📄 বেচাকেনার ক্ষেত্রে উদারতা প্রদর্শনকারীর জন্য দোয়া করতেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'আল্লাহ তাআলা বেচাকেনা ও বিচার-ফয়সালার সময় উদারতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তির ওপর রহম করেন।'¹
হাদিসের ফায়দাসমূহ:
এই হাদিসে লেনদেনের সময় উদারতা ও উন্নত চরিত্র প্রদর্শন এবং কৃপণতা পরিত্যাগ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
হক আদায়ের জন্য মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং পারলে ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তিনি সংবাদ দিয়েছেন যে, লেনদেনের ক্ষেত্রে যারা উদারতার পরিচয় দেয়, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
এ সম্পর্কে আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বেচাকেনা ও বিচার-ফয়সালার সময় উদারতা প্রদর্শনকারীকে ভালোবাসেন।'²
এ ছাড়াও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এই উদারতা জান্নাতের পথকে সুগম করে। যেমন: উসমান বিন আফফান (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যে বেচাকেনা ও বিচার-ফয়সালার সময় সহজ ও উদার থাকে।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২০৭৬।
২. সুনানুত তিরমিজি: ১৩১৯।
৩. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২০১, মুসনাদু আহমাদ: ৪১২।
📄 সাদাকা ও জাকাত আদায়কারীদের জন্য দোয়া করতেন
আব্দুল্লাহ বিন আবি আওফা (রা) বলেন, 'কোনো সম্প্রদায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের সাদাকা নিয়ে আসলে তিনি দোয়া করতেন-"হে আল্লাহ, অমুকের বংশধরদের ওপর রহমত নাজিল করুন।” একদিন আমার পিতা তার সাদাকা নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলে তিনি যথারীতি দোয়া করলেন-'হে আল্লাহ, আবু আওফার (রা) বংশধরদের ওপর রহমত নাজিল করুন।"'¹
আসলে আল্লাহর নিম্নোক্ত নির্দেশ পালনার্থে তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ করো, যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পারো এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া করো, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ। বস্তুত, আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন।'²
এই আয়াত প্রমাণ করে, জাকাতগ্রহীতা জাকাত দানকারীর জন্য দোয়া করা মুসতাহাব।³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৪৯৮, সহিহু মুসলিম: ১০৭৮।
২. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০৩।
৩. ফাতহুল বারি: ৩/৩৬২।
📄 অহংকারের ভাব দেখতে পেলে খুব রাগান্বিত হতেন
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলো। তার গায়ে সবুজ রঙের একটি আলখাল্লা ছিল, যাতে রেশমের ঝালর অথবা বোতাম লাগানো ছিল। সে বলল, "তোমাদের এ বন্ধুটি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক রাখালের ছেলে রাখালকে ওপরে তুলতে চায়; আর প্রত্যেক বীরের ছেলে বীরকে নিচে ফেলতে চায়।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হয়ে তার দিকে তেড়ে গেলেন এবং তার জামার কলার ধরে তাঁর দিকে টেনে আনলেন আর বললেন, "আমি তোমার শরীরে নির্বোধদের পোশাক দেখতে পাচ্ছি না।" তারপর তিনি বসে পড়লেন এবং বললেন:
"নুহ (আলাইহিস সালাম) যখন মৃত্যুর নিকটবর্তী হলেন, তখন তাঁর দুই সন্তানকে ডেকে বললেন, "আমি সংক্ষেপে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। তোমাদের আমি দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। তোমাদের আমি শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি। এবং "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-কে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"র পাল্লা ভারী হবে। আর যদি আসমান ও জমিনকে বৃত্ত আকারে রাখা হয়, অতঃপর তার ওপর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-কে রাখা হয়, তখন ওই বৃত্ত ভেঙে যাবে। আর তোমাদের 'সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, এটি প্রত্যেক বস্তুর দোয়া এবং প্রত্যেক বস্তুকে এটির কারণে রিজিক দেওয়া হয়।"'¹
কাব বিন সুর (রা)-এর আজাদকৃত গোলাম সাইদ বিন আইমান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় এক দরিদ্র ব্যক্তি আসলেন এবং একজন ধনী ব্যক্তি পাশে বসলেন। তখন ধনী লোকটি গরিব লোকটির দিক থেকে নিজের কাপড় গুটিয়ে নিলেন। তা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। বললেন, "হে অমুক, তুমি কি ভয় করো যে, তোমার ধনাঢ্যতা তার কাছে চলে যাবে আর তার দারিদ্র্য তোমার কাছে চলে আসবে?" ধনী লোকটি বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, ধনাঢ্যতা কি খারাপ কিছু?" তিনি বললেন, "হাঁ, তোমার ধনাঢ্যতা তোমাকে জাহান্নামের পথে আহ্বান করে আর তার দারিদ্র্য তাকে জান্নাতের পথে আহ্বান করে।” লোকটি বললেন, "এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?" তিনি বললেন, "তার প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করো।” লোকটি বললেন, "আমি তা-ই করব।” গরিব লোকটি বললেন, "এতে আমার জন্য অতিরিক্ত উপকার কী?" তিনি বললেন, "তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবে এবং গুনাহ মাফ চাইবে (এতে তোমারও উপকার হবে)?"'²
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৬১।
২. ইমাম আহমাদ কৃত আজ-জুহদ, পৃষ্ঠা নং ৩৮।
📄 জাকাত দিতে অস্বীকার করলে তিনি রাগান্বিত হতেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর (রা)-কে জাকাত আদায়ের জন্য প্রেরণ করলেন। এরপর তাঁকে বলা হলো, "ইবনে জামিল, খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আব্বাস (রা) জাকাত দিতে অস্বীকার করেছেন।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'ইবনে জামিলের এই অস্বীকার আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা বৈ কিছু নয়-সে তো নিঃস্ব ছিল অতঃপর আল্লাহ তাকে বিত্তশালী করেছেন। আর খালিদের (রা) কথা এই যে, তোমরা তার প্রতি জুলুম করছ, কেননা সে তার লৌহবর্ম ও যুদ্ধ সরঞ্জমাদি আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিয়েছে। আর আব্বাস (রা), তাঁর জাকাত এবং তৎসঙ্গে অনুরূপ পরিমাণ আদায় করা আমার দায়িত্বে।' এরপর তিনি বললেন, "হে উমর, তুমি কি জানো, চাচা বাপের সমমর্যাদাসম্পন্ন?"'
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "তাঁর জাকাত এবং তৎসঙ্গে অনুরূপ পরিমাণ আদায় করা আমার দায়িত্বে”-এই কথাটির মর্ম হলো, আমি তাঁর থেকে দুই বছরের জাকাত অগ্রিম নিয়ে নিয়েছি। আর যারা অগ্রিম জাকাত আদায় করাকে বৈধ মনে করেন না, তাদের মতে এর অর্থ হলো, তাঁর জাকাত আমি নিজের পক্ষ থেকে আদায় করব। আবু উবাইদ (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ কতিপয় উলামায়ে কিরাম বলেন, এর অর্থ হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাস (রা)-কে জাকাত আদায় করার জন্য তার সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। কারণ, নির্দিষ্ট সময়ে জাকাতের সম্পদের প্রতি তার প্রয়োজন ছিল। তবে হাদিসাংশটির সঠিক অর্থ হলো, আমি তার জাকাত অগ্রিম আদায় করে নিয়েছি। কারণ, অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, "আমি তার থেকে দুই বছরের জাকাত অগ্রিম নিয়ে নিয়েছি।"'¹
টিকাঃ
১. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/৫৭।