📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দাওস গোত্রের নেতা তুফাইল বিন আমরকে দাওয়াত

📄 দাওস গোত্রের নেতা তুফাইল বিন আমরকে দাওয়াত


মুহাম্মাদ বিন ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তুফাইল বিন আমর আদ-দাওসি (রা) মক্কায় থাকাকালে তিনি মক্কায় আসলেন। তখন কুরাইশের কতিপয় লোক তার কাছে আসলো এবং বলল, "হে তুফাইল, আপনি আমাদের দেশে এমন সময়ে এসেছেন, যখন আমাদের বংশেরই এক লোক আমাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আমাদের একতাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। তার কথায় রয়েছে জাদুর প্রভাব-যার ফলে পিতা সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ভাই বিচ্ছিন্ন হয় ভাই থেকে এবং স্বামী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার স্ত্রী থেকে। এমন মুহূর্তে আমরা আপনার এবং আপনার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে তার কবলে পতিত হওয়ার আশঙ্কা করছি। সুতরাং তার সাথে কথা বলবেন না এবং তার কোনো কথায় কান দেবেন না।"'
তুফাইল (রা) বলেন, 'আল্লাহর কসম, তারা আমাকে এত বোঝাল যে, একপর্যায়ে আমি দৃঢ় সংকল্প করে ফেললাম, আমি তাঁর (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) কোনো কথা শুনব না এবং তাঁর সাথে কখনো কথা বলব না। এমনকি আমি মসজিদে যাওয়ার সময় কানে তুলা দিয়ে যেতাম, যেন তাঁর এমন কোনো কথা আমার কানে ঢুকে না যায়, যা আমি শুনতে চাই না।' তিনি বলেন, 'একদিন আমি সকালে মসজিদে গেলাম। দেখলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবার পাশে নামাজ পড়ছেন। আমি তাঁর পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। তখন আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর কিছু কথা শুনতে বাধ্য করলেন। আমি তাঁর থেকে একটি অতি সুন্দর কথা শুনতে পেলাম এবং মনে মনে বললাম, "আমার মা আমাকে হারিয়ে ফেলুক! আল্লাহর কসম, আমি একজন ধীমান সাহিত্যিক ও কবি। খারাপ ও ভালো কথার পার্থক্য আমি ভালোই জানতে পারি। তাই আজ এই লোকের কথা অবশ্যই শুনে দেখব। সে যদি ভালো কথা বলে, তবে আমি তা কবুল করব; আর যদি খারাপ কথা বলে, তবে তা পরিত্যাগ করব।" আমি আরও কিছুক্ষণ অবস্থান করলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ির প্রতি রওনা হলেন। আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। যখন তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন, তখন আমিও তাঁর সাথে প্রবেশ করলাম। তারপর বললাম, "হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার কওম আমাকে এমন এমন কথা বলেছে। তাই এতদিন পর্যন্ত আপনার কথা না শোনার জন্য কানে তুলা দিয়ে থাকতাম। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আজ আমাকে আপনার কথা শুনতে বাধ্য করলেন। এতে আপনার মুখ থেকে একটি অতিশয় সুন্দর কথা শুনতে পেলাম। সুতরাং আপনি আমার সামনে আপনার ধর্মের স্বরূপ উপস্থাপন করুন।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সামনে ইসলাম তুলে ধরলেন এবং আমাকে কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে শোনালেন। আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, এর চেয়ে সুন্দর কথা আমি জীবনেও শুনিনি এবং এমন ইনসাফপূর্ণ জীবনব্যবস্থা জীবনেও দেখিনি। কাজেই আমি সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। অতঃপর বললাম, "হে আল্লাহর নবি, আমার কওমের লোকজন আমার কথা মান্য করে, তাই আমি তাদের নিকট ফিরে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতে চাই। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি আমাকে একটি আলামত (কারামাত) দান করেন, যা দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমার সহায়তা করবে।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন:
'হে আল্লাহ, একে একটি আলামত দান করুন।'
