📄 সন্তানদের দান করার ব্যাপারে সমতা বিধানের নির্দেশ দিতেন
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের মধ্যে কোনো একজনকে অন্যদের তুলনায় বেশি ভালোবাসে। ফলে কোনোকিছু দান করার সময় সন্তানদের মাঝে তারতম্য করে। কাউকে বেশি দেয়, কাউকে কম দেয়। এটা চরম অবিচার। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।
নুমান বিন বশির (রা) থেকে বর্ণিত। 'তাঁর মা বিনতে রাওয়াহা (রা) তাঁর পিতার নিকট স্বীয় পুত্রের জন্য তাঁর সম্পদ থেকে কিছু দান করার অনুরোধ করলেন। এক বছর যাবৎ তিনি বিষয়টি মুলতবি করে রাখেন। পরে ইচ্ছা হলো। বিনতে রাওয়াহা (রা) বললেন, "আমার পুত্রকে যা দান করবেন, তার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাক্ষী না রাখা পর্যন্ত আমি খুশি হব না।” তখন আমার পিতা আমার হাত ধরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। সে সময় আমি বালক ছিলাম। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এর মা বিনতে রাওয়াহার (রা) পছন্দ যে, আমি তাঁর পুত্রকে যা দান করেছি, আপনাকে তার সাক্ষী রাখি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে বশির, এ ছাড়া তোমার কি আর কোনো পুত্র আছে?" তিনি বললেন, "হাঁ।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি তাদের সকলকে এরূপ দান করেছ?" তিনি বললেন, "না।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে আমাকে সাক্ষী রেখো না। কেননা, আমি জুলুমের পক্ষে সাক্ষী হই না।"'¹
সহিহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি কি চাও যে, তারা সবাই তোমার সাথে সমানভাবে সদাচরণ করুক?' তিনি বললেন, 'জি, অবশ্যই।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে এ রকম করো না।'
বুখারি ও মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করো।' এরপর আমার পিতা ফিরে এলেন এবং উক্ত দান ফিরিয়ে নিলেন।
আবু দাউদের বর্ণনায় (হাদিস নং ২৫৪২) এসেছে, 'তোমার ওপর তাদের হক হলো, তুমি তাদের মাঝে ইনসাফ করবে। আর তাদের ওপর তোমার হক হলো, তারা তোমার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।'
সুতরাং দান করার ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা ও সমতা বিধান করা একান্ত অপরিহার্য।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৫৮৭, সহিহু মুসলিম: ১৬২৩।
📄 আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা সম্পদই আসল সম্পদ
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কার কাছে নিজের সম্পদের চেয়ে উত্তরাধিকারীদের সম্পদ বেশি প্রিয়?' সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের মধ্যে তো এমন কেউ নেই, যার নিকট উত্তরাধিকারীদের মালের চেয়ে নিজের মাল প্রিয় নয়।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'নিজের মাল হলো যা আল্লাহর রাস্তায় পেশ করা হয় আর যা রেখে যাওয়া হয়, তা উত্তরাধিকারীদের মাল।'¹
'নিজের মাল হলো যা আল্লাহর রাস্তায় পেশ করা হয়'-অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে বিভিন্ন ভালো কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
'আর যা রেখে যাওয়া হয়, তা উত্তরাধিকারীদের মাল'- অর্থাৎ যে সম্পদ থেকে সাদাকা করা না হয়।
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে ইবাদত-বন্দেগি ও ভালো খাতে যথাসম্ভব ব্যয় করে কিছু সম্পদ আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। যেন ওই সম্পদ আখিরাতে কাজে আসে। কারণ, ওয়ারিশদের জন্য যা রেখে যাওয়া হয়, তা ওয়ারিশদের মালিকানায় চলে যায়। সুতরাং তার মাধ্যমে ওয়ারিশ যদি কোনো ভালো কাজ করে, তার সাওয়াব কেবল ওয়ারিশই পাবে। এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই হাদিস প্রমাণ করে ওয়ারিশদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার চেয়ে কল্যাণের কাজে ব্যয় করা উত্তম। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ (রা)-কে বলেছেন, "তুমি তোমার সন্তানসন্ততিদের বিত্তবান রেখে যাওয়া এর চাইতে উত্তম যে, তুমি তাদের নিঃস্ব রেখে যাবে আর তারা অন্যের নিকট হাতপেতে ভিক্ষা করবে।” তাই উভয় হাদিস পরস্পর বিরোধী মনে হচ্ছে। এর উত্তরে বলা হয়, হাদিসদ্বয় পরস্পর বিরোধী নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ (রা)-কে ওয়ারিশদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার নির্দেশ এ জন্য দিয়েছেন যে, তিনি অসুস্থতার সময় সমুদয় বা অধিকাংশ সম্পত্তি সাদাকা করে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। তাই তাকে এক-তৃতীয়াংশ সাদাকা করে বাকিটুকু ওয়ারিশদের জন্য রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর ইবনে মাসউদ (রা)-এর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সুস্থতার অবস্থায় উপদেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি কৃপণদের সতর্ক করেছেন, যারা ওয়ারিশদের জন্য অধিক সম্পদ রেখে যাওয়ার আশায় ভালো কাজে অর্থ ব্যয় করে না। এই হাদিসে সমুদয় সম্পত্তি সাদাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাই এটাকে সাদ (রা)-এর হাদিসের বিরোধী বলার কোনোই যৌক্তিকতা নেই। সাদ (রা)-এর হাদিস ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, যে অসুস্থতার সময় সমুদয় বা অধিকাংশ সম্পত্তি সাদাকা করে দিতে চায়। আর ইবনে মাসউদ (রা)-এর হাদিস ওই ব্যক্তির জন্য, যে সুস্থ অবস্থায় সাদাকা করে।'²
