📄 ভিক্ষা করতে নিষেধ করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যে ব্যক্তি (অভাবের তাড়না ছাড়া) নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য মানুষের কাছে সম্পদ ভিক্ষা করে বেড়ায়, বস্তুত সে আগুনের অঙ্গার ভিক্ষা করে। কাজেই এখন তার ভেবে দেখা উচিত সে বেশি নেবে, না কম নেবে।'¹
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সেই সত্তার কসম-যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মধ্যে কারও রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে করে বয়ে আনা, কোনো লোকের কাছে গিয়ে হাতপাতার চাইতে অনেক ভালো, চাই সে দিক বা না দিক।'²
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১০৪১।
২. সহিহুল বুখারি: ১৪৭০, সহিহু মুসলিম: ১০৪২।
📄 বিভিন্ন সম্মানজনক পেশা দেখিয়ে দিতেন
কৃষিকাজ:
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'যেকোনো মুসলিম কোনো (ফলবান) গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তা তার পক্ষ থেকে সাদাকা বলে গণ্য হবে।'¹
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে গাছ রোপণ করা ও শস্যখেত করার ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। আর রোপণকারীর সাওয়াব ততদিন পর্যন্ত জারি থাকবে, যতদিন পর্যন্ত গাছ ও শস্য থাকবে। এ ছাড়াও কিয়ামত পর্যন্ত যতদিন এই গাছ ও খেতের বীজ থেকে অন্য গাছ ও ফসল উৎপন্ন হতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত রোপণকারীর প্রতি সাওয়াব পৌঁছতে থাকবে।'²
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
'যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়া শুরু করে আর তোমাদের কারও হাতে একটি খেজুরের চারা থাকে। তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই যদি সেটা রোপণ করা সম্ভব হয়, তখন সে যেন তা-ই করে (চারা রোপণ করে)।'³
কারিগরি:
মিকদাম (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'হাতের কাজের মাধ্যমে উপার্জিত জীবিকার খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।'⁴
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, তিনি জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতি হিসেবে একমাত্র হাতের কাজকেই বেছে নিয়েছিলেন, অথচ সেটার প্রয়োজন তাঁর ছিল না। কারণ, পবিত্র কুরআনের আয়াত অনুযায়ী তিনি জমিনের বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি জীবিকা নির্বাহের সর্বোত্তম পদ্ধতিটাই বেছে নিয়েছিলেন। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা সর্বোত্তম হওয়ার ব্যাপারে তাঁকেই দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।'⁵
ব্যবসা-বাণিজ্য:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।'⁶
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'উকাজ, মাজান্না ও জুল মাজাজ জাহিলি যুগের বাজার ছিল। (ইসলামি যুগে) মুসলমানরা হজের মৌসুমে সেখানে ব্যবসা করাকে গুনাহ মনে করতে লাগল। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করলেন:
'(হজের মৌসুমে) তোমাদের ওপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোনো পাপ নেই।' (সুরা আল-বাকারা: ১৯৭)⁷
বিশেষ দ্রষ্টব্য : (হজের মৌসুমে) অংশটি ইবনে আব্বাস (রা)-এর কিরাত। এটি শাজ (বিচ্ছিন্ন) কিরাত। তাই ইমামগণ এটাকে তাফসিরের হুকুমে রেখেছেন।⁸
উরওয়া আল-বারিকি (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি দিনার দিয়ে একটি ছাগল কিনতে পাঠালেন। তিনি তা দিয়ে দুটি ছাগল কিনলেন। অতঃপর একটি ছাগল এক দিনার দিয়ে বিক্রি করে দিলেন এবং বাকি এক দিনার ও অপর ছাগলটি নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বেচাকেনায় বরকতের দোয়া করলেন-"আল্লাহ তাআলা তোমার হাতের লেনদেনের মধ্যে বরকত দান করুন।" এরপর থেকে তিনি মাটি কিনলেও তাতে লাভবান হতেন।'⁹
