📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের উত্তম গুণাবলির প্রশংসা করতেন

📄 তাদের উত্তম গুণাবলির প্রশংসা করতেন


জারির (রা) বলেন, 'যখন আমি মদিনার কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন বাহনটি বসালাম। অতঃপর সিন্দুক খুলে সেখান থেকে আমার পোশাকের সেটটি পরে নিলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রবেশ করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ওয়াজ করছিলেন। আর লোকজন আমার প্রতি তীক্ষ্ণ নজরে দেখলে লাগল। আমি আমার পাশে বসা লোককে বললাম, "হে আল্লাহর বান্দা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আমাকে স্মরণ করেছেন?" তিনি বললেন, "হাঁ, এই তো কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি খুব উত্তম ভাষায় আপনাকে স্মরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, "এই দরোজা দিয়ে অথবা এই দিক দিয়ে তোমাদের নিকট একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি প্রবেশ করবে। তার চেহারায় ফেরেশতাদের সৌন্দর্যের ঝিলিক থাকবে।" জারির (রা) বলেন, 'তখন আমি আমাকে পরীক্ষায় পতিত করার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করলাম।'¹
ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাই গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল আগমন করল। তাদের সাথে তাদের সর্দার জাইদ আল-খাইলও ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছানোর পর তাদের সাথে তিনি কথা বললেন এবং তাদের সামনে ইসলাম পেশ করলেন। ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করল এবং খুব ভালো মুসলমান হয়ে গেল। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমার কাছে আরবের যত মানুষের প্রশংসা করা হয়েছে, অতঃপর তারা আমার কাছে আগমন করেছে-তাদের প্রত্যেককে আমি তাদের প্রশংসার তুলনায় নিম্নমানের পেয়েছি। একমাত্র জাইদ আল-খাইলই তার ব্যতিক্রম। তার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তা মোটেই বাড়িয়ে বলা হয়নি।'
অতঃপর তিনি তার নাম পরিবর্তন করে "জাইদ আল-খাইর" রাখলেন এবং "ফারদা"² ও তার পশ্চাদবর্তী জমিগুলো তাকে জায়গির প্রদান করলেন এবং এ সম্পর্কে তাকে একটি দলিল লিখে দিলেন। তারপর তিনি নিজ সম্প্রদায়ের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে বের হলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "জাইদ যদি মদিনার জ্বর থেকে রেহাই পেত!" তারপর যখন তিনি "ফারদা" নামক নজদের একটি জলাশয়ের নিকট পৌঁছালেন, তখন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। মৃত্যু ঘনিয়ে আসার উপলব্ধি হলে জাইদ (রা) বললেন:
'সকালবেলা কি আমার সঙ্গীরা পূর্বদিকে যাত্রা করবে, আর আমি পরিত্যক্ত থাকব নজদের এই ফারদায় একটি ঘরে? কত দিনই তো আমি অসুস্থ হয়েছি, আর আমাকে দেখতে এসেছে এমন সব নারী, দূর-দূরান্তের সফর যাদের ক্লান্ত-শ্রান্ত করতে পারত না।'³
আব্দুল কাইস গোত্রের নেতা আসাজ আব্দুল কাইসকে (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
'তোমার মাঝে আল্লাহর প্রিয় দুটি গুণ আছে: বুদ্ধিমত্তা ও স্থিরতা।'⁴
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অর্থ বুদ্ধিমত্তা এবং অর্থ স্থিরতা ও তাড়াহুড়া পরিহার করা। তার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই কথা বলার কারণ হলো, তাদের কাফেলা যখন মদিনায় এসে পৌঁছল, তখন তারা দ্রুত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যেতে চাইল। কিন্তু আসাজ (রা) তাদের বাহনগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাদের গতিরোধ করলেন এবং তার উষ্ট্রীকে বেঁধে রাখলেন। অতঃপর সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গেলেন। ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে নিলেন এবং নিজের পাশে বসালেন। আর বললেন:
'তোমার মাঝে আল্লাহর প্রিয় দুটি গুণ আছে: বুদ্ধিমত্তা ও স্থিরতা।'⁵

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৬৯৮।
২. জায়গার নাম।
৩. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৫৭২।
৪. সহিহু মুসলিম: ১৭। আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত।
৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/১৮৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অনেক সময় তাদের সাহায্য ও আশ্রয় গ্রহণ করতেন

