📄 নিজে সাহায্য করতে না পারলে অন্যের কাছে পাঠাতেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, "আমি খুব ক্ষুধার্ত।” তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন, "সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।” তিনি অন্য এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনিও একই কথা বললেন। এভাবে তাঁরা সকলে একই কথা বললেন, 'সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমার নিকট পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'কোনো ব্যক্তি কি নেই, যে আজ রাতে লোকটির মেহমানদারি করবে? আল্লাহ তার ওপর রহম করবেন।'
এ সময় জনৈক আনসারি ব্যক্তি (রা) উঠে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি করব।” এ বলে তিনি মেহমানকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেহমানকে সম্মান করো।” স্ত্রী বললেন, "বাচ্চাদের খাবার ব্যতীত আমাদের ঘরে তো আর কিছুই নেই।” আনসারি (রা) বললেন, "তুমি আহার প্রস্তুত করো এবং চেরাগ জ্বালিয়ে রাখো। আর বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। আর যখন মেহমান প্রবেশ করবেন, তখন চেরাগ সেখানে রাখবে। তাকে বোঝাবে যে, আমরাও আহার করছি। মেহমান যখন খাওয়া শুরু করবে, তখন তুমি চেরাগের কাছে গিয়ে সেটা নিভিয়ে দেবে।"
(স্বামীর কথা অনুযায়ী) স্ত্রী চেরাগ জ্বালালেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়ালেন এবং সামান্য খাবার যা ছিল, তা উপস্থিত করলেন। (তারপর মেহমানসহ তারা খেতে বসলেন।) তখন চেরাগ ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে তা নিভিয়ে দিলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে থাকলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। এভাবে তারা উভয়ে (বাচ্চারাসহ) সারা রাত ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকলেন। সকালে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, "আল্লাহ তাআলা তোমাদের গতকালের কার্যকলাপ দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা (বলেছেন) খুশি হয়েছেন।” এবং আয়াত নাজিল করেছেন:
'(আনসারদের অন্যতম গুণ হলো এই) তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।'¹-²
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অভিন্ন প্রয়োজন নিয়ে দুই ব্যক্তি আগমন করলেন। তাদের একজন কথা বললেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখ থেকে দুর্গন্ধ পেলেন। তিনি বললেন, "তুমি কি মিসওয়াক করো না?" লোকটি বললেন, "অবশ্যই করি, কিন্তু (দুর্গন্ধ বের হওয়ার কারণ হলো) আমি তিন দিন ধরে খানা খাইনি।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সাহাবিকে (রা) নির্দেশ দিলে তিনি তাদের নিয়ে গেলেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দিলেন।'³
টিকাঃ
১. সুরা আল-হাশর: ৯।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৭৯৮, সহিহু মুসলিম: ২০৫৪।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ২৪০৫।
📄 তাদের কষ্ট ভাগ করে নিতেন
সিমাক বিন হারব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নুমান (রা)-কে বক্তৃতারত অবস্থায় আমি বলতে শুনেছি, উমর (রা) বলেছেন:
'মানুষ কী পরিমাণ দুনিয়া কামাই করেছে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি দেখেছি যে, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় সারা দিন অস্থির থ াকতেন। পেট ভরার মতো নিম্নমানের একটি খেজুরও তিনি (খেতে) পেতেন না।'¹
আবু হাজিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আবু হুরাইরা (রা)-কে তাঁর আঙুল দ্বারা কয়েকবার ইশারা করে বলতে শুনেছি-
'সেই সত্তার কসম-যার হাতে আবু হুরাইরা (রা)-এর প্রাণ, লাগাতার তিন দিন পর্যন্ত আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার গমের রুটি দ্বারা কখনো পরিতৃপ্ত হননি। এমতাবস্থায় তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন।'²