নবিগণ (আলাইহিমুস সালাম) বিভিন্ন কাজ-পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ছাগল চরানো।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'আল্লাহ তাআলা যত নবিই পাঠিয়েছেন, প্রত্যেকে ছাগল চরিয়েছেন।'
সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, 'আপনিও চরিয়েছেন?' তিনি বললেন:
'হাঁ, আমি ছাগলপ্রতি এক কিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।'¹⁰
তন্মধ্যে আরেকটি পেশা হলো কামারের পেশা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
'আমি দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম এই আদেশ মর্মে যে, হে পর্বতমালা, তোমরা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং হে পক্ষীসকল, তোমরাও। আমি তাঁর জন্য লৌহকে নরম করে ছিলাম। এবং তাঁকে আমি বলেছিলাম, প্রশস্ত বর্ম তৈরি করো, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করো এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো। তোমরা যা কিছু করো, আমি তা দেখি।'¹¹
আরেকটি পেশা হলো ছুতারগিরি বা কাঠমিস্ত্রির কাজ।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'জাকারিয়া (আলাইহিস সালাম) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন।'¹²
এই হাদিস থেকে যেসব বিষয় প্রতীয়মান হয়:
কারিগরি পেশাসমূহের বৈধতা।
ছুতারগিরি মনুষ্যত্বকে নিচু করে না; বরং এটি একটি সম্মানজনক পেশা।
জাকারিয়া (আলাইহিস সালাম)-এর ফজিলত। কারণ, তিনি হাতের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন।¹³
এভাবে নবিগণের (আলাইহিমুস সালাম) ওয়ারিশ আল্লাহওয়ালা উলামায়ে কিরামও বিভিন্ন কাজ ও পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ফলে অনেক আলিম নিজ নিজ পেশার নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। যেমন: বাজ্জাজ (বস্ত্র প্রস্তুতকারী বা বস্ত্র ব্যবসায়ী), জাস্সাস (চুন-কামকারী, প্লাস্টারকারী), খাওয়াস (খেজুরপাতা বিক্রেতা), জাজ্জার (কসাই), জাজ্জাজ (কাচ প্রস্তুতকারী বা কাচ ব্যবসায়ী), হাদ্দাদ (কামার), হাজ্জা' (জুতো প্রস্তুতকারী, মুচি) ইত্যাদি।
কর্মক্ষম ব্যক্তি কাজ না করে বসে থাকা খুবই নিন্দনীয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সাদাকা থেকে অলস ও নিষ্কর্মা ব্যক্তিদের জন্য কোনো অংশ রাখেননি। যেন কর্মক্ষম ব্যক্তিরা কাজ ও বৈধ উপার্জনের প্রতি ধাবিত হয়। তিনি ইরশাদ করেন:
'ধনী, কর্মক্ষম ও সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য সাদাকা হালাল নয়।'¹⁴
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'আমি যখন কোনো ব্যক্তিকে দুনিয়া ও আখিরাতের কাজ থেকে বিরত দেখি, তখন তার প্রতি খুব রাগান্বিত হই।'¹⁵
সুফইয়ান সাওরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বীরপুরুষদের মতো কাজ করো। অর্থাৎ হালাল উপার্জন করে পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করো।'¹⁶
আরবি প্রবাদ আছে, 'একটি কূপ খনন করো, আরেকটি কূপ ভরো; তবুও কোনো শ্রমিককে বেকার থাকতে দিয়ো না।'¹⁷ এর ব্যাখ্যা হলো, কোনো যুবককে কর্মহীন রেখো না। তাদের কাজে অভ্যস্ত করে তোলো। যেন বসে বসে খাবার খাওয়ার কুঅভ্যাস তাদের মাঝে না আসে। এমনকি প্রয়োজনীয় কোনো কাজ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয় কাজ করিয়ে তাদের কর্মস্পৃহা ও সামর্থ্যকে জিইয়ে রাখতে হবে। কারণ, কাজটি অপ্রয়োজনীয় হলেও তাদের কাজ ও মেহনতে লিপ্ত থাকা এবং অকর্মণ্য না হওয়া কিন্তু মোটেই অপ্রয়োজনীয় বিষয় নয়।
কবি বলেন:
'উচ্চ মর্যাদা যদি অর্জন করতে চাও, তাহলে ঘুম পরিত্যাগ করো। নিরলস কাজ করতে করতে সকালকে সন্ধ্যার সাথে মিলিয়ে ফেলো। জ্ঞানী ও দার্শনিকদের স্তরে উন্নীত হতে চাইলে পৃথিবীর সকল প্রান্তে ঘুরে বেড়াও। যে মানুষ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়, সে সবার পেছনে পড়ে থাকে। এই ভূপৃষ্ঠ ও তার ওপরে শূন্যলোক যেন একটি বই। তা পাঠ করো হে মেধাবী সম্প্রদায়!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে প্রকৃত মিসকিনের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন:
'সেই ব্যক্তি মিসকিন নয়, যে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং এক-দুই লুকমা খাবার কিংবা দু-একটি খেজুর নিয়ে ফিরে যায়।'
তারা বললেন, 'তাহলে মিসকিন কে, ইয়া রাসুলাল্লাহ?' তিনি বললেন:
'যার কাছে পর্যাপ্ত ধনসম্পদ নেই, যা তাকে অমুখাপেক্ষী রাখবে। কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারে না বিধায় তাকে সাদাকা দেয় না। আর সে মানুষের কাছে ভিক্ষাও করে না।'¹⁸
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৩২০, সহিহু মুসলিম: ১৫৫৩।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/২১৩।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৬৯।
৪. সহিহুল বুখারি: ২০৭২।
৫. ফাতহুল বারি: ৪/৩০৬।
৬. সুরা আন-নিসা, ৪: ২৯।
৭. সহিহুল বুখারি: ৪৫১৯।
৮. ফাতহুল বারি: ৩/৫৯৫।
৯. সহিহুল বুখারি: ৩৬৪৩, সুনানুত তিরমিজি: ১২৫৮।
১০. সহিহুল বুখারি: ২২৬২।
১১. সুরা সাবা, ৩৪: ১০-১১।
১২. সহিহু মুসলিম: ২৩৭৯।
১৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৩৫।
১৪. সুনানুত তিরমিজি: ৬৫২, সুনানু আবি দাউদ: ১৬৩৪।
১৫. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা ৩৪৫৬২।
১৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৮১।
১৭. মাজমাউল আমসাল: ১/২৩০।
১৮. সহিহুল বুখারি: ১৪৭৬, সহিহু মুসলিম: ১০৩৯ (আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত)
📄 ভিক্ষুকের অস্ত্রশস্ত্র হলেও দান করার নির্দেশ দিতেন
ভিক্ষাবৃত্তি অপছন্দ করলেও ভিক্ষুকদের সামান্য হলেও দান করতে বলতেন। কারণ, মানুষের সম্পদে ভিক্ষুকদের হক রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
'এবং তাদের ধনসম্পদে রয়েছে প্রার্থী (ভিক্ষুক) ও বঞ্চিতের হক।'¹
অন্যত্র বলেন:
'এবং যাদের ধনসম্পদে নির্ধারিত হক আছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের।'²
সাদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এবং তাদের ধনসম্পদে হক রয়েছে'- অর্থাৎ মুসতাহাব ও ওয়াজিব হক রয়েছে ওই সব অভাবীর জন্য, যারা মানুষের কাছে ভিক্ষা করে এবং তাদের হকও রয়েছে, যারা মানুষের কাছে ভিক্ষা করে না।³
এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দান করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। যদিও তা সামান্য পরিমাণ হোক।
আব্দুর রহমান বিন বুজাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) তার দাদি উম্মে বুজাইদ (রা) (তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বাইআত গ্রহণকারী সৌভাগ্যবতী মহিলাদের অন্যতম) থেকে বর্ণনা করেন যে, 'তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার দরোজায় মিসকিন আসে, কিন্তু তাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছু থাকে না।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যদি তাকে দেওয়ার জন্য (পশুর) একটি পোড়া খুরও তোমার কাছে থাকে, তাহলে সেটাই তার হাতে তুলে দিয়ো।'⁴
পোড়া খুরের কথা উল্লেখ করে সামান্য পরিমাণ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ভিক্ষুককে খালি হাতে ফিরিয়ে না দিয়ে সামান্য পরিমাণ যা আছে, তা-ই দিয়ে বিদায় করা উচিত। তা পোড়া খুরের মতো নিম্নমানের বস্তুই হোক না কেন?⁵
অপর রিওয়ায়াতে আমর বিন মুআজ আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, 'তাদের দরোজায় একজন ভিক্ষুক আসলেন। তখন তার দাদি বললেন, "ওকে খেজুর খাওয়াও।” বাড়ির লোকেরা বলল, "আমাদের কাছে খেজুর নেই।” তিনি বললেন, "তাহলে ছাতু পান করাও।” তারা বললেন, "আশ্চর্য, আমাদের কাছে যা নেই, তা তাকে কী করে খাওয়াব!" দাদি বললেন, "(আমি কিছু না কিছু এ জন্য দিতে বলছি যে,) আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
