📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 একেবারে রিক্তহস্ত গরিব যারা, তাদের গুরুত্ব দিতেন

📄 একেবারে রিক্তহস্ত গরিব যারা, তাদের গুরুত্ব দিতেন


আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাবুক অভিযানের সময় একদিন মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। সেনাছাউনির একপার্শ্বে আগুন জ্বলতে দেখে আমি সেদিকে গেলাম। সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-কে দেখতে পেলাম। আরও দেখতে পেলাম যে, আব্দুল্লাহ জুল বিজাদাইন আল-মুজানি (রা) ইনতিকাল করেছেন এবং তাঁরা তার জন্য কবর খনন করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে অবতরণ করলেন আর আবু বকর (রা) ও উমর (রা) তাকে তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের ভাইকে আমার হাতে দাও।” তাঁরা তাঁর হাতে তুলে দিলেন। অতঃপর তাকে একপার্শ্বের ওপর কবরে রাখার পর বললেন, "হে আল্লাহ, আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে রাখলাম; আপনিও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান।"'
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বললেন, 'ইশ্, যদি আমিই ওই কবরের ব্যক্তিটি হতাম!'¹
ইবনে হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তাকে "জুল বিজাদাইন" নামকরণ করার কারণ হলো, যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করার প্রতি আগ্রহী হলেন, তখন তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল এবং তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে তার শরীরের একটিমাত্র "বিজাদ” (একপ্রকার মোটা ও খসখসে চাদর) ছাড়া তার সবকিছু কেড়ে নিল। সেটি নিয়েই তিনি সেখান থেকে পালিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে রওনা দিলেন। যখন কাছাকাছি আসলেন, তখন চাদরটিকে দুই টুকরা করে একটি নিম্নবস্ত্র হিসেবে পরলেন এবং অপরটি ওপরের অংশে পরিধান করলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। এই কারণেই তাকে "জুল বিজাদাইন" বলা হয়।'²

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৫২৭।
২. সিরাতু ইবni হিশাম: ২/৫২৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন

📄 তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন


আসমা বিনতে আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যখন জুবাইরের (রা) সাথে আমার বিয়ে হয়, তখন তার কাছে কোনো ধনসম্পদ ছিল না। দাস-দাসীও ছিল না। শুধু কুয়ো থেকে পানি উত্তোলনকারী একটি উট ও একটি ঘোড়া ছিল। আমি তার ঘোড়াটি চরাতাম এবং পানি পান করাতাম। ঘোড়াটি পরিচর্যা করার চাইতে কোনো কাজ আমার কাছে অধিক কঠিন ছিল না। আমি তার জন্য ঘাস সংগ্রহ করতাম এবং তার পরিচর্যা ও দেখাশোনা করতাম। (...)' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু যুদ্ধবন্দী আনা হলে তিনি তাকে একটি দাসী দিলেন।' আসমা (রা) বলেন, 'দাসীটি ঘোড়ার দেখাশোনায় আমার জন্য যথেষ্ট হলো এবং আমি দায়িত্বমুক্ত হলাম।'¹
আরেক রিওয়ায়াতে আছে, 'অতঃপর আবু বকর (রা) ঘোড়া দেখাশোনা করার জন্য আমার সাহায্যার্থে একজন খাদিম পাঠালেন। তখন আমি যেন রেহাই পেলাম।'²
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উভয় রিওয়ায়াতের মাঝে এভাবে সমন্বয় করা যায় যে, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যুদ্ধবন্দীদের আনা হলো, তখন তিনি সেখান থেকে একটি খাদিম আবু বকর (রা)-কে দিলেন, যেন তিনি মেয়ে আসমা (রা)-এর কাছে তা পাঠিয়ে দেন। সুতরাং এ কথা সত্য যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই মূল দাতা, তবে তিনি আবু বকর (রা)-এর মাধ্যমে তা প্রদান করেছেন।'³

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৮২৩, সহিহু মুসলিম: ২১৮২।
২. সহিহুল বুখারি: ৫২২৪, সহিহু মুসলিম ২১৮২।
৩. ফাতহুল বারি: ৯/৩২৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের জিজ্ঞেস করতেন কোনো প্রয়োজন আছে কি না

