📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতেন

📄 মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতেন


মুহাম্মাদ বিন কাব আল-কুরাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমাকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, কুরাইশের অন্যতম নেতা উতবা বিন রাবিআ একদিন কুরাইশের একটি সভায় বলল-তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে একাকী নামাজ পড়ছিলেন-“হে কুরাইশের লোকজন, আমি কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলব এবং তার সামনে কিছু বিষয় পেশ করব, যার কিছু বিষয় সে গ্রহণও করতে পারে, বিনিময়ে আমরা তাকে সে যা চায়, তা-ই দেবো আর সে আমাদের পিছু ছেড়ে দেবে?" এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল হামজা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পরে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারী দিনদিন বৃদ্ধি পেতে দেখে তারা এ সভার আয়োজন করেছিল। তারা বলল, "হে আবুল ওয়ালিদ, আপনি তা-ই করুন। তার কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলুন।" তখন উতবা গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসল। তারপর বলল, "ভাতিজা, তুমি আমাদেরই বংশের লোক। আর তুমি জানো যে, বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বে আমাদের মর্যাদা অনেক ওপরে। কিন্তু তুমি তোমারই কওমের সামনে এমন এক বিষয় নিয়ে হাজির হয়েছ, যার মাধ্যমে তুমি তাদের একতাকে বিনষ্ট করে দিচ্ছ, বুদ্ধিমানদের নির্বোধ সাব্যস্ত করছ, তাদের প্রভুদের প্রতি দোষারোপ করছ এবং পূর্বপুরুষদের দ্বীনের ওপর যারা আছে, তাদের কাফির বলছ। তাই আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমি তোমার সামনে কয়েকটি বিষয় উপস্থাপন করছি, সেগুলো নিয়ে তুমি ভেবে দেখো। সম্ভবত কোনো বিষয় তুমি গ্রহণও করতে পারো।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বলুন, হে আবুল ওয়ালিদ, আমি শুনব।" বলল, "ভাতিজা, যে বিষয় নিয়ে তুমি এসেছ, তার মাধ্যমে যদি সম্পদ অর্জন করা তোমার উদ্দেশ্য হয়, তবে আমরা তোমাকে এত অধিক সম্পদ দেবো যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবার চেয়ে ধনী হয়ে উঠবে। আর যদি নেতৃত্ব লাভ করা তোমার উদ্দেশ্য হয়, তবে তোমাকে আমরা আমাদের নেতা মেনে নেব। তুমি ছাড়া আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। আর যদি এর মাধ্যমে তুমি রাজত্ব অর্জন করতে চাও, তবে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বানাব। আর যদি কোনো অসুস্থতাবশত এমন করে থাকো, যার থেকে তোমার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তি লাভ করতে পারছ না, তবে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। তোমার চিকিৎসার পেছনে যত টাকা লাগে খরচ করব, তবু তোমাকে ভালো করে ছাড়ব। কারণ, অনেক সময় অশরীরী প্রেতাত্মা মানুষের ওপর ভর করে থাকে, যতক্ষণ না তার চিকিৎসা করা হয়।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উতবার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তার কথা শেষ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আপনার কথা কি শেষ হয়েছে, হে আবুল ওয়ালিদ?" সে বলল, "হাঁ।” তিনি বললেন, "এবার তাহলে আমার কথা শোনো।” সে বলল, "হাঁ, তা-ই করব।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন:
'হা-মীম। এটা অবতীর্ণ পরম করুণাময়, দয়ালুর পক্ষ থেকে। এটা কিতাব, এর আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত আরবি কুরআনরূপে জ্ঞানী লোকদের জন্য। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা শোনে না। তারা বলে, আপনি যে বিষয়ের দিকে আমাদের দাওয়াত দেন, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আবৃত, আমাদের কর্ণে আছে বোঝা এবং আমাদের ও আপনার মাঝখানে আছে অন্তরাল। অতএব, আপনি আপনার কাজ করুন এবং আমরা আমাদের কাজ করি। বলুন, আমিও তোমাদের মতোই মানুষ, আমার প্রতি ওহি আসে যে, তোমাদের মাবুদ একমাত্র মাবুদ, অতএব তাঁর দিকেই সোজা হয়ে থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ।'¹
এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একনাগাড়ে তিলাওয়াত করতে থাকলেন আর উতবা তার হাতদুটো পেছনে রেখে সেগুলোর ওপর ভর দিয়ে তন্ময় হয়ে তা শুনতে লাগল। পড়তে পড়তে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সুরার আয়াতে সিজদা পর্যন্ত পৌঁছালেন, ফলে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তখন উতবা তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করছিল, "আল্লাহর কসম, আবুল ওয়ালিদ যে আশা নিয়ে গিয়েছিল, সে আশা পূরণ হয়নি।" যখন তাদের কাছে এসে বসল, তখন তারা বলল, "কী হলো, হে আবুল ওয়ালিদ?" সে বলল, "হলো এই যে, আল্লাহর কসম, আমি তার কাছে এমন কথা শুনেছি, যার মতো কোনো কথা জীবনেও শুনিনি। আল্লাহর কসম, ওই কথা কোনো কবিতা নয়, না কোনো জাদু, না কোনো মন্ত্র। তাই হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমার কথা মেনে নাও এবং এই লোক ও তার মতবাদের পেছনে পড়া বাদ দাও। আল্লাহর কসম, তার যে কথা আমি শুনেছি, তাতে বড় সংবাদ রয়েছে। সুতরাং আরবরা যদি তাকে পরাজিত করে, তবে তার বিরুদ্ধে ওরাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি সে আরবের ওপর বিজয় লাভকরে, তবে তার রাজত্ব মানে তো তোমাদেরই রাজত্ব, তার সম্মান মানে তো তোমাদেরই সম্মান এবং তার মাধ্যমে তোমরা সৌভাগ্যবান লোক হবে।” তারা বলল, "আল্লাহর কসম, সে কথার জাদু দিয়ে তোমাকে মোহিত করে ফেলেছে, হে আবুল ওয়ালিদ।” উতবা বলল, "তার ব্যাপারে আমার রায় শুনিয়ে দিলাম। এবার তোমরা তোমাদের মনে যা আসে, তা-ই করো।"²
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'একবার আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মসজিদে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি উটের ওপর সওয়ার হয়ে সেখানে প্রবেশ করলেন। মসজিদে (প্রাঙ্গণে) তিনি তার উটটি বসিয়ে বেঁধে রাখলেন। এরপর সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) লক্ষ করে বললেন, "তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার সামনেই হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। আমরা বললাম, "এই হেলান দিয়ে বসা ফরসা রঙের ব্যক্তিই হলেন তিনি।” তারপর লোকটি তাঁকে লক্ষ করে বললেন, "হে আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র!" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি তোমার জবাব দিচ্ছি।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব এবং সে প্রশ্ন করার ব্যাপারে কঠোর হব, এতে আপনি রাগ করবেন না।” তিনি বললেন, "তোমার যেমন ইচ্ছা প্রশ্ন করো।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আপনার রব ও আপনার পূর্ববর্তীদের রবের কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, আল্লাহই কি আপনাকে সকল মানুষের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূপে পাঠিয়েছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে দিনরাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে বছরের এ মাসে (রমাজান) সাওম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদের ধনীদের থেকে সাদাকা (জাকাত) উসুল করে গরিবদের মধ্যে ভাগ করে দিতে?" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” এরপর লোকটি বললেন, "আমি ইমান আনলাম আপনি যা (যে শরিয়ত) এনেছেন, তার ওপর। আর আমি আমার কওমের রেখে আসা লোকজনের পক্ষে প্রতিনিধি। আমার নাম দিমাম বিন সা'লাবা (রা)। আমি বনু সাদ বিন বকরের একজন সদস্য।"³

