📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 পরস্পরের আর্থিক বিষয়টি দেখাশোনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন

📄 পরস্পরের আর্থিক বিষয়টি দেখাশোনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন


আবু মুসা আশআরি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা মদিনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনদের খাবার কম হয়ে যায়, তখন তারা তাদের যা কিছু সম্বল থাকে, তা একটা কাপড়ে জমা করে। তারপর একটা পাত্র দিয়ে মেপে তা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। কাজেই তারা আমার এবং আমি তাদের।'¹
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
আশআরি গোত্রের ফজিলত।
পরস্পর সহানুভূতি ও সহমর্মিতার ফজিলত। সফরের সময় সবার আসবাব-পাথেয় একত্রে রাখার ফজিলত। শহরের মধ্যে টাকা-পয়সা কমে গেলে যার যা আছে, সবগুলো এক জায়গায় জমা করে সমানভাগে ভাগ করে নেওয়ার ফজিলত।²
বর্তমান সময়ে 'সাহায্য তহবিল' নামে বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারের লোকেরা এক ধরনের ফান্ড গঠন করে। সেখানে প্রত্যেক সদস্য নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা জমা করে। অতঃপর সব টাকা অভাবগ্রস্তদের জন্য ব্যয় করা হয়। এ ধরনের 'সাহায্য তহবিল' আশআরিদের কর্মের সাথে পুরোপুরি বা আংশিক মিলে যায়।
একটি সতর্কতা: অধিকাংশ মুসলিম দেশে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের অধীনে 'সাহায্য তহবিল' পরিচালিত হয়। এসব তহবিলের টাকা সুদভিত্তিক ব্যাংকে জমা রাখা হয় এবং ব্যাংক থেকে যে সুদ পাওয়া যায়, তা গরিবদের জন্য ব্যয় করা হয়। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এই গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এতে আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী তাদের ব্যাপারে প্রমাণিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
'বলুন, আমি কি তোমাদের সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সেসব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করেছে।'³
কবির ভাষায়:
'হারাম সম্পদ দ্বারা মসজিদ নির্মাণ করলে আল্লাহর প্রশংসা পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তার তুলনা ওই বেশ্যার সাথে হবে, যে ব্যভিচার করে বিনিময় নেয় এবং তা দিয়ে এতিমদের খাওয়ায়। তোমার জন্য ধ্বংস! তোমার ব্যভিচার করারও দরকার নেই, সাদাকা করারও দরকার নেই।'

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৪৮৬, সহিহু মুসলিম ২৫০০।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/৬২।
৩. সুরা আল-কাহফ, ১৮: ১০৩-১০৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দারিদ্র্যের মাঝেও সুন্দরভাবে বাঁচার শিক্ষা দিতেন

📄 দারিদ্র্যের মাঝেও সুন্দরভাবে বাঁচার শিক্ষা দিতেন


আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
'যে ব্যক্তি রিজিকের প্রশস্ততা ও আয়ু বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা করে, সে যেন আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে।'¹
ফায়দা: শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হলো, 'রিজিক হ্রাস-বৃদ্ধি হয় কি না? আর রিজিক কি শুধু খাদ্যকে বোঝায়, না বান্দার মালিকানাধীন সবকিছুকে বোঝায়?' তিনি উত্তর দিলেন, 'রিজিক দুই প্রকার: ১. যা শুধু আল্লাহর ইলমে আছে যে, তিনি বান্দাকে দান করবেন। এ রিজিক পরিবর্তিত হয় না। ২. যা লিপিবদ্ধ করেছেন এবং ফেরেশতাগণকে তা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এই রিজিক উপার্জনের মাধ্যমভেদে কমে কিংবা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যে রিজিক ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার জন্য লিপিবদ্ধ করেন, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার কারণে সে রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যেসব মাধ্যম দ্বারা রিজিক অর্জিত হয়, তাও আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে দেন এবং লিপিবদ্ধ করে রাখেন। যার জন্য তিনি নির্ধারিত করেন যে, সে চেষ্টা ও কামাইয়ের মাধ্যমে রিজিক অর্জন করবে, তার মাঝে চেষ্টা ও কামাই করার বোধ সৃষ্টি করে দেন। যে পরিমাণ রিজিক কামাই করার শর্তে নির্ধারণ করে রাখেন, তা কামাই করা ব্যতীত অর্জিত হবে না। আর যে পরিমাণ রিজিক কামাইবিহীন নির্ধারণ করেছেন, যেমন: উত্তরাধিকার, তা কামাই করা ব্যতীত অর্জিত হয়। রিজিক অর্জনের চেষ্টা দুই প্রকার: ১. রিজিক উপার্জনের জন্য নির্ধারিত বিষয়ের মাধ্যমে চেষ্টা করা। যেমন: কারিগরি, কৃষি ও ব্যবসার মাধ্যমে চেষ্টা করা। ২. দোয়া, তাওয়াক্কুল, মাখলুকের প্রতি অনুগ্রহ ইত্যাদির মাধ্যমে চেষ্টা করা। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্য-সহযোগিতা করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার সাহায্য-সহযোগিতা করেন।'²
গুনাহ পরিত্যাগ করা:
সাওবান (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'গুনাহের কারণে মানুষ রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।'³
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেন, 'একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এলেন এবং বললেন, "হে মুহাজিরগণ, তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। যখন কোনো জাতি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করে, তখন তাদের ওপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, কঠিন বিপদ-মুসিবত। আর যখন জাকাত আদায় করে না, তখন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি ভূপৃষ্ঠে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকত, তাহলে আর কখনো বৃষ্টিপাত হতো না। যখন কোনো জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের ওপর তাদের বিজাতীয় দুশমনকে ক্ষমতাসীন করেন এবং সে তাদের সহায়-সম্পদ সবকিছু কেড়ে নেয়। যখন তোমাদের শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব মোতাবেক মীমাংসা করে না এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে গ্রহণ করে না, তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেন।'⁴
ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'যে ব্যক্তি সুদের মাধ্যমে সম্পদ বাড়িয়েছে, পরিণামে তার সম্পদ অবশ্যই কমে যাবে।'⁵
একসাথে হজ ও উমরা করা:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'একসাথে হজ ও উমরা আদায় করো। কারণ, হজ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহার মরিচা দূর করে দেয়।'⁶
ভিক্ষা পরিত্যাগ করা:
আবু কাবশা আনমারি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন:
'আমি তিনটি জিনিসের ব্যাপারে শপথ করছি:
১. কোনো বান্দার মাল সাদাকা করলে কমে যায় না।
২. কোনো বান্দার ওপর কোনো প্রকার অত্যাচার করা হলে এবং সে তার ওপর ধৈর্যধারণ করলে আল্লাহ নিশ্চয় তার সম্মান বাড়িয়ে দেন।
৩. কোনো বান্দা যাচনার দুয়ার খুললে আল্লাহ তার জন্য দারিদ্র্যের দরোজা খুলে দেন।'⁷
রিজিক অন্বেষণে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা:
উমর বিন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভরশীল হতে, তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয়, সেভাবে তোমাদেরকেও রিজিক দেওয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলায় ভরা পেটে ফিরে আসে।'⁸
'তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভরশীল হতে'-অর্থাৎ যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে যে, আল্লাহই একমাত্র রিজিকদাতা এবং তিনি ব্যতীত দান করার ও বাধা দেওয়ার শক্তি কারও নেই। অতঃপর এই বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে উত্তম উপায়ে রিজিক অন্বেষণ করতে, তখন...⁹

