📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অভাবগ্রস্তদের দান করতে সাহাবিগণকে উৎসাহিত করতেন

📄 অভাবগ্রস্তদের দান করতে সাহাবিগণকে উৎসাহিত করতেন


আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত যে, 'আসহাবে সুফফার সদস্যরা খুবই দরিদ্র লোক ছিলেন। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যার কাছে দুজনের খাবার আছে, সে তিনজন নিয়ে যাও; আর যার কাছে চারজনের খাবার আছে, সে পাঁচ কি ছয়জন নিয়ে যাও।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশজন সাথে নিয়ে আসেন এবং আবু বকর (রা) তিনজন নিয়ে আসেন।'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আমাদের ঘরে ও আবু বকর (রা)-এর ঘরে আমি, আমার পিতা, মাতা, আমার স্ত্রী ও খাদিম ছিলাম। আমার পিতা রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতেন। তিনি সেখানে চলে গেলেন আর আমাকে বলে গেলেন, "হে আব্দুর রহমান, আমি ফেরার পূর্বেই মেহমানদের আপ্যায়ন সম্পন্ন করে নিয়ো।" সন্ধ্যা হলে আমি মেহমানদের খাবারের ব্যবস্থা করলে তারা খেতে অসম্মতি জানালেন। তারা বললেন, "বাড়ির কর্তা আসুক, তারপর একসাথে খাব।” আমি তাদের বললাম, "তিনি খুব কড়া মানুষ, আপনারা না খেলে তিনি আমাকে মারবেন।” কিন্তু তারা তবুও খেতে অস্বীকৃতি জানালেন।'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আবু বকর (রা) ওই রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে রাতের খাবার খেয়ে নিলেন এবং ইশার নামাজ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। ইশার নামাজের পর পুনরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে গমন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তন্দ্রা আসা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন। অবশেষে অনেক রাত পর বাড়িতে আসলেন। স্ত্রী (উম্মে আব্দুর রহমান রা) বললেন, "মেহমান পাঠিয়ে এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?" তিনি বললেন, "তাদের এখনো খানা দাওনি?” স্ত্রী বললেন, "আপনাকে ছাড়া তারা খাবেন না। অনেক অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু তারা আপন সিদ্ধান্তে অনড়।"'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আমি (অবস্থা বেগতিক দেখে) তাড়াতাড়ি কেটে পড়লাম।'
তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে "ওহে নির্বোধ, মাথামোটা!" এ বলে আমাকে অনেক শাসালেন আর বললেন, "ওহে নির্বোধ, তোমাকে আমি কসম দিয়ে বলছি, এখানে আসো, আমার কথা শোনো।” আমি এসে বললাম, "আমার কোনো অপরাধ নেই। আপনার মেহমানদের জিজ্ঞেস করেই দেখুন যে, আমি তাদের খাবার পরিবেশন করেছিলাম, কিন্তু তারাই আপনাকে ছাড়া খেতে অস্বীকার করেছেন।” মেহমানগণ বললেন, "ও আপনাকে সত্য কথাই বলেছে।” তিনি বললেন, "আপনাদের অবশ্যই আমার মেহমানদারি কবুল করতে হবে, তবে কসম আল্লাহর, আজ রাতে আমি আর খাব না।” তারা বললেন, "আল্লাহর কসম, আপনি না খেলে আমরা খাবার মুখে দেবো না।” আবু বকর (রা) বললেন, "(আমার শপথ) শয়তানের পক্ষ থেকে এসেছে।” অতঃপর তিনি খানা আনলেন এবং আল্লাহর নাম নিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। মেহমানরাও তাঁর সাথে খেলেন।'