📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের অজুহাত মেনে নিতেন

📄 তাদের অজুহাত মেনে নিতেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অজুহাত মেনে নিতেন এবং তাদের পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্টের ওপর সবর করতেন। এমনকি তাদের দোষ ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতি লোকদের উদ্বুদ্ধ করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন মুসলমানদের ভুলভ্রান্তি ও স্খলন ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। কারণ, কথিত আছে, 'দ্রুতগামী ঘোড়াও কখনো মুখ থুবড়ে পড়ে, প্রাজ্ঞ আলিমেরও কখনো ভুল হয়ে যায় এবং অপরাজেয় বীরও কখনো ধরাশয়ী হয়।' কবি বলেছেন:
'এমন কোনো মানুষ নেই, যার প্রতিটি স্বভাব ও প্রতিটি কাজ মানুষের পছন্দনীয়। আর মানুষ শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, মানুষ তার দোষত্রুটি গণনা করা শুরু করবে।'
সারকথা হলো, সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশিত তরিকা। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন লোকদের ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দাও। তবে হুদুদ (আল্লাহপ্রদত্ত শাস্তিবিধান)-এর ক্ষেত্রে ক্ষমা করা যাবে না।'¹
'সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন মানুষ'-অর্থাৎ উন্নত ব্যক্তিত্ব ও প্রশংসিত গুণসম্পন্ন মানুষ। ইবনে মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাইআহ' বা গুণ হলো, উন্নত চরিত্র-যা মানুষের মাঝে থাকে।
'ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি'- অর্থাৎ পদস্খলন। ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি মানে এমন অপরাধ, যার কারণে দণ্ড ওয়াজিব হয়। তবে হদ ওয়াজিব হয় না।
'তবে হুদুদ ক্ষমা করা যাবে না'- অর্থাৎ যে অপরাধের কারণে হদ (আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি) ওয়াজিব, তা ক্ষমা করা যাবে না।
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নেতৃত্ব, পদমর্যাদা ও ভদ্রতার কারণে যারা সম্ভ্রান্ত মানুষ হিসেবে স্বীকৃত, আল্লাহ তাআলা তাদের বিশেষ মর্যাদা দানে ভূষিত করেছেন। তাই শয়তানের ধোঁকায় পতিত হয়ে তাদের থেকে কোনো লঘু অপরাধ প্রকাশ পেলে তার শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। তবে তারা যদি এমন কোনো গুরুতর অপরাধ করে ফেলে, যার কারণে হদ ওয়াজিব হয়, তখন ক্ষমা করা যাবে না। কেননা, হদের ক্ষেত্রে সবাই সমান।'²
হাদিসের সারমর্ম হলো, সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান লোকদের থেকে কোনো লঘু অপরাধ প্রকাশ পেলে তা ক্ষমা করে দেওয়া মুসতাহাব। তবে তারা যদি এমন কোনো অপরাধ করে, যা হদ ওয়াজিব করে, আর তা বিচারকের দরবারে উত্থাপিত হয়, তখন তা কার্যকর করা ওয়াজিব।³
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'সাদ বিন উবাদাহ (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী যে, কোনো মানুষ যদি তার স্ত্রীর সাথে অপর কোনো পুরুষকে দেখতে পায়, তখন সে কি ওই পুরুষকে হত্যা করে ফেলবে?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না।” সাদ (রা) বললেন, "সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে সম্মানিত করেছেন, নিশ্চয় সে তাকে কতল করবে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমাদের সর্দার কী বলছেন, শোনো।'⁴
সহিহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে, 'সাদ বিন উবাদা (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে দেখতে পাই, তবে চারজন সাক্ষী হাজির না করা পর্যন্ত আমি কি তাকে স্পর্শ করব না?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ।” তিনি (সাদ রা) বললেন, "কখনো নয়, সেই মহান সত্তার কসম-যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, অবশ্যই আমি তার (চারজন সাক্ষী হাজির করার) আগেই দ্রুত তার প্রতি তলোয়ার ব্যবহার করব।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো, তোমাদের সরদার কী বলছেন। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় আত্মমর্যাদার অধিকারী। আর আমি তার চাইতেও অধিকতর আত্মমর্যাদাশীল এবং আল্লাহ আমার চাইতেও অধিক আত্মমর্যাদাবান।'
মোল্লা আলি কারি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সাদ (রা)-এর অজুহাত কবুল করার কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি যে (আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার ওপর) কথা বলেছেন, তা তার আত্মমর্যাদাবোধের কারণে বলেছেন।'⁵
'আমি তার আগেই দ্রুত তার প্রতি তলোয়ার ব্যবহার করব'-মাওয়ারদি (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ আরও অনেক আলিম বলেন, 'এই বাক্য বলে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাকে প্রত্যাখ্যান বা তাঁর বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি এমন অবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ও মাত্রাতিরিক্ত রাগের কথা ব্যক্ত করেছেন। কারণ, মানুষ তখন বৈধ-অবৈধ বাছবিচার না করে তলোয়ার চালিয়ে দেওয়ার মানসিকতায় চলে আসে।'⁶
আবু দারদা (রা) বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবু বকর (রা) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তার উভয় হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের এ সাথি এই মাত্র কারও সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে।” তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার ও উমর বিন খাত্তাব (রা)-এর মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর আমি লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাজির হয়েছি।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবু বকর!” এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন।'⁷