তারপর আমি আমার কওমের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। যেতে যেতে যখন আমি একটি গিরিপথের নিকট পৌঁছালাম, যা আমাকে পানি নিতে আসা লোকদের কাছে নিয়ে যাবে, তখন আমার দুই চোখের মাঝখানে বাতির মতো একটি নুর উদয় হলো। তখন আমি দোয়া করলাম, "ইয়া আল্লাহ, আমার চেহারা ব্যতীত অন্য জায়গায় (আলামত) দান করুন। কারণ, আমি ভয় পাচ্ছি যে, তারা এটাকে তাদের দ্বীন ছেড়ে দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ আমার চেহারায় বিকৃতি এসেছে মনে করবে।" তখন নুরটি স্থানান্তরিত হয়ে আমার লাঠির মাথায় উদিত হলো। আমি যখন গিরিপথ থেকে নিচে নামছিলাম, তখন পানি নিতে আসা লোকেরা আমার লাঠির মাথায় ঝুলন্ত বাতির মতো নুরটি দেখতে পাচ্ছিল। তারপর আমি তাদের কাছে পৌঁছে গেলাম এবং তাদের মাঝে মিশে গেলাম। আমি নামার পর আমার পিতা আমার নিকট আসলেন। তিনি বয়োবৃদ্ধ ছিলেন। আমি বললাম, "বাবা, আমার থেকে দূরে সরে যান। আমি আপনার নই, আপনিও আমার নন।" তিনি বললেন, "বেটা, এমন কথা কেন বলছ তুমি?" আমি বললাম, "আমি মুসলমান হয়ে গেছি এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বীনের অনুসারী হয়ে গিয়েছি।” তিনি বললেন, "বেটা আমার, তোমার দ্বীনই তো আমার দ্বীন।” আমি বললাম, "তাহলে আপনি গোসল করে পবিত্র কাপড় পরিধান করে আসুন। অতঃপর যা আমি শিখে এসেছি, তা আপনাকে শেখাব।” তারপর তিনি ফিরে গেলেন, গোসল করলেন এবং পবিত্র কাপড় পরিধান করলেন। অতঃপর আমার কাছে আসলেন। তখন আমি তার সামনে ইসলাম পেশ করলাম আর তিনি তা কবুল করে নিলেন। অতঃপর আমার স্ত্রী আমার নিকট আসলে আমি তাকে বললাম, "আমার থেকে দূরে থাকো! আমি তোমার নই, তুমিও আমার নও।" সে বলল, "আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আপনি এমন কথা কেন বলছেন?" আমি বললাম, "ইসলাম তোমার ও আমার মাঝে পার্থক্য করে দিয়েছে। কারণ, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছি।” সে বলল, "আপনার ধর্মই আমার ধর্ম।” আমি বললাম, "তাহলে পবিত্র হয়ে আসো।” অতঃপর সে গোসল করে আমার নিকট আসলে আমি তার সামনে ইসলাম পেশ করলাম আর সে মুসলমান হয়ে গেল। অতঃপর পুরো দাওস গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম। কিন্তু তারা আমার কথা মানতে অস্বীকৃতি জানাল। অতঃপর আমি মক্কায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললাম, "হে আল্লাহর নবি, দাওসের কাছে আমার ওপর তাদের ব্যভিচার জয়ী হয়েছে। তাই আপনি তাদের জন্য বদদোয়া করুন।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন:
'হে আল্লাহ, দাওসকে হিদায়াত দান করুন।'
অতঃপর তিনি বললেন:
'তোমার কওমের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের নম্রতার সহিত আল্লাহর পথে দাওয়াত দাও।'
তিনি বলেন, "তারপর থেকে আমি দাওস গোত্রের লোকদের অনবরত ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ পর্যন্ত আমি নিজ কওমকে দ্বীনের দাওয়াত দানে ব্যস্ত থাকলাম। অতঃপর আমি আমার সাথে যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের সাথে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে রওনা হলাম। তিনি তখন খাইবারে ছিলেন। মদিনায় আমরা সত্তর-আশিটি দাউসের ঘর নির্মাণ করলাম। তারপর খাইবারে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মিলিত হলাম। তিনি মুসলমানদের পাশাপাশি আমাদেরকেও (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে) অংশ দান করলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা মক্কাকে মুসলমানদের করায়ত্তে নিয়ে আসলে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুরোধ করলাম, "আমাকে আমর বিন হিমার দুই হাতবিশিষ্ট মূর্তি পোড়ানোর জন্য প্রেরণ করুন।"'
বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর তিনি (অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে) মূর্তির কাছে গেলেন এবং তার ওপর আগুন ধরিয়ে দিয়ে বললেন:
'হে দুই হাতওয়ালা মূর্তি, আমি তোর পূজারি নই। আমাদের জন্ম তোর জন্মের চেয়েও আগে। আমি তোর অন্তরের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছি।'
অতঃপর তিনি মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে আসলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন।'¹

টিকাঃ
১. দালায়িলুন নুবুওয়াহ লিল বাইহাকি ৫/৪৬০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিভিন্ন দেশের সম্রাটদের দাওয়াত

📄 বিভিন্ন দেশের সম্রাটদের দাওয়াত


তাদের দাওয়াত দানের উদ্দেশ্য ছিল, যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তবে তাদের প্রজা ও অনুসারীরা তাদের অনুগামী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নেবে। ষষ্ঠ হিজরির শেষের দিকে হুদাইবিয়া সন্ধির পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন দেশের রাজাদের উদ্দেশে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি প্রেরণ করা শুরু করেন। ইবনে হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন রাজা-বাদশাদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের নিকট দূত প্রেরণ করলেন। দিহইয়াহ কালবি (রা)-কে 'কাইসার' (রোমান বাদশা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা (রা)-কে 'কিসরা' (পারস্যের রাজা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। আমর বিন উমাইয়া দামরি (রা)-কে 'নাজ্জাশি' (হাবশার বাদশা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। হাতিব বিন আবু বালতাআ (রা)-কে আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশা মুকাওকিসের নিকট প্রেরণ করলেন।'¹
রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সাথে আবু সুফইয়ান (রা)-এর সাক্ষাতের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে যে, হিরাক্লিয়াস আবু সুফইয়ানকে (রা) বললেন, 'তাঁর সম্পর্কে তোমার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে তিনি ঠিকই নবি। তিনি আবির্ভূত হবেন তা আমি জানতাম বটে, তবে তোমাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন, তা মনে করিনি। যদি আমি তাঁর সান্নিধ্যে পৌঁছাবার সুযোগ পেতাম, তাহলে আমি তাঁর সাক্ষাৎকে অগ্রাধিকার দিতাম। যদি আমি তাঁর নিকট অবস্থান করতাম, তাহলে আমি তাঁর পদযুগল ধুইয়ে দিতাম। আমার নিচের জমিন পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব বিস্তৃতি লাভ করবে।' আবু সুফইয়ান (রা) বলেন, 'তারপর হিরাক্লিয়াস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্রখানি আনতে বললেন। এরপর পাঠ করতে বললেন। চিঠির বক্তব্য নিম্নরূপ-
'পরম করুণাময় আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে রোমের অধিপতি হিরাক্লিয়াসের প্রতি। হিদায়াতের অনুসারীর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। পরসমাচার এই-আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, মুক্তি পাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে সকল প্রজার পাপরাশিও আপনার ওপর নিপতিত হবে।'²

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৬০৭।
২. সহিহুল বুখারি ৭, সহিহু মুসলিম: ১৭৭৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে খুব আনন্দিত হতেন

📄 তাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে খুব আনন্দিত হতেন


ইবনে শিহাব জুহরি (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'উম্মে হাকিম বিনতে হারিস বিন হিশাম (রা) ইকরামা বিন আবু জাহেলের স্ত্রী ছিলেন। মক্কা-বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু তার স্বামী ইকরামা বিন আবু জাহেল ইসলাম গ্রহণ না করে ইয়ামান পালিয়ে গেলেন। তখন উম্মে হাকিম (রা) স্বামীর খোঁজে ইয়ামান চলে গেলেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং মক্কা-বিজয়ের বছরেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখামাত্র তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তাঁর শরীরে কোনো চাদর ছিল না। অতঃপর তাকে বাইআত করালেন।'¹