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা পাত্র থেকে একটি লুকমা নিলেই নিচ থেকে তার চেয়ে খাবার বেড়ে যেতে লাগল। এমনকি আমরা সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলাম, তখনও পূর্বের চেয়ে অধিক খাবার অবশিষ্ট রয়ে গেল। আবু বকর (রা) খাবারের প্রতি তাকালেন। তখন তাঁর কাছে খাবার পূর্বের ন্যায় অবশিষ্ট আছে বা তার চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মনে হলো। তা দেখে স্ত্রীকে বললেন, "কী ব্যাপার, হে বনু ফিরাসের বোন?" তিনি বললেন, "আমার চোখের প্রশান্তির কসম, এখন এ তো খেতে শুরু করার আগের চেয়ে অনেক বেশি!" অতঃপর তিনি তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে গেলেন। তখনও খাবারের পাত্র পূর্বের মতো পূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, (এ খাবার খেয়ে) তারা পুণ্য অর্জন করেছে, কিন্তু আমি শপথ ভঙ্গ করেছি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না, বরং তুমিই তাদের চেয়ে পুণ্যবান ও উত্তম। কারণ, তুমি তোমার সেই শপথ ভঙ্গ করেছ, যা ভঙ্গ করা তোমার জন্য উচিত ও কল্যাণকর ছিল। সুতরাং এ দিক দিয়ে তুমি তাদের চেয়ে উত্তম কাজ করেছ।"'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আমাদের (মুসলমানদের) ও অন্য একটি গোত্রের মধ্যে সন্ধি ছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াতে তাদের মোকাবেলা করার জন্য আমাদের বারোজনকে নেতা মনোনীত করা হলো। প্রত্যেক নেতার অধীনে আবার কয়েকজন করে লোক ছিল। আল্লাহই ভালো জানেন, তাদের প্রত্যেকের সাথে কতজন করে দেওয়া হয়েছিল। এ খাবার তাদের নিকট পাঠানো হলে তাদের প্রত্যেকেই তা থেকে আহার করলেন।'¹
হাদিস থেকে শিক্ষা:
তৃপ্তিভরে খাওয়ার ক্ষেত্রে গরিবদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা মুসতাহাব। এ জন্য যার কাছে দুজনের খাবার আছে, তাকে তিনজন নিয়ে যেতে এবং যার কাছে চারজনের খাবার আছে, তাকে পাঁচজন নিয়ে যেতে আদেশ করেছেন।
আল্লাহর বন্ধুদের প্রতি তাঁর অসীম করুণার প্রমাণ।
অগ্রাধিকার দেওয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করার ফজিলত। আর যখন মেহমানের সংখ্যা বেশি হয়, তখন সমাজের লোকদের উচিত হলো, মেহমানদের ভাগ করে নেওয়া এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়িতে মেহমান নিয়ে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে সমাজের নেতা তার জন্য নির্দেশ প্রদান করবেন এবং তিনিও যথাসাধ্য মেহমান নিয়ে যাবেন।
গরিবদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়লে মসজিদে আশ্রয় নেবে। তবে শর্ত হলো, এতে মুসল্লিদের ওপর সাহায্য করার ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
কঠিন ক্ষুধার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করা।
স্ত্রী, সন্তান ও মেহমানদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবারের ব্যবস্থা করে তাদের নিকট থেকে অনুপস্থিত থাকা বৈধ।
(গৃহকর্তার সাধারণ অনুমতি থাকলে) গৃহকর্ত্রী গৃহকর্তার বিশেষ অনুমতি ব্যতীত মেহমানের জন্য খাবার পরিবেশন করতে পারবে।
শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং ভালো কাজের অনুশীলন করানোর স্বার্থে পিতা তার সন্তানদের শাসাতে পারবে।
বৈধ কাজ না করার ওপর শপথ করা জায়িজ।
সত্যবাদী পুরুষ শপথের মাধ্যমে তার সংবাদকে পোক্ত করে।
শপথের পর তা ভঙ্গ করা বৈধ।
বরকত প্রকাশ পাওয়া খাদ্য বড়দের সমীপে পাঠানো এবং তারা তা গ্রহণ করা।
প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে কাজ করা। কারণ আবু বকর (রা) ধারণা করেছিলেন যে, আব্দুর রহমান (রা) প্রবল মেহমানদারি করার ক্ষেত্রে শিথিলতা করেছেন। তাই বাড়িতে এসেই তাকে বকলেন। আব্দুর রহমান (রা)-এর চুপিসারে কেটে পড়া তার ধারণাকে আরও প্রবল করেছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক ফজিলতপূর্ণ বিষয় অবলম্বন করতেন এবং বদান্যতার প্রতি সবার আগে অগ্রসর হতেন। ওই রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে মেহমানের সংখ্যা তাঁর পরিবারের সদস্যসংখ্যার প্রায় সমান ছিল।²

