📄 বিভিন্ন দেশের সম্রাটদের দাওয়াত
তাদের দাওয়াত দানের উদ্দেশ্য ছিল, যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তবে তাদের প্রজা ও অনুসারীরা তাদের অনুগামী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নেবে। ষষ্ঠ হিজরির শেষের দিকে হুদাইবিয়া সন্ধির পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন দেশের রাজাদের উদ্দেশে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি প্রেরণ করা শুরু করেন। ইবনে হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন রাজা-বাদশাদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের নিকট দূত প্রেরণ করলেন। দিহইয়াহ কালবি (রা)-কে 'কাইসার' (রোমান বাদশা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা (রা)-কে 'কিসরা' (পারস্যের রাজা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। আমর বিন উমাইয়া দামরি (রা)-কে 'নাজ্জাশি' (হাবশার বাদশা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। হাতিব বিন আবু বালতাআ (রা)-কে আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশা মুকাওকিসের নিকট প্রেরণ করলেন।'¹
রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সাথে আবু সুফইয়ান (রা)-এর সাক্ষাতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস আবু সুফইয়ানকে (রা) বললেন, 'তাঁর সম্পর্কে তোমার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে তিনি ঠিকই নবি। তিনি আবির্ভূত হবেন তা আমি জানতাম বটে, তবে তোমাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন, তা মনে করিনি। যদি আমি তাঁর সান্নিধ্যে পৌঁছাবার সুযোগ পেতাম, তাহলে আমি তাঁর সাক্ষাৎকে অগ্রাধিকার দিতাম। যদি আমি তাঁর নিকট অবস্থান করতাম, তাহলে আমি তাঁর পদযুগল ধুইয়ে দিতাম। আমার নিচের জমিন পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব বিস্তৃতি লাভ করবে।' আবু সুফইয়ান (রা) বলেন, 'তারপর হিরাক্লিয়াস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্রখানি আনতে বললেন। এরপর পাঠ করতে বললেন। চিঠির বক্তব্য নিম্নরূপ-
'পরম করুণাময় আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে রোমের অধিপতি হিরাক্লিয়াসের প্রতি। হিদায়াতের অনুসারীর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। পরসমাচার এই-আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, মুক্তি পাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে সকল প্রজার পাপরাশিও আপনার ওপর নিপতিত হবে।'²
টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৬০৭।
২. সহিহুল বুখারি ৭, সহিহু মুসলিম: ১৭৭৩।
📄 তাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে খুব আনন্দিত হতেন
ইবনে শিহাব জুহরি (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'উম্মে হাকিম বিনতে হারিস বিন হিশাম (রা) ইকরামা বিন আবু জাহেলের স্ত্রী ছিলেন। মক্কা-বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু তার স্বামী ইকরামা বিন আবু জাহেল ইসলাম গ্রহণ না করে ইয়ামান পালিয়ে গেলেন। তখন উম্মে হাকিম (রা) স্বামীর খোঁজে ইয়ামান চলে গেলেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং মক্কা-বিজয়ের বছরেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখামাত্র তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তাঁর শরীরে কোনো চাদর ছিল না। অতঃপর তাকে বাইআত করালেন।'¹