'ভিক্ষুককে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না; অন্তত পোড়া খুর হলেও তাকে দিয়ো।'⁶
টিকাঃ
১. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ১৯।
২. সুরা আল-মাআরিজ, ৭০: ২৪-২৫।
৩. তাফসিরুস সাদি: ১/৮০৮।
৪. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৬৭, সুনানুত তিরমিজি: ৬৬৫।
৫. তুফফাতুল আহওয়াজি: ৩/২৬৮।
৬. মুসনাদু আহমাদ: ২৬৬০৭।
📄 গরিবদের শান্তি করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন
আবু বারজা আসলামি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আনসারদের কাছে কোনো বিবাহযোগ্য কন্যা থাকলে তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিয়ে দিতেন না, যতক্ষণ না তারা জেনে নিতেন যে, তার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রয়োজন আছে কি না। তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক আনসারি লোককে বললেন, "তোমার মেয়েকে আমার কাছে বিয়ে দাও।” তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, তা তো আমার জন্য খুবই সৌভাগ্য ও সম্মানের বিষয় হবে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি নিজের জন্য তাকে চাইছি না।” তিনি বললেন, "তো কার জন্য, ইয়া রাসুলাল্লাহ?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমার দুধ-সন্তানের জন্য।” তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে একটু মেয়ের মায়ের সাথে পরামর্শ করতে হবে।” তখন লোকটি মেয়ের মায়ের কাছে গিয়ে বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।” মা বললেন, "তা তো খুবই সৌভাগ্যের বিষয়!" তিনি বললেন, "তিনি নিজের জন্য প্রস্তাব দেননি; বরং তাঁর দুধ-সন্তানের জন্য দিয়েছেন।” মা বললেন, "তাঁর দুধ-সন্তান তো তাঁর নিজের সন্তান নয়। আল্লাহর কসম, আমি তাকে বিয়ে দেবো না।” যখন তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মেয়ের মায়ের সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য যেতে উদ্যত হলেন, তখন মেয়ে বললেন, "তোমাদের নিকট কে প্রস্তাব পাঠিয়েছে?" মা তাকে বিস্তারিত ঘটনা শোনালেন। তখন মেয়েটি বললেন, "তোমরা কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে চাও? আমাকে তাঁর কাছে সোপর্দ করে নাও। তিনি আমার ক্ষতি করবেন না।” এরপর মেয়ের বাবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ-সন্তানের সাথে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেল।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক যুদ্ধাভিযানে বের হলেন। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা (বিজয় দান করলেন এবং) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ দান করলেন, তখন তিনি বললেন, "তোমরা কি কাউকে হারিয়ে ফেলেছ?" তারা বললেন, "আমরা অমুক অমুককে হারিয়ে ফেলেছি।” তিনি বললেন, "ভালো করে দেখো, আরও কাউকে হারিয়ে ফেলেছ কি না।” তারা বললেন, "না, আর কেউ নেই।” তিনি বললেন, "কিন্তু আমি তো আমার দুধ-সন্তানকে দেখতে পাচ্ছি না। নিহতদের মধ্যে তাকে খুঁজে দেখো।” তখন সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাকে খুঁজতে লাগলেন। একপর্যায়ে তাকে সাতজন নিহত শত্রুসেনার পাশে পাওয়া গেল। তিনি ওই সাতজনকে হত্যা করার পর নিহত হয়েছেন। সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, সাতজনকে মেরে তিনি নিহত হয়ে এখানে পড়ে আছেন।