📄 সাথে সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন এবং তাদের বাড়িতে খানা খেতেন
কাইস বিন সাদ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দেখতে আমাদের বাড়িতে আসলেন। এসেই তিনি বললেন, "আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।" সাদ (রা) নিম্নস্বরে তার জবাব দিলেন (এমনভাবে জবাব দিলেন, যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনতে না পান)। কাইস (রা) বলেন, আমি বললাম, "আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেবেন না?" তিনি বললেন, "দাঁড়াও, তিনি আমাদের আরও সালাম করুক।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার সালাম দিলেন। এবারেও সাদ (রা) নিম্নস্বরে উত্তর দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকবার সালাম দিলেন এবং সাড়া না পেয়ে ফিরে যেতে লাগলেন। তখন সাদ (রা) তাঁর পিছে পিছে গিয়ে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনার সালাম শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু জবাব নিম্নস্বরে দিচ্ছিলাম, যেন আপনি আমাদের অধিকবার সালাম করেন।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে আসলেন। সাদ (রা) তাঁর জন্য সাবানজাতীয় বস্তু আনতে বললেন এবং তা দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসল করলেন। অতঃপর জাফরান বা ওয়ারাস-এর রঙে রঙিন একটি বড় চাদর এনে তাঁকে দিলেন আর তিনি সেটি গায়ে জড়িয়ে নিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত তুলে দোয়া করলেন:
'হে আল্লাহ, আপনার রহমত ও করুণা সাদ বিন উবাদার (রা) পরিবারের প্রতি বর্ষণ করুন।'
অতঃপর খাবার খেলেন। তারপর চলে আসতে উদ্যত হলে সাদ (রা) মখমলের কাপড় পরিহিত একটি গাধা নিয়ে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর সওয়ার হলেন। সাদ (রা) বললেন, "হে কাইস, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সওয়ার হও!" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও বললেন, "হাঁ, সওয়ার হও!" আমি তাঁর সাথে সওয়ার হতে অস্বীকৃতি জানালাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হয় সওয়ার হও, না হয় ফিরে যাও।" কাইস (রা) বলেন, 'তখন আমি সেখান থেকে চলে আসলাম।'¹
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ ১৫০৫০, সুনানু আবি দাউদ: ৫১৮৫।
📄 তাদের সাথে রসিকতা করতেন
উসাই বিন খুদাইর (রা) (তিনি বুদ্ধিমান ও রায় প্রদানে অভিজ্ঞ ছিলেন এবং আকাবার রাতে বাইআত হওয়া বারোজন সাহাবির একজন ছিলেন) থেকে বর্ণিত, 'একবার তিনি লোকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন এবং মাঝেমধ্যে রসিকতা করে লোকদের হাসাচ্ছিলেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কাঠের টুকরা দিয়ে তার পেটে খোঁচা দিলেন। উসাইদ (রা) বললেন, "আপনি আমাকে এর বদলা নিতে দিন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমার থেকে বদলা নাও।” উসাইদ (রা) বললেন, "আপনার গায়ে তো জামা আছে, অথচ আমার গায়ে জামা ছিল না।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গায়ের জামা খুলে দিলেন। তখন উসাইদ (রা), রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জড়িয়ে ধরে তাঁর এক পাশে চুম্বন করতে লাগলেন, আর বললেন, "আমার এটাই ইচ্ছা ছিল হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।"'¹
টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৫২২৪।
📄 তাদের সম্ভ্রম রাখার প্রতি গুরুত্ব দিতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'আওসের নেতা সাদ বিন মুআজ (রা) খন্দকের যুদ্ধে হাব্বান বিন আরকা নামক এক কুরাইশ ব্যক্তির ছোড়া তিরে আঘাতপ্রাপ্ত হলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য মসজিদ অভ্যন্তরে একটি তাঁবু দিয়ে একটি কক্ষ তৈরি করলেন, যেন তিনি কাছ থেকে তার দেখাশোনা ও সেবা-শুশ্রূষা করতে পারেন।'¹
আবু বকর বিন আরবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক রোগীকে কয়েকবার দেখতে যাওয়া সুন্নাত। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন মুআজ (রা)-এর জন্য মসজিদে একটি কক্ষ তৈরি করে প্রতিদিন তার দেখাশোনা করতেন।'²