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখামাত্র তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তাঁর শরীরে কোনো চাদর ছিল না।'-এর ব্যাখ্যায় আবু ওয়ালিদ সুলাইমান আল-বাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এটা লোকদের ইসলাম গ্রহণের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অতিশয় আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ইকরামা (রা)-এর মতো নেতৃস্থানীয় একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে আনন্দের আতিশয্যে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি (খালি গায়েই তাকে জড়িয়ে ধরলেন)। কারণ, ইকরামা (রা) বনি মাখজুমের অন্যতম বড় নেতা ছিলেন।'
অনুরূপভাবে তিনি আদি বিন হাতিম তাইএ (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ করায় অত্যধিক আনন্দিত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি পিতার মৃত্যুর পর তার গোত্রের অধিপতি ছিলেন।
আদি বিন হাতিম (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে শোনার পর আমি তাঁকে যতটুকু ঘৃণা করেছি, আরবের আর কোনো লোক তাঁকে এতটুকু ঘৃণা করেনি। আমি ছিলাম একজন অভিজাত বংশের লোক এবং ধর্মবিশ্বাসে খ্রিষ্টান। আমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ আমি লাভ করতাম।² আমার ধারণা অনুযায়ী আমি সঠিক ধর্মবিশ্বাসের ওপর ছিলাম। আমার প্রতি আমার সম্প্রদায়ের আচার-ব্যবহারে আমি ছিলাম তাদের রাজাসদৃশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যখন আমি শুনতে পেলাম, তখন তাঁর প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা হলো। আমি আমার উটের রাখাল আরবি গোলামকে বললাম, "সতর্ক থেকো! কিছু বেগবান ও হৃষ্টপুষ্ট উট সব সময় আমার কাছাকাছি প্রস্তুত রাখবে। আর যখন শুনবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সৈন্য আমাদের এই অঞ্চলে পদার্পণ করেছে, আমাকে জানাবে।" সে তা-ই করল। এরপর একদিন সকালবেলা সে আমার কাছে এসে বলল, "হে আদি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেনাবাহিনী আপনার ওপর হামলা চালালে আপনি যা করতে চেয়েছিলেন, তা করে ফেলুন। কারণ, আমি বহু পতাকা দেখতে পেয়েছি। সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে লোকেরা বলেছে, এটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সৈন্যশিবির।"'
আদি (রা) বলেন, 'আমি বললাম, "আমার উটগুলো কাছে নিয়ে আসো।” সে তা কাছে নিয়ে আসলো। আমি আমার পরিবারবর্গ ও সন্তানদের সঙ্গে নিলাম এবং বললাম, "আমি শামে আমার স্বধর্মীয় খ্রিষ্টানদের কাছে চলে যাব।” এই বলে আমি জাওশিয়া, ইবনে হিশামের (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা অনুযায়ী হাওশিয়া³-এর পথে অগ্রসর হলাম এবং হাতিমের এক কন্যাকে⁴ হাদিরে⁵ রেখে গেলাম। অবশেষে শামে পৌঁছে সেখানে অবস্থান করতে থাকলাম।'
আদি (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহিনী আমার পশ্চাদ্ধাবন করছিল। তাদের (বনু তাইয়ের) অনেকে বন্দী হলো, যাদের মধ্যে হাতিম-তনয়াও ছিল। বনু তাই-এর বন্দীদের সাথে তাকেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত করা হলো। আমার শামে পলায়নের কথা তাঁর কানে পৌঁছে গিয়েছিল। হাতিম-তনয়াকে মসজিদের সামনে খোঁয়াড়ের মতো একটি স্থানে রাখা হলো। তার মধ্যে বন্দীদের আটকে রাখা হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাতিম-তনয়া তাঁর মুখোমুখি হলেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, স্পষ্টভাষিণী। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতা গত হয়েছেন। যিনি আমার দেখাশোনা করতেন, তিনিও আমাকে ফেলে গেছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতিও সদয় হবেন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কে তোমার দেখাশোনা করত?" তিনি বললেন, "হাতিমের পুত্র আদি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ওই ব্যক্তি তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পলায়ন করেছে।"