টিকাঃ
১. পুরা ঘটনাটি সহিহ বুখারির কয়েকটি রিওয়ায়াত (৬০২, ৩৫৮১, ৬১৪১); সহিহ মুসলিমের ২০৭৫ ও মুসনাদে আহমাদের ১৭১৪ নং রিওয়ায়াতের সমন্বয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২. ফাতহুল বারি (ইবনে হাজার) ৬/৬০০, ফাতহুল বারি (ইবনে রজব): ৪/১৭৫, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দরিদ্রদের মাঝে নিজের খাবার ভাগ করে দিতেন

📄 দরিদ্রদের মাঝে নিজের খাবার ভাগ করে দিতেন


মিকদাদ বিন আমর (রা) বলেন, 'আমি ও আমার এক বন্ধু (মদিনায়) এলাম। ক্ষুধার তাড়নায় আমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল। আমরা মানুষের কাছে নিজেদের পেশ করতে লাগলাম। কেউই আমাদের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করল না। অতঃপর আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। লোকদের নিকট গিয়েছিলাম, কেউ আমাদের মেহমানদারি করতে রাজি হয়নি। তাই আপনার নিকট আসলাম।" তখন তিনি আমাদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনটি মেষ ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা ভাগ করে পান করব।” এরপর থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ পান করত। আর আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তাঁর অংশ তুলে রাখতাম।'
মিকদাদ (রা) বলেন, 'তিনি রাতে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম দিতেন, যাতে ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হয় আর জাগ্রত ব্যক্তি শুনতে পায়। এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন এবং ফিরে এসে দুধ পান করতেন। এক রাতে আমার কাছে শয়তান এল। আমি তখন আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারিদের কাছে গেলে তারা তাকে হাদিয়া দিয়ে থাকে এবং তাদের কাছে তিনি খেয়েও থাকেন। তার এ সামান্য দুধের প্রয়োজন নেই।” তখন আমি এসে সেটুকুও পান করে ফেললাম। দুধ যখন ভালোভাবে আমার পেটে প্রবেশ করল এবং আমি বুঝলাম, এ দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই, তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, "তোমার সর্বনাশ হোক তুমি কী কাণ্ড করলে! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি এসে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার ওপর বদদোয়া করবেন। তাতে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তোমার দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ হয়ে যাবে।" আমার গায়ে ছিল একটা চাদর। এটি এত ছোট যে পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে আবার মাথা আবৃত করতে গেলে পা দেখা যায়। আমার ঘুম আসছিল না। আমার সঙ্গীদ্বয় ঘুমাচ্ছিল। তারা তো আমার মতো কাজ করেনি।'
এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে যেভাবে সালাম দিতেন, সেভাবেই সালাম দিলেন। তারপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। এরপর দুধের কাছে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। এরপর তিনি তাঁর মাথা আসমানের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, "এখনই তিনি আমার ওপর বদদোয়া করবেন, আর আমি ধ্বংস হয়ে যাব।” তিনি বললেন, "হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আমাকে আহার করায়, তাকে তুমি আহার করাও। আর যে আমাকে পান করায়, তাকে তুমি পান করাও।"'
মিকদাদ (রা) বলেন, 'এ সময় আমি চাদরটি নিয়ে শরীরে বাঁধলাম, আর একটি ছুরি নিলাম, তারপর (এই ভেবে) মেষগুলির কাছে গেলাম যে, এগুলোর মাঝে যেটি সবচেয়ে মোটাতাজা, আমি সেটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য জবাই করব। গিয়ে দেখলাম, সেটি দুধে পরিপূর্ণ এবং অন্য সব মেষও দুধে পরিপূর্ণ। এরপর আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের একটি পাত্র নিয়ে এলাম, যাতে তাঁরা দুধ দোহানোর কথা ভাবতেন না (পাত্রটি বড় হওয়ার কারণে)। আমি তাতেই দুধ দোহন করলাম, এমনকি পাত্রের ওপরিভাগে ফেনা ভেসে উঠল। এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম। তিনি বললেন, "তোমরা কি রাতের দুধ পান করেছ?" আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি পান করুন।” তিনি পান করলেন, এরপর আমাকে দিলেন। আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি পান করুন।” তিনি পান করে আবার আমাকে দিলেন। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন এবং আমি তাঁর দোয়া পেয়ে গেছি, তখন আমি হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে গেলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে মিকদাদ, এটি তাহলে তোমার কাজ?" তখন আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি এই এই কাজ করেছি।” তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা একমাত্র আল্লাহর মেহেরবানি। তুমি কেন আমাকে অবহিত করলে না? আমরা আমাদের সাথিদ্বয়কে জাগ্রত করতাম, তাহলে তারাও এর ভাগ পেত।" আমি তখন বললাম, "সে মহান সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আপনি যখন পেয়েছেন এবং আমি যখন আপনার সাথে ভাগ পেয়েছি, তখন অন্য কোনো লোক পেয়েছি কি পায়নি, তার পরোয়া করি না।"'¹
সালমান ফারসি (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনিতেও বর্ণিত হয়েছে যে, 'যখন তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কিছু খাবার হাদিয়া দিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে খেলেন এবং সাহাবিদেরকেও (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁর সাথে খাওয়ালেন।'²

টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২০৫৫।
২. মুসনাদু আহমাদ: ২৩২২৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নিজে সাহায্য করতে না পারলে অন্যের কাছে পাঠাতেন

📄 নিজে সাহায্য করতে না পারলে অন্যের কাছে পাঠাতেন


আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, "আমি খুব ক্ষুধার্ত।” তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন, "সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।” তিনি অন্য এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনিও একই কথা বললেন। এভাবে তাঁরা সকলে একই কথা বললেন, 'সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমার নিকট পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'কোনো ব্যক্তি কি নেই, যে আজ রাতে লোকটির মেহমানদারি করবে? আল্লাহ তার ওপর রহম করবেন।'
এ সময় জনৈক আনসারি ব্যক্তি (রা) উঠে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি করব।” এ বলে তিনি মেহমানকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেহমানকে সম্মান করো।” স্ত্রী বললেন, "বাচ্চাদের খাবার ব্যতীত আমাদের ঘরে তো আর কিছুই নেই।” আনসারি (রা) বললেন, "তুমি আহার প্রস্তুত করো এবং চেরাগ জ্বালিয়ে রাখো। আর বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। আর যখন মেহমান প্রবেশ করবেন, তখন চেরাগ সেখানে রাখবে। তাকে বোঝাবে যে, আমরাও আহার করছি। মেহমান যখন খাওয়া শুরু করবে, তখন তুমি চেরাগের কাছে গিয়ে সেটা নিভিয়ে দেবে।"
(স্বামীর কথা অনুযায়ী) স্ত্রী চেরাগ জ্বালালেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়ালেন এবং সামান্য খাবার যা ছিল, তা উপস্থিত করলেন। (তারপর মেহমানসহ তারা খেতে বসলেন।) তখন চেরাগ ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে তা নিভিয়ে দিলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে থাকলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। এভাবে তারা উভয়ে (বাচ্চারাসহ) সারা রাত ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকলেন। সকালে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, "আল্লাহ তাআলা তোমাদের গতকালের কার্যকলাপ দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা (বলেছেন) খুশি হয়েছেন।” এবং আয়াত নাজিল করেছেন:
'(আনসারদের অন্যতম গুণ হলো এই) তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।'¹-²
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অভিন্ন প্রয়োজন নিয়ে দুই ব্যক্তি আগমন করলেন। তাদের একজন কথা বললেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখ থেকে দুর্গন্ধ পেলেন। তিনি বললেন, "তুমি কি মিসওয়াক করো না?" লোকটি বললেন, "অবশ্যই করি, কিন্তু (দুর্গন্ধ বের হওয়ার কারণ হলো) আমি তিন দিন ধরে খানা খাইনি।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সাহাবিকে (রা) নির্দেশ দিলে তিনি তাদের নিয়ে গেলেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দিলেন।'³

টিকাঃ
১. সুরা আল-হাশর: ৯।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৭৯৮, সহিহু মুসলিম: ২০৫৪।
৩. মুসনাদু আহমাদ: ২৪০৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের কষ্ট ভাগ করে নিতেন

