📄 অভাবগ্রস্তদের প্রতি অনুগ্রহ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সেই সত্তার কসম-যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, ক্ষুধার জ্বালায় আমি আমার পেটকে মাটিতে রেখে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম। আর কোনো সময় ক্ষুধার জ্বালায় আমার পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম।'
সহিহ বুখারির আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিম্বর ও আয়িশা (রা)-এর কামরার মধ্যবর্তী স্থানে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যেত। আগন্তুকরা এসে (মৃগীরোগী) পাগল মনে করে আমার গর্দানে পা রাখত। অথচ আমার তিলমাত্র পাগলামি ছিল না। ক্ষুধার যন্ত্রণাই ছিল এর কারণ।'¹
'একদিন আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বের হওয়ার পথে বসে থাকলাম। আবু বকর (রা) যেতে লাগলে আমি কুরআনের একটা আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি (আমার অবস্থা বুঝতে পেরে) আমাকে পরিতৃপ্ত করে কিছু খাওয়াবেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন; কিছুই করলেন না। কিছুক্ষণ পর উমর (রা) যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। এবারেও আমি প্রশ্ন করলাম এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি আমাকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন। আমার কোনো ব্যবস্থা করলেন না। তার পরক্ষণে আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে দেখেই মুচকি হাসলেন এবং আমার প্রাণে কী অস্থিরতা বিরাজ করছে, আমার চেহারার অবস্থা দেখেই তিনি তা আঁচ করতে পারলেন। আমাকে বললেন, "হে আবু হির!” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি হাজির আছি।" তিনি বললেন, "আমার সঙ্গে আসো।” এ বলে তিনি চললেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইলেন এবং আমাকে ঢোকার অনুমতি দিলেন। তারপর তিনি ঘরের ভেতর গিয়ে একটি পেয়ালার মধ্যে কিছু পরিমাণ দুধ পেলেন। তিনি বললেন, "এ দুধ কোথা থেকে এসেছে?" পরিবারের লোকজন বললেন, "এটা আপনার জন্য অমুক পুরুষ অথবা (বললেন) অমুক মহিলা হাদিয়া পাঠিয়েছে।” তখন তিনি বললেন, "হে আবু হির!” আমি বললাম, "জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তুমি সুফফাবাসীদের কাছে গিয়ে তাদের আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো।"'
বর্ণনাকারী বলেন, 'সুফফাবাসীরা ছিলেন ইসলামের মেহমান। তাদের কোনো পরিবার ছিল না এবং তাদের কারও ওপর নির্ভরশীল হওয়ারও সুযোগ ছিল না। কোনো সাদাকা এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এর থেকে কিছুই তিনি গ্রহণ করতেন না। আর যখন কোনো হাদিয়া আসত, তখন তার কিছু অংশ তাদের দিয়ে দিতেন এবং নিজের জন্যও কিছু রাখতেন এবং এতে তাদের শরিক করতেন।'
(আবু হুরাইরা রা বলেন,) 'এ আদেশ শুনে আমার মনে কিছুটা হতাশা এল। মনে মনে ভাবলাম, এ সামান্য দুধ দ্বারা সুফফাবাসীর কী হবে? এ সামান্য দুধ আমার জন্যই যথেষ্ট হতো। এটা পান করে আমি শরীরে কিছুটা শক্তি পেতাম। তিনি যেহেতু ওদের ডাকার জন্য আমাকে পাঠাচ্ছেন, তাদের মাঝে দুধ বণ্টন করার দায়িত্বও আমাকে দেবেন। এতে আমি আর ভাগে দুধ পাওয়ার আশা নেই। যদিও প্রথমে ভেবেছিলাম, তৃপ্তিভরে আমি খেতে পারব। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ না মেনে উপায় নেই। তাই তাদের কাছে গিয়ে তাদের ডেকে আনলাম। তারা এসে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলে তিনি তাদের অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে আসন গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, "হে আবু হির!” আমি বললাম, "আমি হাজির ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তিনি বললেন, "তুমি পেয়ালাটি নাও আর তাদের দাও।” আমি পেয়ালা নিয়ে একজনকে দিলাম। তিনি তা পরিতৃপ্ত হয়ে পান করে পেয়ালাটি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। আমি আরেকজনকে পেয়ালাটি দিলাম। তিনিও তৃপ্তিভরে পান করে পেয়ালাটি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। এমনকি আমি এভাবে সবাইকে তৃপ্তিভরে পান করিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছালাম। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়ালাটি নিজ হাতে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। আর বললেন, "আবু হির!” আমি বললাম, "লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ!” তিনি বললেন, "এখন তো আমি আর তুমি আছি।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি ঠিক বলেছেন।” তিনি বললেন, "এখন তুমি বসে পান করো।” তখন আমি বসে কিছু পান করলাম। তিনি বললেন, "তুমি আরও পান করো।” আমি আরও পান করলাম। তিনি বারবার আমাকে পান করার নির্দেশ দিতে লাগলেন (আর আমিও বারবার পান করতে লাগলাম)। এমনকি আমি বলতে বাধ্য হলাম যে, "আর না। যে সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীন নিয়ে পাঠিয়েছেন-তাঁর কসম খেয়ে বলছি, আমার পেটে আর পান করার মতো জায়গা নেই।” তিনি বললেন, "তাহলে আমাকে দাও।” আমি পেয়ালাটি তাঁকে দিলাম। তিনি আলহামদুলিল্লাহ বলে বাকি দুধ পান করলেন।'
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'তারপর আমি উমর (রা)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁকে পুরো ঘটনার বিবরণ শোনালাম আর বললাম, "আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে এর বন্দোবস্ত করেছেন, যিনি এ ব্যাপারে আপনার চেয়ে বেশি উপযুক্ত। আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে আয়াতটির পাঠ শুনতে চেয়েছি অথচ আমি আপনার চেয়ে তা ভালো পাঠ করতে পারি।” উমর (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, আপনাকে আপ্যায়ন করা আমার নিকট লাল বর্ণের উটের চেয়েও অধিক প্রিয়।"²
এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবগ্রস্তের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বুঝতে পারতেন এবং তাদের ক্ষুধার জ্বালা আঁচ করতে পারতেন। অতঃপর যথাসাধ্য সহানুভূতি দেখাতেন।
হাদিস থেকে শিক্ষা:
কওমের খাদিম যখন একটি পাত্র থেকে সবাইকে পান করাবে, তখন নিয়ম হলো, তার ডান পাশ থেকে পান করানো শুরু করবে। মাঝখানে কাউকে বাদ দিয়ে নিজের বন্ধুকে পান করাবে না। কেননা, এতে মেহমানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়।
এ হাদিসে একটি মহান মুজিজা উল্লেখিত হয়েছে-যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করে। তা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতে খানা ও পানীয় বৃদ্ধি পাওয়া।
পরিপূর্ণ পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করা বৈধ। কেননা, আবু হুরাইরা (রা) বলেছিলেন, 'পেটে আর জায়গা নেই।' আর তাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৌনসম্মতি প্রকাশ করেছেন। তবে পূর্ণ তৃপ্তিভরে আহার করাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়। কেননা, এতে ইবাদতে অলসতাসহ আরও বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভাব লুকানো এবং একান্ত প্রয়োজন হলে সরাসরি প্রকাশ না করে ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানো।
নিজের এবং নিজের পরিবার-পরিজন ও খাদিমের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহানুভবতা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় অনেক সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দারিদ্র্যপীড়িত ছিলেন।
