📄 আল্লাহর সাথে সওদা করতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন
আল্লাহর সাথে সওদা করা সবচেয়ে লাভজনক সওদা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
'যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামাজ কায়িম করে এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে-তারা এমন ব্যবসা আশা করে, যাতে কখনো লোকসান হবে না। পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ তাদের সাওয়াব পুরোপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশি দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী।'¹
সাদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "তারা এমন ব্যবসা আশা করে, যাতে কখনো লোকসান হবে না”-এই কথাটির মর্ম হলো, যে ব্যবসা কখনো অলাভজনক ও নষ্ট হওয়ার নয়। বরং এই ব্যবসা সর্বাধিক উত্তম ও উন্নত ব্যবসা। এই ব্যবসা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, বিশাল সাওয়াব অর্জন এবং তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া।²
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, "অমুক ব্যক্তির কাছে একটি খেজুর গাছ আছে। আমি সেটা দিয়ে একটি দেয়াল (ঘর) বানাতে চাইছি। তাই আপনি তাকে খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দিতে বলুন, যাতে আমি তা দিয়ে দেয়ালটি বানাতে পারি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে বললেন, "জান্নাতে একটি খেজুর গাছের বিনিময়ে তাকে তোমার খেজুর গাছটি দিয়ে দাও।” লোকটি অস্বীকৃতি জানালেন। অতঃপর আবু দাহদাহ (রা) লোকটির নিকট এসে বললেন, "তোমার খেজুর গাছটি আমাকে আমার বাগানের বিনিময়ে বিক্রি করো।” লোকটি বিক্রি করে দিলেন। তারপর আবু দাহদাহ (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আমার বাগানের বিনিময়ে ওই লোকের খেজুর গাছটি কিনে নিয়েছি। এবার আপনি এই লোকটিকে তা দিয়ে দিতে পারেন। আমি তাকে এটি দান করলাম।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "জান্নাতে আবু দাহদাহের (রা) জন্য অনেক শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট একটি খেজুর গাছ ফুটেছে!" কথাটি কয়েকবার বললেন তিনি।'
বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর আবু দাহদাহ (রা) তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন, "ওহে দাহদাহের মা, বাগানটি থেকে বের হয়ে যাও। এটাকে আমি জান্নাতের একটি খেজুর গাছের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছি।” তা শুনে স্ত্রী বললেন, "এটি খুবই লাভজনক সওদা হয়েছে।"'³
টিকাঃ
১. সুরা ফাতির, ৩৫: ২৯-৩০।
২. তাফসিরুস সাদি: ১/৬৮৯।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১২০৭৩।
📄 ধনবান ব্যবসায়ীদের সাদাকা করতে উদ্বুদ্ধ করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধনবান ব্যবসায়ীদের জন্য সুন্দর নাম চয়ন করতেন এবং তাদের সাদাকা করতে উদ্বুদ্ধ করতেন।
কাইস বিন আবু গারজাহ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে আমাদের (ব্যবসায়ীদের) 'সিমসার' (দালাল, ব্রোকার) নামে ডাকা হতো। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের পাশ দিয়ে গমন করার সময় পূর্বের নামের চেয়ে সুন্দর নামে আমাদের ডাকলেন। বললেন:
'হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, বেচাকেনার মধ্যে বেহুদা কথা ও শপথ বেশি উচ্চারিত হয়, তাই বেচাকেনাকে সাদাকার সাথে মিলিয়ে নাও (অর্থাৎ বেচাকেনার ফাঁকে ফাঁকে সাদাকা করো, যেন বেহুদা কথা ও শপথের গুনাহ মুছে যায়)।'¹
খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "সিমসার” একটি অনারব শব্দ। সে যুগে আরবের অধিকাংশ ব্যবসায়ী অনারব ছিল। শব্দটি তাদের থেকে এসেছিল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবর্তে আরবি নাম "তাজির" প্রবর্তন করলেন।'²
'তাই বেচাকেনাকে সাদাকার সাথে মিলিয়ে নাও'-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জানিয়ে দিলেন যে, স্বাভাবিকভাবে বেচাকেনার সময় অনর্থক কথাবার্তা ও শপথ বেশি উচ্চারিত হয়। তাই তারা যেন বেচাকেনার সময় দান-সাদাকা করে। এতে তাদের বেহুদা কথা ও শপথের গুনাহ মুছে যাবে। কেননা, দান-সাদাকা আল্লাহর ক্রোধাগ্নিকে নির্বাপিত করে আর পুণ্যকর্ম পাপকর্মের গুনাহকে মিটিয়ে দেয়।³