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখামাত্র তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তাঁর শরীরে কোনো চাদর ছিল না।'-এর ব্যাখ্যায় আবু ওয়ালিদ সুলাইমান আল-বাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এটা লোকদের ইসলাম গ্রহণের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অতিশয় আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ইকরামা (রা)-এর মতো নেতৃস্থানীয় একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে আনন্দের আতিশয্যে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি (খালি গায়েই তাকে জড়িয়ে ধরলেন)। কারণ, ইকরামা (রা) বনি মাখজুমের অন্যতম বড় নেতা ছিলেন।'
অনুরূপভাবে তিনি আদি বিন হাতিম তাইএ (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ করায় অত্যধিক আনন্দিত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি পিতার মৃত্যুর পর তার গোত্রের অধিপতি ছিলেন।
আদি বিন হাতিম (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে শোনার পর আমি তাঁকে যতটুকু ঘৃণা করেছি, আরবের আর কোনো লোক তাঁকে এতটুকু ঘৃণা করেনি। আমি ছিলাম একজন অভিজাত বংশের লোক এবং ধর্মবিশ্বাসে খ্রিষ্টান। আমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ আমি লাভ করতাম।² আমার ধারণা অনুযায়ী আমি সঠিক ধর্মবিশ্বাসের ওপর ছিলাম। আমার প্রতি আমার সম্প্রদায়ের আচার-ব্যবহারে আমি ছিলাম তাদের রাজাসদৃশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যখন আমি শুনতে পেলাম, তখন তাঁর প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা হলো। আমি আমার উটের রাখাল আরবি গোলামকে বললাম, "সতর্ক থেকো! কিছু বেগবান ও হৃষ্টপুষ্ট উট সব সময় আমার কাছাকাছি প্রস্তুত রাখবে। আর যখন শুনবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সৈন্য আমাদের এই অঞ্চলে পদার্পণ করেছে, আমাকে জানাবে।" সে তা-ই করল। এরপর একদিন সকালবেলা সে আমার কাছে এসে বলল, "হে আদি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেনাবাহিনী আপনার ওপর হামলা চালালে আপনি যা করতে চেয়েছিলেন, তা করে ফেলুন। কারণ, আমি বহু পতাকা দেখতে পেয়েছি। সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে লোকেরা বলেছে, এটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সৈন্যশিবির।"'
আদি (রা) বলেন, 'আমি বললাম, "আমার উটগুলো কাছে নিয়ে আসো।” সে তা কাছে নিয়ে আসলো। আমি আমার পরিবারবর্গ ও সন্তানদের সঙ্গে নিলাম এবং বললাম, "আমি শামে আমার স্বধর্মীয় খ্রিষ্টানদের কাছে চলে যাব।” এই বলে আমি জাওশিয়া, ইবনে হিশামের (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা অনুযায়ী হাওশিয়া³-এর পথে অগ্রসর হলাম এবং হাতিমের এক কন্যাকে⁴ হাদিরে⁵ রেখে গেলাম। অবশেষে শামে পৌঁছে সেখানে অবস্থান করতে থাকলাম।'
আদি (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহিনী আমার পশ্চাদ্ধাবন করছিল। তাদের (বনু তাইয়ের) অনেকে বন্দী হলো, যাদের মধ্যে হাতিম-তনয়াও ছিল। বনু তাই-এর বন্দীদের সাথে তাকেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত করা হলো। আমার শামে পলায়নের কথা তাঁর কানে পৌঁছে গিয়েছিল। হাতিম-তনয়াকে মসজিদের সামনে খোঁয়াড়ের মতো একটি স্থানে রাখা হলো। তার মধ্যে বন্দীদের আটকে রাখা হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাতিম-তনয়া তাঁর মুখোমুখি হলেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, স্পষ্টভাষিণী। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতা গত হয়েছেন। যিনি আমার দেখাশোনা করতেন, তিনিও আমাকে ফেলে গেছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতিও সদয় হবেন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কে তোমার দেখাশোনা করত?" তিনি বললেন, "হাতিমের পুত্র আদি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ওই ব্যক্তি তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পলায়ন করেছে।"
