📄 দ্বীন ইসলামের সেবায় তাদের ভূমিকার সাক্ষ্য দিয়েছেন
গত পরিচ্ছেদে আমরা দরিদ্রদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণবিধি সম্পর্কে আলোকপাত করেছি। সেখানে আমরা উল্লেখ করেছি যে, কখনো কখনো তিনি তাদের খাবার খাওয়াতেন। কখনো তাদের নিজের ঘরে বসাতেন। কখনো তাদের সাদাকা দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। কখনো সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নিকট তাদের মেহমানদারি করার জন্য পেশ করতেন। কখনো তাদের জন্য দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ তাআলা তাদের অভাব দূর করে দেন এবং সচ্ছলতা দান করেন। কখনো তাদের সবর করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন এবং সান্ত্বনা দিতেন। তাদের বোঝাতেন যে, এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখিরাত চিরস্থায়ী। কখনো তাদের ক্ষুধার্ত থাকা ও দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্য ধরে থাকার ফজিলত স্মরণ করিয়ে দিতেন। কখনো তাদের কাজ করে টাকা-পয়সা উপার্জনের পন্থা বাতলিয়ে দিতেন। এ পরিচ্ছেদে ধনীদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণবিধি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। ধনী সম্প্রদায় হলো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়। সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবনযাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা অর্বাচীনদের হাতে তুলে দিয়ো না। বরং তা থেকে তাদের খাওয়াও, পরাও এবং তাদের সান্ত্বনার বাণী শোনাও।'¹
অর্থাৎ ধনসম্পদ দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য করার মাধ্যমে তাদের জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করো।²
আল্লাহ তাআলা আমাদের ধনসম্পদ দান করার মাধ্যমে বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন:
'হে আদম-সন্তান, আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবর্তীণ করেছি সাজসজ্জার বস্ত্র এবং পরহেজগারির পোশাক, এটি সর্বোত্তম।'³
'রিশ' তথা সাজসজ্জার বস্ত্র থেকে সকল আসবাবপত্র ও ধনসম্পদ উদ্দেশ্য।⁴
সুফইয়ান সাওরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমার কাছে দশ হাজার দিরহাম থাকা-কিয়ামতের দিন যেগুলোর হিসাব দিতে হবে- (দারিদ্র্যের কারণে) মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়ার চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।'⁵
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারীদের মধ্যে গরিব শ্রেণির লোক যেমন ছিলেন, ধনী শ্রেণির লোকও ছিলেন। সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মধ্যে বিশালসংখ্যক লোক ধনী ছিলেন। যেমন: আবু বকর (রা), আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা), উসমান বিন আফফান (রা), সাদ বিন রাবি (রা), আবু তালহা (রা) প্রমুখ। এই ধনী শ্রেণির লোকদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণবিধি কেমন ছিল, তা নিম্নে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
আবু দারদা (রা) বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবু বকর (রা) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে তার দুহাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের এ সাথি এই মাত্র কারও সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে।” তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার ও উমর বিন খাত্তাব (রা)-এর মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর আমি লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাজির হয়েছি।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবু বকর!” এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর উমর (রা) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবু বকর (রা)-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "আবু বকর (রা) কি বাড়িতে আছেন?" তারা বলল, "না।” তখন উমর (রা) নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চলে আসলেন। (তাকে দেখে) নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবু বকর (রা) ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি।” এ কথাটি তিনি দুবার বললেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আল্লাহ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূপে প্রেরণ করেছেন, তখন তোমরা সবাই বলেছ, "তুমি মিথ্যা বলছ” আর আবু বকর (রা) বলেছে, "আপনি সত্য বলছেন।” তাঁর জানমাল সবকিছু দিয়ে আমার প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেছে। তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথিকে অব্যাহতি দেবে?'
