📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তিনি তাদের উপস্থিতি কামনা করতেন

📄 তিনি তাদের উপস্থিতি কামনা করতেন


গরিবদের অসিলায় আল্লাহর সাহায্য আসে এবং তাদের দোয়ার কারণে রিজিক আসে।
আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'তোমরা দুর্বল লোকদের খোঁজ করে আমার কাছে নিয়ে এসো। কেননা, তোমরা তো এই দুর্বলদের বরকতেই রিজিক এবং আল্লাহর সাহায্য পেয়ে থাকো।'¹
'দুর্বল লোক'-গরিব মুসলমানদের বোঝানো হয়েছে, যাদের জীর্ণতার কারণে মানুষ তাদের দুর্বল মনে করে।
'তোমরা সাহায্য পেয়ে থাকো'- অর্থাৎ তাদের কারণে অথবা তাদের দোয়ার বরকতে শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করা হয়।
সাদ (রা) তাঁর অধীনস্থদের ওপর নিজেকে উত্তম মনে করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'দুর্বলদের কারণেই তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক দেওয়া হয়।'²
অন্য রিওয়ায়াতে আছে-
'আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে তাদের দুর্বল শ্রেণির লোকদের দোয়া, নামাজ ও ইখলাসের বরকতে সাহায্য করেন।'³
হাদিসের মর্ম হলো, দুর্বল লোকদের দোয়া ও ইবাদতে ইখলাস বেশি থাকে। কারণ, তাদের অন্তরসমূহ দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মুক্ত থাকে এবং তাদের চিন্তা স্থির থাকে। তাই তাদের আমলসমূহ পবিত্র হয় এবং দোয়া কবুল করা হয়।⁴

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ ২৫৯৪, সুনানুত তিরমিজি: ১৭০২৩।
২. সহিহুল বুখারি: ২৮৯৬।
৩. সুনানুন নাসায়ি: ৩১৭৮।
৪. ফাতহুল বারি: ৬/৮৯, ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৫/৯০, আওনুল মাবুদ: ৭/২৫৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার নির্দেশ দিতেন

📄 তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার নির্দেশ দিতেন


মানুষের অপছন্দনীয় খাবার তাদের খাওয়াতে নিষেধ করতেন। এ সম্পর্কে আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি গুইসাপ হাদিয়া পাঠানো হলো। তিনি তা খাননি। তখন আয়িশা (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন:
'তোমরা যা খাও না, তা তাদের খেতে দিয়ো না।'¹
আসলে এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার এই আদেশ বাস্তবায়ন করেছেন। আল্লাহ বলেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনো গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।'²
এই আয়াত সম্পর্কে বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'আয়াতটি আমাদের আনসারদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা খেজুর বাগানের মালিক ছিলাম। লোকেরা তাদের খেজুরের বাগান থেকে আপন আপন সামর্থ্য অনুসারে নিয়ে আসত। কোনো ব্যক্তি এক ছড়া বা দুই ছড়া নিয়ে আসত এবং তা মসজিদে ঝুলিয়ে রাখত। সুফফাবাসী সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের কারও যখন ক্ষুধা লাগত, তখন তারা খেজুর ছড়ার কাছে এসে তার লাঠি দিয়ে তাতে আঘাত করতেন। এতে তা থেকে কাঁচা-পাকা খেজুর ঝরে পড়ত। আর তারা তা খেয়ে নিতেন। কিন্তু যেসব লোকের ভালো কাজের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না, তাদের কেউ এমন খেজুরের ছড়াও নিয়ে আসত, যার মধ্যে খারাপ ও পচা খেজুর থাকত এবং ভেঙে পড়া ছড়াও নিয়ে এসে তা ঝুলিয়ে দিত। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনো গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।'
তিনি বলেন, 'অর্থাৎ তোমরা যা দান করো, এই জাতীয় বস্তু যদি তোমাদের কাউকে হাদিয়া দেওয়া হয়, তবে সে তা চক্ষু বন্ধ করে রেখে বা লজ্জায় পড়ে গ্রহণ করা ছাড়া হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করবে না।' বারা (রা) বলেন, 'এরপর আমাদের প্রত্যেকেই তার নিকট যা আছে, তার মধ্যে উত্তমটি নিয়ে আসত।'³
জনৈক সালাফের আমল: মুনজির সাওরি (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাবি বিন খুসাইম (রাহিমাহুল্লাহ) এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীকে একপ্রকার মূল্যবান মিষ্টি খাওয়াচ্ছিলেন। তা দেখে এক ব্যক্তি তাকে বলল, "এই লোকটি কি জানে, আপনি তাকে কী মূল্যবান খাবার খাওয়াচ্ছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ তো জানেন।"'⁴

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ২৪২১৫।
২. সুরা আল-বাকারা: ২৬৭।
৩. সুনানুত তিরমিজি: ২৯৭৮।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/২৯০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিয়ে-শাদির দাওয়াতে তাদের উপেক্ষা করতে নিষেধ করতেন