হাতিম-তনয়া বলেন, "এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রেখে চলে গেলেন। পরবর্তী দিন তিনি আমার কাছ দিয়ে আবার যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে আগের মতোই বললাম। তিনিও আমাকে গত দিনের মতো জবাব দিলেন। এরপর তিনি তৃতীয় দিন এভাবে আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আমি তাঁর পক্ষ হতে কোনো অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর পেছনের এক লোক আমাকে ইঙ্গিত করে বলল, "দাঁড়াও, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলো।” আমি তাঁর সামনে দাঁড়ালাম এবং বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতা গত হয়েছেন। যিনি আমার দেখাশোনা করতেন, তিনিও আমাকে ফেলে গেছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতিও সদয় হবেন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "করেছি তো। কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করো না, যাবৎ না তোমার সম্প্রদায়ের নির্ভরযোগ্য কোনো লোককে পাও, যে তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছে দেবে। এমন কোনো লোককে পাওয়া গেলে আমাকে জানাবে।" যে লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে ইঙ্গিত করেছিলেন, আমি জানতে চাইলাম, "তিনি কে?" বলা হলো, "তিনি আলি বিন আবি তালিব (রা)।" আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। অবশেষে বনু বালি অথবা বনু কুজাআ গোত্রের একটি কাফেলার আগমন হলো। আমার ইচ্ছা ছিল শামদেশে আমার ভাইয়ের নিকট চলে যাব। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার সম্প্রদায়ের একটি কাফেলা এসেছে। তাতে এমন লোক আছে, যে নির্ভরযোগ্য এবং আমাকে জায়গামতো পৌঁছে দেবে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কাপড়-চোপড়, বাহন ও পথখরচ দিলেন। আমি তা নিয়ে কাফেলার সঙ্গে বের হয়ে পড়লাম এবং শামদেশে চলে আসলাম।"
আদি (রা) বলেন, "আল্লাহর শপথ, আমি আমার পরিবারবর্গের মাঝে বসা ছিলাম। সহসা দেখলাম, একটি স্ত্রীলোক হাওদার ভেতরে এবং সে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি বলে উঠলাম, "এ তো দেখি হাতিম-তনয়া!" ঠিকই দেখা গেল যে সে হাতিমের কন্যাই। সে আমার সম্মুখে এসেই আমাকে তিরস্কার করে বলতে শুরু করল, "সম্পর্কচ্ছেদকারী জালিম! নিজের বউ-ছেলে নিয়ে চলে এসেছ, আর বাবার মেয়েকে ফেলে এসেছ!" আমি বললাম, "প্রিয় বোনটি আমার, রাগ করো না! আল্লাহর কসম, আমার অপরাধ অমার্জনীয়। ঠিকই তুমি যা বলেছ, আমি তা-ই করেছি।" আদি (রা) বলেন, "এরপর সে নেমে আসলো এবং আমার নিকট থাকতে লাগল। সে ছিল ভীষণ বুদ্ধিমতী। আমি একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "এই লোকটির বিষয়ে তুমি কী মনে করো?" সে বলল, "আল্লাহর কসম, আমার মতে তুমি শীঘ্রই তাঁর নিকট চলে যাও। কারণ, তিনি যদি নবি হয়ে থাকেন, তা হলে যারা আগে আগে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, তিনি তাদের প্রতি সদয় হবেন। আর যদি তিনি রাজা হন, তবে তাঁর মহত্ত্বপূর্ণ গৌরবে তুমি ছোট হয়ে যাবে না। তুমি তুমিই থাকবে।” আমি বললাম, "হাঁ, এটাই বিজ্ঞজনোচিত রায়।" আদি (রা) বলেন, "তখন আমি রওনা হয়ে মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছে গেলাম। তিনি মসজিদে বসা ছিলেন। আমি তাঁর নিকট প্রবেশ করে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, "কে এই লোক?" বললাম, "আদি বিন হাতিম (রা)।