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ১২০৮, সুনানুন নাসায়ি: ৩৭৯৭।
২. মাআলিমুস সুনান: ২/১৩১।
৩. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/২৮১।
📄 তাদের সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাদের সাথে মিলিত হতেন এবং তাদের সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতেন।
রিফাআ (রা) বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম। তখন দেখি, সাতসকালেই মানুষ বেচাকেনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ডাক দিলেন, "হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়!" যখন তারা (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডাক শুনে) চোখ ও গর্দান ওপরে তুলল, তখন তিনি বললেন:
'নিশ্চয় ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন পাপাচারী হিসেবে উত্থিত হবে, তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে, সদাচরণ করে এবং সত্য কথা বলে (তারা পাপাচারী হিসেবে উত্থিত হবে না)।'¹
'তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে...'-এর অর্থ হলো, যারা বেচাকেনার সময় মানুষের সাথে উত্তম আচার-ব্যবহার করে এবং ছোট-বড় কোনো গুনাহে লিপ্ত হয় না; যেমন: লোকদের সাথে প্রতারণা করে না, অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না ইত্যাদি। অথবা এর অর্থ হলো, ব্যবসার পাশাপাশি তারা আল্লাহর ইবাদত করে।²
কাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সাধারণত ব্যবসায়ীরা লেনদেনের মধ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয় এবং মিথ্যা শপথ করে খারাপ মাল বেচাকেনা করে, তাই তাদের পাপাচারী বলা হয়েছে। কিন্তু যারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকে এবং মিথ্যা শপথের আশ্রয় না নিয়ে সততার সাথে বেচাকেনা করে, তাদের পাপাচারী বলা হয়নি।'³
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ১২১০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২১৪৬।
২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৩৩৬।
৩. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৩৩৬।
📄 বেচাকেনার সময় প্রতারণা করতে নিষেধ করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খাদ্যস্তূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং আঙুলের মধ্যে ভেজা অনুভব করলেন। তখন তিনি বললেন, "ওহে খাদ্যওয়ালা, এ কী?" উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এর ওপর বৃষ্টির পানি পড়েছে।” তিনি বললেন:
'তাহলে ভেজা অংশ ওপরে রাখোনি কেন, যেন মানুষ তা দেখতে পারে? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "আমার দলভুক্ত নয়" মানে এমন কাজ করা আমার শিক্ষা, কাজ ও উন্নত পদ্ধতির সাথে মানানসই নয়। কিন্তু সুফইয়ান বিন উয়াইনা (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসাংশটির এভাবে ব্যাখ্যা করতে অপছন্দ করতেন। বরং তিনি তার প্রকাশ্য ও বাহ্যিক অর্থটিই করতেন, যেন প্রতারণার ভয়াবহতা ও তার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তিরস্কার অন্তরসমূহে ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়।²
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'উট ও ছাগলের দুগ্ধদোহন থেকে বিরত থেকো না (এই উদ্দেশ্যে যে, এর মাধ্যমে উলানে দুধ বেশি জমবে, আর ক্রেতা তা দেখে বিভ্রান্ত হয়ে চড়া দামে তা ক্রয় করে নেবে)। এরপর যদি কেউ তা ক্রয় করে নেয়, তখন দুধ দোহন করার পর তার কাছে দুটি ইচ্ছাধিকার থাকবে-চাইলে সে তা নিজের কাছে রেখে দিতে পারবে অথবা এক সা' খেজুর সহকারে তা ফেরত দিতে পারবে।'³
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "তাসরিয়া” (উল্লিখিত পন্থায় দুধালো জন্তু বিক্রি করা) হারাম। চাই তা উট, গরু, ছাগল, দাসী, ঘোড়া... যে প্রাণীতেই হোক। কারণ, এটা প্রতারণা ও ধোঁকা। কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা বিক্রি করলে বিক্রয় শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে ক্রেতার ইচ্ছাধিকার থাকবে-চাইলে রেখে দিতে পারবে কিংবা ফেরত দিতে পারবে।'⁴
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১০২।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/১০৯।
৩. সহিহুল বুখারি: ২১৪৮, সহিহু মুসলিম: ১৫১৫।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/১৬২।