📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সম্ভ্রম রাখার প্রতি গুরুত্ব দিতেন

📄 তাদের সম্ভ্রম রাখার প্রতি গুরুত্ব দিতেন


আয়িশা (রা) বলেন, 'আওসের নেতা সাদ বিন মুআজ (রা) খন্দকের যুদ্ধে হাব্বান বিন আরকা নামক এক কুরাইশ ব্যক্তির ছোড়া তিরে আঘাতপ্রাপ্ত হলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য মসজিদ অভ্যন্তরে একটি তাঁবু দিয়ে একটি কক্ষ তৈরি করলেন, যেন তিনি কাছ থেকে তার দেখাশোনা ও সেবা-শুশ্রূষা করতে পারেন।'¹
আবু বকর বিন আরবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক রোগীকে কয়েকবার দেখতে যাওয়া সুন্নাত। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন মুআজ (রা)-এর জন্য মসজিদে একটি কক্ষ তৈরি করে প্রতিদিন তার দেখাশোনা করতেন।'²
শুধু তা-ই নয়, তিনি তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছিলেন। যেমন জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'সাদ বিন মুআজ (রা) আহজাব যুদ্ধের দিন তিরবিদ্ধ হয়ে আহত হলেন। তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে গেল। তার ক্ষতস্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেঁক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করলেন। তারপর তার হাত ফুলে গেল। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে শুরু করল। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দিলেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠল। তিনি (সাদ রা) নিজের এ অবস্থা দেখে বললেন, "হে আল্লাহ, আমার জীবন কেড়ে নেবেন না, যতক্ষণ না বনু কুরাইজার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ জুড়াতে পারি।" তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোঁটাও বের হয়নি। এরপর বনু কুরাইজা সাদ বিন মুআজ (রা)-কে সালিশ মানতে রাজি হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট সমাধান চেয়ে লোক পাঠালেন। তিনি সমাধান দিলেন যে, বনু কুরাইজার পুরুষদের মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদের বাঁচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাদের ব্যাপারে তোমার মত আল্লাহ তাআলার মতের অনুরূপ হয়েছে।" তাদের পুরুষের সংখ্যা ছিল চারশ। সাহাবিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাদের মেরে ফেলার পর তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হলো এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।'³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৪৬৩, সহিহু মুসলিম: ১৭৬৯।
২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৩৮।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১৪৩৫৯, সুনানুত তিরমিজি: ১৫৮২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 খায়রাজের সর্দার সাদ বিন উবাদা -এর সাথে অনুরূপ আচরণ করেছিলেন

📄 খায়রাজের সর্দার সাদ বিন উবাদা -এর সাথে অনুরূপ আচরণ করেছিলেন


আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসা ছিলাম, এমন সময় জনৈক আনসারি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তাঁকে সালাম করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে আনসারি ভাই, আমার ভাই সাদ বিন উবাদা (রা) কেমন আছে?” তিনি উত্তর দিলেন, "ভালো।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের কে কে তাকে দেখতে যাবে?" এ বলে তিনি দাঁড়ালে আমরাও তাঁর সাথে দাঁড়ালাম। সংখ্যায় আমরা দশজনের বেশি ছিলাম। আমাদের কারও পায়ে জুতো, মোজা, মাথায় টুপি এবং গায়ে জামা ছিল না। সে অবস্থায়ই খড়খড়ে রাস্তা দিয়ে চললাম এবং তার কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। আমাদের দেখে তার গোত্রের লোকজন তার কাছ থেকে সরে গেলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এ কি মারা গেছে?” লোকজন জানাল, "না, ইয়া রাসুলাল্লাহ।" তখন তিনি কেঁদে দিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে উপস্থিত লোকেরাও কাঁদতে শুরু করলেন। তখন তিনি বললেন:
'শুনে রাখো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা চোখের পানি ও অন্তরের ব্যথার কারণে আজাব দেবেন না। তিনি আজাব দেবেন অথবা রহম করবেন এর কারণে (এই বলে তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন)। আর নিশ্চয় মৃত ব্যক্তির জন্য পরিবার-পরিজনের বিলাপের কারণে তাকে আজাব দেওয়া হয়।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
রোগীর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া।
রোগীকে দেখতে যাওয়া মুসতাহাব।
উচ্চস্তরের লোক তার চেয়ে নিম্নস্তরের লোককে রোগশয্যায় দেখতে যাওয়া।
ইমাম, কাজি ও আলিম তার অনুসারীদের দেখতে যাওয়া।
ইমাম ও আলিম তার অনুচরদের নিয়ে রোগীকে দেখতে যাওয়া।
সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। দুনিয়াবি সাজসজ্জা ও অতি উন্নত পোশাক-আশাক পরিধান করা থেকে তাঁরা বিরত থাকতেন।
নগ্ন পায়ে হাঁটা বৈধ।