সহিহ বুখারির বর্ণনায় আছে-
'মৃত্যু পর্যন্ত কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার লাগাতার তিন দিন পরিপূর্ণ তৃপ্তিভরে খাবার খাননি।'³
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, 'তিনি উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বললেন:
'ভাগিনা, আমরা (মাসের) নতুন চাঁদ দেখতাম, আবার নতুন চাঁদ দেখতাম। এভাবে দুই মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো ঘরেই (চুলায়) আগুন জ্বালানো হতো না।'
উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি জিজ্ঞেস করলাম, "খালা, আপনারা তাহলে কী খেয়ে জীবনযাপন করতেন?" তিনি বললেন:
'দুটি কালো জিনিস অর্থাৎ খেজুর আর পানি খেয়েই আমরা জীবনযাপন করতাম। অবশ্য কয়েক ঘর আনসারি পরিবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিবেশী ছিল। তাঁদের কিছু হাদিয়ার উটনী ও বকরি ছিল। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য দুধ হাদিয়া পাঠাত। তিনি আমাদের তা পান করতে দিতেন।'⁴
'হাদিয়ার পশু' বলে বোঝানো হচ্ছে, এমন সব পশু যেগুলোকে মালিক কিছুদিনের জন্য অন্যকে হাদিয়াস্বরূপ দিয়ে দেয়। আর সে পশুর দুধ, বাচ্চা ও পশম থেকে লোকটি উপকৃত হয়। তারপর নির্দিষ্ট সময় পর মালিককে আবার ফেরত দেয়।
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
'যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকাল করেন, তখন আমার পাত্রে সামান্য কিছু যব ব্যতীত কোনো কলিজাধারী (প্রাণী) খেতে পারে-এমন কিছু ছিল না। আমি তা থেকে (পরিমাপ না করে) খেতাম। এভাবে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমি তা পরিমাপ করে দেখলাম। ফলে তা শেষ হয়ে গেল।'⁵
আয়িশা (রা) বলেন:
'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের লোকেরা একদিনে দুবেলা খাবার খেলে একবেলায় কেবল খেজুর থাকত।'⁶
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা)-এর সূত্রে খন্দক খনন করার ঘটনা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, 'খন্দক যুদ্ধের দিন আমরা পরিখা খনন করেছিলাম। এ সময় একখণ্ড শক্ত পাথর বেরিয়ে আসলে (যা ভাঙা যাচ্ছিল না) সকলেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "খন্দকের মাঝে একখণ্ড শক্ত পাথর বেরিয়েছে (আমরা তা ভাঙতে পারছি না)।” এ কথা শুনে তিনি বললেন, "আমি নিজেই খন্দকে অবতরণ করব।” এরপর তিনি দাঁড়ালেন। এ সময় তাঁর পেটে একটি পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তিন দিন পর্যন্ত অনাহারী ছিলাম। কোনো কিছুর স্বাদও গ্রহণ করিনি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একখানা কোদাল হাতে নিয়ে প্রস্তরখণ্ডে আঘাত করলেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তা চূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হলো...।'⁷
আবু তালহা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ক্ষুধার অভিযোগ করলাম এবং আমাদের পেটের কাপড় সরিয়ে প্রত্যেকের পেটে একটি করে পাথর (বাঁধা) দেখালাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পেটের কাপড় সরিয়ে দুটি পাথর (বাঁধা) দেখালেন।'⁸
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২৯৭৮।
২. সহিহু মুসলিম: ২৯৭৬।
৩. সহিহুল বুখারি: ৫৩৭৪।
৪. সহিহুল বুখারি: ৫৩৭৪, সহিহু মুসলিম: ২৯৭২।
৫. সহিহুল বুখারি: ৬৪৫১, সহিহু মুসলিম: ২৯৭৩।
৬. সহিহুল বুখারি: ৬৪৫৫।
৭. সহিহুল বুখারি ৪১০১, সহিহু মুসলিম: ২০৩৯।
৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৭১।
📄 গরিবদের সাথে মিলেমিশে থাকতে নির্দেশ দিতেন