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২০৬৭, ৫৯৮৫; সহিহু মুসলিম: ২৫৫৭।
২. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৮/৫৪০-৫৪১।
৩. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০২২।
৪. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০১৯।
৫. সুনানু ইবni মাজাহ: ২২৭৯।
৬. সুনানুন নাসায়ি: ২৬৩০।
৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৩২৫।
৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৪, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৬৪।
৯. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ঈমানের ব্যাপারে দারিদ্র্যের চেয়ে ধনবত্তাকে বেশি ভয় করতেন

📄 ঈমানের ব্যাপারে দারিদ্র্যের চেয়ে ধনবত্তাকে বেশি ভয় করতেন


আমর বিন আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রা)-কে জিজিয়া আনার জন্য বাহরাইন পাঠান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহরাইনবাসীদের সাথে সন্ধি করে আলা বিন হাজরামি (রা)-কে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। আবু উবাইদা (রা) বাহরাইন থেকে মাল নিয়ে এসে পৌঁছালে, আনসারগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তার আগমনের সংবাদ জানতে পেরে সকলেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ফজরের নামাজ আদায় করার উদ্দেশ্যে উপস্থিত হলেন। নামাজের পর ফিরে বসলে তারা সকলেই তাঁর সামনে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে মুচকি হেসে বললেন, "আমার মনে হয়, তোমরা শুনতে পেয়েছ যে, আবু উবাইদা (রা) কিছু মাল নিয়ে এসেছে?” তারা সকলেই বললেন, "হাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ!” তিনি বললেন:
'সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তোমাদের আনন্দদায়ক বিষয়ের আশায় থাকো, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না। বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য এসে যাবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে এসেছিল, তখন তোমরা তা লাভ করার জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতা করবে-যেমনভাবে তারা করেছিল। আর এ ধনসম্পদ তাদের যেমনিভাবে ধ্বংস করেছিল, তোমাদেরকেও তেমনিভাবে ধ্বংস করে দেবে।'¹
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার চাকচিক্য ও প্রাচুর্য যার অর্জিত হয়েছে, সে যেন তার মন্দ পরিণাম ও ভয়ংকর ফিতনার ব্যাপারে সতর্ক থাকে। দুনিয়ার চাকচিক্য ও প্রাচুর্য নিয়ে নিশ্চিন্ত ও বেপরোয়া হয়ে না পড়ে এবং তা অর্জনের জন্য অন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে।'²
আবু দারদা (রা) বলেন, 'একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসেন, তখন আমরা দারিদ্র্য সম্পর্কে আলাপরত ছিলাম এবং আমরা সে বিষয়ে শঙ্কিত ছিলাম। তিনি বললেন:
'তোমরা দারিদ্র্যকে ভয় করছ? সেই সত্তার শপথ-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই তোমাদের ওপর পৃথিবী প্রবল বেগে প্রবাহিত হবে (প্রভাব বিস্তার করবে), এমনকি পৃথিবী তোমাদের অন্তর কেবল তার দিকেই আকৃষ্ট করে ফেলবে। আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের পরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছেড়ে গেলাম, যার রাত ও দিন ঔজ্জ্বল্যে পরস্পর সমান।'³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪০১৫, সহিহুল মুসলিম: ২৯৬১।
২. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ১০/১৫৫।
৩. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00