📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দান করার সামর্থ্য না থাকলে সুন্দর ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করতেন

📄 দান করার সামর্থ্য না থাকলে সুন্দর ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করতেন


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
'নম্র কথা বলা এবং ক্ষমা প্রদর্শন করা ওই দানখয়রাত অপেক্ষা উত্তম, যার পরে কষ্ট দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা সম্পদশালী, সহিষ্ণু।'¹
আবু সাইদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'কতিপয় আনসারি লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইলে তিনি তাদের দান করলেন। অতঃপর আবার চাইলে তিনি আবার দান করলেন। অতঃপর আবার চাইলে তিনি আবার দান করলেন। এভাবে তাঁর কাছে যা ছিল, সব শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন:
'আমার নিকট যে মাল থাকে, তা তোমাদের না দিয়ে আমার নিকট জমা রাখি না। তবে যে হাতপাতা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তাকে তা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন আর যে পরমুখাপেক্ষী না হয়, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। সবরের চাইতে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।'²
'তবে যে ব্যক্তি হাতপাতা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তাকে তা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন'-অর্থাৎ যে মানুষের কাছে হাতপাতা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তাআলা এর বদৌলতে তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন এবং অভাব দূর করে দেন।
'আর যে পরমুখাপেক্ষী না হয়'- অর্থাৎ যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রতি মুখাপেক্ষী না হয়, তখন আল্লাহ তাআলা এ পরিমাণ সম্পদ দান করেন যে, তার আর কারও কাছে কিছু চাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।³
ওই লোকদের ঘটনাও এ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত, যারা গাজওয়ায়ে তাবুকে যাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বাহন চেয়েছিল, যেন তার ওপর সাওয়ার হয়ে জিহাদ করতে পারে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি অপারগতা জ্ঞাপন করলেন যে, তাঁর কাছে তাদের দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
'জিহাদে অংশগ্রহণ না করায় দুর্বলদের বিরুদ্ধে কিংবা পীড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আন্তরিক থাকে। সৎকর্মশীলদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কারণ নেই। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। তাদের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ নেই, যারা তোমাদের কাছে বাহনের জন্য এলে তুমি বলেছিলে, "আমার কাছে তো তোমাদের দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই।” তখন তারা ব্যয় করার মতো কিছু না পাওয়ার কষ্টে অশ্রুপূর্ণ নয়নে ফিরে গিয়েছিল।'⁴
আবু মুসা আশআরি (রা) বলেন, 'আমি আশআরিদের একটি দল নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বাহনের জন্য আসলাম। তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের বাহন দিতে পারব না। আর তোমাদের দেওয়ার মতো কোনো বাহনও নেই আমার কাছে।"'
তিনি বলেন, 'তখন আমরা যতক্ষণ আল্লাহ চেয়েছেন, ততক্ষণ অবস্থান করলাম। অতঃপর তাঁর কাছে কিছু উট আনা হলো। সেখান থেকে সাদা কুঁজওয়ালা তিনটি উট আমাদের দিলেন। তা নিয়ে আমরা যখন ফিরছিলাম, তখন আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম, "আল্লাহ তাআলা আমাদের বরকত দান করবেন না। কেননা, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বাহনের জন্য গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের বাহন দেবেন না বলে শপথ করেছিলেন। অথচ তিনি আমাদের বাহন দান করেছেন।” তখন তারা এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে ব্যাপারে অবহিত করল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমি তোমাদের বাহন দিইনি; আল্লাহই তোমাদের দান করেছেন। আর আল্লাহর কসম, আল্লাহর ইচ্ছায় আমি কোনো বিষয়ের শপথ করার পর যদি (তা ভঙ্গ করার মধ্যে) কোনো কল্যাণ দেখতে পাই, তখন কসমের কাফফারা দিয়ে তা ভঙ্গ করে ফেলি এবং কল্যাণকর বিষয়টি গ্রহণ করি।'⁵

টিকাঃ
১. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৬৩।
২. সহিহুল বুখারি: ১৪৬৯, সহিহু মুসলিম: ১০৫৩।
৩. ফাতহুল বারি: ১১/৩০৪।
৪. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৯১-৯২।
৫. সহিহুল বুখারি: ৩১৩৩, সহিহু মুসলিম: ১৬৪৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নিজের পরিবারের চাহিদার ওপর গরিবদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতেন

📄 নিজের পরিবারের চাহিদার ওপর গরিবদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতেন


আলি বিন আবি তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, 'জাঁতাকলে আটা পিষতে পিষতে ফাতিমা (রা)-এর হাতে ফোসকা পড়ে গেল। তখন একজন খাদিম চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলেন। কিন্তু এসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিনি পেলেন না। তাই আয়িশা (রা)-কে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরলে আয়িশা (রা) তাঁকে ফাতিমা (রা)-এর আগমনের ব্যাপারে জানালেন।'
আলি (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন। তখন আমরা বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। আমরা আমাদের বিছানা থেকে উঠতে চাচ্ছিলাম, তখনই তিনি বললেন, "তোমরা তোমাদের জায়গায় থাকো।” এরপর তিনি আমাদের সামনে বসলেন। তখন আমি তাঁর পায়ের শীতলতা আমার বুকে অনুভব করলাম। তিনি বললেন:
'আমি কি তোমাদের এমন কিছু শিক্ষা দেবো না, যা তোমরা যা চেয়েছিলে তার চাইতে উত্তম? (তা হলো) যখন তোমরা শয্যা গ্রহণ করবে, তখন ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ এবং ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ পড়বে। এটি তোমাদের জন্য খাদিমের চেয়েও উত্তম।'¹
অপর বর্ণনায় আলি (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমি আহলে সুফফাকে বাদ দিয়ে তোমাদের দিতে পারব না। ক্ষুধায় তাদের পেট পেঁচিয়ে আছে।' আরেকবার বললেন, 'আমি ক্ষুধার জ্বালায় পেট পেঁচিয়ে থাকা আহলে সুফফাকে বাদ দিয়ে তোমাদের খিদমত করতে পারব না।'²
মুহাল্লাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মেয়েকে জিকির শিক্ষা দিয়েছেন, যা আখিরাতে তার কাজে আসবে। আর আহলে সুফফাকে তার ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ, তারা তৃপ্তিভরে খানা পাওয়ার শর্তের ওপর নিজেদের ইলম অর্জন ও সুন্নাহ আয়ত্তে আনার কাজে নিয়োজিত রেখেছেন। সম্পদ কামাই করা ও পরিবার-পরিজনের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তবে তারা খাদ্যের বিনিময়ে নিজেদের আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।'³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩১১৩, সহিহু মুসলিম: ২৭২৭।
২. মুসনাদু আহমাদ: ৫৯৭।
৩. ফাতহুল বারি: ১১/১২৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ভিক্ষা করতে নিষেধ করতেন

📄 ভিক্ষা করতে নিষেধ করতেন


আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যে ব্যক্তি (অভাবের তাড়না ছাড়া) নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য মানুষের কাছে সম্পদ ভিক্ষা করে বেড়ায়, বস্তুত সে আগুনের অঙ্গার ভিক্ষা করে। কাজেই এখন তার ভেবে দেখা উচিত সে বেশি নেবে, না কম নেবে।'¹
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সেই সত্তার কসম-যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মধ্যে কারও রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে করে বয়ে আনা, কোনো লোকের কাছে গিয়ে হাতপাতার চাইতে অনেক ভালো, চাই সে দিক বা না দিক।'²

টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১০৪১।
২. সহিহুল বুখারি: ১৪৭০, সহিহু মুসলিম: ১০৪২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিভিন্ন সম্মানজনক পেশা দেখিয়ে দিতেন