শুধু তা-ই নয়, তিনি তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছিলেন। যেমন জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'সাদ বিন মুআজ (রা) আহজাব যুদ্ধের দিন তিরবিদ্ধ হয়ে আহত হলেন। তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে গেল। তার ক্ষতস্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেঁক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করলেন। তারপর তার হাত ফুলে গেল। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে শুরু করল। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দিলেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠল। তিনি (সাদ রা) নিজের এ অবস্থা দেখে বললেন, "হে আল্লাহ, আমার জীবন কেড়ে নেবেন না, যতক্ষণ না বনু কুরাইজার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ জুড়াতে পারি।" তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোঁটাও বের হয়নি। এরপর বনু কুরাইজা সাদ বিন মুআজ (রা)-কে সালিশ মানতে রাজি হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট সমাধান চেয়ে লোক পাঠালেন। তিনি সমাধান দিলেন যে, বনু কুরাইজার পুরুষদের মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদের বাঁচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাদের ব্যাপারে তোমার মত আল্লাহ তাআলার মতের অনুরূপ হয়েছে।" তাদের পুরুষের সংখ্যা ছিল চারশ। সাহাবিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাদের মেরে ফেলার পর তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হলো এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৪৬৩, সহিহু মুসলিম: ১৭৬৯।
২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৩৮।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১৪৩৫৯, সুনানুত তিরমিজি: ১৫৮২।
📄 খায়রাজের সর্দার সাদ বিন উবাদা -এর সাথে অনুরূপ আচরণ করেছিলেন
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসা ছিলাম, এমন সময় জনৈক আনসারি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তাঁকে সালাম করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে আনসারি ভাই, আমার ভাই সাদ বিন উবাদা (রা) কেমন আছে?” তিনি উত্তর দিলেন, "ভালো।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের কে কে তাকে দেখতে যাবে?" এ বলে তিনি দাঁড়ালে আমরাও তাঁর সাথে দাঁড়ালাম। সংখ্যায় আমরা দশজনের বেশি ছিলাম। আমাদের কারও পায়ে জুতো, মোজা, মাথায় টুপি এবং গায়ে জামা ছিল না। সে অবস্থায়ই খড়খড়ে রাস্তা দিয়ে চললাম এবং তার কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। আমাদের দেখে তার গোত্রের লোকজন তার কাছ থেকে সরে গেলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এ কি মারা গেছে?” লোকজন জানাল, "না, ইয়া রাসুলাল্লাহ।" তখন তিনি কেঁদে দিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে উপস্থিত লোকেরাও কাঁদতে শুরু করলেন। তখন তিনি বললেন:
'শুনে রাখো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা চোখের পানি ও অন্তরের ব্যথার কারণে আজাব দেবেন না। তিনি আজাব দেবেন অথবা রহম করবেন এর কারণে (এই বলে তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন)। আর নিশ্চয় মৃত ব্যক্তির জন্য পরিবার-পরিজনের বিলাপের কারণে তাকে আজাব দেওয়া হয়।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
রোগীর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া।
রোগীকে দেখতে যাওয়া মুসতাহাব।
উচ্চস্তরের লোক তার চেয়ে নিম্নস্তরের লোককে রোগশয্যায় দেখতে যাওয়া।
ইমাম, কাজি ও আলিম তার অনুসারীদের দেখতে যাওয়া।
ইমাম ও আলিম তার অনুচরদের নিয়ে রোগীকে দেখতে যাওয়া।
সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। দুনিয়াবি সাজসজ্জা ও অতি উন্নত পোশাক-আশাক পরিধান করা থেকে তাঁরা বিরত থাকতেন।
নগ্ন পায়ে হাঁটা বৈধ।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৩০৪, সহিহু মুসলিম: ৯২৪।