📄 বিয়ে-শাদির দাওয়াতে তাদের উপেক্ষা করতে নিষেধ করতেন


আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সর্বনিকৃষ্ট খানা হলো সেই অলিমার খানা, যেখানে ধনবানদের দাওয়াত করা হবে এবং গরিবরা উপেক্ষিত থাকবে। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবাধ্যতা করে।'¹
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরের যুগের একটি অবস্থা সম্পর্কে খবর দেওয়া হয়েছে। তা হচ্ছে, বিয়ে-শাদির দাওয়াতে ধনীদের প্রাধান্য দেওয়া এবং উন্নত ও রুচিসম্মত খাবারে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া। যা আজ অধিকাংশ দাওয়াতে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।'²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫১৭৭, সহিহু মুসলিম: ১৪৩২।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৯/২৩৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের ভিক্ষা না করতে উদ্বুদ্ধ করতেন

📄 তাদের ভিক্ষা না করতে উদ্বুদ্ধ করতেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কেউ কোনো কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই দান করতেন। যতবার চাইতেন ততবার দিতেন। তবে অনেক সময় তিনি তাদের বুঝিয়ে দিতেন যে, এভাবে কারও নিকট কোনো কিছু চেয়ে বেড়ানো ভালো কাজ নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে মুমিনের সে সকল গুণের প্রশংসা করেছেন, তন্মধ্যে মানুষের সামনে হাত না পাতা অন্যতম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'খয়রাত ওই সকল গরিব লোকের জন্য, যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে-জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়। অজ্ঞ লোকেরা হাত না পাতার কারণে তাদের অভাবমুক্ত মনে করে। তোমরা তাদেরকে তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতিমিনতি করে ভিক্ষা চায় না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে, তা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই পরিজ্ঞাত।'¹
'তারা মানুষের কাছে কাকুতিমিনতি করে ভিক্ষা চায় না'- এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে কি তারা কাকুতিমিনতি না করে ভিক্ষা চায়? এর উত্তরে বলা হয়, তারা একদমই ভিক্ষা করে না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদের ভিক্ষাবৃত্তি-না-করা লোক বলে অভিহিত করেছেন এবং লক্ষণ দ্বারা তাদের পরিচয় পাওয়ার কথা বলেছেন। যদি তারা কোনোভাবেই ভিক্ষা করত, তবে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এমন কথা বলতেন না। আর কাকুতিমিনতি না করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি ভিক্ষুকদের এই বদঅভ্যাসটি ওইসব লোকের মধ্যে না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।²
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিগণকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বলতেন, তারা যেন যথাসম্ভব ভিক্ষা পরিত্যাগ করে।
হাকিম বিন হিজাম (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইলাম, তিনি আমাকে দান করলেন। অতঃপর আবার চাইলে তিনি আবার দান করলেন। অতঃপর আবার চাইলে তিনি আবার দান করলেন। অতঃপর তিনি বললেন:
'হে হাকিম, এই মাল-সম্পদ তরতাজা মিষ্টি ফলের মতো। সুতরাং কেউ মনের মাঝে উদারতা রেখে তা গ্রহণ করলে (অর্থাৎ কারও কাছে হাত না পেতে মেহনত করে অর্জন করলে) তাতে বরকত দেওয়া হয়। আর যদি কেউ মনের মধ্যে লোভ রেখে তা গ্রহণ করে, তাতে বরকত দেওয়া হয় না। সে ওই ব্যক্তির মতো, যে খায় কিন্তু তৃপ্ত হতে পারে না। আর ওপরের (দাতার) হাত নিচের (গ্রহীতার) হাতের চেয়ে উত্তম।'
হাকিম (রা) বলেন, 'আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, কসম সেই সত্তার-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আপনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কারও সম্পদ কম করব না (অর্থাৎ কারও কাছে হাতপেতে তার সম্পদ কমিয়ে দেবো না)।" এর পর আবু বকর (রা) তাকে দান করার জন্য ডাকতেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতেন। অতঃপর উমর (রা) তাকে দান করার জন্য ডাকলে তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তখন উমর (রা) বললেন, 'হে মুসলিম সম্প্রদায়, আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে হাকিমের (রা) হক তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু সে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।'
এভাবে হাকিম (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি।³
হাফিজ ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাকিম (রা) সরকারি অনুদান গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন, অথচ তা তার অধিকার ছিল। এর কারণ হলো, তিনি আশঙ্কা করতেন যে, এভাবে অনুদান গ্রহণ করলেও নেওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হবে। তখন তিনি না চাইলেও প্রবৃত্তি তাকে হাতপাতার দিকে নিয়ে যাবে। তাই তিনি যেকোনো অনুদান গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থেকেছেন এবং সংশয়যুক্ত সকল কিছু পরিত্যাগ করেছেন। উমর (রা) লোকদের সাক্ষী বানানোর কারণ হলো, কেউ যেন মনে মনে এই ধারণা করতে না পারে যে, উমর (রা) হাকিমের (রা) অধিকার হরণ করেছেন।'⁴
দান করার সামর্থ্য না থাকলে সুন্দর ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করতেন।

টিকাঃ
১. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৭৩।
২. তাফসিরুত তাবারি ৫/৫৯৩-৬০০। (কিছুটা পরিবর্তিত ও সংক্ষিপ্ত করে উপস্থাপিত)
৩. সহিহুল বুখারি: ১৪৭২, সহিহু মুসলিম: ১০৩৫।
৪. ফাতহুল বারি: ৩/৩৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00