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৩০৪, সহিহু মুসলিম: ৯২৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন

📄 তাদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন


বদর যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেতৃস্থানীয় আনসারি সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন।
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন আবু সুফইয়ান (রা)-এর প্রত্যাবর্তনের খবর আসলো, তখন তিনি পরামর্শ তলব করলেন। প্রথমে আবু বকর (রা) কথা বললেন, কিন্তু তিনি তার কথার কোনো উত্তর দেননি। অতঃপর উমর (রা) কথা বললেন, তার কথারও কোনো উত্তর দেননি। পরিশেষে সাদ বিন উবাদা (রা) দাঁড়ালেন এবং বললেন:
'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি সম্ভবত আমাদের (আনসারদের) মন্তব্য জানতে চাইছেন? সেই সত্তার শপথ-যার হাতে আমার জীবন, আপনি যদি আমাদের ঘোড়া হাঁকিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেন, আমরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ব; আর যদি আমাদের সওয়ারি হাঁকিয়ে "বারকুল গিমাদ"¹ পর্যন্ত পৌঁছার নির্দেশ দেন, আমরা অবশ্যই তা-ই করব।'
বর্ণনাকারী বলেন, 'তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সবাই রওনা হলেন এবং বদর প্রান্তরে গিয়ে উপনীত হলেন।'²
সাদ (রা)-এর কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন এবং তাঁর মাঝে চাঙা ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। উলামায়ে কিরাম বলেন, 'এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কারণ, তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এই মর্মে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন যে, তারা তাঁর সাথে কিতালের উদ্দেশ্যে বের হবেন এবং তাঁকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করবেন। তাই আবু সুফইয়ানের (রা) কাফেলা যখন ফিরতি যাত্রা শুরু করল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, আনসাররা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাদের কৃত অঙ্গীকারের ওপর অটল আছে কি না। অতঃপর তারা খুব সুন্দর ও দৃঢ় ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে, তারা এখনও তাদের দেওয়া অঙ্গীকারের ওপর অটল আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এই হাদিস থেকে বন্ধুবান্ধব ও বিজ্ঞজনদের থেকে পরামর্শ চাওয়ার গুরুত্ব বুঝে আসে।'³
অনুরূপভাবে খন্দক যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন মুআজ (রা) ও সাদ বিন উবাদা (রা)-এর নিকট পরামর্শ চেয়েছিলেন। যখন কুরাইশরা দশ হাজার বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করতে আসলো, তখন গাতফান গোত্রের উয়াইনা বিন হিসন ও তার গোত্রের লোকজনও তাদের সাথে মিলিত হলো। এদিকে হুয়াই বিন আহতাব বনু কুরাইজার লোকদের কাছে গিয়ে তাদের বোঝালে তারা মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসল। এসব কারণে মুসলমানদের বিপদ খুব বড় আকার ধারণ করল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উয়াইনা বিন হিসনের সাথে এই মর্মে চুক্তি করতে চাইলেন যে, তাকে ও তার গোত্রের লোকদের মদিনার এক-তৃতীয়াংশ ফল দিয়ে দেওয়া হবে, বিনিময়ে সে তার গাতফান গোত্রের লোকদের নিয়ে যৌথবাহিনীর সঙ্গ ত্যাগ করে ফিরে যাবে। এ ব্যাপারে পরামর্শ চাওয়ার জন্য সাদ বিন মুআজ (রা) ও সাদ বিন উবাদা (রা)-এর নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোক পাঠালেন। আনসারদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অন্য নেতাদের বাদ দিয়ে শুধু তাঁদের দুজনের নিকট পরামর্শ চাওয়ার কারণ হলো, তাঁরা উভয়ে নিজ নিজ গোত্রের অধিপতি ছিলেন। সাদ বিন মুআজ (রা) আওস গোত্রের অধিপতি ছিলেন এবং সাদ বিন উবাদা (রা) খাজরাজ গোত্রের নেতা ছিলেন। তাই বিশেষভাবে তাঁদের দুজনের কাছেই পরামর্শ চাইলেন। ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'খন্দক যুদ্ধের সময় মুসলমানরা যখন দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ হয়ে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাতফানের দুই নেতা উয়াইনা বিন হিসন ও হারিস বিন আওফের সাথে এই মর্মে চুক্তি করার ইচ্ছা করলেন যে, মদিনার এক-তৃতীয়াংশ ফল তাদের দেওয়া হবে, বিনিময়ে তারা তাদের কওমের লোকজন নিয়ে চলে যাবে। এ চুক্তির ওপর উভয়পক্ষ থেকে একপ্রকার সম্মতি হয়ে গিয়েছিল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই সাদের (রা) নিকট পরামর্শ চাইলেন। তাঁরা বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এটা যদি আপনার নির্দেশ হয়, তাহলে আমরা বিনাবাক্যব্যয়ে তা মেনে নেব। আর যদি আপনি আমাদের করুণ অবস্থার দিকে চেয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে তার প্রয়োজন আমাদের নেই। আমরা ও তারা উভয় সম্প্রদায় একসময় শিরক ও মূর্তিপূজায় জড়িত ছিলাম। তখনও তারা আমাদের কাছ থেকে মেহমানদারি ও বেচাকেনা ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে আমাদের ফল খাওয়ার লোভ করত না। এখন তো আল্লাহ তাআলা আমাদের হিদায়াত দান করেছেন এবং ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, তাই আমাদের সম্পদ তাদের দেওয়ার প্রশ্নই আসতে পারে না। আল্লাহর কসম, তাদের আমরা তলোয়ারের আঘাত ছাড়া আর কিছুই দেবো না।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের পরামর্শকে যথার্থ মনে করলেন এবং বললেন, "সত্যই, আমি উক্ত সিদ্ধান্ত তোমাদের করুণ অবস্থার প্রতি লক্ষ করেই নিয়েছিলাম-যখন আমি দেখতে পেলাম যে, গোটা আরব এক ধনুক থেকে তোমাদের প্রতি তির বর্ষণ করতে শুরু করেছে।"⁴
আমিরুল মুমিনিন উমর (রা)-ও এভাবে পরামর্শ করেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, 'একদা উমর বিন খাত্তাব (রা) সিরিয়ার দিকে যাত্রা করলেন। অতঃপর যখন তিনি "সার্গ” (সউদিয়া ও সিরিয়ার সীমান্ত) এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সাথে সৈন্যবাহিনীর প্রধানগণ-আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রা) ও তাঁর সাথিগণ-সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানান যে, "সিরিয়া এলাকায় (প্লেগ) মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।"' ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'তখন উমর (রা) আমাকে বললেন, "আমার কাছে প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা হিজরত করেছিলেন, সেই মুহাজিরদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ডেকে আনো।” আমি তাঁদের ডেকে আনলাম। উমর (রা) তাঁদের শাম দেশের মহামারির কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে সুপরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হলো। কেউ বললেন, "আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন। তাই তা থেকে ফিরে যাওয়াকে আমরা পছন্দ করি না।” আবার কেউ কেউ বললেন, "আপনার সাথে রয়েছেন অবশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। কাজেই আমাদের কাছে ভালো মনে হয় না যে, আপনি তাঁদের এই মহামারির মধ্যে ঠেলে দেবেন।” উমর (রা) বললেন, "আপনারা উঠুন।” তারপর