কঠিন অভাবের সময়েও প্রকাশ্যে হাতপাতা থেকে বিরত থাকা এবং নিজ স্বার্থের ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আবু হুরাইরা (রা)-এর অতুলনীয় ফজিলত।
নিমন্ত্রিত ব্যক্তিও নিমন্ত্রণকারীর অনুমতি ব্যতীত তার বাড়িতে প্রবেশ করবে না।³
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'তিনটি দিন আমার এমন কাটল যে আমি কিছুই খেতে পাইনি। আমি সুফফার দিকে যাওয়ার মনস্থ করলাম। (অত্যধিক দুর্বলতায়) আমি বারবার টলে পড়ছিলাম। বাচ্চাকাচ্চারা চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, "আবু হুরাইরা পাগল হয়ে গেছে।” এরপর আমি উচ্চস্বরে "বরং তোমরাই পাগল" বলতে বলতে সুফফায় পৌঁছালাম।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক গামলা সারিদ আনা হলে তিনি সুফফাবাসীকে ডেকে আনলেন এবং তারা খানা শুরু করলেন। ঘটনাক্রমে আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। আমি ইতিউতি করতে লাগলাম যেন তারা আমাকে ডাকেন। কিন্তু গামলার তলায় অল্প কিছু অবশিষ্ট রেখে তারা সবাই খানা শেষ করে উঠে গেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশিষ্ট খাদ্য একত্র করে একটি লুকমা তৈরি করলেন। সেটাকে আঙুলের ওপর নিয়ে আমাকে বললেন, "বিসমিল্লাহ বলে এটা আহার করো।” আল্লাহর শপথ করে বলছি, ওই একটি লুকমা খেয়েই আমি সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়ে গেলাম।'⁴
এই হাদিসে আবু হুরাইরা (রা) গরিব সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তা হলো, যখন কোনো সাদাকা আসত, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এর থেকে কিছুই তিনি গ্রহণ করতেন না। আর যখন কোনো হাদিয়া আসত, তখন তার কিছু অংশ তাদের দিয়ে দিতেন এবং নিজের জন্যও কিছু রাখতেন এবং এতে তাদের শরিক করতেন।
সালমান (রা)-এর ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে, সালমান (রা) বলেন, 'আমি কিছু জিনিস জমা করে সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে রওনা হলাম। তিনি তখন কুবায় অবস্থান করছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, "আমি খবর পেয়েছি যে, আপনি একজন ভালো মানুষ এবং আপনার সাথে কতিপয় অভাবগ্রস্ত সঙ্গী আছে। আর আমার কাছে কিছু সাদাকার মাল আছে, আমার মনে হয়েছে আপনারাই এর উপযুক্ত হকদার।” সালমান ফারসি (রা) বলেন, "আমি তা (সাদাকার মাল) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে রাখলাম। তখন তিনি সঙ্গীদের বললেন, "আহার করো।” কিন্তু তিনি হাত গুটিয়ে রাখলেন। তা থেকে আহার করেননি। আমি মনে মনে বললাম, "(নবুওয়াতের) একটি প্রমাণ পেলাম।” অতঃপর তাঁর কাছ থেকে চলে আসলাম এবং আরও কিছু জিনিস জমা করলাম। ততদিনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় চলে গিয়েছেন। অতঃপর তাঁর কাছে এসে বললাম, "আমি দেখলাম যে, আপনি সাদাকা খান না; তাই আপনার সমীপে এগুলো হাদিয়া দিচ্ছি।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে খেলেন এবং সঙ্গীদেরও তাঁর সাথে খাওয়ার নির্দেশ দিলে তাঁরাও তাঁর সাথে খেলেন। তখন আমি মনে মনে বললাম, "(নবুওয়াতের) দুটি প্রমাণ পেলাম...।'⁵
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৭৩২৪।
২. সহিহুল বুখারি: ৫৩৭৫, ৬৪৫২; সুনানুত তিরমিজি: ২৪৭৭।
৩. ফাতহুল বারি: ১১/২৮৯।
৪. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৬৫৩৩ (শাইখ আলবানি হাদিসটিকে জইফ বলেছেন। তালিকাতুল হিসান: ৬৪৯৯)
৫. মুসনাদু আহমাদ: ২৩২২৫।
📄 সম্ভ্রান্ত সাহাবিদেরকে নিঃস্বদের সাহায্য করার নির্দেশ দিতেন
