📄 গরিবদের স্মরণ করত এবং খোঁজখবর নিতেন
আবু উমামা সাহল বিন হানিফ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, 'এক অসহায় মহিলা অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার অসুস্থতা সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসহায় ও নিঃস্বদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি সে (অসহায় মহিলা) মারা যায়, তবে আমাকে সংবাদ দিয়ো।” (অতঃপর সে মারা গেলে) রাতেই তার জানাজা পড়া হলো। সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাগানো সমীচীন মনে করলেন না। সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঘটনা জানানো হলে তিনি বললেন, "আমি কি তোমাদের আমাকে সংবাদ দিতে বলিনি?" তাঁরা বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা আপনাকে রাতে জাগানো সমীচীন মনে করিনি।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কবরের পাশে গিয়ে লোকজন নিয়ে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ালেন এবং চারটি তাকবির বললেন (জানাজার নামাজ পড়লেন)।'¹
টিকাঃ
১. মুয়াত্তা মালিক: ৫৩১, সুনানুন নাসায়ি ১৯০৭। এমন ঘটনা সহিহ বুখারিতে (৪৮৫) ও সহিহ মুসলিমে (৯৫৬) আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে।
📄 একেবারে রিক্তহস্ত গরিব যারা, তাদের গুরুত্ব দিতেন
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাবুক অভিযানের সময় একদিন মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। সেনাছাউনির একপার্শ্বে আগুন জ্বলতে দেখে আমি সেদিকে গেলাম। সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-কে দেখতে পেলাম। আরও দেখতে পেলাম যে, আব্দুল্লাহ জুল বিজাদাইন আল-মুজানি (রা) ইনতিকাল করেছেন এবং তাঁরা তার জন্য কবর খনন করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে অবতরণ করলেন আর আবু বকর (রা) ও উমর (রা) তাকে তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের ভাইকে আমার হাতে দাও।” তাঁরা তাঁর হাতে তুলে দিলেন। অতঃপর তাকে একপার্শ্বের ওপর কবরে রাখার পর বললেন, "হে আল্লাহ, আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে রাখলাম; আপনিও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান।"'
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বললেন, 'ইশ্, যদি আমিই ওই কবরের ব্যক্তিটি হতাম!'¹
ইবনে হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তাকে "জুল বিজাদাইন" নামকরণ করার কারণ হলো, যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করার প্রতি আগ্রহী হলেন, তখন তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল এবং তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে তার শরীরের একটিমাত্র "বিজাদ” (একপ্রকার মোটা ও খসখসে চাদর) ছাড়া তার সবকিছু কেড়ে নিল। সেটি নিয়েই তিনি সেখান থেকে পালিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে রওনা দিলেন। যখন কাছাকাছি আসলেন, তখন চাদরটিকে দুই টুকরা করে একটি নিম্নবস্ত্র হিসেবে পরলেন এবং অপরটি ওপরের অংশে পরিধান করলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। এই কারণেই তাকে "জুল বিজাদাইন" বলা হয়।'²
টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/৫২৭।
২. সিরাতু ইবni হিশাম: ২/৫২৭।
📄 তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন
আসমা বিনতে আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যখন জুবাইরের (রা) সাথে আমার বিয়ে হয়, তখন তার কাছে কোনো ধনসম্পদ ছিল না। দাস-দাসীও ছিল না। শুধু কুয়ো থেকে পানি উত্তোলনকারী একটি উট ও একটি ঘোড়া ছিল। আমি তার ঘোড়াটি চরাতাম এবং পানি পান করাতাম। ঘোড়াটি পরিচর্যা করার চাইতে কোনো কাজ আমার কাছে অধিক কঠিন ছিল না। আমি তার জন্য ঘাস সংগ্রহ করতাম এবং তার পরিচর্যা ও দেখাশোনা করতাম। (...)' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু যুদ্ধবন্দী আনা হলে তিনি তাকে একটি দাসী দিলেন।' আসমা (রা) বলেন, 'দাসীটি ঘোড়ার দেখাশোনায় আমার জন্য যথেষ্ট হলো এবং আমি দায়িত্বমুক্ত হলাম।'¹