তিনি বললেন, "আমার নিকট আনসারদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ডেকে আনো।” সুতরাং আমি তাঁদের ডেকে আনলাম এবং তিনি তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কিন্তু তাঁরাও মুহাজিরদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতো তাঁরাও পরস্পর মতানৈক্য করলেন। উমর (রা) বললেন, "আপনারা উঠুন।” তারপর আমাকে বললেন, "এখানে যে সকল বয়োজ্যৈষ্ঠ কুরাইশি আছেন-যাঁরা মক্কা-বিজয়ের বছর হিজরত করেছিলেন-তাঁদের ডেকে আনো।” আমি তাঁদের ডেকে আনলাম। তখন তাঁরা পরস্পর কোনো মতবিরোধ করলেন না। তাঁরা একযোগে বললেন, "আমাদের রায় হলো, আপনি লোকজন নিয়ে ফিরে যান এবং তাদের এই মহামারির কবলে ঠেলে দেবেন না।” তখন উমর (রা) লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, "আমি ভোরে বাহনের পিঠে (ফিরে যাওয়ার জন্য) আরোহণ করব। অতএব তোমরাও তা-ই কোরো।” আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রা) বললেন, "আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির থেকে পলায়ন করার জন্য ফিরে যাচ্ছেন?" উমর (রা) বললেন, "হে আবু উবাইদা, যদি তুমি ছাড়া অন্য কেউ কথাটি বলত!" আসলে উমর (রা) তাঁর বিরোধিতা করাকে অপছন্দ করতেন। উমর (রা) বললেন, "হাঁ, আমরা আল্লাহর তাকদির থেকে আল্লাহর তাকদিরের দিকেই ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলো তো, তুমি কিছু উটকে যদি এমন কোনো উপত্যকায় দিয়ে আসো, যেখানে আছে দুটি প্রান্ত। তন্মধ্যে একটি হলো সবুজ-শ্যামল, আর অন্যটি হলো বৃক্ষহীন। এবার ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ প্রান্তে চরাও, তাহলে তা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ীই চরাবে। আর যদি তুমি বৃক্ষহীন প্রান্তে চরাও, তাহলেও তা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ীই চরাবে?"' বর্ণনাকারী (ইবনে আব্বাস রা) বলেন, 'এমন সময় আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) এলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোনো প্রয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, "এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে। আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে-
'তোমরা যখন কোনো এলাকায় (প্লেগের) প্রাদুর্ভাবের কথা শুনবে, তখন সেখানে যেয়ো না। আর যদি এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব নেমে আসে আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে পলায়ন করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।"'
(এ হাদিস শুনে) উমর (রা) আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং ফিরে গেলেন।⁵
ফায়দা: সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি নববি পদ্ধতি হলো, আক্রান্ত এলাকার কাউকে বাইরে আসতে দেওয়া হবে না এবং বাইরের কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই পদ্ধতি কোয়ার‍্যান্টিন (Quarantine) নামে পরিচিত-যা আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক পূর্বে ইসলাম চালু করেছে। আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বুঝতে পেরেছেন যে, মহামারি-আক্রান্ত অঞ্চল থেকে কাউকে বের হতে না দিলে তা ওই এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে না। তাই তারা মহামারি-আক্রান্ত লোকদের ওই এলাকা থেকে বের হতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এটাকেই কোয়ার‍্যান্টিন (Quarantine) বলা হয়। কিন্তু ইসলাম চোদ্দো-শ বছর পূর্বেই এই পদ্ধতি চালু করে যায়।⁶