হাতিম-তনয়া বলেন, "এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রেখে চলে গেলেন। পরবর্তী দিন তিনি আমার কাছ দিয়ে আবার যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে আগের মতোই বললাম। তিনিও আমাকে গত দিনের মতো জবাব দিলেন। এরপর তিনি তৃতীয় দিন এভাবে আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আমি তাঁর পক্ষ হতে কোনো অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর পেছনের এক লোক আমাকে ইঙ্গিত করে বলল, "দাঁড়াও, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলো।” আমি তাঁর সামনে দাঁড়ালাম এবং বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতা গত হয়েছেন। যিনি আমার দেখাশোনা করতেন, তিনিও আমাকে ফেলে গেছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতিও সদয় হবেন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "করেছি তো। কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করো না, যাবৎ না তোমার সম্প্রদায়ের নির্ভরযোগ্য কোনো লোককে পাও, যে তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছে দেবে। এমন কোনো লোককে পাওয়া গেলে আমাকে জানাবে।" যে লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে ইঙ্গিত করেছিলেন, আমি জানতে চাইলাম, "তিনি কে?" বলা হলো, "তিনি আলি বিন আবি তালিব (রা)।" আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। অবশেষে বনু বালি অথবা বনু কুজাআ গোত্রের একটি কাফেলার আগমন হলো। আমার ইচ্ছা ছিল শামদেশে আমার ভাইয়ের নিকট চলে যাব। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার সম্প্রদায়ের একটি কাফেলা এসেছে। তাতে এমন লোক আছে, যে নির্ভরযোগ্য এবং আমাকে জায়গামতো পৌঁছে দেবে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কাপড়-চোপড়, বাহন ও পথখরচ দিলেন। আমি তা নিয়ে কাফেলার সঙ্গে বের হয়ে পড়লাম এবং শামদেশে চলে আসলাম।"
আদি (রা) বলেন, "আল্লাহর শপথ, আমি আমার পরিবারবর্গের মাঝে বসা ছিলাম। সহসা দেখলাম, একটি স্ত্রীলোক হাওদার ভেতরে এবং সে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি বলে উঠলাম, "এ তো দেখি হাতিম-তনয়া!" ঠিকই দেখা গেল যে সে হাতিমের কন্যাই। সে আমার সম্মুখে এসেই আমাকে তিরস্কার করে বলতে শুরু করল, "সম্পর্কচ্ছেদকারী জালিম! নিজের বউ-ছেলে নিয়ে চলে এসেছ, আর বাবার মেয়েকে ফেলে এসেছ!" আমি বললাম, "প্রিয় বোনটি আমার, রাগ করো না! আল্লাহর কসম, আমার অপরাধ অমার্জনীয়। ঠিকই তুমি যা বলেছ, আমি তা-ই করেছি।" আদি (রা) বলেন, "এরপর সে নেমে আসলো এবং আমার নিকট থাকতে লাগল। সে ছিল ভীষণ বুদ্ধিমতী। আমি একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "এই লোকটির বিষয়ে তুমি কী মনে করো?" সে বলল, "আল্লাহর কসম, আমার মতে তুমি শীঘ্রই তাঁর নিকট চলে যাও। কারণ, তিনি যদি নবি হয়ে থাকেন, তা হলে যারা আগে আগে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, তিনি তাদের প্রতি সদয় হবেন। আর যদি তিনি রাজা হন, তবে তাঁর মহত্ত্বপূর্ণ গৌরবে তুমি ছোট হয়ে যাবে না। তুমি তুমিই থাকবে।” আমি বললাম, "হাঁ, এটাই বিজ্ঞজনোচিত রায়।" আদি (রা) বলেন, "তখন আমি রওনা হয়ে মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছে গেলাম। তিনি মসজিদে বসা ছিলেন। আমি তাঁর নিকট প্রবেশ করে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, "কে এই লোক?" বললাম, "আদি বিন হাতিম (রা)।