টিকাঃ
১. সুরা ফুসসিলাত, ৪১: ১-৬।
২. দালায়িলুন নুবুওয়াহ লিল বাইহাকি ২/২০৪।
৩. সহিহুল বুখারি: ৬৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের অজুহাত মেনে নিতেন

📄 তাদের অজুহাত মেনে নিতেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অজুহাত মেনে নিতেন এবং তাদের পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্টের ওপর সবর করতেন। এমনকি তাদের দোষ ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতি লোকদের উদ্বুদ্ধ করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন মুসলমানদের ভুলভ্রান্তি ও স্খলন ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। কারণ, কথিত আছে, 'দ্রুতগামী ঘোড়াও কখনো মুখ থুবড়ে পড়ে, প্রাজ্ঞ আলিমেরও কখনো ভুল হয়ে যায় এবং অপরাজেয় বীরও কখনো ধরাশয়ী হয়।' কবি বলেছেন:
'এমন কোনো মানুষ নেই, যার প্রতিটি স্বভাব ও প্রতিটি কাজ মানুষের পছন্দনীয়। আর মানুষ শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, মানুষ তার দোষত্রুটি গণনা করা শুরু করবে।'
সারকথা হলো, সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশিত তরিকা। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন লোকদের ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দাও। তবে হুদুদ (আল্লাহপ্রদত্ত শাস্তিবিধান)-এর ক্ষেত্রে ক্ষমা করা যাবে না।'¹
'সম্ভ্রান্ত ও গুণসম্পন্ন মানুষ'-অর্থাৎ উন্নত ব্যক্তিত্ব ও প্রশংসিত গুণসম্পন্ন মানুষ। ইবনে মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাইআহ' বা গুণ হলো, উন্নত চরিত্র-যা মানুষের মাঝে থাকে।
'ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি'- অর্থাৎ পদস্খলন। ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি মানে এমন অপরাধ, যার কারণে দণ্ড ওয়াজিব হয়। তবে হদ ওয়াজিব হয় না।
'তবে হুদুদ ক্ষমা করা যাবে না'- অর্থাৎ যে অপরাধের কারণে হদ (আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি) ওয়াজিব, তা ক্ষমা করা যাবে না।
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নেতৃত্ব, পদমর্যাদা ও ভদ্রতার কারণে যারা সম্ভ্রান্ত মানুষ হিসেবে স্বীকৃত, আল্লাহ তাআলা তাদের বিশেষ মর্যাদা দানে ভূষিত করেছেন। তাই শয়তানের ধোঁকায় পতিত হয়ে তাদের থেকে কোনো লঘু অপরাধ প্রকাশ পেলে তার শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। তবে তারা যদি এমন কোনো গুরুতর অপরাধ করে ফেলে, যার কারণে হদ ওয়াজিব হয়, তখন ক্ষমা করা যাবে না। কেননা, হদের ক্ষেত্রে সবাই সমান।'²
হাদিসের সারমর্ম হলো, সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান লোকদের থেকে কোনো লঘু অপরাধ প্রকাশ পেলে তা ক্ষমা করে দেওয়া মুসতাহাব। তবে তারা যদি এমন কোনো অপরাধ করে, যা হদ ওয়াজিব করে, আর তা বিচারকের দরবারে উত্থাপিত হয়, তখন তা কার্যকর করা ওয়াজিব।³
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'সাদ বিন উবাদাহ (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী যে, কোনো মানুষ যদি তার স্ত্রীর সাথে অপর কোনো পুরুষকে দেখতে পায়, তখন সে কি ওই পুরুষকে হত্যা করে ফেলবে?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না।” সাদ (রা) বললেন, "সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে সম্মানিত করেছেন, নিশ্চয় সে তাকে কতল করবে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমাদের সর্দার কী বলছেন, শোনো।'⁴
সহিহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে, 'সাদ বিন উবাদা (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে দেখতে পাই, তবে চারজন সাক্ষী হাজির না করা পর্যন্ত আমি কি তাকে স্পর্শ করব না?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ।” তিনি (সাদ রা) বললেন, "কখনো নয়, সেই মহান সত্তার কসম-যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, অবশ্যই আমি তার (চারজন সাক্ষী হাজির করার) আগেই দ্রুত তার প্রতি তলোয়ার ব্যবহার করব।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো, তোমাদের সরদার কী বলছেন। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় আত্মমর্যাদার অধিকারী। আর আমি তার চাইতেও অধিকতর আত্মমর্যাদাশীল এবং আল্লাহ আমার চাইতেও অধিক আত্মমর্যাদাবান।'
মোল্লা আলি কারি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সাদ (রা)-এর অজুহাত কবুল করার কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি যে (আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার ওপর) কথা বলেছেন, তা তার আত্মমর্যাদাবোধের কারণে বলেছেন।'⁵
'আমি তার আগেই দ্রুত তার প্রতি তলোয়ার ব্যবহার করব'-মাওয়ারদি (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ আরও অনেক আলিম বলেন, 'এই বাক্য বলে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাকে প্রত্যাখ্যান বা তাঁর বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি এমন অবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ও মাত্রাতিরিক্ত রাগের কথা ব্যক্ত করেছেন। কারণ, মানুষ তখন বৈধ-অবৈধ বাছবিচার না করে তলোয়ার চালিয়ে দেওয়ার মানসিকতায় চলে আসে।'⁶
আবু দারদা (রা) বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবু বকর (রা) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তার উভয় হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের এ সাথি এই মাত্র কারও সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে।” তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার ও উমর বিন খাত্তাব (রা)-এর মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর আমি লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাজির হয়েছি।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবু বকর!” এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন।'⁷

