📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের বলতেন, জান্নাতিদের মধ্যে গরিবরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ

📄 তাদের বলতেন, জান্নাতিদের মধ্যে গরিবরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ


ইমরান বিন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'আমাকে জান্নাত দেখানো হয়েছে। তখন দেখলাম যে, তার অধিকাংশ অধিবাসী গরিব শ্রেণির লোক। আর আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়েছে। তাতে দেখতে পেলাম যে, তার অধিকাংশ অধিবাসী নারী।'¹
এই হাদিসে দুনিয়া ও ধনসম্পদ থেকে বঞ্চিত গরিবদের জন্য অনেক বড় মানসিক প্রশান্তি রয়েছে।
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিস ধনীদের ওপর গরিবদের শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করে না। বরং হাদিসের অর্থ হলো, পৃথিবীতে ধনীদের চেয়ে গরিবদের সংখ্যাই বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবে জান্নাতেও তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। তা ছাড়া তাদের জান্নাতে যাওয়ার কারণ তাদের দারিদ্র্য নয়; বরং দারিদ্র্যে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও নেক আমল করার কারণেই তারা জান্নাতে যাবে। কারণ, গরিব যদি নেক আমল না করে, সে কখনো সৎকর্মশীল ধনীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে না।'²
আর স্বামীর অবাধ্যতা সম্পর্কে ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'জাহান্নামে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "তারা স্বামীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না। আর এটি তাদের ইমান হ্রাস করে।" এখান থেকে বোঝা যায়, স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করলে নারীদের ইমান বাড়ে। অনুরূপভাবে অন্যান্য নেক আমলের দ্বারাও ইমান বাড়ে। এখান থেকে বোঝা যায়, আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত। ইমান হলো, মৌখিক স্বীকৃতি ও দৈহিক আমলের সম্মিলিত রূপ। এই কারণেই নেক আমলের দ্বারা ইমান বৃদ্ধি পায় এবং বদ আমলের কারণে ইমান হ্রাস পায়।'³
উসামা বিন জাইদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'আমি জান্নাতের দরোজায় দাঁড়ালাম। অতঃপর দেখলাম, যারা জান্নাতে প্রবেশ করেছে, তাদের অধিকাংশ গরিব-মিসকিন মানুষ। আর ধনবানদের (তখনও হিসাবের জন্য) আটকে রাখা হয়েছে। আর ওদিকে জাহান্নামীদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।'⁴
মালিক বিন দিনার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একটি সফর থেকে আমি ফিরছিলাম। যখন আমাদের নৌকা পুলের কাছে পৌঁছাল, তখন শুল্ক আদায়কারী দাঁড়িয়ে বলল, "কেউ নৌকা থেকে বের হবে না এবং কেউ আপন আসন থেকে উঠবে না।” আমি আমার কাপড়-চোপড় কাঁধের ওপর নিয়ে একটা লাফ দিলাম এবং সোজা জমিনের ওপর পড়লাম। শুল্ক আদায়কারী বলল, "আপনি বেরিয়ে গেলেন কেন?" আমি বললাম, "আমার কাছে কিছুই নেই।” সে বলল, "আচ্ছা, যান তাহলে।” তখন আমি মনে মনে বললাম, "আখিরাতেও ঠিক এমনটাই ঘটবে (অর্থাৎ গরিবরা সহজে পার পেয়ে যাবে)।"'⁵

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩২৪১, সহিহু মুসলিম: ২৭৩৭।
২. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ১০/১৭৩।
৩. ইমান হ্রাস-বৃদ্ধির মাসআলায় ইমামদের মাঝে যে মতানৈক্য রয়েছে, তা মূলত শাব্দিক মতবিরোধ। এতে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। উভয় দলের মাসআলা বর্ণনার দৃষ্টিকোণ ভিন্ন হওয়ার কারণে বিষয়টি মতবিরোধের মতো মনে হয়। তাই এটি নিয়ে সাধারণ পাঠক ভাইদের ব্যস্ত হওয়ার কোনো অর্থ হয় না। একান্ত কেউ জানতে চাইলে আলিমদের শরণাপন্ন হতে দোষ নেই। (অনুবাদক)
৪. সহিহুল বুখারি ৫১৯৬, সহিহু মুসলিম: ২৭৩৬।
৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৭৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তিনি তাদের উপস্থিতি কামনা করতেন