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন এবং পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, "সাতজনকে হত্যা করে সে নিহত হয়েছে। সে আমার থেকে আর আমি তার থেকে।” কথাটি দুবার বা তিনবার বললেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজ বাহুর ওপর নিলেন এবং তার জন্য কবর খনন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহুদ্বয় ছাড়া তাকে কোনো খাটিয়ায় তোলা হয়নি। অতঃপর তাকে কবরে রাখলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গোসল দিয়েছেন কি না, তা বর্ণনাকারী উল্লেখ করেননি। ইসহাক বিন আব্দুল্লাহ বিন আবু তালহা (রাহিমাহুল্লাহ) সাবিত (রা)-কে বললেন, "আপনার কি জানা আছে, ওই মেয়ের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী দোয়া করেছিলেন?" তিনি বললেন, (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেছিলেন :)
'হে আল্লাহ, এই মেয়ের ওপর কল্যাণ ঢেলে দিন এবং তার জীবনকে কষ্টমুক্ত রাখুন।'
সাবিত (রা) বলেন, 'এর পর থেকে আনসারিদের মধ্যে তার মতো প্রশস্ত হাতে ব্যয়কারী কোনো মানুষ ছিল না।'¹
আব্দুল মুত্তালিব বিন রাবিআ বিন হারিস (রা) বলেন, 'রাবিআ বিন হারিস (রা) (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই) ও আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা) পরস্পর বলছিলেন, "আল্লাহর শপথ, যদি আমরা এ দুজনকে (আব্দুল মুত্তালিব বিন রাবিআ রা ও ফজল বিন আব্বাস রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠাই। তারা দুজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুজনকে সাদাকা আদায়ের কাজে লাগিয়ে দেবেন। তারা অন্যদের মতো সাদাকা উত্তোলন করে দেবে। ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরও তা-ই দেবেন, যা অন্য সাদাকা উত্তোলনকারীদের দিয়ে থাকেন।"
তাদের কথা বলার সময় আলি (রা) এসে উপস্থিত হলেন। তারা দুজন আলিকে (রা) বললেন ব্যাপারটা। আলি (রা) বললেন, "এমনটা করবে না। আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো এমনটা করবেন না। (তথা সাদাকা উত্তোলনের পারিশ্রমিক দেবেন না।)" আলির (রা) কথায় রাবিআ বিন হারিস (রা) রাগান্বিত হয়ে বললেন, "আল্লাহর শপথ, তুমি আমাদের প্রতি হিংসাবশতই এমন বলছ। আল্লাহর কসম, তুমি তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাই হয়েছ-আমরা তো তোমার প্রতি হিংসা পোষণ করি না।"
এরপর আলি (রা) "ঠিক আছে। তাদের পাঠিয়ে দাও।" বলে নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে সেখানে শুয়ে পড়লেন। বললেন, "আমি সাইয়িদ হাসানের (রা) পিতা। আল্লাহর কসম, তোমরা যে উদ্দেশ্যে তোমাদের ছেলেদের পাঠালে তার (বিফলতার) জবাব না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ছি না।"
আব্দুল মুত্তালিব (রা) বলেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোহর পড়ে আসার আগেই আমরা তাঁর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি এসে আমাদের দুজনের কান ধরে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, "কী উদ্দেশ্যে এসেছ, না লুকিয়ে বলে ফেলো।" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলেন। আমরাও তাঁর সাথে এলাম ঘরের ভেতর। সেদিন তিনি জাইনাব বিনতে জাহাশ (রা)-এর ঘরে ছিলেন। কথা বলার জন্য আমরা একে অন্যকে বলছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমাদের একজন কথাটা তুলল। বলল, "আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি মানুষের প্রতি সর্বোচ্চ অনুগ্রহকারী। সর্বোত্তম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। আমরা বিয়ের উপযুক্ত হয়েছি। তাই আপনার কাছে এসেছি, যদি আপনি আমাদের সাদাকা উত্তোলনের কাজ দেন, তবে আমরা অন্যদের মতো সাদাকা তুলে দেবো, আপনি অন্যদের যে রকম পারিশ্রমিক দেন, আমাদেরও তেমন দেবেন।