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। আল্লাহর কসম, তিনি যখন আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পথিমধ্যে এক জীর্ণ-শীর্ণ বৃদ্ধার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বৃদ্ধা তাঁকে দাঁড়াতে বললে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। বৃদ্ধা দীর্ঘক্ষণ তার প্রয়োজন সম্পর্কে তাঁর সাথে কথা বললেন। আমি মনে মনে বললাম, "আল্লাহর শপথ, এই লোক কিছুতেই রাজা হতে পারেন না।" এরপর তিনি আমাকে নিয়ে অগ্রসর হলেন। গৃহের ভেতর প্রবেশ করে তিনি একটি বালিশ নিয়ে আমার দিকে ছুড়ে দিলেন। তার ওপরে ছিল চামড়া, ভেতরে খেজুরের বাকল। তিনি বললেন, "এর ওপর বসো।” আমি বললাম, "বরং আপনিই এর ওপর বসুন।” তিনি বললেন, "না, তুমিই বসো।” আমি তার ওপর বসে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলেন মাটিতে। আমি মনে মনে বললাম, "আল্লাহর কসম, এটা রাজাদের আচরণ নয়।" তারপর তিনি আমাকে বললেন, "হে আদি বিন হাতিম, ইসলাম গ্রহণ করো, নিরাপত্তা লাভ করবে।” আমি বললাম, "আমি একটি দ্বীনের অনুসারী।” তিনি বললেন, "তোমার ধর্ম সম্পর্কে আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি।" আমি বললাম, "কী! আপনি আমার ধর্ম সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানেন!?" তিনি বললেন, "হাঁ।” অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে বলো তো, হে আদি বিন হাতিম, তুমি কি "রাকুসি"⁶ নও?” আমি বললাম, "তা-ই বটে!” তিনি বললেন, "তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ লাভ করতে না?" আমি বললাম, "হাঁ।” তিনি বললেন, "তোমার ধর্ম অনুযায়ী তো সেটা তোমার জন্য বৈধ ছিল না।” আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, আপনি যথার্থই বলেছেন।” আদি (রা) বলেন, "এতক্ষণে আমার বুঝতে বাকি থাকল না যে, তিনি একজন প্রেরিত নবি। যা বলা হয় না, তাও তিনি জানেন। আমি তাঁর পাশেই ছিলাম, তখন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে ক্ষুধার অভিযোগ করল। অতঃপর আরেক ব্যক্তি এসে ডাকাতের আক্রমণের অভিযোগ করল। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "হে আদি, এই দ্বীন গ্রহণে হয়তো-বা তোমাকে এই জিনিস বাধা দিয়ে থাকবে যে, তুমি তাদের অভাব-অভিযোগে পীড়িত দেখছ। কিন্তু আল্লাহর কসম, সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন তাদের চারদিক থেকে ধন-দৌলত উপচে পড়বে, নেওয়ার মতো কোনো লোক পাওয়া যাবে না। হয়তো-বা তাদের শত্রুর সংখ্যাধিক্য এবং তাদের নিজেদের সামরিক শক্তির অপ্রতুলতা তোমাকে এ দ্বীন গ্রহণে বাধা দিয়ে থাকবে। কিন্তু আল্লাহর কসম, সেদিন দূরে নয়, যখন তুমি শুনতে পাবে, এক-একজন স্ত্রীলোক সেই সুদূর কাদিসিয়া থেকে উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে এই বাইতুল্লাহ-য় এসে জিয়ারত করবে। রাস্তাঘাটে সে কোনো কিছুর ভয় করবে না।" আমি মনে মনে বললাম, "তাহলে তাই গোত্রের লম্পটরা তখন কোথায় যাবে, যারা লাম্পট্যের জন্য নিজেদের দেশের মূল্য লাগাতেও দ্বিধা করে না?" তিনি আরও বললেন, "হয়তো-বা এই জিনিস তোমাকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিয়ে থাকবে যে, তুমি দেখছ, রাজত্ব ও বাদশাহি অন্যদের মাঝে। কিন্তু আল্লাহর শপথ, সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন শুনতে পাবে, ব্যাবিলনের শ্বেত প্রাসাদগুলো মুসলিমদের হাতে বিজিত হয়ে গিয়েছে।” আদি (রা) বলেন, "এ কথার পর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। তখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মুবারকে আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেলাম।” অন্য রিওয়ায়াতে এসেছে, "তখন তাঁর চেহারা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল।” আদি (রা) বলেন, "দুটি তো হয়ে গেছে। তবে আল্লাহর কসম, সেটিও অবশ্যই হবে। আমি দেখেছি, ব্যাবিলনের শ্বেত ভবনগুলো বিজিত হয়েছে। দেখেছি, কাদিসিয়া হতে একজন নারী তার উটের ওপর সাওয়ার হয়ে নির্ভয়ে পথ চলতে থাকে এবং বাইতুল্লাহর হজ করে যায়। আর আল্লাহর কসম, তৃতীয়টিও অবশ্যই একদিন ঘটবে। অর্থ-সম্পদের এমন ঢল নামবে যে, তা গ্রহণ করার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না।"'⁷