📄 তিনি তাদের উপস্থিতি কামনা করতেন


গরিবদের অসিলায় আল্লাহর সাহায্য আসে এবং তাদের দোয়ার কারণে রিজিক আসে।
আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'তোমরা দুর্বল লোকদের খোঁজ করে আমার কাছে নিয়ে এসো। কেননা, তোমরা তো এই দুর্বলদের বরকতেই রিজিক এবং আল্লাহর সাহায্য পেয়ে থাকো।'¹
'দুর্বল লোক'-গরিব মুসলমানদের বোঝানো হয়েছে, যাদের জীর্ণতার কারণে মানুষ তাদের দুর্বল মনে করে।
'তোমরা সাহায্য পেয়ে থাকো'- অর্থাৎ তাদের কারণে অথবা তাদের দোয়ার বরকতে শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করা হয়।
সাদ (রা) তাঁর অধীনস্থদের ওপর নিজেকে উত্তম মনে করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'দুর্বলদের কারণেই তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক দেওয়া হয়।'²
অন্য রিওয়ায়াতে আছে-
'আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে তাদের দুর্বল শ্রেণির লোকদের দোয়া, নামাজ ও ইখলাসের বরকতে সাহায্য করেন।'³
হাদিসের মর্ম হলো, দুর্বল লোকদের দোয়া ও ইবাদতে ইখলাস বেশি থাকে। কারণ, তাদের অন্তরসমূহ দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মুক্ত থাকে এবং তাদের চিন্তা স্থির থাকে। তাই তাদের আমলসমূহ পবিত্র হয় এবং দোয়া কবুল করা হয়।⁴

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ ২৫৯৪, সুনানুত তিরমিজি: ১৭০২৩।
২. সহিহুল বুখারি: ২৮৯৬।
৩. সুনানুন নাসায়ি: ৩১৭৮।
৪. ফাতহুল বারি: ৬/৮৯, ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৫/৯০, আওনুল মাবুদ: ৭/২৫৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার নির্দেশ দিতেন

📄 তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার নির্দেশ দিতেন


মানুষের অপছন্দনীয় খাবার তাদের খাওয়াতে নিষেধ করতেন। এ সম্পর্কে আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি গুইসাপ হাদিয়া পাঠানো হলো। তিনি তা খাননি। তখন আয়িশা (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন:
'তোমরা যা খাও না, তা তাদের খেতে দিয়ো না।'¹
আসলে এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার এই আদেশ বাস্তবায়ন করেছেন। আল্লাহ বলেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনো গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।'²
এই আয়াত সম্পর্কে বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'আয়াতটি আমাদের আনসারদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা খেজুর বাগানের মালিক ছিলাম। লোকেরা তাদের খেজুরের বাগান থেকে আপন আপন সামর্থ্য অনুসারে নিয়ে আসত। কোনো ব্যক্তি এক ছড়া বা দুই ছড়া নিয়ে আসত এবং তা মসজিদে ঝুলিয়ে রাখত। সুফফাবাসী সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের কারও যখন ক্ষুধা লাগত, তখন তারা খেজুর ছড়ার কাছে এসে তার লাঠি দিয়ে তাতে আঘাত করতেন। এতে তা থেকে কাঁচা-পাকা খেজুর ঝরে পড়ত। আর তারা তা খেয়ে নিতেন। কিন্তু যেসব লোকের ভালো কাজের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না, তাদের কেউ এমন খেজুরের ছড়াও নিয়ে আসত, যার মধ্যে খারাপ ও পচা খেজুর থাকত এবং ভেঙে পড়া ছড়াও নিয়ে এসে তা ঝুলিয়ে দিত। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনো গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।'
তিনি বলেন, 'অর্থাৎ তোমরা যা দান করো, এই জাতীয় বস্তু যদি তোমাদের কাউকে হাদিয়া দেওয়া হয়, তবে সে তা চক্ষু বন্ধ করে রেখে বা লজ্জায় পড়ে গ্রহণ করা ছাড়া হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করবে না।' বারা (রা) বলেন, 'এরপর আমাদের প্রত্যেকেই তার নিকট যা আছে, তার মধ্যে উত্তমটি নিয়ে আসত।'³
জনৈক সালাফের আমল: মুনজির সাওরি (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাবি বিন খুসাইম (রাহিমাহুল্লাহ) এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীকে একপ্রকার মূল্যবান মিষ্টি খাওয়াচ্ছিলেন। তা দেখে এক ব্যক্তি তাকে বলল, "এই লোকটি কি জানে, আপনি তাকে কী মূল্যবান খাবার খাওয়াচ্ছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহ তো জানেন।"'⁴

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ২৪২১৫।
২. সুরা আল-বাকারা: ২৬৭।
৩. সুনানুত তিরমিজি: ২৯৭৮।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/২৯০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিয়ে-শাদির দাওয়াতে তাদের উপেক্ষা করতে নিষেধ করতেন

📄 বিয়ে-শাদির দাওয়াতে তাদের উপেক্ষা করতে নিষেধ করতেন


আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সর্বনিকৃষ্ট খানা হলো সেই অলিমার খানা, যেখানে ধনবানদের দাওয়াত করা হবে এবং গরিবরা উপেক্ষিত থাকবে। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবাধ্যতা করে।'¹
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরের যুগের একটি অবস্থা সম্পর্কে খবর দেওয়া হয়েছে। তা হচ্ছে, বিয়ে-শাদির দাওয়াতে ধনীদের প্রাধান্য দেওয়া এবং উন্নত ও রুচিসম্মত খাবারে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া। যা আজ অধিকাংশ দাওয়াতে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।'²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫১৭৭, সহিহু মুসলিম: ১৪৩২।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৯/২৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00