📄 ধনবান ব্যবসায়ীদের সাদাকা করতে উদ্বুদ্ধ করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধনবান ব্যবসায়ীদের জন্য সুন্দর নাম চয়ন করতেন এবং তাদের সাদাকা করতে উদ্বুদ্ধ করতেন।
কাইস বিন আবু গারজাহ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে আমাদের (ব্যবসায়ীদের) 'সিমসার' (দালাল, ব্রোকার) নামে ডাকা হতো। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের পাশ দিয়ে গমন করার সময় পূর্বের নামের চেয়ে সুন্দর নামে আমাদের ডাকলেন। বললেন:
'হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, বেচাকেনার মধ্যে বেহুদা কথা ও শপথ বেশি উচ্চারিত হয়, তাই বেচাকেনাকে সাদাকার সাথে মিলিয়ে নাও (অর্থাৎ বেচাকেনার ফাঁকে ফাঁকে সাদাকা করো, যেন বেহুদা কথা ও শপথের গুনাহ মুছে যায়)।'¹
খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "সিমসার” একটি অনারব শব্দ। সে যুগে আরবের অধিকাংশ ব্যবসায়ী অনারব ছিল। শব্দটি তাদের থেকে এসেছিল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবর্তে আরবি নাম "তাজির" প্রবর্তন করলেন।'²
'তাই বেচাকেনাকে সাদাকার সাথে মিলিয়ে নাও'-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জানিয়ে দিলেন যে, স্বাভাবিকভাবে বেচাকেনার সময় অনর্থক কথাবার্তা ও শপথ বেশি উচ্চারিত হয়। তাই তারা যেন বেচাকেনার সময় দান-সাদাকা করে। এতে তাদের বেহুদা কথা ও শপথের গুনাহ মুছে যাবে। কেননা, দান-সাদাকা আল্লাহর ক্রোধাগ্নিকে নির্বাপিত করে আর পুণ্যকর্ম পাপকর্মের গুনাহকে মিটিয়ে দেয়।³
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ১২০৮, সুনানুন নাসায়ি: ৩৭৯৭।
২. মাআলিমুস সুনান: ২/১৩১।
৩. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/২৮১।
📄 তাদের সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাদের সাথে মিলিত হতেন এবং তাদের সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতেন।
রিফাআ (রা) বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম। তখন দেখি, সাতসকালেই মানুষ বেচাকেনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ডাক দিলেন, "হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়!" যখন তারা (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডাক শুনে) চোখ ও গর্দান ওপরে তুলল, তখন তিনি বললেন:
'নিশ্চয় ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন পাপাচারী হিসেবে উত্থিত হবে, তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে, সদাচরণ করে এবং সত্য কথা বলে (তারা পাপাচারী হিসেবে উত্থিত হবে না)।'¹
'তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে...'-এর অর্থ হলো, যারা বেচাকেনার সময় মানুষের সাথে উত্তম আচার-ব্যবহার করে এবং ছোট-বড় কোনো গুনাহে লিপ্ত হয় না; যেমন: লোকদের সাথে প্রতারণা করে না, অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না ইত্যাদি। অথবা এর অর্থ হলো, ব্যবসার পাশাপাশি তারা আল্লাহর ইবাদত করে।²
কাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সাধারণত ব্যবসায়ীরা লেনদেনের মধ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয় এবং মিথ্যা শপথ করে খারাপ মাল বেচাকেনা করে, তাই তাদের পাপাচারী বলা হয়েছে। কিন্তু যারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকে এবং মিথ্যা শপথের আশ্রয় না নিয়ে সততার সাথে বেচাকেনা করে, তাদের পাপাচারী বলা হয়নি।'³
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ১২১০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২১৪৬।
২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৩৩৬।
৩. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৩৩৬।
📄 বেচাকেনার সময় প্রতারণা করতে নিষেধ করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খাদ্যস্তূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং আঙুলের মধ্যে ভেজা অনুভব করলেন। তখন তিনি বললেন, "ওহে খাদ্যওয়ালা, এ কী?" উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এর ওপর বৃষ্টির পানি পড়েছে।” তিনি বললেন:
'তাহলে ভেজা অংশ ওপরে রাখোনি কেন, যেন মানুষ তা দেখতে পারে? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "আমার দলভুক্ত নয়" মানে এমন কাজ করা আমার শিক্ষা, কাজ ও উন্নত পদ্ধতির সাথে মানানসই নয়। কিন্তু সুফইয়ান বিন উয়াইনা (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসাংশটির এভাবে ব্যাখ্যা করতে অপছন্দ করতেন। বরং তিনি তার প্রকাশ্য ও বাহ্যিক অর্থটিই করতেন, যেন প্রতারণার ভয়াবহতা ও তার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তিরস্কার অন্তরসমূহে ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়।²
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'উট ও ছাগলের দুগ্ধদোহন থেকে বিরত থেকো না (এই উদ্দেশ্যে যে, এর মাধ্যমে উলানে দুধ বেশি জমবে, আর ক্রেতা তা দেখে বিভ্রান্ত হয়ে চড়া দামে তা ক্রয় করে নেবে)। এরপর যদি কেউ তা ক্রয় করে নেয়, তখন দুধ দোহন করার পর তার কাছে দুটি ইচ্ছাধিকার থাকবে-চাইলে সে তা নিজের কাছে রেখে দিতে পারবে অথবা এক সা' খেজুর সহকারে তা ফেরত দিতে পারবে।'³