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৩৭৫।
২. বাদায়িউল ফাওয়ায়িদ: ৩/৬৬১।
৩. ফাতাওয়া আল-লাজনাতুত দায়িমাহ: ২২/৫৬।
৪. সহিহুল বুখারি: ১৪/৯৪।
৫. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৫/২১৬।
৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/১৩১।
৭. সহিহুল বুখারি: ৩৬৬১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সম্মান করতেন এবং সম্মান করার নির্দেশ দিতেন

📄 তাদের সম্মান করতেন এবং সম্মান করার নির্দেশ দিতেন


জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'জারির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালি (রা) (তিনি তার কওমের নেতা ছিলেন) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে তাঁর সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বসা ছিলেন। তিনি প্রবেশ করার পর উপস্থিত সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নিজ নিজ আসনে বসে থাকলেন, কেউই তার জন্য বসার জায়গা করে দেননি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের চাদর খুলে তার দিকে ছুড়ে মারলেন এবং বললেন, "এর ওপর বসো।" জারির (রা) চাদরটিকে নিজের গলা ও মুখের ওপর বোলালেন, চুম্বন করলেন এবং চোখের ওপর রাখলেন। তারপর বললেন, "আপনি যেভাবে আমাকে সম্মানিত করেছেন, সেভাবে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সম্মানিত করুন।” অতঃপর সেটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিঠের ওপর রাখলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের (কিয়ামতের) ওপর ইমান রাখে, সে যেন তার নিকট কোনো কওমের সম্মানিতজন আসলে তার প্রতি সম্মান দেখায়।'¹
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যখন তোমাদের নিকট কোনো সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তি আগমন করবে, তখন তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।'²

টিকাঃ
১. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭৭৯১।
২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৭১২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন

📄 তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন


তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য এবং তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার আগ্রহে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতেন। এমনকি তারা বন্দী হয়ে তাঁর কাছে আসলেও।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নজদ অভিমুখে একটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করলেন। তারা সেখান থেকে বনু হানিফার এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আনলেন। তারা তার পরিচয় জানতে পারেননি, যতক্ষণ না তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনা হলো। তাকে দেখেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা কি জানো, কাকে ধরে এনেছ তোমরা? এ হচ্ছে সুমামা বিন উসাল আল-হানাফি (রা)। এ ইয়ামামাবাসীদের সর্দার। তার প্রতি ভালো আচরণ করো।” অতঃপর তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হলো। তারপর তিনি নিজ পরিবারবর্গের কাছে চলে গেলেন। তাদের বললেন, "তোমাদের কাছে যা খানাদানা আছে, তা একত্র করো এবং সুমামার (রা) কাছে পাঠিয়ে দাও।” সেই সাথে নির্দেশ দিলেন দুধের উটনি যেন সকাল-সন্ধ্যায় তার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দুধ দোহনের পর যেন তাকে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সব সময় তার খোঁজখবর নিতেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট এসে বললেন, "ওহে সুমামা, তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?” তিনি উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার কাছে তো ভালোই মনে হচ্ছে। (কারণ, আপনি মানুষের ওপর কখনো জুলুম করেন না; বরং অনুগ্রহই করে থাকেন)। যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে আপনি একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ দান করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ দান করবেন। আর যদি আপনি মুক্তিপণ চান, তাহলে যে পরিমাণ ইচ্ছা দাবি করুন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেই অবস্থার ওপর রেখে দিলেন। পরের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাকে বললেন, "ওহে সুমামা, তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?" তখন তিনি পূর্বের দিনের কথা পুনরাবৃত্তি করলেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাকে বিগত দিনের মতো রেখে চলে আসলেন। পরের দিন এসে তিনি একই কথা জানতে চাইলেন এবং সুমামাও অভিন্ন উত্তর দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা সুমামার (রা) বন্ধন খুলে দাও।" এবার (মুক্তি পেয়ে) সুমামা (রা) মসজিদে নববির নিকটস্থ একটি খেজুরের বাগানে গেলেন এবং গোসল করলেন। এরপর ফিরে এসে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। (তিনি আরও বললেন) ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, ইতিপূর্বে আমার কাছে জমিনের বুকে আপনার চেহারার চাইতে অধিক অপছন্দনীয় আর কোনো চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম, আমার কাছে আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক ঘৃণ্য অপর কোনো দ্বীন ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে অধিক সমাদৃত। আল্লাহর কসম, আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে বেশি খারাপ শহর অন্য কোনোটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আর আপনার অশ্বারোহী সৈন্যরা যখন আমাকে ধরে এনেছে, তখন আমি উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। এখন আমার (উমরা করা না-করা) সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইসলাম গ্রহণ করার কারণে বড় কল্যাণ অর্জন করার এবং সকল গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাওয়ার) সুসংবাদ দিলেন এবং উমরা করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি মক্কায় গেলে এক ব্যক্তি তাকে বলল, "তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেছ?" তিনি বললেন, "না, কিন্তু আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মুসলমান হয়ে গেছি। আর আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও আসবে না।"'¹
হাদিসের ফায়দাসমূহ:
ইসলাম গ্রহণ করার আগে গোসল করা।
উত্তম আচরণ ঘৃণা ও শত্রুতা বিতাড়িত করে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা প্রতিষ্ঠা করে।
কোনো কাফির যদি কাফির থাকা অবস্থায় কোনো ভালো কর্মের ইচ্ছা করে থাকে, ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামি শরিয়ত তাকে তা পালন করার নির্দেশ প্রদান করে।
কাফির বন্দীর সাথে ভালো আচরণ করতে হবে, যদি তাতে ইসলামের কল্যাণ থাকে। বিশেষ করে এমন ব্যক্তির সাথে খুব ভালো আচরণ করতে হবে, যে ইসলাম গ্রহণ করলে তার দেখাদেখি অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে।²
ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি একজন উত্তম মুসলমান হয়ে উঠলেন। আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে ইসলামের অনেক উপকার করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর ইয়ামামাবাসী মুসাইলামার হাত ধরে মুরতাদ হতে শুরু করলে তিনি এর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি খুতবা দিলেন:
'হে বনি হানিফা, তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি কোথায় হারিয়ে গেল?' মুসাইলামার অসারতা তুলে ধরে দীর্ঘক্ষণ বক্তব্য দিলেন। এভাবে তার বক্তব্য শুনে তিন হাজার মানুষ তার আনুগত্য করে পুনরায় মুসলমান হয়ে যায়। এর মাধ্যমে মুসাইলামার শক্তি অনেকাংশে কমে আসে।³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৪৩৭২, সহিহু মুসলিম: ১৭৬৪, সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৬৩৮।
২. ফাতহুল বারি: ৮/৮৯।
৩. আর-রাওজুল আনফ ৪/৪১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00