📄 তাদের কষ্ট ভাগ করে নিতেন


সিমাক বিন হারব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নুমান (রা)-কে বক্তৃতারত অবস্থায় আমি বলতে শুনেছি, উমর (রা) বলেছেন:
'মানুষ কী পরিমাণ দুনিয়া কামাই করেছে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি দেখেছি যে, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় সারা দিন অস্থির থ াকতেন। পেট ভরার মতো নিম্নমানের একটি খেজুরও তিনি (খেতে) পেতেন না।'¹
আবু হাজিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আবু হুরাইরা (রা)-কে তাঁর আঙুল দ্বারা কয়েকবার ইশারা করে বলতে শুনেছি-
'সেই সত্তার কসম-যার হাতে আবু হুরাইরা (রা)-এর প্রাণ, লাগাতার তিন দিন পর্যন্ত আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার গমের রুটি দ্বারা কখনো পরিতৃপ্ত হননি। এমতাবস্থায় তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন।'²
সহিহ বুখারির বর্ণনায় আছে-
'মৃত্যু পর্যন্ত কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার লাগাতার তিন দিন পরিপূর্ণ তৃপ্তিভরে খাবার খাননি।'³
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, 'তিনি উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বললেন:
'ভাগিনা, আমরা (মাসের) নতুন চাঁদ দেখতাম, আবার নতুন চাঁদ দেখতাম। এভাবে দুই মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো ঘরেই (চুলায়) আগুন জ্বালানো হতো না।'
উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি জিজ্ঞেস করলাম, "খালা, আপনারা তাহলে কী খেয়ে জীবনযাপন করতেন?" তিনি বললেন:
'দুটি কালো জিনিস অর্থাৎ খেজুর আর পানি খেয়েই আমরা জীবনযাপন করতাম। অবশ্য কয়েক ঘর আনসারি পরিবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিবেশী ছিল। তাঁদের কিছু হাদিয়ার উটনী ও বকরি ছিল। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য দুধ হাদিয়া পাঠাত। তিনি আমাদের তা পান করতে দিতেন।'⁴
'হাদিয়ার পশু' বলে বোঝানো হচ্ছে, এমন সব পশু যেগুলোকে মালিক কিছুদিনের জন্য অন্যকে হাদিয়াস্বরূপ দিয়ে দেয়। আর সে পশুর দুধ, বাচ্চা ও পশম থেকে লোকটি উপকৃত হয়। তারপর নির্দিষ্ট সময় পর মালিককে আবার ফেরত দেয়।
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
'যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকাল করেন, তখন আমার পাত্রে সামান্য কিছু যব ব্যতীত কোনো কলিজাধারী (প্রাণী) খেতে পারে-এমন কিছু ছিল না। আমি তা থেকে (পরিমাপ না করে) খেতাম। এভাবে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমি তা পরিমাপ করে দেখলাম। ফলে তা শেষ হয়ে গেল।'⁵
আয়িশা (রা) বলেন:
'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের লোকেরা একদিনে দুবেলা খাবার খেলে একবেলায় কেবল খেজুর থাকত।'⁶
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা)-এর সূত্রে খন্দক খনন করার ঘটনা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, 'খন্দক যুদ্ধের দিন আমরা পরিখা খনন করেছিলাম। এ সময় একখণ্ড শক্ত পাথর বেরিয়ে আসলে (যা ভাঙা যাচ্ছিল না) সকলেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "খন্দকের মাঝে একখণ্ড শক্ত পাথর বেরিয়েছে (আমরা তা ভাঙতে পারছি না)।” এ কথা শুনে তিনি বললেন, "আমি নিজেই খন্দকে অবতরণ করব।” এরপর তিনি দাঁড়ালেন। এ সময় তাঁর পেটে একটি পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তিন দিন পর্যন্ত অনাহারী ছিলাম। কোনো কিছুর স্বাদও গ্রহণ করিনি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একখানা কোদাল হাতে নিয়ে প্রস্তরখণ্ডে আঘাত করলেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তা চূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হলো...।'⁷
আবু তালহা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ক্ষুধার অভিযোগ করলাম এবং আমাদের পেটের কাপড় সরিয়ে প্রত্যেকের পেটে একটি করে পাথর (বাঁধা) দেখালাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পেটের কাপড় সরিয়ে দুটি পাথর (বাঁধা) দেখালেন।'⁸

টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২৯৭৮।
২. সহিহু মুসলিম: ২৯৭৬।
৩. সহিহুল বুখারি: ৫৩৭৪।
৪. সহিহুল বুখারি: ৫৩৭৪, সহিহু মুসলিম: ২৯৭২।
৫. সহিহুল বুখারি: ৬৪৫১, সহিহু মুসলিম: ২৯৭৩।
৬. সহিহুল বুখারি: ৬৪৫৫।
৭. সহিহুল বুখারি ৪১০১, সহিহু মুসলিম: ২০৩৯।
৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00