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আমরাই কথা বলার জন্য উদ্যত হচ্ছিলাম এমন সময় জাইনাব (রা) পর্দার আড়াল থেকে ইশারা করে আমাদের চুপ থাকতে বললেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার-পরিজনের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করা সমীচীন নয়। সাদাকা মানুষের (সম্পদের) ময়লা। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারের জন্য এটা হালাল নয়। তোমরা মাহমিয়া বিন জাজ' (রা) ও নাওফাল বিন হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)-কে ডেকে আনো।” বনু আসাদের এক লোকের নাম ছিল মাহমিয়া (রা)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুমুসের² কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করেছিলেন। তারা দুজন এলে মাহমিয়াকে (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এ ছেলের কাছে তোমার মেয়েকে বিয়ে দাও'-এই বলে তিনি ফজল বিন আব্বাস (রা)-এর দিকে ইশারা করলেন। মাহমিয়া (রা) তাকে তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। তারপর আমার (আব্দুল মুত্তালিব রা) দিকে ইশারা করে নাওফাল বিন হারিস (রা)-কে বললেন, "এ ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দাও।” নাওফাল (রা) তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিলেন। এরপর তিনি মাহমিয়াকে (রা) বললেন, "খুমুসের সম্পদ থেকে এত এত পরিমাণ এদের দুজনকে দাও।"³
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"খুমসের ভান্ডার থেকে এদের দাও"-হতে পারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয় হওয়ার কারণে খুমুস থেকে তারা দুজন একটা অংশ পেয়েছিলেন। কারণ, তারা দুজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয় ছিলেন। আবার এও হতে পারে যে, খুমুসের যে অংশ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেতেন, সেখান থেকেই তাদের দুজনকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।'⁴
এক মহিলা নিজেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে সোপর্দ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এমন এক দরিদ্র লোকের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন, যার কাছে মোহরানা দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। ঘটনাটি সাহল বিন সাদ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, 'একজন মহিলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি নিজেকে আপনার কাছে সমর্পণ করতে এসেছি।' এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে দেখলেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দৃষ্টি দিলেন। আপাদমস্তক দেখা শেষ করে তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলা দেখতে পেলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোনো ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন তিনি বসে পড়লেন। তারপর একজন সাহাবি (রা) দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যদি আপনার এ মহিলার কোনো প্রয়োজন না থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে তাকে বিয়ে দিয়ে দিন।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার কাছে কোনো সম্পদ আছে কি?" তিনি বললেন, "না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার কাছে কোনো সম্পদ নেই।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তোমার পরিবারের লোকদের কাছে গিয়ে দেখো, কোনো কিছু পাও কি না?" অতঃপর তিনি চলে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, "না, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি কিছুই পেলাম না।” তখন তিনি বললেন, "অন্তত একটি লোহার আংটি হলেও পাও কি না দেখো!" তিনি চলে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, "না, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহর কসম, একটি লোহার আংটিও পেলাম না; কিন্তু এই আমার তহবন্দ আছে। [বর্ণনাকারী সাহল (রা) বলেন, তার কোনো চাদর ছিল না] এর অর্ধেক তাকে দিয়ে দেবো।