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। আল্লাহর কসম, তিনি যখন আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পথিমধ্যে এক জীর্ণ-শীর্ণ বৃদ্ধার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বৃদ্ধা তাঁকে দাঁড়াতে বললে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। বৃদ্ধা দীর্ঘক্ষণ তার প্রয়োজন সম্পর্কে তাঁর সাথে কথা বললেন। আমি মনে মনে বললাম, "আল্লাহর শপথ, এই লোক কিছুতেই রাজা হতে পারেন না।" এরপর তিনি আমাকে নিয়ে অগ্রসর হলেন। গৃহের ভেতর প্রবেশ করে তিনি একটি বালিশ নিয়ে আমার দিকে ছুড়ে দিলেন। তার ওপরে ছিল চামড়া, ভেতরে খেজুরের বাকল। তিনি বললেন, "এর ওপর বসো।” আমি বললাম, "বরং আপনিই এর ওপর বসুন।” তিনি বললেন, "না, তুমিই বসো।” আমি তার ওপর বসে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলেন মাটিতে। আমি মনে মনে বললাম, "আল্লাহর কসম, এটা রাজাদের আচরণ নয়।" তারপর তিনি আমাকে বললেন, "হে আদি বিন হাতিম, ইসলাম গ্রহণ করো, নিরাপত্তা লাভ করবে।” আমি বললাম, "আমি একটি দ্বীনের অনুসারী।” তিনি বললেন, "তোমার ধর্ম সম্পর্কে আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি।" আমি বললাম, "কী! আপনি আমার ধর্ম সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানেন!?" তিনি বললেন, "হাঁ।” অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে বলো তো, হে আদি বিন হাতিম, তুমি কি "রাকুসি"⁶ নও?” আমি বললাম, "তা-ই বটে!” তিনি বললেন, "তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ লাভ করতে না?" আমি বললাম, "হাঁ।” তিনি বললেন, "তোমার ধর্ম অনুযায়ী তো সেটা তোমার জন্য বৈধ ছিল না।” আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, আপনি যথার্থই বলেছেন।” আদি (রা) বলেন, "এতক্ষণে আমার বুঝতে বাকি থাকল না যে, তিনি একজন প্রেরিত নবি। যা বলা হয় না, তাও তিনি জানেন। আমি তাঁর পাশেই ছিলাম, তখন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে ক্ষুধার অভিযোগ করল। অতঃপর আরেক ব্যক্তি এসে ডাকাতের আক্রমণের অভিযোগ করল। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "হে আদি, এই দ্বীন গ্রহণে হয়তো-বা তোমাকে এই জিনিস বাধা দিয়ে থাকবে যে, তুমি তাদের অভাব-অভিযোগে পীড়িত দেখছ। কিন্তু আল্লাহর কসম, সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন তাদের চারদিক থেকে ধন-দৌলত উপচে পড়বে, নেওয়ার মতো কোনো লোক পাওয়া যাবে না। হয়তো-বা তাদের শত্রুর সংখ্যাধিক্য এবং তাদের নিজেদের সামরিক শক্তির অপ্রতুলতা তোমাকে এ দ্বীন গ্রহণে বাধা দিয়ে থাকবে। কিন্তু আল্লাহর কসম, সেদিন দূরে নয়, যখন তুমি শুনতে পাবে, এক-একজন স্ত্রীলোক সেই সুদূর কাদিসিয়া থেকে উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে এই বাইতুল্লাহ-য় এসে জিয়ারত করবে। রাস্তাঘাটে সে কোনো কিছুর ভয় করবে না।" আমি মনে মনে বললাম, "তাহলে তাই গোত্রের লম্পটরা তখন কোথায় যাবে, যারা লাম্পট্যের জন্য নিজেদের দেশের মূল্য লাগাতেও দ্বিধা করে না?" তিনি আরও বললেন, "হয়তো-বা এই জিনিস তোমাকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিয়ে থাকবে যে, তুমি দেখছ, রাজত্ব ও বাদশাহি অন্যদের মাঝে। কিন্তু আল্লাহর শপথ, সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন শুনতে পাবে, ব্যাবিলনের শ্বেত প্রাসাদগুলো মুসলিমদের হাতে বিজিত হয়ে গিয়েছে।” আদি (রা) বলেন, "এ কথার পর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। তখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মুবারকে আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেলাম।” অন্য রিওয়ায়াতে এসেছে, "তখন তাঁর চেহারা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল।” আদি (রা) বলেন, "দুটি তো হয়ে গেছে। তবে আল্লাহর কসম, সেটিও অবশ্যই হবে। আমি দেখেছি, ব্যাবিলনের শ্বেত ভবনগুলো বিজিত হয়েছে। দেখেছি, কাদিসিয়া হতে একজন নারী তার উটের ওপর সাওয়ার হয়ে নির্ভয়ে পথ চলতে থাকে এবং বাইতুল্লাহর হজ করে যায়। আর আল্লাহর কসম, তৃতীয়টিও অবশ্যই একদিন ঘটবে। অর্থ-সম্পদের এমন ঢল নামবে যে, তা গ্রহণ করার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না।"'⁷