ইবনে সিরিন (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধ্যাবেলা সুফফাবাসীদেরকে সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মাঝে বণ্টন করে দিতেন। কেউ একজন নিয়ে যেতেন, কেউ দুজন, কেউ তিনজন... এভাবে দশজন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কথা বর্ণিত আছে।'¹
হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এভাবে সবাই নিয়ে যাওয়ার পর যারা থেকে যেতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিজের ঘরে নিয়ে যেতেন এবং ঘরে যা আছে, তা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।'²
ইয়াইশ বিন তিখফা গিফারি (রা) বলেন, 'আমার পিতা আসহাবে সুফফার সদস্য ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে আসহাবে সুফফার লোকদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কেউ একজন, কেউ দুজন... এভাবে সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো। অবশেষে আমরা পাঁচজন রয়ে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "চলো।” আমরা তাঁর সাথে আয়িশা (রা)-এর ঘরে গেলাম। তিনি বললেন, "আয়িশা, আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করো।” তিনি হাশিশা (আটার তৈরি একপ্রকারের খাদ্য, যেটার সাথে খেজুর বা গোশত মিশিয়ে দেওয়া হয়) পরিবেশন করলেন এবং আমরা খেলাম। অতঃপর তিনি কবুতরের মতো সামান্য হায়সা (খেজুর, ময়দা, পনির ও ঘিয়ের মিশেলে তৈরি একপ্রকার খাবার) নিয়ে আসলেন আর আমরা খেলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আয়িশা, এবার আমাদের পান করাও।” তিনি একটি বড় পাত্রে দুধ নিয়ে আসলেন আর আমরা পান করলাম। অতঃপর তিনি দুধভর্তি একটি ছোট পেয়ালা নিয়ে আসলেন আর আমরা তা পান করলাম।³ অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা চাইলে এখানে রাত কাটাতে পারো অথবা মসজিদে ফিরে যেতে পারো।” আমরা বললাম, "আমরা বরং মসজিদেই ফিরে যাই।"'⁴
টিকাঃ
১. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ২৭১৫৪।
২. শুআবুল ইমান: ১০৩৩৩।
৩. কবুতরের মতো বলার দ্বারা হায়সার পরিমাণ কম হওয়া উদ্দেশ্য।
৪. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৭৫২।
📄 অভাবগ্রস্তদের দান করতে সাহাবিগণকে উৎসাহিত করতেন
আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত যে, 'আসহাবে সুফফার সদস্যরা খুবই দরিদ্র লোক ছিলেন। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যার কাছে দুজনের খাবার আছে, সে তিনজন নিয়ে যাও; আর যার কাছে চারজনের খাবার আছে, সে পাঁচ কি ছয়জন নিয়ে যাও।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশজন সাথে নিয়ে আসেন এবং আবু বকর (রা) তিনজন নিয়ে আসেন।'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আমাদের ঘরে ও আবু বকর (রা)-এর ঘরে আমি, আমার পিতা, মাতা, আমার স্ত্রী ও খাদিম ছিলাম। আমার পিতা রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতেন। তিনি সেখানে চলে গেলেন আর আমাকে বলে গেলেন, "হে আব্দুর রহমান, আমি ফেরার পূর্বেই মেহমানদের আপ্যায়ন সম্পন্ন করে নিয়ো।" সন্ধ্যা হলে আমি মেহমানদের খাবারের ব্যবস্থা করলে তারা খেতে অসম্মতি জানালেন। তারা বললেন, "বাড়ির কর্তা আসুক, তারপর একসাথে খাব।” আমি তাদের বললাম, "তিনি খুব কড়া মানুষ, আপনারা না খেলে তিনি আমাকে মারবেন।” কিন্তু তারা তবুও খেতে অস্বীকৃতি জানালেন।'