📄 তাদের জিজ্ঞেস করতেন কোনো প্রয়োজন আছে কি না


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো এক মহিলা বা পুরুষ খাদিম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিমকে জিজ্ঞেস করতেন, "তোমার কি কোনো প্রয়োজন আছে?" একদিন খাদিম উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার প্রয়োজন আছে।” তিনি বললেন, "বলো, কী প্রয়োজন তোমার?" খাদিম বললেন, "আমার প্রয়োজন হলো, আপনি কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবেন।” তিনি বললেন, "এমন প্রয়োজনের কথা কে শিখিয়ে দিয়েছে তোমাকে?" খাদিম বললেন, "আমার রব।' তিনি বললেন, "হাঁ, এই প্রয়োজন ধরে রেখো। তবে (তোমার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য) তুমি অধিক সিজদার মাধ্যমে আমাকে সহযোগিতা কোরো।"'¹
রাবিআ (রা)-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করতাম এবং সারা দিন তাঁর প্রয়োজন পূরণ করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতাম। এমনকি যখন তিনি ইশার নামাজ পড়ার পর বাড়িতে প্রবেশ করে দরোজায় দাঁড়াতেন, তখন আমি মনে মনে চাইতাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো প্রয়োজন দেখা দিক (যেন আমি তা পূরণ করতে পারি)। তবে তখন তাঁকে শুধু "সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" বলতে শুনতাম। এতে একসময় আমার বিরক্তি এসে যেত, ফলে আমি ফিরে আসতাম। অথবা আমার চোখ লেগে আসত, ফলে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।'
তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খিদমতের প্রতি আমার আগ্রহ অনুধাবন করতে পারতেন বিধায় একদিন তিনি আমাকে বললেন, "হে রাবিআ, আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি একটু ভেবে দেখি, তারপর আপনাকে এ ব্যাপারে জানাব।” এরপর আমি চিন্তাভাবনা করে বুঝতে পারলাম যে, দুনিয়া অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আখিরাতের সফলতা চাইব। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। অতঃপর তাঁর কাছে আসলে তিনি জানতে চাইলেন, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার কাছে আমি এটা চাই যে, আপনি আপনার প্রভুর কাছে আমার জন্য সুপারিশ করবেন, তিনি যেন আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।” তিনি বললেন, "হে রাবিআ, তোমাকে এটি কে শিখিয়ে দিয়েছে?” আমি বললাম, "সেই সত্তার কসম-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমাকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাবান আপনার মতো মহান ব্যক্তি যখন আমাকে বললেন, "আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব", তখন আমি চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, দুনিয়া যেহেতু অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়-তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আখিরাতের সফলতাই চাইব।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ হয়ে গেলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, "আমি তা করব, তবে অধিক সিজদার (অধিক নামাজ পড়ার) মাধ্যমে আমাকে সহযোগিতা করতে হবে।"²

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৬৪৬।
২. মুসনাদু আহমাদ: ১৬১৪৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 গরিবদের মর্যাদা কথা বলতেন

📄 গরিবদের মর্যাদা কথা বলতেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গরিবদের ফজিলত এবং আল্লাহর কাছে তাদের বিশাল মর্যাদার কথা প্রকাশ করতেন, যেন দারিদ্র্যের কারণে কোনো মানুষ তাদের অবজ্ঞা না করে।
সাহল বিন সাদ আস-সায়িদি (রা) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট দিয়ে গমন করছিল, তখন তিনি বললেন, "এই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা?" তারা উত্তর দিলেন:
'যদি কোনো মহিলার প্রতি এ লোকটি বিয়ের প্রস্তাব পেশ করে, তার সাথে বিয়ে দেওয়া যায়। যদি সে সুপারিশ করে, তাহলে সুপারিশ গ্রহণ করা যায়। যদি কথা বলে, তবে কান লাগিয়ে শোনা উচিত।'
অতঃপর কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সেখান দিয়ে একজন গরিব মুসলমান অতিক্রম করতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা?" তারা জবাব দিলেন:
'যদি এ ব্যক্তি কোথাও বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তাকে বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। যদি কারও জন্য সুপারিশ করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। যদি কোনো কথা বলে, তা শোনা হবে না।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'পৃথিবী-ভর্তি ওই রকম ধনীর চেয়ে এই গরিব লোকটি উত্তম।'¹
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিস প্রমাণ করে, কেবল দুনিয়ার জীবনের নেতৃত্ব ও প্রাচুর্যের কোনো মূল্য নেই; আখিরাতের নেতৃত্ব ও প্রাচুর্যই মূল। আর কেউ দুনিয়ার প্রাচুর্য থেকে বঞ্চিত হলে আখিরাতের সাওয়াব দ্বারা তার ক্ষতিপূরণ করা হয়।'²
আবু জার (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আবু জার, তুমি কি মনে করো যে, ধনসম্পদের আধিক্যই ধনাঢ্যতা?" আমি বললাম, "হাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তিনি বললেন, "তুমি কি মনে করো, ধনসম্পদ কম হওয়াই দারিদ্র্য?" আমি বললাম, "হাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তিনি বললেন, "ধনাঢ্যতা হলো হৃদয়ের ধনাঢ্যতা; আর দারিদ্র্য হলো হৃদয়ের দারিদ্র্য।" অতঃপর আমাকে কুরাইশের এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, "অমুককে চেনো?” আমি বললাম, "হাঁ, চিনি।” তিনি বললেন, "তাকে কেমন মনে হয় তোমার?” আমি বললাম, "সে কিছু চাইলে তাকে দেওয়া উচিত, আর সে আগমন করলে তাকে (বাড়িতে) প্রবেশ করানো উচিত।"
তারপর আহলে সুফফার এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, "অমুককে চেনো?" আমি বললাম, "না, তাকে আমি চিনি না, ইয়া রাসুলাল্লাহ।” তখন তিনি তার আকার-আকৃতি ও গুণাবলি বর্ণনা করতে লাগলে আমি তাকে চিনতে পারলাম এবং বললাম, "জি, এখন চিনতে পেরেছি।” তখন তিনি বললেন, "তাকে কেমন মনে হয় তোমার?” আমি বললাম, "ও তো আহলে সুফফার এক হতদরিদ্র লোক।” তিনি বললেন, "সে সারা পৃথিবীর প্রথমোক্ত লোকের চেয়ে উত্তম।" আমি বললাম, "তাকে কি এমন কিছুই দেওয়া হয় না, যা প্রথমজনকে দেওয়া হয়?" তিনি বললেন, "তাকে কল্যাণকর যা দান করা হয়, সে তার যোগ্য; আর যেসব থেকে তাকে বঞ্চিত রাখা হয়, তার বিনিময়ে তাকে সাওয়াব দান করা হয়।"³
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'মাথায় উশকোখুশকো চুল ও দেহে ধুলোমলিন দুখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। বারা বিন মালিক (রা) তাদের দলভুক্ত।'⁴

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫০৯১।
২. ফাতহুল বারি: ১/২৭৮।
৩. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৬৮৫।
৪. সুনানুত তিরমিজি: ৩৮৫৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00