে-তার এত এত অপরাধ সত্ত্বেও আমরা তার ব্যাপারে ধৈর্য ধরে আছি!" তারা তাদের আলাপচারিতায় রত ছিল-এমন সময় সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে রুকনের নিকট আসলেন, অতঃপর তাদের পাশ দিয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করতে লাগলেন। তিনি যখন তাদের পাশ দিয়ে প্রদক্ষিণ করলেন, তখন তারা বিভিন্ন অশালীন কথা বলে তাঁকে কটাক্ষ করল। আমর বিন আস (রা) বলেন, "তখন আমি তাঁর চেহারায় অসন্তোষভাব লক্ষ করলাম। অতঃপর তিনি সামনে চলে গেলেন। তারপর দ্বিতীয় প্রদক্ষিণে তাঁর নিকট হতে অতিক্রম করার সময় তারা পূর্বের মতো কটাক্ষ করল। এবারেরও তাঁর চেহারায় অসন্তোষভাব দেখতে পেলাম। তিনি সামনে চলে গেলেন। তৃতীয় প্রদক্ষিণে তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা আবার কটাক্ষ করল। তখন তিনি বললেন:
'শুনে নাও হে কুরাইশ, সেই সত্তার কসম খেয়ে বলছি-যাঁর হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাণ, আমি তোমাদের জবাই করতে এসেছি।'
তাঁর কথা শুনে তারা ঘাবড়ে গেল। তাদের অবস্থা এমন হয়ে গেল, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। ইতিপূর্বে যে সবার চেয়ে শক্ত কথা বলে কটাক্ষ করছিল, সে নম্রতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়ে যথাসাধ্য সুন্দর ভাষায় বলল, "চলে যাও, হে আবুল কাসিম, শান্ত হয়ে চলে যাও! আল্লাহর কসম, তুমি নির্বোধ নও।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে গেলেন। পরের দিন তারা আবার হাতিমে একত্রিত হলো। আমিও তাদের সাথে ছিলাম। তারা একে অপরকে বলল, "তোমাদের মনে আছে, তোমরা তাকে কী বলেছিলে, আর সে তোমাদের কী বলেছিল। এমনকি (গতকাল) সে তোমাদেরকে তোমাদের অপ্রিয় কথা শোনালেও তোমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছিলে।" তারা আলাপরত ছিল-এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। তখন তারা একযোগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে বলতে লাগল, "তুমি কি এমন এমন কথা বলো?" কারণ, তাদের নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি তাদের উপাস্য ও দ্বীনের নিন্দা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ, আমিই তা বলেছি।” আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা) বলেন, "তখন আমি দেখলাম যে, এক ব্যক্তি তাঁর চাদরের সংযোগস্থল আঁকড়ে ধরল। তখন আবু বকর (রা) পেছনে দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে বললেন: তাঁর
'তোমরা কি একজনকে এ জন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ?'
অতঃপর তারা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেল। এটাই আমার দেখা কুরাইশ কর্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর সবচেয়ে মারাত্মক আক্রমণ।'¹

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ১/২৯৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের দয়া-মায়া শিক্ষা দিতেন

📄 তাদের দয়া-মায়া শিক্ষা দিতেন


আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান বিন আলি (রা)-কে চুম্বন করলেন। তখন তাঁর পাশে আকরা বিন হাবিস তামিমি (রা) বসা ছিলেন। তিনি বললেন, "আমার দশটি সন্তান আছে, তাদের কাউকেই কখনো চুমু খাইনি আমি।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে ফিরে বললেন:
'যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।'¹

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫৯৯৭, সহিহু মুসলিম: ২৩১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00