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "তোমার এ তহবন্দ দ্বারা কী হবে? যদি তুমি পরো, তবে তার জন্য কিছুই থাকবে না; আর যদি সে পরে, তাহলে তোমার জন্য কিছুই থাকবে না।” এরপর লোকটি বসে পড়লেন। দীর্ঘক্ষণ পরে তিনি চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখলেন এবং ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কুরআন কতটুকু জানা আছে?" তিনি বললেন, "হাঁ, আমার অমুক, অমুক, অমুক সুরা জানা আছে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি এগুলো মুখস্থ পড়তে পারো?" তিনি বললেন, "হাঁ।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যাও, যে পরিমাণ কুরআন মুখস্থ জানো, এর বিনিময়ে এই মহিলাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে করিয়ে দিলাম।"⁵
হাদিসের ফায়দাসমূহ:
কোনো মেয়ে নিজেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে সঁপে দেওয়া বৈধ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিনা মোহরানায় বিয়ে করতে পারবেন)। তবে এই বৈধতা শুধু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য। অন্য কারও জন্য এটা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
'কোনো মুমিন নারী যদি নিজেকে নবির কাছে সমর্পণ করে, নবি তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য; অন্য মুমিনদের জন্য নয়।'⁶
কোনো মেয়েকে বিয়ে করার ইচ্ছা করলে তাকে দেখা ও তাকে নিয়ে চিন্তা করা বৈধ।
কোনো মেয়ে নিজেকে কোনো ভালো মানুষের কাছে বিয়ে করার জন্য পেশ করতে পারবে।
কারও কাছে কোনো প্রয়োজন চাওয়া হলো, কিন্তু তার কাছে তা পূরণ করে দেওয়ার সামার্থ্য নেই। তখন চুপ থাকা মুসতাহাব যেন আবেদনকারী বুঝতে পারে। সরাসরি না করে দিয়ে তাকে লজ্জা দেওয়া উচিত নয়। অবশ্য আবেদনকারী যদি চুপ থাকা থেকে বুঝতে না পারে, তখন স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া যায়।
মোহরানাসহ নিকাহ করা মুসতাহাব। কারণ, এতে ঝগড়া-ফাসাদের রাস্তা বন্ধ হয় এবং মেয়ের উপকার হয়। বিশেষ করে তখন উপকার হয়, যখন মিলনের পূর্বে তালাক দেওয়া হয় এবং নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক তাকে দিয়ে দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। মোহর নির্ধারণ করা না হলে ওই অবস্থায় সে অর্ধেক মোহর পায় না; বরং মুতআ পায়। অবশ্য মোহর ব্যতীত কেউ বিয়ে করলে বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যাবে।⁷ আল্লাহ তাআলা বলেন:
'স্ত্রীদের স্পর্শ করার আগে এবং কোনো মোহর সাব্যস্ত করার পূর্বেও যদি তালাক দিয়ে দাও, তবে তাতেও তোমাদের কোনো পাপ নেই।'⁸
স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে মোহর কম-বেশি হওয়া বৈধ।
লোহার আংটি পরিধান করা বৈধ।
কেউ শপথের দাবি না করলেও এবং প্রয়োজন না থাকলেও শপথ করা বৈধ।
অভাবগ্রস্ত লোকের বিয়ে করা ও তাকে বিয়ে দেওয়া জায়িজ।
এই হাদিসে কওমের লোকদের প্রতি নেতার চিন্তা-ফিকির ও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরকে কাজের উপায় বলে দেওয়ার স্বরূপ ফুটে উঠেছে।
অনুরূপভাবে এই হাদিস থেকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়ার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ১৯২৮৫।
২. জিহাদে মুজাহিদরা যে গনিমত লাভ করে, তার এক-পঞ্চমাংশকে খুমুস বলা হচ্ছে। (অনুবাদক)
৩. সহিহু মুসলিম: ১০৭২।
৪. সহিহু মুসলিম: ১০৭২।
৫. সহিহুল বুখারি: ৫০৩০, সহিহু মুসলিম: ১৪২৫।
৬. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৫০।
৭. হানাফি মাজহাব অনুসারে, মোহর নির্ধারণ না করলেও মোহরে মিছিল ওয়াজিব হয়ে যায়। (অনুবাদক)
৮. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৩৬।