আরেক রিওয়ায়াতে আছে, 'অতঃপর আবু বকর (রা) ঘোড়া দেখাশোনা করার জন্য আমার সাহায্যার্থে একজন খাদিম পাঠালেন। তখন আমি যেন রেহাই পেলাম।'²
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উভয় রিওয়ায়াতের মাঝে এভাবে সমন্বয় করা যায় যে, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যুদ্ধবন্দীদের আনা হলো, তখন তিনি সেখান থেকে একটি খাদিম আবু বকর (রা)-কে দিলেন, যেন তিনি মেয়ে আসমা (রা)-এর কাছে তা পাঠিয়ে দেন। সুতরাং এ কথা সত্য যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই মূল দাতা, তবে তিনি আবু বকর (রা)-এর মাধ্যমে তা প্রদান করেছেন।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৮২৩, সহিহু মুসলিম: ২১৮২।
২. সহিহুল বুখারি: ৫২২৪, সহিহু মুসলিম ২১৮২।
৩. ফাতহুল বারি: ৯/৩২৪।
📄 তাদের জিজ্ঞেস করতেন কোনো প্রয়োজন আছে কি না
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো এক মহিলা বা পুরুষ খাদিম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিমকে জিজ্ঞেস করতেন, "তোমার কি কোনো প্রয়োজন আছে?" একদিন খাদিম উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার প্রয়োজন আছে।” তিনি বললেন, "বলো, কী প্রয়োজন তোমার?" খাদিম বললেন, "আমার প্রয়োজন হলো, আপনি কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবেন।” তিনি বললেন, "এমন প্রয়োজনের কথা কে শিখিয়ে দিয়েছে তোমাকে?" খাদিম বললেন, "আমার রব।' তিনি বললেন, "হাঁ, এই প্রয়োজন ধরে রেখো। তবে (তোমার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য) তুমি অধিক সিজদার মাধ্যমে আমাকে সহযোগিতা কোরো।"'¹
রাবিআ (রা)-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করতাম এবং সারা দিন তাঁর প্রয়োজন পূরণ করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতাম। এমনকি যখন তিনি ইশার নামাজ পড়ার পর বাড়িতে প্রবেশ করে দরোজায় দাঁড়াতেন, তখন আমি মনে মনে চাইতাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো প্রয়োজন দেখা দিক (যেন আমি তা পূরণ করতে পারি)। তবে তখন তাঁকে শুধু "সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" বলতে শুনতাম। এতে একসময় আমার বিরক্তি এসে যেত, ফলে আমি ফিরে আসতাম। অথবা আমার চোখ লেগে আসত, ফলে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।'
তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খিদমতের প্রতি আমার আগ্রহ অনুধাবন করতে পারতেন বিধায় একদিন তিনি আমাকে বললেন, "হে রাবিআ, আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি একটু ভেবে দেখি, তারপর আপনাকে এ ব্যাপারে জানাব।” এরপর আমি চিন্তাভাবনা করে বুঝতে পারলাম যে, দুনিয়া অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আখিরাতের সফলতা চাইব। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। অতঃপর তাঁর কাছে আসলে তিনি জানতে চাইলেন, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার কাছে আমি এটা চাই যে, আপনি আপনার প্রভুর কাছে আমার জন্য সুপারিশ করবেন, তিনি যেন আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।” তিনি বললেন, "হে রাবিআ, তোমাকে এটি কে শিখিয়ে দিয়েছে?” আমি বললাম, "সেই সত্তার কসম-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমাকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাবান আপনার মতো মহান ব্যক্তি যখন আমাকে বললেন, "আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব", তখন আমি চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, দুনিয়া যেহেতু অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়-তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আখিরাতের সফলতাই চাইব।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ হয়ে গেলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, "আমি তা করব, তবে অধিক সিজদার (অধিক নামাজ পড়ার) মাধ্যমে আমাকে সহযোগিতা করতে হবে।"²
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৬৪৬।
২. মুসনাদু আহমাদ: ১৬১৪৩।