📄 তাদের কেউ উপকার করলে তার প্রতিদান দিতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একসময় (ঘর থেকে) বের হলেন, যে সময় (সাধারণত) তিনি বের হন না এবং এই সময়ে তাঁর সঙ্গে কেউ সাক্ষাৎ করতেও আসে না। তখন আবু বকর (রা) তাঁর কাছে এলেন। তিনি বললেন, "হে আবু বকর, তোমার আগমনের কারণ কী?" তিনি বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলাম। তাঁর চেহারা মুবারকের দিকে তাকাব এবং তাঁকে সালাম পেশ করব।" কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই উমর (রা) এসে হাজির হলেন। তিনি বললেন, "হে উমর, তোমার আগমনের কারণ কী?" তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ক্ষুধার জ্বালায়।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমিও কিছুটা ক্ষুধা অনুভব করছি।" এরপর তাঁরা সকলেই আবুল হাইসাম বিন তায়্যিহান আনসারি (রা)-এর বাড়ির পানে চললেন। তার কাছে অনেক খেজুর গাছ ও ছাগল ছিল, তবে তার কোনো চাকর-নওকর ছিল না। তাঁরা তাকে বাড়িতে পেলেন না। তার স্ত্রীকে বললেন, "তোমার সঙ্গী কই?" তার স্ত্রী বললেন, "আমাদের জন্য মিঠা পানি আনতে গিয়েছেন তিনি।" অল্পক্ষণ পরেই আবুল হাইসাম (রা) পানিভর্তি মশক বয়ে ফিরে আসলেন। মশকটি রেখেই তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাপটে ধরলেন এবং বললেন, "আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক!" অতঃপর তাঁদের নিয়ে তার বাগানে গেলেন এবং তাঁদের জন্য একটি বিছানা বিছিয়ে দিলেন। তারপর একটি খেজুর গাছ থেকে এক ছড়া খেজুর পেড়ে তাঁদের সামনে পরিবেশন করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "(এত বেশি না এনে) আমাদের জন্য শুধু পাকা খেজুরগুলো নিয়ে আসলেই তো পারতে?" আবুল হাইসাম (রা) বললেন, "আমি চাই, আপনারা কাঁচা পাকা যা পছন্দ করেন, তা-ই খান।” এরপর তাঁরা তা আহার করলেন এবং তার আনা মশক থেকে পানি পান করলেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সেই সত্তার কসম-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এটিও এমন এক নিয়ামত, যা সম্পর্কে কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রশ্ন করা হবে। এই শীতল ছায়া, সুস্বাদু পাকা টাটকা খেজুর আর ঠান্ডা পানি (কত বিশাল নিয়ামত)!" তারপর আবুল হাইসাম (রা) তাঁদের জন্য খানা প্রস্তুত করার জন্য উঠে দাঁড়ালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কোনো দুধওয়ালা পশু জবাই কোরো না।” তিনি তাঁদের জন্য একটি ছাগলের বাচ্চা জবাই করলেন এবং তা রান্না করে নিয়ে এলেন। তারপর সকলে মিলে তা খেলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তোমার কি কোনো খাদিম আছে?” তিনি বললেন, "জি না, নেই।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যখন কোনো বন্দী আনা হবে, তখন আমার কাছে এসো।" এর পরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মাত্র দুটি দাস আনা হয়। তাদের সাথে তৃতীয় কোনো দাস ছিল না। তখন আবুল হাইসাম (রা) তাঁর কাছে আসলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ দুটি থেকে যেটা তোমার পছন্দ হয়, সেটা নিয়ে যাও।” আবুল হাইসাম (রা) বললেন, "হে আল্লাহর নবি, আপনিই আমার জন্য একটিকে পছন্দ করে দিন।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "পরামর্শদাতাকে আমানতদার হতে হয়। এটাকে নাও। একে আমি নামাজ আদায় করতে দেখেছি। আর তোমাকে তার সাথে সদ্ব্যবহার করতে বিশেষভাবে উপদেশ দিচ্ছি।” আবুল হাইসাম (রা) তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাটি বললেন। তখন স্ত্রী বললেন, "একে আজাদ করে দেওয়া ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা যথাযথ মানা যাবে না।” তখন তিনি বললেন, "তাহলে এখন থেকে সে স্বাধীন।” তা জানার পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ তাআলা যত নবি বা প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন, প্রত্যেকের কাছে দুজন অন্তরঙ্গ পরামর্শদাতা ছিল। একজন তাকে সৎ কাজের আদেশ দিয়েছে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করেছে। আরেকজন তার ক্ষতি করতে বিন্দুমাত্র কসুর করেনি। আর যাকে মন্দ পরামর্শদাতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তিনিই বেঁচে থাকতে পেরেছেন।"¹
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৬৯।
📄 তাদের জন্য বরকতের দোয়া করতেন
আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা)-এর সম্পদে বরকতের দোয়া করেছিলেন।