এ কথাটি তিনি দুবার বললেন। এরপর থেকে আবু বকর (রা)-কে আর কখনো কষ্ট দেওয়া হয়নি।⁶
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আবু বকরের (রা) সম্পদ দ্বারা যে উপকার আমার হয়েছে, তা অন্য কোনো সম্পদ দ্বারা হয়নি।'
তা শুনে আবু বকর (রা) কেঁদে দিলেন এবং বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি ও আমার ধনসম্পদ তো আপনারই।"⁷
তিনি বললেন যে, আমার ধনসম্পদ নয়; শুধু বরং আমিও আপনার। অবশ্য তাঁর এ কথায় আশ্চর্যের কিছুই নেই। কারণ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ ও হকদার। এটি আবু বকর (রা)-এর উন্নত চরিত্রের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছেন এবং নিজের জানমাল দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেছেন। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সামনেই তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং উম্মাহর সামনে দ্বীনের প্রতি তাঁর এ মহান অনুগ্রহের কথা স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন, 'আবু বকরের (রা) সম্পদ দ্বারা যে উপকার আমার হয়েছে, তা অন্য কোনো সম্পদ দ্বারা হয়নি।'
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) আদব ও বিনয়ের স্বরূপ।
উপকারীর উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও তার জন্য দোয়া করা উন্নত চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত।⁸
আব্দুর রহমান বিন সামুরা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গাজওয়ায়ে উসরার জন্য রসদ সংগ্রহ করছিলেন, তখন উসমান বিন আফফান (রা) তার কাপড়ে ভরে এক হাজার দিনার এনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোলে রাখলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো হাত দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলেন এবং বললেন:
'আজকের পর থেকে আফফানের বেটা যে কাজই করুক, সেটা তার জন্য ক্ষতিকর হবে না।' কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন।⁹
টিকাঃ
১. সুরা আন-নিসা, ৪: ৫।
২. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/২১৪।
৩. সুরা আল-আরাফ, ৭: ২৬।
৪. তাফসিরুত তাবারি: ১২/৩৬৪।
৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৮১।
৬. সহিহুল বুখারি: ৩৬৬১।
৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩৬৬১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৯৪।
৮. হাশিয়াতুস সিনদি আলা সুনানি ইবনি মাজাহ: ১/৮৫।
৯. সুনানুত তিরমিজি: ৩৭০১, মুসনাদু আহমাদ: ২০১০৭।
📄 নেক কাজে নিজের বিশেষ সম্পদ থেকে খরচ করতে ভালোবাসতেন
হিজরতের ঘটনায় আয়িশা (রা) বলেন, 'এমন দিন খুব কমই গিয়েছে, যেদিন সকালে বা বিকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমার পিতা) আবু বকর (রা)-এর ঘরে আসেননি। যখন তাঁকে (মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে) মদিনার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো, তিনি একদিন দুপুরের সময় আগমন করায় আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আবু বকর (রা)-কে এ সংবাদ জানানো হলে তিনি বলে উঠলেন, "নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কোনো ঘটনার কারণেই অসময়ে আগমন করেছেন।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করে আবু বকর (রা)-কে বললেন, "যারা তোমার কাছে আছে, তাদের সরিয়ে দাও।” আবু বকর (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এরা তো আমার দুই কন্যা আয়িশা (রা) ও আসমা (রা)।” তিনি বললেন, "তুমি কি জানো, আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে?” আবু বকর (রা) বললেন, "আপনার সফরসঙ্গী হওয়া আমার কাম্য ইয়া রাসুলাল্লাহ!” তিনি বললেন, "হাঁ, তুমি আমার সফরসঙ্গী হবে।” আবু বকর (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার কাছে দুটি উষ্ট্রি রয়েছে, যা আমি হিজরতের জন্য প্রস্তুত রেখেছি। এর একটি আপনি গ্রহণ করুন।” তিনি বললেন, "আমি মূল্যের বিনিময়ে তা গ্রহণ করলাম।"'¹