📄 অনেক সময় তাদের সাহায্য ও আশ্রয় গ্রহণ করতেন


তায়িফবাসী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাওয়াত কবুল করতে এবং তাঁকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি হেরা পর্বতে চলে গেলেন। অতঃপর আখনাস বিন শুরাইকের নিকট আশ্রয় চেয়ে খবর পাঠালেন। সে বলল, 'আমি (কুরাইশের সাথে) মৈত্রিচুক্তিতে আবদ্ধ। আর মৈত্রিচুক্তিতে আবদ্ধ লোক (মিত্র গোত্রের বিরুদ্ধে) কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না।' তখন সুহাইল বিন আমরের কাছে খবর পাঠালেন। সে জানাল, 'বনু আমির বনু কাবের বিরুদ্ধে কাউকে আশ্রয় দেয় না।' তারপর মুতইম বিন আদির নিকট পাঠালেন। তিনি আবেদন গ্রহণ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে গেলেন এবং ওই রাত সেখানেই অবস্থান করলেন। সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন। তার সাথে মুতইম (রা) ও তার ছয় কি সাতজন ছেলেও অস্ত্রসজ্জিত হয়ে বের হলেন। তারা সবাই মসজিদে প্রবেশ করলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, 'এদের তলোয়ারের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাঝে তাওয়াফ করো।' তখন আবু সুফইয়ান (রা) এসে মুতইমকে (রা) বললেন, 'তুমি কি তাকে আশ্রয় দিয়েছ, না তার অনুসারী হয়ে গেছ?' তিনি বলনে, 'না, অনুসারী হইনি, তাকে আশ্রয় দিয়েছি মাত্র।' আবু সুফইয়ান (রা) বললেন, 'তাহলে তুমি আমাদের লজ্জা দাওনি।' তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাওয়াফ শেষ হওয়া পর্যন্ত আবু সুফইয়ান (রা) তার পাশে বসে থাকলেন। তাওয়াফ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে আসলে তারাও তাঁর সাথে আসলেন। আর সুফইয়ান (রা) নিজের মজলিসের দিকে রওনা দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, 'তার কিছুদিন পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হিজরত করার অনুমতি দেওয়া হলো এবং তিনি মদিনায় হিজরত করলেন। তাঁর হিজরতের অল্প কদিন পর মুতইম বিন আদি (রা) ইনতিকাল করলেন। তখন হাসসান বিন সাবিত (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি তার জন্য শোকগাথা রচনা করব।" তারপর তিনি আবৃত্তি করলেন:
'প্রতিপত্তির যদি ক্ষমতা থাকত, কোনো মানুষকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখার, তা হলে মুতইমকে (রা) তার প্রতিপত্তি আজও বাঁচিয়ে রাখত। যদি তার সম্পর্কে বনু মাআদ, বnu কাহতান এবং বনু জুরহুমের অবশিষ্ট লোকদের জিজ্ঞেস করা হয়, তবে তারা একযোগে বলবে, "তিনি তার আশ্রিতকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করতেন এবং আদায় করতেন আপন জিম্মাদারি, যখন তা আদায়ের সময় আসত।” সুতরাং তাদের ওপর তার মতো উজ্জ্বল সূর্য আর উদিত হবে না, যা তার মতো অধিক সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন।'¹
এ জন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে আলোচনা করার সময় বলেছেন:
'আজ যদি মুতইম বিন আদি (রা) জীবিত থাকতেন এবং এই ঘৃণ্য লোকদের (মুক্তির) ব্যাপারে আমার সাথে কথা বলতেন, তাহলে তার সম্মানার্থে আমি এদের মুক্ত করে দিতাম।'²

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম।
২. সহিহুল বুখারি: ৩১৩৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের খানার দাওয়াত কবুল করতেন

📄 তাদের খানার দাওয়াত কবুল করতেন


আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন উবাদা (রা)-এর কাছে গেলেন। তখন তিনি রুটি ও তেল আনলেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা আহার করলেন। অতঃপর বললেন:
'রোজাদাররা তোমাদের কাছে এসে ইফতার করুক, সৎকর্মশীল লোকেরা তোমাদের খাবার আহার করুক, আর ফেরেশতাগণ তোমাদের জন্য রহমতের দোয়া করুন।'¹
এটি বাহ্যত 'জুমলায়ে খাবারিয়‍্যাহ' বা বিবৃতিমূলক বাক্য হলেও আসলে এটি একটি 'জুমলায়ে দুআয়িয়‍্যাহ' বা প্রার্থনামূলক বাক্য। তাই রোজাদার যখন অন্য কারও নিকট ইফতার করবে, তখন তার জন্য এই দোয়াটি পড়া মুসতাহাব।²

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৩৮৫৪।
২. ফাইজুল কাদির: ২/৫৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সাথে সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন এবং তাদের বাড়িতে খানা খেতেন

📄 সাথে সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন এবং তাদের বাড়িতে খানা খেতেন


কাইস বিন সাদ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দেখতে আমাদের বাড়িতে আসলেন। এসেই তিনি বললেন, "আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।" সাদ (রা) নিম্নস্বরে তার জবাব দিলেন (এমনভাবে জবাব দিলেন, যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনতে না পান)। কাইস (রা) বলেন, আমি বললাম, "আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেবেন না?" তিনি বললেন, "দাঁড়াও, তিনি আমাদের আরও সালাম করুক।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার সালাম দিলেন। এবারেও সাদ (রা) নিম্নস্বরে উত্তর দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকবার সালাম দিলেন এবং সাড়া না পেয়ে ফিরে যেতে লাগলেন। তখন সাদ (রা) তাঁর পিছে পিছে গিয়ে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনার সালাম শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু জবাব নিম্নস্বরে দিচ্ছিলাম, যেন আপনি আমাদের অধিকবার সালাম করেন।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে আসলেন। সাদ (রা) তাঁর জন্য সাবানজাতীয় বস্তু আনতে বললেন এবং তা দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসল করলেন। অতঃপর জাফরান বা ওয়ারাস-এর রঙে রঙিন একটি বড় চাদর এনে তাঁকে দিলেন আর তিনি সেটি গায়ে জড়িয়ে নিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত তুলে দোয়া করলেন:
'হে আল্লাহ, আপনার রহমত ও করুণা সাদ বিন উবাদার (রা) পরিবারের প্রতি বর্ষণ করুন।'
অতঃপর খাবার খেলেন। তারপর চলে আসতে উদ্যত হলে সাদ (রা) মখমলের কাপড় পরিহিত একটি গাধা নিয়ে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর সওয়ার হলেন। সাদ (রা) বললেন, "হে কাইস, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সওয়ার হও!" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও বললেন, "হাঁ, সওয়ার হও!" আমি তাঁর সাথে সওয়ার হতে অস্বীকৃতি জানালাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হয় সওয়ার হও, না হয় ফিরে যাও।" কাইস (রা) বলেন, 'তখন আমি সেখান থেকে চলে আসলাম।'¹

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ ১৫০৫০, সুনানু আবি দাউদ: ৫১৮৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00