📄 বিভিন্ন সম্মানজনক পেশা দেখিয়ে দিতেন


কৃষিকাজ:
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'যেকোনো মুসলিম কোনো (ফলবান) গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তা তার পক্ষ থেকে সাদাকা বলে গণ্য হবে।'¹
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে গাছ রোপণ করা ও শস্যখেত করার ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। আর রোপণকারীর সাওয়াব ততদিন পর্যন্ত জারি থাকবে, যতদিন পর্যন্ত গাছ ও শস্য থাকবে। এ ছাড়াও কিয়ামত পর্যন্ত যতদিন এই গাছ ও খেতের বীজ থেকে অন্য গাছ ও ফসল উৎপন্ন হতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত রোপণকারীর প্রতি সাওয়াব পৌঁছতে থাকবে।'²
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
'যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়া শুরু করে আর তোমাদের কারও হাতে একটি খেজুরের চারা থাকে। তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই যদি সেটা রোপণ করা সম্ভব হয়, তখন সে যেন তা-ই করে (চারা রোপণ করে)।'³
কারিগরি:
মিকদাম (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'হাতের কাজের মাধ্যমে উপার্জিত জীবিকার খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।'⁴
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, তিনি জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতি হিসেবে একমাত্র হাতের কাজকেই বেছে নিয়েছিলেন, অথচ সেটার প্রয়োজন তাঁর ছিল না। কারণ, পবিত্র কুরআনের আয়াত অনুযায়ী তিনি জমিনের বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি জীবিকা নির্বাহের সর্বোত্তম পদ্ধতিটাই বেছে নিয়েছিলেন। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা সর্বোত্তম হওয়ার ব্যাপারে তাঁকেই দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।'⁵
ব্যবসা-বাণিজ্য:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।'⁶
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'উকাজ, মাজান্না ও জুল মাজাজ জাহিলি যুগের বাজার ছিল। (ইসলামি যুগে) মুসলমানরা হজের মৌসুমে সেখানে ব্যবসা করাকে গুনাহ মনে করতে লাগল। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করলেন:
'(হজের মৌসুমে) তোমাদের ওপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোনো পাপ নেই।' (সুরা আল-বাকারা: ১৯৭)⁷
বিশেষ দ্রষ্টব্য : (হজের মৌসুমে) অংশটি ইবনে আব্বাস (রা)-এর কিরাত। এটি শাজ (বিচ্ছিন্ন) কিরাত। তাই ইমামগণ এটাকে তাফসিরের হুকুমে রেখেছেন।⁸
উরওয়া আল-বারিকি (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি দিনার দিয়ে একটি ছাগল কিনতে পাঠালেন। তিনি তা দিয়ে দুটি ছাগল কিনলেন। অতঃপর একটি ছাগল এক দিনার দিয়ে বিক্রি করে দিলেন এবং বাকি এক দিনার ও অপর ছাগলটি নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বেচাকেনায় বরকতের দোয়া করলেন-"আল্লাহ তাআলা তোমার হাতের লেনদেনের মধ্যে বরকত দান করুন।" এরপর থেকে তিনি মাটি কিনলেও তাতে লাভবান হতেন।'⁹
নবিগণ (আলাইহিমুস সালাম) বিভিন্ন কাজ-পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ছাগল চরানো।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'আল্লাহ তাআলা যত নবিই পাঠিয়েছেন, প্রত্যেকে ছাগল চরিয়েছেন।'
সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, 'আপনিও চরিয়েছেন?' তিনি বললেন:
'হাঁ, আমি ছাগলপ্রতি এক কিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।'¹⁰
তন্মধ্যে আরেকটি পেশা হলো কামারের পেশা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
'আমি দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম এই আদেশ মর্মে যে, হে পর্বতমালা, তোমরা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং হে পক্ষীসকল, তোমরাও। আমি তাঁর জন্য লৌহকে নরম করে ছিলাম। এবং তাঁকে আমি বলেছিলাম, প্রশস্ত বর্ম তৈরি করো, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করো এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো। তোমরা যা কিছু করো, আমি তা দেখি।'¹¹
আরেকটি পেশা হলো ছুতারগিরি বা কাঠমিস্ত্রির কাজ।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'জাকারিয়া (আলাইহিস সালাম) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন।'¹²