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "তাসরিয়া” (উল্লিখিত পন্থায় দুধালো জন্তু বিক্রি করা) হারাম। চাই তা উট, গরু, ছাগল, দাসী, ঘোড়া... যে প্রাণীতেই হোক। কারণ, এটা প্রতারণা ও ধোঁকা। কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা বিক্রি করলে বিক্রয় শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে ক্রেতার ইচ্ছাধিকার থাকবে-চাইলে রেখে দিতে পারবে কিংবা ফেরত দিতে পারবে।'⁴
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১০২।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/১০৯।
৩. সহিহুল বুখারি: ২১৪৮, সহিহু মুসলিম: ১৫১৫।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/১৬২।
📄 তাদের কেউ উপকার করলে তার প্রতিদান দিতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একসময় (ঘর থেকে) বের হলেন, যে সময় (সাধারণত) তিনি বের হন না এবং এই সময়ে তাঁর সঙ্গে কেউ সাক্ষাৎ করতেও আসে না। তখন আবু বকর (রা) তাঁর কাছে এলেন। তিনি বললেন, "হে আবু বকর, তোমার আগমনের কারণ কী?" তিনি বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলাম। তাঁর চেহারা মুবারকের দিকে তাকাব এবং তাঁকে সালাম পেশ করব।" কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই উমর (রা) এসে হাজির হলেন। তিনি বললেন, "হে উমর, তোমার আগমনের কারণ কী?" তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ক্ষুধার জ্বালায়।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমিও কিছুটা ক্ষুধা অনুভব করছি।" এরপর তাঁরা সকলেই আবুল হাইসাম বিন তায়্যিহান আনসারি (রা)-এর বাড়ির পানে চললেন। তার কাছে অনেক খেজুর গাছ ও ছাগল ছিল, তবে তার কোনো চাকর-নওকর ছিল না। তাঁরা তাকে বাড়িতে পেলেন না। তার স্ত্রীকে বললেন, "তোমার সঙ্গী কই?" তার স্ত্রী বললেন, "আমাদের জন্য মিঠা পানি আনতে গিয়েছেন তিনি।" অল্পক্ষণ পরেই আবুল হাইসাম (রা) পানিভর্তি মশক বয়ে ফিরে আসলেন। মশকটি রেখেই তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাপটে ধরলেন এবং বললেন, "আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক!" অতঃপর তাঁদের নিয়ে তার বাগানে গেলেন এবং তাঁদের জন্য একটি বিছানা বিছিয়ে দিলেন। তারপর একটি খেজুর গাছ থেকে এক ছড়া খেজুর পেড়ে তাঁদের সামনে পরিবেশন করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "(এত বেশি না এনে) আমাদের জন্য শুধু পাকা খেজুরগুলো নিয়ে আসলেই তো পারতে?" আবুল হাইসাম (রা) বললেন, "আমি চাই, আপনারা কাঁচা পাকা যা পছন্দ করেন, তা-ই খান।” এরপর তাঁরা তা আহার করলেন এবং তার আনা মশক থেকে পানি পান করলেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সেই সত্তার কসম-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এটিও এমন এক নিয়ামত, যা সম্পর্কে কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রশ্ন করা হবে। এই শীতল ছায়া, সুস্বাদু পাকা টাটকা খেজুর আর ঠান্ডা পানি (কত বিশাল নিয়ামত)!" তারপর আবুল হাইসাম (রা) তাঁদের জন্য খানা প্রস্তুত করার জন্য উঠে দাঁড়ালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কোনো দুধওয়ালা পশু জবাই কোরো না।” তিনি তাঁদের জন্য একটি ছাগলের বাচ্চা জবাই করলেন এবং তা রান্না করে নিয়ে এলেন। তারপর সকলে মিলে তা খেলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তোমার কি কোনো খাদিম আছে?” তিনি বললেন, "জি না, নেই।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যখন কোনো বন্দী আনা হবে, তখন আমার কাছে এসো।" এর পরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মাত্র দুটি দাস আনা হয়। তাদের সাথে তৃতীয় কোনো দাস ছিল না। তখন আবুল হাইসাম (রা) তাঁর কাছে আসলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ দুটি থেকে যেটা তোমার পছন্দ হয়, সেটা নিয়ে যাও।” আবুল হাইসাম (রা) বললেন, "হে আল্লাহর নবি, আপনিই আমার জন্য একটিকে পছন্দ করে দিন।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "পরামর্শদাতাকে আমানতদার হতে হয়। এটাকে নাও। একে আমি নামাজ আদায় করতে দেখেছি। আর তোমাকে তার সাথে সদ্ব্যবহার করতে বিশেষভাবে উপদেশ দিচ্ছি।” আবুল হাইসাম (রা) তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাটি বললেন। তখন স্ত্রী বললেন, "একে আজাদ করে দেওয়া ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা যথাযথ মানা যাবে না।” তখন তিনি বললেন, "তাহলে এখন থেকে সে স্বাধীন।” তা জানার পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ তাআলা যত নবি বা প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন, প্রত্যেকের কাছে দুজন অন্তরঙ্গ পরামর্শদাতা ছিল। একজন তাকে সৎ কাজের আদেশ দিয়েছে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করেছে। আরেকজন তার ক্ষতি করতে বিন্দুমাত্র কসুর করেনি। আর যাকে মন্দ পরামর্শদাতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তিনিই বেঁচে থাকতে পেরেছেন।"¹
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৬৯।