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত এসেছে: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি এমন উটে সাওয়াব হব না, যা আমার নয়।” আবু বকর (রা) বললেন, "তাহলে এটা আপনার।” তিনি বললেন, "এভাবে নয়, বরং তুমি যে মূল্য দিয়ে এটি ক্রয় করেছ, তার বিনিময়ে নেব।"'²
তাবারানির বর্ণনায় আসমা বিনতে আবু বকর (রা)-এর হাদিসে এসেছে: তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, 'তার মূল্যের বিনিময়ে নেব, হে আবু বকর (রা)।' আবু বকর (রা) বললেন, 'আপনি যখন চাইছেন, তখন মূল্যের বিনিময়েই নিন।'³
ফায়দা: এক আলিমকে প্রশ্ন করা হলো, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটি কেন গ্রহণ করেননি, অথচ এর পূর্বে আবু বকর (রা) মূল্য পরিশোধ করা ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য (দ্বীনের জন্য) আরও বড় অঙ্কের টাকা খরচ করেছেন?' তিনি উত্তর দিলেন: 'এটি এ জন্য যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত ও জিহাদের পূর্ণাঙ্গ ফজিলত পাওয়ার জন্য নিজের জান ও মাল উভয়টি ব্যয় করার ইচ্ছা করেছেন।'⁴
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২১৩৮।
২. সিরাতু ইবনি হিশাম ৩/১৩, ফাতহুল বারি: ৭/২৩৫।
৩. ফাতহুল বারি: ৭/২৩৫।
৪. আর-রাওজুল উনফ: ৪/১৩১।
📄 ধনীদের সাদাকার উপযুক্ত খাত দেখিয়ে দিতেন
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেজুর বাগান ছিল আবু তালহা (রা)-এর। তার প্রিয় বাগান ছিল 'বাইরুহা'। বাগানটি মসজিদের সামনে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে প্রবেশ করতেন এবং সেখান থেকে ভালো পানি পান করতেন।'
আনাস (রা) বলেন, 'যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো, "কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না করো।” (সুরা আলি ইমরান, ৩ ৯২), তখন আবু তালহা (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ বলছেন, "কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না করো।” আর বাইরুহা বাগানটি আমার সবচেয়ে প্রিয়। এটি আল্লাহর নামে সাদাকা করে দিলাম, আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়স্বরূপ থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভালো মনে করেন, তাকে দান করুন।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বাহ, এ সম্পদ অনেক লাভজনক, এ সম্পদ অনেক লাভজনক! তুমি যা বলেছ, তা আমি শুনলাম। তবে আমার মতে এ বাগান তোমার আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে দেওয়া সবচেয়ে উত্তম হবে।” তখন আবু তালহা (রা) বললেন, "তা-ই করব ইয়া রাসুলাল্লাহ!” অতঃপর আবু তালহা (রা) বাগানটি তাঁর নিকটাত্মীয় ও চাচার বংশধরদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন। তাদের মধ্যে হাসসান (রা) ও উবাই বিন কাব (রা)-ও ছিলেন।'¹
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদাকার উপযুক্ত খাত তাদের দেখিয়ে দিতেন।
হাদিসের ফায়দাসমূহ:
প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করা মুসতাহাব।
সাদাকার খাত ও ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞানী ও বুজুর্গদের সাথে পরামর্শ করা।
অনাত্মীয়দের দান করার চেয়ে আত্মীয়-স্বজনদের দান করা উত্তম, যদি আত্মীয়-স্বজন অভাবগ্রস্ত হয়।