বিশিষ্ট তাবি তাবিয়ি উসমান বিন ইয়ামান (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মদিনাতে যখন মুহাজিরদের সংখ্যা বেড়ে গেল, তখন তাঁদের অনেকে থাকার জন্য ঘর বা স্থান পাননি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করলেন এবং তাঁদের নামকরণ করলেন "আসহাবে সুফফা”। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতার সাথে ওঠাবসা ও মেলামেশা করতেন।'¹
তাঁদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আন্তরিক ওঠাবসা তাঁদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ। এটা মূলত আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত নির্দেশের আনুগত্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ডাকে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফিল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার অনুগত্য করবেন না।'²
সাদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সকল উম্মতকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নিজেদেরকে সৎকর্মশীল মুমিন বান্দাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখেন, যারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদতে মাশগুল থাকে। হোক তারা গরিব, তবুও তাদের সাথে উত্তমরূপে মেলামেশা ও ওঠাবসা বজায় রাখতে হবে। কারণ, তাদের সংসর্গে অগণিত উপকারিতা রয়েছে।'
'তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না'- অর্থাৎ সর্বদা তাদের প্রতি খেয়াল রাখবেন এবং কখনো তাদের ব্যাপারে চিন্তা-ফিকির করা বাদ দেবেন না।
'আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে'- কারণ, পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে একনিষ্ঠ সৎকর্মশীল মুমিনদের সংসর্গ পরিত্যাগ করলে অনেক অপকারিতা বয়ে আনে এবং অনেক দ্বীনি ক্ষতি সাধিত হয়। কেননা, তা অন্তরকে দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করে বিধায় সকল ধ্যান-জ্ঞান দুনিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এবং কলব থেকে আখিরাতের প্রতি আগ্রহ চলে যায়। কারণ, দুনিয়ার চাকচিক্য চোখ অন্ধ করে দেয়, বিবেককে অকেজো করে দেয়; ফলে হৃদয় আল্লাহর জিকির থেকে গাফিল হয়ে পড়ে এবং অবৈধ স্বাদ ও আসক্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, স্থায়ীভাবে লজ্জিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।
'যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে'- অর্থাৎ প্রবৃত্তি যা চায়, তা-ই করে; যদিও তাতে ধ্বংস ও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। প্রবৃত্তিকেই সে নিজের মাবুদ বানিয়ে নেয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
'আপনি কি তার প্রতি লক্ষ করেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনেশুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা করো না?'³
'যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা'- অর্থাৎ যার পার্থিব ও দ্বীনি সকল বিষয় কল্যাণবঞ্চিত। এ ধরনের লোকের আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তার আনুগত্য তার অনুসরণের দিকে নিয়ে যায় এবং সে তার অনুগত ব্যক্তিকেও তারই মতো করার চেষ্টা করে।⁴
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন:
'আর তাদের বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যা স্বীয় পালনকর্তাকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও আপনার দায়িত্বে নয় এবং আপনার হিসাব বিন্দুমাত্রও তাদের দায়িত্বে নয় যে, আপনি তাদের বিতাড়িত করবেন। নতুবা আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।'⁵
সাদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অর্থাৎ অন্য লোকদের আপনার মজলিসে জায়গা দেওয়ার জন্য আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদতকারী লোকদের আপনার মজলিস থেকে বিতাড়িত করবেন না। কেননা, তারা ইবাদত, জিকির, নামাজ ইত্যাদির মাধ্যমে সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহকে ডাকে। তারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করে; ইবাদতের মাধ্যমে তারা পার্থিব স্বার্থ অন্বেষণ করে না। কাজেই তাদের এড়িয়ে চলা ও বিতাড়ন করা যাবে না; বরং তাদের ভালোবাসতে হবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে হবে এবং তাদের কাছাকাছি রাখতে হবে। কারণ, তারা গরিব হতে পারে, কিন্তু তারা সৃষ্টির সেরা ও বাছাই করা জীব। মানুষের দৃষ্টিতে তারা নিম্নশ্রেণির লোক হলেও বাস্তবে তারা উচ্চশ্রেণির লোক।'
"তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও আপনার দায়িত্বে নয় এবং আপনার হিসাব বিন্দুমাত্রও তাদের দায়িত্বে নয়"-অর্থাৎ যার যার ভালো-মন্দের হিসাব তার তার থেকে নেওয়া হবে। তাই তাদের বিতাড়িত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবুও যদি আপনি তা করেন, তাহলে আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। আল্লাহর এই নির্দেশ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তিনি যখন দরিদ্র শ্রেণির মুমিনদের সাথে বসতেন, তখন ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতেন। তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। বিনয় ও নম্রতা প্রদর্শন করতেন। তাদের প্রতি উত্তম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন এবং তাদের তাঁর কাছাকাছি বসাতেন। শুধু তা-ই নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মজলিসে গরিব শ্রেণির লোকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল।⁶
এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পটভূমি হলো, আরবের উচ্চবিত্ত লোকদের এক দল ইসলামের দাওয়াত কবুল করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। এর কারণ হিসেবে তারা জানাল, 'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিলাল (রা), সুহাইব (রা), আম্মার (রা), খাব্বাব (রা), সালমান (রা) ও ইবনে মাসউদ (রা) প্রমুখের মতো নিতান্ত দরিদ্র শ্রেণির লোকদের আসা-যাওয়া আছে। দারিদ্র্যের কারণে তাদের শরীরের কাপড় থেকে ঘামের দুর্গন্ধ বের হয়। এমন লোকদের সাথে কুরাইশের মহান মহান নেতারা কী করে একই মজলিসে বসতে পারে!?' তাই তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুরোধ করল, তিনি যেন এই দরিদ্র শ্রেণির লোকদের তাঁর কাছ থেকে তাড়িয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দিলেন এবং বললেন:
'আমি কিন্তু ইমানদারদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা অবশ্যই তাদের পালনকর্তার সাক্ষাৎ লাভ করবে। বরং তোমাদেরই আমি অজ্ঞ সম্প্রদায় হিসেবে দেখছি।'⁷
তখন তারা সুর পাল্টিয়ে অনুরোধ করল, 'তাহলে তাদের জন্য আলাদা মজলিসের ব্যবস্থা করা হোক এবং উচ্চবিত্ত লোকদের জন্য আলাদা মজলিসের ব্যবস্থা করা হোক, যেখানে দরিদ্র শ্রেণির লোক থাকবে না। যেন জাহিলি সমাজের মতো ইসলামি সমাজেও কুরাইশ নেতাদের আভিজাত্য, বিশেষত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ইসলামে দীক্ষিত করার আশায় তাদের অনুরোধে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। তখন আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ হলো:
'আর তাদের বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যা স্বীয় পালনকর্তাকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও আপনার দায়িত্বে নয় এবং আপনার হিসাব বিন্দুমাত্রও তাদের দায়িত্বে নয় যে, আপনি তাদের বিতাড়িত করবেন। নতুবা আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।'⁸
ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, 'কুরাইশের একটি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে সুহাইব (রা), বিলাল (রা), আম্মার (রা), খাব্বাব (রা)-সহ আরও কয়েকজন গরিব মুসলমান বসা ছিলেন। তা দেখে তারা বলল, "হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তোমার সম্প্রদায় থেকে এই (নিম্নশ্রেণির) লোকদের নিয়েই কি তুমি সন্তুষ্ট? এরাই কি সেই লোক, আমাদের মধ্য থেকে যাদের আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন? আমাদের কি এমন লোকদের অনুসরণ করতে হবে? তুমি তাদের তাড়িয়ে দাও, তখন আমরা তোমাকে অনুসরণ করার কথা ভেবে দেখব।" তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করলেন:
'আর তাদের বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যা স্বীয় পালনকর্তাকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে...।'⁹
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করেন, 'একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমি, ইবনে মাসউদ (রা), হুজাইল গোত্রের এক ব্যক্তি, বিলাল (রা), আরও দুজন লোক যাদের নাম আমি জানি না-মোট ছয়জন ছিলাম। তখন মুশরিকরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, "এদের তাড়িয়ে দাও; আমাদের ওপর স্পর্ধা দেখানোর অধিকার তাদের নেই।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে মনে কী যেন ভাবছিলেন, তখনই আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করলেন:
'আর তাদের বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যা স্বীয় পালনকর্তাকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে...।'¹⁰
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একদা দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, "ধনী লোকেরা উচ্চ মর্যাদা ও নিয়ামত নিয়ে গেল।” তিনি বললেন, "তা কেমন করে?" তারা বললেন, "তারা নামাজ আদায় করে যেরূপ আমরা নামাজ আদায় করি, তারা রোজা রাখে যেরূপ আমরা রোজা রাখি। কিন্তু তারা সাদাকা করে, আমরা সাদাকা করতে পারি না। তারা (দাস-দাসী) আজাদ করে, আমরা আজাদ করতে পারি না।” (সহিহ বুখারির বর্ণনায়: “তাদের সম্পদ বেশি, তাই তারা হজ করতে পারে, উমরা করতে পারে, জিহাদ করতে পারে এবং সাদাকা করতে পারে।") রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমি কি তোমাদের এমন কিছু শিক্ষা দেবো না, যার দ্বারা তোমরা তোমাদের অগ্রগামীদের মর্যাদা লাভ করবে এবং অন্যদের থেকে অগ্রগামী থাকবে; আর তোমাদের অপেক্ষা কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারবে না-অবশ্য যারা তোমাদের মতো করবে, তাদের কথা ভিন্ন?'
তারা বললেন, "নিশ্চয়ই, ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তিনি বললেন:
'প্রত্যেক (ফরজ) নামাজের পর তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার এবং তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ বলবে।'
এরপর দরিদ্র মুহাজিররা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে এলেন এবং বললেন, "আমাদের ধনী ভাইয়েরা আমাদের আমলের বিষয়টি শুনে ফেলেছেন এবং তারাও আমাদের মতো আমল করা শুরু করেছেন।" তিনি বললেন:
'এটা আল্লাহর দান-তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।'¹¹
টিকাঃ
১. বাইহাকি: ৪১৩৫।
২. সুরা আল-কাহফ, ১৮: ২৮।
৩. সুরা আল-জাসিয়া, ৪৫: ২৩।
৪. তাফসিরুস সাদি: ১/৪৭৫।
৫. সুরা আল-আনআম, ৬: ৫২।
৬. তাফসিরুস সাদি: ১/২৫৭।
৭. সুরা হুদ, ১১: ২৯।
৮. সুরা আল-আনআম, ৬: ৫২।
৯. তাফসিরুত তাবারি: ১১/৩৭৪।
১০. সহিহু মুসলিম: ২৪১৩।
১১. সহিহুল বুখারি: ৮৪৩, সহিহু মুসলিম: ৫৯৫।
📄 আল্লাহর কাছে গরিব ও নিঃস্বদের ভালোবাসা কামনা করতেন
নামাজের মধ্যে তিনি দোয়া করতেন:
'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে সৎকর্ম করা ও মন্দকর্ম পরিত্যাগ করার তাওফিক কামনা করছি। আপনার কাছে নিঃস্বদের ভালোবাসা কামনা করছি। আর আপনি যখন আপনার বান্দাদের সাথে ফিতনার ইচ্ছা করবেন, তখন আমাকে আপনার কাছে তুলে নিয়েন, যেন ফিতনায় জড়িয়ে না পড়ি।'¹
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ৩২৩৩।