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৩৭৫।
২. বাদায়িউল ফাওয়ায়িদ: ৩/৬৬১।
৩. ফাতাওয়া আল-লাজনাতুত দায়িমাহ: ২২/৫৬।
৪. সহিহুল বুখারি: ১৪/৯৪।
৫. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৫/২১৬।
৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/১৩১।
৭. সহিহুল বুখারি: ৩৬৬১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সম্মান করতেন এবং সম্মান করার নির্দেশ দিতেন

📄 তাদের সম্মান করতেন এবং সম্মান করার নির্দেশ দিতেন


জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'জারির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালি (রা) (তিনি তার কওমের নেতা ছিলেন) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে তাঁর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বসা ছিলেন। তিনি প্রবেশ করার পর উপস্থিত সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নিজ নিজ আসনে বসে থাকলেন, কেউই তার জন্য বসার জায়গা করে দেননি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের চাদর খুলে তার দিকে ছুড়ে মারলেন এবং বললেন, "এর ওপর বসো।" জারির (রা) চাদরটিকে নিজের গলা ও মুখের ওপর বোলালেন, চুম্বন করলেন এবং চোখের ওপর রাখলেন। তারপর বললেন, "আপনি যেভাবে আমাকে সম্মানিত করেছেন, সেভাবে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সম্মানিত করুন।” অতঃপর সেটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিঠের ওপর রাখলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের (কিয়ামতের) ওপর ইমান রাখে, সে যেন তার নিকট কোনো কওমের সম্মানিতজন আসলে তার প্রতি সম্মান দেখায়।'¹
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যখন তোমাদের নিকট কোনো সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তি আগমন করবে, তখন তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।'²

টিকাঃ
১. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭৭৯১।
২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৭১২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন

📄 তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন


তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য এবং তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার আগ্রহে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতেন। এমনকি তারা বন্দী হয়ে তাঁর কাছে আসলেও।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নজদ অভিমুখে একটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করলেন। তারা সেখান থেকে বনু হানিফার এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আনলেন। তারা তার পরিচয় জানতে পারেননি, যতক্ষণ না তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনা হলো। তাকে দেখেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা কি জানো, কাকে ধরে এনেছ তোমরা? এ হচ্ছে সুমামা বিন উসাল আল-হানাফি (রা)। এ ইয়ামামাবাসীদের সর্দার। তার প্রতি ভালো আচরণ করো।” অতঃপর তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হলো। তারপর তিনি নিজ পরিবারবর্গের কাছে চলে গেলেন। তাদের বললেন, "তোমাদের কাছে যা খানাদানা আছে, তা একত্র করো এবং সুমামার (রা) কাছে পাঠিয়ে দাও।” সেই সাথে নির্দেশ দিলেন দুধের উটনি যেন সকাল-সন্ধ্যায় তার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দুধ দোহনের পর যেন তাকে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সব সময় তার খোঁজখবর নিতেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট এসে বললেন, "ওহে সুমামা, তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?” তিনি উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার কাছে তো ভালোই মনে হচ্ছে। (কারণ, আপনি মানুষের ওপর কখনো জুলুম করেন না; বরং অনুগ্রহই করে থাকেন)। যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ দান করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ দান করবেন। আর যদি আপনি মুক্তিপণ চান, তাহলে যে পরিমাণ ইচ্ছা দাবি করুন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেই অবস্থার ওপর রেখে দিলেন। পরের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাকে বললেন, "ওহে সুমামা, তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?" তখন তিনি পূর্বের দিনের কথা পুনরাবৃত্তি করলেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাকে বিগত দিনের মতো রেখে চলে আসলেন। পরের দিন এসে তিনি একই কথা জানতে চাইলেন এবং সুমামাও অভিন্ন উত্তর দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা সুমামার (রা) বন্ধন খুলে দাও।" এবার (মুক্তি পেয়ে) সুমামা (রা) মসজিদে নববির নিকটস্থ একটি খেজুরের বাগানে গেলেন এবং গোসল করলেন। এরপর ফিরে এসে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। (তিনি আরও বললেন) ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, ইতিপূর্বে আমার কাছে জমিনের বুকে আপনার চেহারার চাইতে অধিক অপছন্দনীয় আর কোনো চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম, আমার কাছে আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক ঘৃণ্য অপর কোনো দ্বীন ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে অধিক সমাদৃত। আল্লাহর কসম, আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে বেশি খারাপ শহর অন্য কোনোটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আর আপনার অশ্বারোহী সৈন্যরা যখন আমাকে ধরে এনেছে, তখন আমি উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। এখন আমার (উমরা করা না-করা) সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইসলাম গ্রহণ করার কারণে বড় কল্যাণ অর্জন করার এবং সকল গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাওয়ার) সুসংবাদ দিলেন এবং উমরা করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি মক্কায় গেলে এক ব্যক্তি তাকে বলল, "তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেছ?" তিনি বললেন, "না, কিন্তু আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মুসলমান হয়ে গেছি। আর আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও আসবে না।"'¹
হাদিসের ফায়দাসমূহ:
ইসলাম গ্রহণ করার আগে গোসল করা।
উত্তম আচরণ ঘৃণা ও শত্রুতা বিতাড়িত করে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা প্রতিষ্ঠা করে।
কোনো কাফির যদি কাফির থাকা অবস্থায় কোনো ভালো কর্মের ইচ্ছা করে থাকে, ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামি শরিয়ত তাকে তা পালন করার নির্দেশ প্রদান করে।
কাফির বন্দীর সাথে ভালো আচরণ করতে হবে, যদি তাতে ইসলামের কল্যাণ থাকে। বিশেষ করে এমন ব্যক্তির সাথে খুব ভালো আচরণ করতে হবে, যে ইসলাম গ্রহণ করলে তার দেখাদেখি অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে।²
ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি একজন উত্তম মুসলমান হয়ে উঠলেন। আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে ইসলামের অনেক উপকার করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর ইয়ামামাবাসী মুসাইলামার হাত ধরে মুরতাদ হতে শুরু করলে তিনি এর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি খুতবা দিলেন:
'হে বনি হানিফা, তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি কোথায় হারিয়ে গেল?' মুসাইলামার অসারতা তুলে ধরে দীর্ঘক্ষণ বক্তব্য দিলেন। এভাবে তার বক্তব্য শুনে তিন হাজার মানুষ তার আনুগত্য করে পুনরায় মুসলমান হয়ে যায়। এর মাধ্যমে মুসাইলামার শক্তি অনেকাংশে কমে আসে।³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৪৩৭২, সহিহু মুসলিম: ১৭৬৪, সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৬৩৮।
২. ফাতহুল বারি: ৮/৮৯।
৩. আর-রাওজুল আনফ ৪/৪১৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ দিতেন

📄 তাদের দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ দিতেন


জারির (রা) বলেন, 'আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি, তখন থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর কাছে প্রবেশ করতে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন, তিনি মুচকি হাসতেন। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আমার অসুবিধার কথা জানালাম যে, আমি ঘোড়ার পিঠে স্থির থাকতে পারি না। তখন তিনি আমার বুকে হাত দিয়ে আঘাত করলেন এবং এ দোয়া করলেন:
'হে আল্লাহ, তাকে স্থির রাখুন এবং তাকে হিদায়াতকারী ও হিদায়াতপ্রাপ্ত বানান।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
কওমের যিনি সর্দার, তার জন্য আলাদা সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। যেমন : জারির (রা) তার কওমের সর্দার ছিলেন বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশেষ সম্মান দান করতেন।
হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা নববি চরিত্র। তা ছাড়া এর মাধ্যমে অহমিকার অনুপস্থিতি প্রমাণিত হয় এবং পারস্পরিক হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়।
ঘোড়সওয়ারি শেখার ফজিলত এবং এটা প্রত্যেক সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় লোকের জানা আবশ্যক।
আলিম বা ইমাম কোনো মানুষের সাথে কথা বলার সময় বা অন্য যেকোনো সময় তার শরীরে হাত রাখতে পারবে এবং হালকা আঘাত করতে পারবে। এটা নম্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং অন্তরকে আকর্ষিত করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়ার বরকত। কারণ, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, তার পর থেকে তিনি কখনো ঘোড়ার পিঠ থেকে পতিত হননি।²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩০৩৬, সহিহু মুসলিম: ২৪৭৫।
২. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৫/১৯৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00