কয়েক পুরুষ ওপরে গিয়ে বংশ একত্রিত হওয়া আত্মীয়-স্বজনদের সাথেও আত্মীয়তা-সম্পর্ক রাখতে হয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবু তালহা (রা)-কে আত্মীয়দের সাদাকা করার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি উবাই বিন কাব (রা) ও হাসসান বিন সাবিত (রা)-কেও সাদাকার অংশ দান করলেন। অথচ সাত পুরুষ ওপরে গিয়ে তার বংশ তাদের বংশের সাথে একীভূত হয়।
বাগান নির্মাণ করা, আলিমদের তাতে প্রবেশ করা, তার ফল খাওয়া এবং সেখানে ঘোরাফেরা করা ইত্যাদি বিষয় অনেক সময় মুসতাহাব হয় এবং এতে সাওয়াব দেওয়া হয়। তবে শর্ত হলো এসবের উদ্দেশ্য হতে হবে ইবাদতের ক্লান্তি ঘুচিয়ে পরবর্তী ইবাদতের জন্য নিজেকে চাঙা করে নেওয়া।
বন্ধু বাড়িতে না থাকলেও তার বাড়ি থেকে পানি পান করা জায়িজ, যদি জানা থাকে যে, বন্ধু এতে আপত্তি করবে না।
আবু তালহা (রা)-এর ফজিলত। কারণ যখনই প্রিয় বস্তু থেকে দান করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আয়াত নাজিল হলো, তখনই তিনি তার সর্বাধিক প্রিয় বস্তুটি দান করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করলেন, 'বাহ' শব্দ উচ্চারণ করে তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। অতঃপর উপযুক্ত স্থানে তা ব্যয় করার নির্দেশ দিলেন।
ইবাদতের জন্য শরীর-মন চাঙা করলে সাওয়াব অর্জিত হয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীনদার ধনীদের বাগানে গিয়ে গাছের ছায়ার পরশ নিতেন, বেড়াতেন এবং ফলমূল খেতেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আত্মীয়-স্বজনদের দান করা অন্যদের দান করার চেয়ে তখনই উত্তম, যখন আত্মীয়-স্বজন অভাবগ্রস্ত হয়। অনেক মানুষ জাকাত দেওয়ার মাধ্যমে আত্মীয়দের প্রতি সৌজন্য প্রকাশ করতে চায়। যেমন: জাকাতদাতার একজন মধ্যবিত্ত আত্মীয় আছে। তার কাছে যা আছে, তা দিয়েই তার মোটামুটি চলে। আরেকজন খুব নিঃস্ব ব্যক্তি আছে, কিন্তু জাকাতদাতার সাথে তার আত্মীয়তা নেই। তখন জাকাতদাতা এই নিঃস্ব লোকটাকে দান না করে ওই আত্মীয়কে দান করে। এটা নাজায়িজ। কারণ এটা স্বজনপ্রীতির অন্তর্ভুক্ত, যা জাকাতের ক্ষেত্রে জায়িজ নেই। তবে হাঁ, যখন আত্মীয় ও অনাত্মীয় উভয়জন অভাবী হয়, তখন আত্মীয় অগ্রাধিকার পাবে। যাতে একসাথে সাদাকা ও আত্মীয়তা রক্ষা করার সাওয়াব অর্জিত হয়।
সালমান বিন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'মিসকিনকে সাদাকা দিলে সাদাকার (একটি) সাওয়াব হয়। আত্মীয়কে সাদাকা দিলে দুটি সাওয়াব হয়: সাদাকা ও আত্মীয়তা রক্ষা করার সাওয়াব।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৪৬১, সহিহু মুসলিম: ৯৯৮।
২. সুনানুত তিরমিজি: ৬৮৫, সুনানুন নাসায়ি: ২৫৮২।
📄 সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ সাদাকা করার পরামর্শ দিতেন
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) বলেন, 'বিদায় হজের বছর আমি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে আসলেন। তখন আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার রোগ কী পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আর আমি একজন বিত্তবান লোক, কিন্তু আমার উত্তরাধিকারী হচ্ছে একটিমাত্র কন্যা। তাই আমি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ কি আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করে দেবো?” তিনি বললেন "না।” আমি বললাম, "তবে কি অর্ধেক?" তিনি বললেন:
'হে সাদ, এক-তৃতীয়াংশ দান করো। এক-তৃতীয়াংশই অনেক বেশি। সন্তানসন্ততিদের বিত্তবান অবস্থায় রেখে যাওয়া নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম-যে নিঃস্বতার কারণে তারা অন্যের নিকট হাতপেতে ভিক্ষা করবে। তা ছাড়া তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা-ই ব্যয় করো, আল্লাহ তাঁর প্রতিদান দান করেন। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লুকমাটি তুলে দাও, এর প্রতিদানও আল্লাহ তোমাকে দান করেন।'
আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি কি আমার সঙ্গী-সাথিদের থেকে পেছনে থেকে যাব (অর্থাৎ মক্কায় আমার মৃত্যু হয়ে যাবে)?"¹ তিনি বললেন:
'তুমি কখনোই পশ্চাতে থাকবে না (মক্কায় মৃত্যুবরণ করবে না) ফলে বাকি সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তুমি যেসব নেক আমল করবে, এর বিনিময়ে তোমার সম্মান ও মর্যাদা আরও বেড়ে যাবে। সম্ভবত, তুমি আরও হায়াত পাবে এবং এর ফলে তোমার দ্বারা অনেক মানুষ উপকৃত হবে (তুমি যুদ্ধ করে গনিমতপ্রাপ্ত হবে আর তা দ্বারা মুসলমানরা উপকৃত হবে) এবং অনেক মানুষ (কাফিররা তোমার হাতে মার খেয়ে) ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহ, আমার সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) হিজরতকে অক্ষুণ্ণ রাখুন। তাদের পশ্চাৎমুখী করে ফিরিয়ে নেবেন না (মক্কায় মৃত্যু দান করবেন না)। কিন্তু বেচারা সাদ বিন খাওলা (রা) (তার মৃত্যু মক্কায় হয়ে গিয়েছে)!'
জুহরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'শেষের কথাটি বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন খাওলা (রা) মক্কায় মৃত্যুবরণ করার ওপর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।'²
ফায়দা:
রোগী দেখতে যাওয়া সমাজের নেতা ও সাধারণ মানুষ সবার জন্য মুসতাহাব।
চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শের জন্য, দোয়া চাওয়ার জন্য অথবা অসিয়ত ইত্যাদি সম্পর্কে পরামর্শ করার উদ্দেশ্যে অসুস্থ ব্যক্তি তার কষ্টের কথা ব্যক্ত করতে পারবে। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার জন্য কষ্টের কথা ব্যক্ত করা জায়িজ নেই। এতে রোগের প্রতিদান নষ্ট হয়ে যায়।
ওয়ারিশ থাকলে এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করা হারাম। এ সম্পর্কে সকল আলিম একমত।
এই হাদিসে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা, আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ করা এবং ওয়ারিশদের প্রতি মায়া-মমতা রাখার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা ও অনুগ্রহ করার ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় প্রাধান্য পাবে দূরতম আত্মীয়ের ওপর।
যেকোনো ভালো কাজে সম্পদ ব্যয় করা মুসতাহাব।
আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
কোনো বৈধ কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করলে সেটা ইবাদত হয়ে যায় এবং তার ওপর সাওয়াব দেওয়া হয়। যেমন: ইবাদতের জন্য শক্তি অর্জনের নিয়তে পানাহার করা, প্রশান্ত মনে ইবাদত করতে পারার উদ্দেশ্যে ঘুমানো, নিজেকে ও নিজের দৃষ্টিকে গুনাহ থেকে বাঁচানোর জন্য স্ত্রী-সহবাস করা, অনুরূপভাবে স্ত্রীর হক আদায়ের উদ্দেশ্যে এবং নেককার সন্তান লাভের আশায় স্ত্রী-সহবাস করা ইত্যাদি বিষয় নিয়তের কারণে ইবাদতে পরিণত হয়।
দীর্ঘজীবী হওয়া সৌভাগ্যের কারণ। কেননা, তার দ্বারা অধিক নেক আমল করার সুযোগ হয়।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করলে সাওয়াব পাওয়া যায়।
আমল করার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত করার প্রতি উৎসাহ।³
টিকাঃ
১. প্রশ্নটি তিনি এ জন্য করলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) যে মক্কা থেকে আল্লাহর জন্য হিজরত করেছেন, সেখানে মৃত্যুবরণ করা অপছন্দ করতেন। (ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/৭৮।)
২. সহিহুল বুখারি: ৩৯৩৬, সহিহু মুসলিম: ১৬২৮।
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/৭৬।