টিকাঃ
১. মুয়াত্তা মালিক: ১১৫৬, মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ১২৬৪৬।
২. যেহেতু আমি ছিলাম তাদের গোত্রাধিপতি।
৩. নজদের একটি পাহাড়ের নাম।
৪. তার নাম সাফফাহ।
৫. বনু তাই-এর বসতি।
৬. খ্রিষ্টান ও সাবিয়ি ধর্মের মাঝামাঝি একটি ধর্মের অনুসারী সম্প্রদায়বিশেষ।
৭. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৫৮০।
📄 তাদের প্রতি সম্মান ও গুরুত্ব প্রদর্শন করতেন
মিসওয়ার বিন মাখরামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, 'তার পিতা মাখরামাহ (রা) তাকে বললেন, "বৎস, আমার কাছে খবর এসেছে যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু কাবা¹ জামা এসেছে। তিনি সেগুলো বণ্টন করছেন। চলো আমরা তাঁর কাছে যাই। আমরা গেলাম এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর বাসগৃহে পেলাম। আমাকে (আমার পিতা) বললেন, "বৎস, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমার কাছে ডাকো।” আমার নিকট কাজটি অতি কঠিন বলে মনে হলো। তাই আমি বললাম, "আপনার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডাকব?" তিনি বললেন, "বৎস, তিনি তো কঠোর স্বভাবের লোক নন (তাঁকে ডাকলে রাগ করবেন না)।” যাহোক, আমি তাঁকে ডাকলাম। তিনি বেরিয়ে এলেন। তাঁর গায়ে তখন স্বর্ণের বোতাম লাগানো মিহি রেশমি কাপড়ের কাবা পরিহিত ছিল। তিনি বললেন:
'হে মাখরামাহ, এটা আমি তোমার জন্য সংরক্ষণ করেছিলাম।' এরপর তিনি সেটা তাকে দিয়ে দিলেন।'²
'তাঁর গায়ে তখন স্বর্ণের বোতাম লাগানো মিহি রেশমি কাপড়ের কাবা পরিহিত ছিল'-এখান থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেশমের কাপড় পরিধান করেছেন। এর উত্তরে কেউ কেউ বলেন, এটা রেশমি কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ হওয়ার আগের ঘটনা। অথবা বলা যায় যে, তিনি কাপড়টি পরিধান করেননি; বরং কাঁধের ওপর রেখেছিলেন, যেন মাখরামাহ (রা) তা ভালোভাবে দেখতে পান। আমি (ইবনে হাজার আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ) বলি, 'নির্দিষ্ট করে কাঁধের ওপরেই ছিল বলার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং হাতের ওপর বিছানো থাকাটাও সম্ভব। আর হাদিসে (তাঁর গায়ের ওপর) বলতে তাঁর গায়ের কোনো এক অঙ্গের ওপর বলা উদ্দেশ্য। হাতিম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর রিওয়ায়াতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, "তিনি একটি কাবা নিয়ে বেরিয়ে এলেন এবং মাখরামাকে (রা) তার সৌন্দর্য দেখালেন।"'³
তিনি মাখরামাহকে (রা) বললেন, 'এটা তোমার জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছি।' এই কথা বলে তিনি মাখরামাহর (রা) প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশ করেছেন।⁴
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আচার-আচরণে ভদ্রতা, কথাবার্তায় নম্রতা এবং কথা বলার সময় কঠোরতা পরিহার করা মুমিনের আখলাক। এর মাধ্যমে আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা তৈরি হয় এবং ঘৃণা-বিদ্বেষ বিলুপ্ত হয়।⁵
এই হাদিসে সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নম্রতা ও সুন্দর ব্যবহারের চিত্র ফুটে উঠেছে।⁶
টিকাঃ
১. আলখাল্লা-জাতীয় পোশাক।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৮৬৫, সহিহু মুসলিম: ১০৫৮।
৩. ফাতহুল বারি: ১০/২৭০।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১৪৮।
৫. শারহু সহিহিল বুখারি লি-ইবনি বাত্তাল: ৯/৩০৫।
৬. ফাতহুল বারি: ১০/৩১৫।
📄 মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতেন
মুহাম্মাদ বিন কাব আল-কুরাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমাকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, কুরাইশের অন্যতম নেতা উতবা বিন রাবিআ একদিন কুরাইশের একটি সভায় বলল-তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে একাকী নামাজ পড়ছিলেন-“হে কুরাইশের লোকজন, আমি কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলব এবং তার সামনে কিছু বিষয় পেশ করব, যার কিছু বিষয় সে গ্রহণও করতে পারে, বিনিময়ে আমরা তাকে সে যা চায়, তা-ই দেবো আর সে আমাদের পিছু ছেড়ে দেবে?" এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল হামজা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পরে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারী দিনদিন বৃদ্ধি পেতে দেখে তারা এ সভার আয়োজন করেছিল। তারা বলল, "হে আবুল ওয়ালিদ, আপনি তা-ই করুন। তার কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলুন।" তখন উতবা গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসল। তারপর বলল, "ভাতিজা, তুমি আমাদেরই বংশের লোক। আর তুমি জানো যে, বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বে আমাদের মর্যাদা অনেক ওপরে। কিন্তু তুমি তোমারই কওমের সামনে এমন এক বিষয় নিয়ে হাজির হয়েছ, যার মাধ্যমে তুমি তাদের একতাকে বিনষ্ট করে দিচ্ছ, বুদ্ধিমানদের নির্বোধ সাব্যস্ত করছ, তাদের প্রভুদের প্রতি দোষারোপ করছ এবং পূর্বপুরুষদের দ্বীনের ওপর যারা আছে, তাদের কাফির বলছ। তাই আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমি তোমার সামনে কয়েকটি বিষয় উপস্থাপন করছি, সেগুলো নিয়ে তুমি ভেবে দেখো। সম্ভবত কোনো বিষয় তুমি গ্রহণও করতে পারো।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বলুন, হে আবুল ওয়ালিদ, আমি শুনব।" বলল, "ভাতিজা, যে বিষয় নিয়ে তুমি এসেছ, তার মাধ্যমে যদি সম্পদ অর্জন করা তোমার উদ্দেশ্য হয়, তবে আমরা তোমাকে এত অধিক সম্পদ দেবো যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবার চেয়ে ধনী হয়ে উঠবে। আর যদি নেতৃত্ব লাভ করা তোমার উদ্দেশ্য হয়, তবে তোমাকে আমরা আমাদের নেতা মেনে নেব। তুমি ছাড়া আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। আর যদি এর মাধ্যমে তুমি রাজত্ব অর্জন করতে চাও, তবে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বানাব। আর যদি কোনো অসুস্থতাবশত এমন করে থাকো, যার থেকে তোমার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তি লাভ করতে পারছ না, তবে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। তোমার চিকিৎসার পেছনে যত টাকা লাগে খরচ করব, তবু তোমাকে ভালো করে ছাড়ব। কারণ, অনেক সময় অশরীরী প্রেতাত্মা মানুষের ওপর ভর করে থাকে, যতক্ষণ না তার চিকিৎসা করা হয়।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উতবার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তার কথা শেষ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আপনার কথা কি শেষ হয়েছে, হে আবুল ওয়ালিদ?" সে বলল, "হাঁ।” তিনি বললেন, "এবার তাহলে আমার কথা শোনো।” সে বলল, "হাঁ, তা-ই করব।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন:
'হা-মীম। এটা অবতীর্ণ পরম করুণাময়, দয়ালুর পক্ষ থেকে। এটা কিতাব, এর আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত আরবি কুরআনরূপে জ্ঞানী লোকদের জন্য। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা শোনে না। তারা বলে, আপনি যে বিষয়ের দিকে আমাদের দাওয়াত দেন, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আবৃত, আমাদের কর্ণে আছে বোঝা এবং আমাদের ও আপনার মাঝখানে আছে অন্তরাল। অতএব, আপনি আপনার কাজ করুন এবং আমরা আমাদের কাজ করি। বলুন, আমিও তোমাদের মতোই মানুষ, আমার প্রতি ওহি আসে যে, তোমাদের মাবুদ একমাত্র মাবুদ, অতএব তাঁর দিকেই সোজা হয়ে থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ।'¹
এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একনাগাড়ে তিলাওয়াত করতে থাকলেন আর উতবা তার হাতদুটো পেছনে রেখে সেগুলোর ওপর ভর দিয়ে তন্ময় হয়ে তা শুনতে লাগল। পড়তে পড়তে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সুরার আয়াতে সিজদা পর্যন্ত পৌঁছালেন, ফলে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তখন উতবা তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করছিল, "আল্লাহর কসম, আবুল ওয়ালিদ যে আশা নিয়ে গিয়েছিল, সে আশা পূরণ হয়নি।" যখন তাদের কাছে এসে বসল, তখন তারা বলল, "কী হলো, হে আবুল ওয়ালিদ?" সে বলল, "হলো এই যে, আল্লাহর কসম, আমি তার কাছে এমন কথা শুনেছি, যার মতো কোনো কথা জীবনেও শুনিনি। আল্লাহর কসম, ওই কথা কোনো কবিতা নয়, না কোনো জাদু, না কোনো মন্ত্র। তাই হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমার কথা মেনে নাও এবং এই লোক ও তার মতবাদের পেছনে পড়া বাদ দাও। আল্লাহর কসম, তার যে কথা আমি শুনেছি, তাতে বড় সংবাদ রয়েছে। সুতরাং আরবরা যদি তাকে পরাজিত করে, তবে তার বিরুদ্ধে ওরাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি সে আরবের ওপর বিজয় লাভকরে, তবে তার রাজত্ব মানে তো তোমাদেরই রাজত্ব, তার সম্মান মানে তো তোমাদেরই সম্মান এবং তার মাধ্যমে তোমরা সৌভাগ্যবান লোক হবে।” তারা বলল, "আল্লাহর কসম, সে কথার জাদু দিয়ে তোমাকে মোহিত করে ফেলেছে, হে আবুল ওয়ালিদ।” উতবা বলল, "তার ব্যাপারে আমার রায় শুনিয়ে দিলাম। এবার তোমরা তোমাদের মনে যা আসে, তা-ই করো।"²
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'একবার আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মসজিদে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি উটের ওপর সওয়ার হয়ে সেখানে প্রবেশ করলেন। মসজিদে (প্রাঙ্গণে) তিনি তার উটটি বসিয়ে বেঁধে রাখলেন। এরপর সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) লক্ষ করে বললেন, "তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার সামনেই হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। আমরা বললাম, "এই হেলান দিয়ে বসা ফরসা রঙের ব্যক্তিই হলেন তিনি।” তারপর লোকটি তাঁকে লক্ষ করে বললেন, "হে আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র!" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি তোমার জবাব দিচ্ছি।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব এবং সে প্রশ্ন করার ব্যাপারে কঠোর হব, এতে আপনি রাগ করবেন না।” তিনি বললেন, "তোমার যেমন ইচ্ছা প্রশ্ন করো।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আপনার রব ও আপনার পূর্ববর্তীদের রবের কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, আল্লাহই কি আপনাকে সকল মানুষের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূপে পাঠিয়েছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে দিনরাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে বছরের এ মাসে (রমাজান) সাওম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” লোকটি বললেন, "আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদের ধনীদের থেকে সাদাকা (জাকাত) উসুল করে গরিবদের মধ্যে ভাগ করে দিতে?" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ সাক্ষী, হাঁ।” এরপর লোকটি বললেন, "আমি ইমান আনলাম আপনি যা (যে শরিয়ত) এনেছেন, তার ওপর। আর আমি আমার কওমের রেখে আসা লোকজনের পক্ষে প্রতিনিধি। আমার নাম দিমাম বিন সা'লাবা (রা)। আমি বনু সাদ বিন বকরের একজন সদস্য।"³
টিকাঃ
১. সুরা ফুসসিলাত, ৪১: ১-৬।
২. দালায়িলুন নুবুওয়াহ লিল বাইহাকি ২/২০৪।
৩. সহিহুল বুখারি: ৬৩।