আব্দুল্লাহ বিন শিখখির (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। তখন তিনি সুরা আত-তাকাসুর পাঠ করছিলেন। তিনি বললেন:
'মানুষ বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ; অথচ হে মানুষ, তোমার সম্পদ তো এ ছাড়া কিছুই নয়: ১. যা তুমি খেয়ে নিঃশেষ করে দাও, ২. অথবা পরিধান করে পুরাতন করে ফেলো, ৩. অথবা সাদাকা করে জমা রাখো।'³
আবু হুরাইরা (রা) থেকে এরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাঁর হাদিসে অতিরিক্ত এসেছে-
'এ ছাড়া অবশিষ্ট মাল তার থেকে চলে যাবে এবং তা মানুষের জন্য ছেড়ে যাবে।'⁴
কবি বলেন:
'ওহে ধনসম্পদ জমাকারী ব্যক্তি, অচিরেই তোমার এই সম্পদ মেয়েদের স্বামী আর ছেলেদের বউদের হাতে চলে যাবে। আর তুমি একা পড়ে থাকবে কবরে। না থাকবে পরিবার, না থাকবে বন্ধুবান্ধব। তাই এতিম-মিসকিনদের দান করে কিছু সম্পদ নিজের জন্য জমা রাখো।'
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৬৪৪২।
২. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ১৯/২১৬।
৩. সহিহু মুসলিম: ২৯৫৮।
৪. সহিহু মুসলিম: ২৯৫৯।
📄 কেউ সমুদয় সম্পত্তি সাদাকা করতে চাইলে তা কবুল করতেন না
এ জন্য কাব বিন মালিক (রা) তার তাওবা কবুল হওয়ার পর যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, 'তাওবা কবুল হওয়ার খুশিতে আমি আমার সমুদয় সম্পত্তি আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদাকা করে দিতে চাই'-তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'কিছু সম্পদ নিজের কাছে রাখো, এটাই তোমার জন্য ভালো হবে।'¹
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম, এমন সময় এক ব্যক্তি ডিমসদৃশ একটি সোনার টুকরা নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। এসেই তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এটি খনি থেকে পেয়েছি। আপনি এটাকে সাদাকা হিসেবে গ্রহণ করুন। আর এটা ছাড়া আমার কোনো সম্পদ নেই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তখন লোকটি তাঁর ডান দিক থেকে এসে আগের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লোকটি তাঁর বাম দিক থেকে এসে কথাটি আবার বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবারেও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর লোকটি তাঁর পেছন দিক থেকে এসে পূর্বের কথাটি বললেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটি নিয়ে তার দিকে এমনভাবে ছুড়ে মারলেন যে, যদি সেটি তার গায়ে লাগত, তবে তিনি ব্যথা পেতেন অথবা তার শরীর ফেটে যেত। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমাদের কেউ নিজের যা কিছু আছে, সব নিয়ে এসে বলে, এগুলো সাদাকা; তারপর মানুষের কাছে হাত পাতে! (এটা ঠিক নয়, বরং) উত্তম সাদাকা হলো, যা নিজের ধনাঢ্যতা ধরে রেখে করা হয়।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৭৫৮, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৯।
২. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৭৩, মুসতাদরাকুল হাকিম: ১৫০৭।
📄 অনেকের কাছ থেকে সমুদয় সম্পত্তি গ্রহণ করতেন
অনেক সময় কারও নিকট থেকে তার তাওয়াক্কুল, দারিদ্র্যের ওপর সবর ও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকার গুণের কারণে সমুদয় সম্পত্তি গ্রহণ করতেন।
জাইদ বিন আসলাম (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, 'আমি উমর বিন খাত্তাব (রা)-কে বলতে শুনেছি, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাদাকা করার নির্দেশ দিলেন। তখন আমার যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ ছিল। তাই আমি বললাম, "কোনো দিন যদি (কল্যাণের কাজে) আবু বকর (রা)-এর চেয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আজই সেই দিন।” এরপর আমার সম্পদের অর্ধেক নিয়ে আসলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ?" আমি বললাম, "এগুলোর সমপরিমাণ রেখে এসেছি।"
তারপর আবু বকর (রা) তাঁর সমুদয় সম্পত্তি নিয়ে হাজির হলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আবু বকর, পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ?” তিনি বললেন, "তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রেখে এসেছি।” তখন আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, আবু বকরের (রা) চেয়ে এগিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আর কোনো দিন সম্ভব হবে না।"'¹
আবু বকর (রা) তাঁর সমুদয় সম্পত্তি দান করে দিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেননি। কেননা, তিনি আবু বকর (রা)-এর নিয়তের যথার্থতা ও মানসিক শক্তির ব্যাপারে অবগত ছিলেন। তাঁর ব্যাপারে অন্যদের মতো কোনো ধরনের ফিতনা ও ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল না।²
তাবারি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কেউ যদি এমন অবস্থায় তার সমুদয় সম্পত্তি সাদাকা করে যে, সে শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ সুস্থ, তার ওপর কোনো কর্জ নেই, তার দারিদ্র্যের কষ্টের ওপর সবর করার শক্তি আছে এবং তার কোনো পরিবার-পরিজন নেই অথবা থাকলেও তারাও তার মতো সবর করার শক্তি রাখে, তখন অধিকাংশ আলিমের মতে তা বৈধ হবে। তবে উল্লিখিত শর্তসমূহ থেকে কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে তা মাকরুহ হবে।'³
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৬৭৫, সুনানু আবি দাউদ: ১৬৭৮।
২. শারহু আবি দাউদ লিল আইনি: ৬/৪৩২।
৩. ফাতহুল বারি: ৩/২৫৯।