এই হাদিস থেকে যেসব বিষয় প্রতীয়মান হয়:
কারিগরি পেশাসমূহের বৈধতা।
ছুতারগিরি মনুষ্যত্বকে নিচু করে না; বরং এটি একটি সম্মানজনক পেশা।
জাকারিয়া (আলাইহিস সালাম)-এর ফজিলত। কারণ, তিনি হাতের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন।¹³
এভাবে নবিগণের (আলাইহিমুস সালাম) ওয়ারিশ আল্লাহওয়ালা উলামায়ে কিরামও বিভিন্ন কাজ ও পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ফলে অনেক আলিম নিজ নিজ পেশার নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। যেমন: বাজ্জাজ (বস্ত্র প্রস্তুতকারী বা বস্ত্র ব্যবসায়ী), জাস্সাস (চুন-কামকারী, প্লাস্টারকারী), খাওয়াস (খেজুরপাতা বিক্রেতা), জাজ্জার (কসাই), জাজ্জাজ (কাচ প্রস্তুতকারী বা কাচ ব্যবসায়ী), হাদ্দাদ (কামার), হাজ্জা' (জুতো প্রস্তুতকারী, মুচি) ইত্যাদি।
কর্মক্ষম ব্যক্তি কাজ না করে বসে থাকা খুবই নিন্দনীয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সাদাকা থেকে অলস ও নিষ্কর্মা ব্যক্তিদের জন্য কোনো অংশ রাখেননি। যেন কর্মক্ষম ব্যক্তিরা কাজ ও বৈধ উপার্জনের প্রতি ধাবিত হয়। তিনি ইরশাদ করেন:
'ধনী, কর্মক্ষম ও সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য সাদাকা হালাল নয়।'¹⁴
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'আমি যখন কোনো ব্যক্তিকে দুনিয়া ও আখিরাতের কাজ থেকে বিরত দেখি, তখন তার প্রতি খুব রাগান্বিত হই।'¹⁵
সুফইয়ান সাওরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বীরপুরুষদের মতো কাজ করো। অর্থাৎ হালাল উপার্জন করে পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করো।'¹⁶
আরবি প্রবাদ আছে, 'একটি কূপ খনন করো, আরেকটি কূপ ভরো; তবুও কোনো শ্রমিককে বেকার থাকতে দিয়ো না।'¹⁷ এর ব্যাখ্যা হলো, কোনো যুবককে কর্মহীন রেখো না। তাদের কাজে অভ্যস্ত করে তোলো। যেন বসে বসে খাবার খাওয়ার কুঅভ্যাস তাদের মাঝে না আসে। এমনকি প্রয়োজনীয় কোনো কাজ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয় কাজ করিয়ে তাদের কর্মস্পৃহা ও সামর্থ্যকে জিইয়ে রাখতে হবে। কারণ, কাজটি অপ্রয়োজনীয় হলেও তাদের কাজ ও মেহনতে লিপ্ত থাকা এবং অকর্মণ্য না হওয়া কিন্তু মোটেই অপ্রয়োজনীয় বিষয় নয়।
কবি বলেন:
'উচ্চ মর্যাদা যদি অর্জন করতে চাও, তাহলে ঘুম পরিত্যাগ করো। নিরলস কাজ করতে করতে সকালকে সন্ধ্যার সাথে মিলিয়ে ফেলো। জ্ঞানী ও দার্শনিকদের স্তরে উন্নীত হতে চাইলে পৃথিবীর সকল প্রান্তে ঘুরে বেড়াও। যে মানুষ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়, সে সবার পেছনে পড়ে থাকে। এই ভূপৃষ্ঠ ও তার ওপরে শূন্যলোক যেন একটি বই। তা পাঠ করো হে মেধাবী সম্প্রদায়!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে প্রকৃত মিসকিনের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন:
'সেই ব্যক্তি মিসকিন নয়, যে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং এক-দুই লুকমা খাবার কিংবা দু-একটি খেজুর নিয়ে ফিরে যায়।'
তারা বললেন, 'তাহলে মিসকিন কে, ইয়া রাসুলাল্লাহ?' তিনি বললেন:
'যার কাছে পর্যাপ্ত ধনসম্পদ নেই, যা তাকে অমুখাপেক্ষী রাখবে। কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারে না বিধায় তাকে সাদাকা দেয় না। আর সে মানুষের কাছে ভিক্ষাও করে না।'¹⁸

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৩২০, সহিহু মুসলিম: ১৫৫৩।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/২১৩।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৬৯।
৪. সহিহুল বুখারি: ২০৭২।
৫. ফাতহুল বারি: ৪/৩০৬।
৬. সুরা আন-নিসা, ৪: ২৯।
৭. সহিহুল বুখারি: ৪৫১৯।
৮. ফাতহুল বারি: ৩/৫৯৫।
৯. সহিহুল বুখারি: ৩৬৪৩, সুনানুত তিরমিজি: ১২৫৮।
১০. সহিহুল বুখারি: ২২৬২।
১১. সুরা সাবা, ৩৪: ১০-১১।
১২. সহিহু মুসলিম: ২৩৭৯।
১৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৩৫।
১৪. সুনানুত তিরমিজি: ৬৫২, সুনানু আবি দাউদ: ১৬৩৪।
১৫. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা ৩৪৫৬২।
১৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৮১।
১৭. মাজমাউল আমসাল: ১/২৩০।
১৮. সহিহুল বুখারি: ১৪৭৬, সহিহু মুসলিম: ১০৩৯ (আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00