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আবু বকর (রা) ওই রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে রাতের খাবার খেয়ে নিলেন এবং ইশার নামাজ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। ইশার নামাজের পর পুনরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে গমন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তন্দ্রা আসা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন। অবশেষে অনেক রাত পর বাড়িতে আসলেন। স্ত্রী (উম্মে আব্দুর রহমান রা) বললেন, "মেহমান পাঠিয়ে এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?" তিনি বললেন, "তাদের এখনো খানা দাওনি?” স্ত্রী বললেন, "আপনাকে ছাড়া তারা খাবেন না। অনেক অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু তারা আপন সিদ্ধান্তে অনড়।"'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আমি (অবস্থা বেগতিক দেখে) তাড়াতাড়ি কেটে পড়লাম।'
তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে "ওহে নির্বোধ, মাথামোটা!" এ বলে আমাকে অনেক শাসালেন আর বললেন, "ওহে নির্বোধ, তোমাকে আমি কসম দিয়ে বলছি, এখানে আসো, আমার কথা শোনো।” আমি এসে বললাম, "আমার কোনো অপরাধ নেই। আপনার মেহমানদের জিজ্ঞেস করেই দেখুন যে, আমি তাদের খাবার পরিবেশন করেছিলাম, কিন্তু তারাই আপনাকে ছাড়া খেতে অস্বীকার করেছেন।” মেহমানগণ বললেন, "ও আপনাকে সত্য কথাই বলেছে।” তিনি বললেন, "আপনাদের অবশ্যই আমার মেহমানদারি কবুল করতে হবে, তবে কসম আল্লাহর, আজ রাতে আমি আর খাব না।” তারা বললেন, "আল্লাহর কসম, আপনি না খেলে আমরা খাবার মুখে দেবো না।” আবু বকর (রা) বললেন, "(আমার শপথ) শয়তানের পক্ষ থেকে এসেছে।” অতঃপর তিনি খানা আনলেন এবং আল্লাহর নাম নিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। মেহমানরাও তাঁর সাথে খেলেন।'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা পাত্র থেকে একটি লুকমা নিলেই নিচ থেকে তার চেয়ে খাবার বেড়ে যেতে লাগল। এমনকি আমরা সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলাম, তখনও পূর্বের চেয়ে অধিক খাবার অবশিষ্ট রয়ে গেল। আবু বকর (রা) খাবারের প্রতি তাকালেন। তখন তাঁর কাছে খাবার পূর্বের ন্যায় অবশিষ্ট আছে বা তার চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মনে হলো। তা দেখে স্ত্রীকে বললেন, "কী ব্যাপার, হে বনু ফিরাসের বোন?" তিনি বললেন, "আমার চোখের প্রশান্তির কসম, এখন এ তো খেতে শুরু করার আগের চেয়ে অনেক বেশি!" অতঃপর তিনি তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে গেলেন। তখনও খাবারের পাত্র পূর্বের মতো পূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, (এ খাবার খেয়ে) তারা পুণ্য অর্জন করেছে, কিন্তু আমি শপথ ভঙ্গ করেছি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না, বরং তুমিই তাদের চেয়ে পুণ্যবান ও উত্তম। কারণ, তুমি তোমার সেই শপথ ভঙ্গ করেছ, যা ভঙ্গ করা তোমার জন্য উচিত ও কল্যাণকর ছিল। সুতরাং এ দিক দিয়ে তুমি তাদের চেয়ে উত্তম কাজ করেছ।"'
আব্দুর রহমান (রা) বলেন, 'আমাদের (মুসলমানদের) ও অন্য একটি গোত্রের মধ্যে সন্ধি ছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াতে তাদের মোকাবেলা করার জন্য আমাদের বারোজনকে নেতা মনোনীত করা হলো। প্রত্যেক নেতার অধীনে আবার কয়েকজন করে লোক ছিল। আল্লাহই ভালো জানেন, তাদের প্রত্যেকের সাথে কতজন করে দেওয়া হয়েছিল। এ খাবার তাদের নিকট পাঠানো হলে তাদের প্রত্যেকেই তা থেকে আহার করলেন।'¹
হাদিস থেকে শিক্ষা:
তৃপ্তিভরে খাওয়ার ক্ষেত্রে গরিবদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা মুসতাহাব। এ জন্য যার কাছে দুজনের খাবার আছে, তাকে তিনজন নিয়ে যেতে এবং যার কাছে চারজনের খাবার আছে, তাকে পাঁচজন নিয়ে যেতে আদেশ করেছেন।
আল্লাহর বন্ধুদের প্রতি তাঁর অসীম করুণার প্রমাণ।
অগ্রাধিকার দেওয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করার ফজিলত। আর যখন মেহমানের সংখ্যা বেশি হয়, তখন সমাজের লোকদের উচিত হলো, মেহমানদের ভাগ করে নেওয়া এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়িতে মেহমান নিয়ে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে সমাজের নেতা তার জন্য নির্দেশ প্রদান করবেন এবং তিনিও যথাসাধ্য মেহমান নিয়ে যাবেন।
গরিবদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়লে মসজিদে আশ্রয় নেবে। তবে শর্ত হলো, এতে মুসল্লিদের ওপর সাহায্য করার ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
কঠিন ক্ষুধার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করা।
স্ত্রী, সন্তান ও মেহমানদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবারের ব্যবস্থা করে তাদের নিকট থেকে অনুপস্থিত থাকা বৈধ।
(গৃহকর্তার সাধারণ অনুমতি থাকলে) গৃহকর্ত্রী গৃহকর্তার বিশেষ অনুমতি ব্যতীত মেহমানের জন্য খাবার পরিবেশন করতে পারবে।
শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং ভালো কাজের অনুশীলন করানোর স্বার্থে পিতা তার সন্তানদের শাসাতে পারবে।
বৈধ কাজ না করার ওপর শপথ করা জায়িজ।
সত্যবাদী পুরুষ শপথের মাধ্যমে তার সংবাদকে পোক্ত করে।
শপথের পর তা ভঙ্গ করা বৈধ।
বরকত প্রকাশ পাওয়া খাদ্য বড়দের সমীপে পাঠানো এবং তারা তা গ্রহণ করা।
প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে কাজ করা। কারণ আবু বকর (রা) ধারণা করেছিলেন যে, আব্দুর রহমান (রা) প্রবল মেহমানদারি করার ক্ষেত্রে শিথিলতা করেছেন। তাই বাড়িতে এসেই তাকে বকলেন। আব্দুর রহমান (রা)-এর চুপিসারে কেটে পড়া তার ধারণাকে আরও প্রবল করেছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক ফজিলতপূর্ণ বিষয় অবলম্বন করতেন এবং বদান্যতার প্রতি সবার আগে অগ্রসর হতেন। ওই রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে মেহমানের সংখ্যা তাঁর পরিবারের সদস্যসংখ্যার প্রায় সমান ছিল।²
টিকাঃ
১. পুরা ঘটনাটি সহিহ বুখারির কয়েকটি রিওয়ায়াত (৬০২, ৩৫৮১, ৬১৪১); সহিহ মুসলিমের ২০৭৫ ও মুসনাদে আহমাদের ১৭১৪ নং রিওয়ায়াতের সমন্বয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২. ফাতহুল বারি (ইবনে হাজার) ৬/৬০০, ফাতহুল বারি (ইবনে রজব): ৪/১৭৫, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১৮।
📄 দরিদ্রদের মাঝে নিজের খাবার ভাগ করে দিতেন
মিকদাদ বিন আমর (রা) বলেন, 'আমি ও আমার এক বন্ধু (মদিনায়) এলাম। ক্ষুধার তাড়নায় আমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল। আমরা মানুষের কাছে নিজেদের পেশ করতে লাগলাম। কেউই আমাদের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করল না। অতঃপর আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। লোকদের নিকট গিয়েছিলাম, কেউ আমাদের মেহমানদারি করতে রাজি হয়নি। তাই আপনার নিকট আসলাম।" তখন তিনি আমাদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনটি মেষ ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা ভাগ করে পান করব।” এরপর থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ পান করত। আর আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তাঁর অংশ তুলে রাখতাম।'
মিকদাদ (রা) বলেন, 'তিনি রাতে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম দিতেন, যাতে ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হয় আর জাগ্রত ব্যক্তি শুনতে পায়। এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন এবং ফিরে এসে দুধ পান করতেন। এক রাতে আমার কাছে শয়তান এল। আমি তখন আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারিদের কাছে গেলে তারা তাকে হাদিয়া দিয়ে থাকে এবং তাদের কাছে তিনি খেয়েও থাকেন। তার এ সামান্য দুধের প্রয়োজন নেই।” তখন আমি এসে সেটুকুও পান করে ফেললাম। দুধ যখন ভালোভাবে আমার পেটে প্রবেশ করল এবং আমি বুঝলাম, এ দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই, তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, "তোমার সর্বনাশ হোক তুমি কী কাণ্ড করলে! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি এসে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার ওপর বদদোয়া করবেন। তাতে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তোমার দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ হয়ে যাবে।" আমার গায়ে ছিল একটা চাদর। এটি এত ছোট যে পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে আবার মাথা আবৃত করতে গেলে পা দেখা যায়। আমার ঘুম আসছিল না। আমার সঙ্গীদ্বয় ঘুমাচ্ছিল। তারা তো আমার মতো কাজ করেনি।'
এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে যেভাবে সালাম দিতেন, সেভাবেই সালাম দিলেন। তারপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। এরপর দুধের কাছে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। এরপর তিনি তাঁর মাথা আসমানের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, "এখনই তিনি আমার ওপর বদদোয়া করবেন, আর আমি ধ্বংস হয়ে যাব।” তিনি বললেন, "হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আমাকে আহার করায়, তাকে তুমি আহার করাও। আর যে আমাকে পান করায়, তাকে তুমি পান করাও।"'
মিকদাদ (রা) বলেন, 'এ সময় আমি চাদরটি নিয়ে শরীরে বাঁধলাম, আর একটি ছুরি নিলাম, তারপর (এই ভেবে) মেষগুলির কাছে গেলাম যে, এগুলোর মাঝে যেটি সবচেয়ে মোটাতাজা, আমি সেটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য জবাই করব। গিয়ে দেখলাম, সেটি দুধে পরিপূর্ণ এবং অন্য সব মেষও দুধে পরিপূর্ণ। এরপর আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের একটি পাত্র নিয়ে এলাম, যাতে তাঁরা দুধ দোহানোর কথা ভাবতেন না (পাত্রটি বড় হওয়ার কারণে)। আমি তাতেই দুধ দোহন করলাম, এমনকি পাত্রের ওপরিভাগে ফেনা ভেসে উঠল। এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম। তিনি বললেন, "তোমরা কি রাতের দুধ পান করেছ?" আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি পান করুন।” তিনি পান করলেন, এরপর আমাকে দিলেন। আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি পান করুন।” তিনি পান করে আবার আমাকে দিলেন। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন এবং আমি তাঁর দোয়া পেয়ে গেছি, তখন আমি হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে গেলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে মিকদাদ, এটি তাহলে তোমার কাজ?" তখন আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি এই এই কাজ করেছি।” তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা একমাত্র আল্লাহর মেহেরবানি। তুমি কেন আমাকে অবহিত করলে না? আমরা আমাদের সাথিদ্বয়কে জাগ্রত করতাম, তাহলে তারাও এর ভাগ পেত।" আমি তখন বললাম, "সে মহান সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আপনি যখন পেয়েছেন এবং আমি যখন আপনার সাথে ভাগ পেয়েছি, তখন অন্য কোনো লোক পেয়েছি কি পায়নি, তার পরোয়া করি না।"'¹
সালমান ফারসি (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনিতেও বর্ণিত হয়েছে যে, 'যখন তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কিছু খাবার হাদিয়া দিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে খেলেন এবং সাহাবিদেরকেও (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁর সাথে খাওয়ালেন।'²
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২০৫৫।
২. মুসনাদু আহমাদ: ২৩২২৫।