টিকাঃ
১. মুয়াত্তা মালিক: ১১৫৬, মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ১২৬৪৬।
২. যেহেতু আমি ছিলাম তাদের গোত্রাধিপতি।
৩. নজদের একটি পাহাড়ের নাম।
৪. তার নাম সাফফাহ।
৫. বনু তাই-এর বসতি।
৬. খ্রিষ্টান ও সাবিয়ি ধর্মের মাঝামাঝি একটি ধর্মের অনুসারী সম্প্রদায়বিশেষ।
৭. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৫৮০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের প্রতি সম্মান ও গুরুত্ব প্রদর্শন করতেন

📄 তাদের প্রতি সম্মান ও গুরুত্ব প্রদর্শন করতেন


মিসওয়ার বিন মাখরামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, 'তার পিতা মাখরামাহ (রা) তাকে বললেন, "বৎস, আমার কাছে খবর এসেছে যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু কাবা¹ জামা এসেছে। তিনি সেগুলো বণ্টন করছেন। চলো আমরা তাঁর কাছে যাই। আমরা গেলাম এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর বাসগৃহে পেলাম। আমাকে (আমার পিতা) বললেন, "বৎস, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমার কাছে ডাকো।” আমার নিকট কাজটি অতি কঠিন বলে মনে হলো। তাই আমি বললাম, "আপনার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডাকব?" তিনি বললেন, "বৎস, তিনি তো কঠোর স্বভাবের লোক নন (তাঁকে ডাকলে রাগ করবেন না)।” যাহোক, আমি তাঁকে ডাকলাম। তিনি বেরিয়ে এলেন। তাঁর গায়ে তখন স্বর্ণের বোতাম লাগানো মিহি রেশমি কাপড়ের কাবা পরিহিত ছিল। তিনি বললেন:
'হে মাখরামাহ, এটা আমি তোমার জন্য সংরক্ষণ করেছিলাম।' এরপর তিনি সেটা তাকে দিয়ে দিলেন।'²
'তাঁর গায়ে তখন স্বর্ণের বোতাম লাগানো মিহি রেশমি কাপড়ের কাবা পরিহিত ছিল'-এখান থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেশমের কাপড় পরিধান করেছেন। এর উত্তরে কেউ কেউ বলেন, এটা রেশমি কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ হওয়ার আগের ঘটনা। অথবা বলা যায় যে, তিনি কাপড়টি পরিধান করেননি; বরং কাঁধের ওপর রেখেছিলেন, যেন মাখরামাহ (রা) তা ভালোভাবে দেখতে পান। আমি (ইবনে হাজার আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ) বলি, 'নির্দিষ্ট করে কাঁধের ওপরেই ছিল বলার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং হাতের ওপর বিছানো থাকাটাও সম্ভব। আর হাদিসে (তাঁর গায়ের ওপর) বলতে তাঁর গায়ের কোনো এক অঙ্গের ওপর বলা উদ্দেশ্য। হাতিম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর রিওয়ায়াতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, "তিনি একটি কাবা নিয়ে বেরিয়ে এলেন এবং মাখরামাকে (রা) তার সৌন্দর্য দেখালেন।"'³
তিনি মাখরামাহকে (রা) বললেন, 'এটা তোমার জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছি।' এই কথা বলে তিনি মাখরামাহর (রা) প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশ করেছেন।⁴
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আচার-আচরণে ভদ্রতা, কথাবার্তায় নম্রতা এবং কথা বলার সময় কঠোরতা পরিহার করা মুমিনের আখলাক। এর মাধ্যমে আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা তৈরি হয় এবং ঘৃণা-বিদ্বেষ বিলুপ্ত হয়।⁵
এই হাদিসে সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নম্রতা ও সুন্দর ব্যবহারের চিত্র ফুটে উঠেছে।⁶

টিকাঃ
১. আলখাল্লা-জাতীয় পোশাক।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৮৬৫, সহিহু মুসলিম: ১০৫৮।
৩. ফাতহুল বারি: ১০/২৭০।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১৪৮।
৫. শারহু সহিহিল বুখারি লি-ইবনি বাত্তাল: ৯/৩০৫।
৬. ফাতহুল বারি: ১০/৩১৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00