টিকাঃ
১. ইয়ামানের একটি অঞ্চলের নাম। অথবা মক্কার পেছনে পাঁচ রাতের দূরত্বে অবস্থিত একটি জায়গা। (আন-নিহায়া: ১/১২১।)
২. সহিহু মুসলিম: ১৭৭৯।
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/১২৪।
৪. জাদুল মাআদ ৩/৩৪০, সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/২২৩।
৫. সহিহুল বুখারি: ৫৭২৯, সহিহু মুসলিম: ২২১৯।
৬. আল-বুহুসুল ইসলামিয়্যাহ-য় (৭১/৩৭১-৩৭২) প্রকাশিত ড. আলি বিন জাবিরের গবেষণা থেকে।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের উপকারের কথা স্মরণ রাখতেন এবং তার প্রতিদান দিতেন

📄 তাদের উপকারের কথা স্মরণ রাখতেন এবং তার প্রতিদান দিতেন


জুবাইর বিন মুতইম (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের বন্দীদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন:
'আজ যদি মুতইম বিন আদি (রা) জীবিত থাকতেন এবং এই ঘৃণ্য লোকদের (মুক্তির) ব্যাপারে আমার সাথে কথা বলতেন, তাহলে তার সম্মানার্থে আমি এদের মুক্ত করে দিতাম।'¹
এই কথা বলে তিনি মুতইম বিন আদির (রা) সেই উপকারের কথা স্মরণ করেছেন, যা তায়িফ থেকে ফিরে আসার পর মক্কায় তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে করেছিলেন। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
অনুরূপভাবে সাফওয়ান বিন উমাইয়া (রা)-কে তিনি উপকারের প্রতিদান দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিনি কয়েকটি লৌহবর্ম ধার দিয়েছিলেন। হুনাইন যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সেই উপকারের প্রতিদান দিলেন এবং তার মন জয় করে নিলেন।
সাফওয়ান বিন উমাইয়া (রা) বর্ণনা করেন, 'খাইবার যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে কয়েকটি লৌহবর্ম ধার চাইলেন। তিনি বলেন, "হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এগুলো কি কেড়ে নিতে চাইছ?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না, বরং এগুলো ধার হিসেবে নিচ্ছি। নষ্ট হয়ে গেলে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকব।" বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর সেখান থেকে কয়েকটি নষ্ট হয়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে তিনি (সাফওয়ান বিন উমাইয়া রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আজ আমি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি।"'²
অতঃপর হুনাইন যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উপকারের বদলা দান করেছিলেন। এ সম্পর্কে ইবনে শিহাব (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, 'মক্কা জয় করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে মুসলমানদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তারপর হুনাইনে গিয়ে তাঁরা যুদ্ধ করলেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীন ও মুসলমানদের বিজয় দান করলেন। সেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান বিন উমাইয়া (রা)-কে একশ গবাদি পশু দান করলেন। অতঃপর একশ একশ করে আরও দুইশ পশু দান করলেন।' ইবনে শিহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমাকে সাইদ বিন মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, সাফওয়ান (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অনেক বেশি দান করলেন। তিনি আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তিনি আমাকে এত অধিক হারে দান করতে লাগলেন যে, একসময় তিনিই আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি হয়ে উঠলেন।"'³
আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলকেও তার উপকারের বদলা দিয়েছিলেন। জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে কবরে রাখার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আসলেন। এসেই তাকে কবর থেকে বের করতে বললেন। তারপর তাকে নিজের হাঁটুর ওপর রেখে তার শরীরে পবিত্র লালা ফেললেন এবং নিজের জামাটি তাকে পরিয়ে দিলেন। আল্লাহই ভালো জানেন, তিনি নিজের জামা তাকে দিয়ে দেওয়ার কারণ হলো, সে আব্বাস (রা)-কে একটি জামা দিয়েছিল।' সুফইয়ান বিন উয়াইনা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবু হারুন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীরে দুটি জামা ছিল। আব্দুল্লাহর ছেলে তাঁকে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতাকে আপনার শরীরের চামড়ার সাথে লাগানো জামাটি পরিয়ে দিন।" সুফইয়ান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অতঃপর উপস্থিত লোকজন দেখতে পেল যে, তিনি তাঁর পূর্বের উপকারের বিনিময়স্বরূপ আব্দুল্লাহকে তাঁর জামাটি পরিয়ে দিলেন।'⁴

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩১৩৯।
২. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৬২, মুসনাদু আহমাদ: ১৪৮৭৮।
৩. সহিহু মুসলিম: ২৩১৩।
৪. সহিহুল বুখারি: ১৩৫০, সহিহু মুসলিম: ২৭৭৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00