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা)-এর শরীরে হলুদ রঙের ছাপ দেখতে পেয়ে বললেন, "কী ব্যাপার?" তিনি বললেন, "আমি একটি মেয়েকে খেজুর বিচি পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে শাদি করেছি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন। অন্তত একটি ছাগল জবাই করে হলেও অলিমার ব্যবস্থা করো।'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সচ্ছল ব্যক্তির অলিমার খাবার একটি ছাগল থেকে কম না হওয়া মুসতাহাব। আর কাজি (রাহিমাহুল্লাহ) এ কথার ওপর উলামায়ে কিরামের ইজমা (সবার ঐকমত্য) উল্লেখ করেছেন যে, অলিমা আদায় হওয়ার জন্য খাবারের কোনো পরিমাণ নির্ধারিত নেই। বরং যেকোনো খাবার খাওয়ালে অলিমা আদায় হয়ে যাবে। আর ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) সাফিয়্যা (রা)-এর অলিমা সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে, তা গোশতবিহীন ছিল। আর জাইনাব (রা)-এর অলিমার ব্যাপারে বর্ণনা করেন, "আমরা (সাহাবিগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তৃপ্তিভরে রুটি আর গোশত খেয়েছি।" এসব রিওয়ায়াত প্রমাণ করে যে, যেকোনো প্রকার ও যেকোনো পরিমাণ খাবার দ্বারা অলিমা আদায় হয়ে যাবে। তবে মুসতাহাব হলো, বরের আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী অলিমার আয়োজন করা।'²
উরওয়া আল-বারিকি (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কিছু আমদানিকৃত মাল পেশ করা হলো। তখন তিনি আমাকে একটি দিনার দিয়ে বললেন, "আমদানিকৃত মাল থেকে আমার জন্য একটি ছাগল কিনে নিয়ে আসো।” আমি সেখানে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে দরাদরি করে এক দিনার দিয়ে দুটি ছাগল ক্রয় করলাম। তারপর ছাগলদুটিকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসতে লাগলাম। পথিমধ্যে এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমার সাথে দরাদরি করে এক দিনারের বিনিময়ে একটি ছাগল কিনে নিলেন। তারপর আমি এক দিনার ও একটি ছাগল নিয়ে চলে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এই নিন আপনার দিনার এবং এই নিন আপনার ছাগল।” তারপর পুরো ঘটনা তাকে শোনালাম। তখন তিনি বললেন:
'হে আল্লাহ, এর হাতের লেনদেনে বরকত দান করুন।'
(তাঁর দুআর বরকতে) আমি কুফার আবর্জনা ফেলার জায়গায় দাঁড়িয়ে (বেচাকেনা করে) ঘরে ফেরার পূর্বে চল্লিশ হাজার লাভ করতাম।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫১৫৫, সহিহু মুসলিম: ১৪২৭।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৯/২১৭।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৮৭৩।
📄 বেচাকেনার ক্ষেত্রে উদারতা প্রদর্শনকারীর জন্য দোয়া করতেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'আল্লাহ তাআলা বেচাকেনা ও বিচার-ফয়সালার সময় উদারতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তির ওপর রহম করেন।'¹
হাদিসের ফায়দাসমূহ:
এই হাদিসে লেনদেনের সময় উদারতা ও উন্নত চরিত্র প্রদর্শন এবং কৃপণতা পরিত্যাগ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
হক আদায়ের জন্য মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং পারলে ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তিনি সংবাদ দিয়েছেন যে, লেনদেনের ক্ষেত্রে যারা উদারতার পরিচয় দেয়, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
এ সম্পর্কে আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বেচাকেনা ও বিচার-ফয়সালার সময় উদারতা প্রদর্শনকারীকে ভালোবাসেন।'²
এ ছাড়াও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এই উদারতা জান্নাতের পথকে সুগম করে। যেমন: উসমান বিন আফফান (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যে বেচাকেনা ও বিচার-ফয়সালার সময় সহজ ও উদার থাকে।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২০৭৬।
২. সুনানুত তিরমিজি: ১৩১৯।
৩. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২০১, মুসনাদু আহমাদ: ৪১২।
📄 সাদাকা ও জাকাত আদায়কারীদের জন্য দোয়া করতেন
আব্দুল্লাহ বিন আবি আওফা (রা) বলেন, 'কোনো সম্প্রদায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের সাদাকা নিয়ে আসলে তিনি দোয়া করতেন-"হে আল্লাহ, অমুকের বংশধরদের ওপর রহমত নাজিল করুন।” একদিন আমার পিতা তার সাদাকা নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলে তিনি যথারীতি দোয়া করলেন-'হে আল্লাহ, আবু আওফার (রা) বংশধরদের ওপর রহমত নাজিল করুন।"'¹
আসলে আল্লাহর নিম্নোক্ত নির্দেশ পালনার্থে তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ করো, যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পারো এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া করো, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ। বস্তুত, আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন।'²
এই আয়াত প্রমাণ করে, জাকাতগ্রহীতা জাকাত দানকারীর জন্য দোয়া করা মুসতাহাব।³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৪৯৮, সহিহু মুসলিম: ১০৭৮।
২. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০৩।
৩. ফাতহুল বারি: ৩/৩৬২।