📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 রাসূল ﷺ অতিরিক্ত সম্পদ দরিদ্র ও নিঃস্বদের দিয়ে দিতেন

📄 রাসূল ﷺ অতিরিক্ত সম্পদ দরিদ্র ও নিঃস্বদের দিয়ে দিতেন


ইসলামি শরিয়তে দারিদ্র্য বলা হয়, মৌলিক প্রয়োজন পূর্ণ করতে অসমর্থ হওয়াকে। সুতরাং প্রত্যেক ওই ব্যক্তি, যার নিকট এতটুকু সম্বল নেই যে, সে নিজের ও নিজের পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের যথাযথ ব্যবস্থা করতে পারে, সে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে দরিদ্র শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।¹
উমর বিন খাত্তাব (রা) বলেন:
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় মাল পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করার পর অবশিষ্ট অংশ সাদাকা করে দিতেন।'²
খাইবার বিজয় করার পর সেখান থেকে তিনি গনিমতের যে এক-পঞ্চমাংশ পেয়েছিলেন, তা থেকেও পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করার পর অবশিষ্ট অংশ সাদাকা করে দিলেন। উমর (রা) বলেন:
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবারের আয়কে তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন: দুইভাগ মুসলিম জনসাধারণের জন্য এবং একভাগ নিজের পরিবার-পরিজনের খোরপোশের জন্য। এরপরও পরিবারের খরচ মিটিয়ে যদি কিছু অবশিষ্ট থাকত, তা দরিদ্র মুহাজিরদের মাঝে বিতরণ করে দিতেন।'³
আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
'নবির যাবতীয় সম্পদ তাঁর পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের খরচ বাদে বাকি সবই সাদাকা। আমাদের (নবিদের) সম্পদের কোনো ওয়ারিশ থাকে না।'⁴

টিকাঃ
১. মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৮/৫৭০।
২. সুনানু আবি দাউদ: ২৯৭৫।
৩. সুনানু আবি দাউদ: ২৯৬৭।
৪. সহিহুল বুখারি: ২৯০৪, সহিহু মুসলিম: ১৭৫৭, সুনানু আবি দাউদ: ২৯৭৫। শব্দউৎস: সুনানু আবি দাউদ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 চেহারা ও বেশভূষায় অভাবের ছাপ দেখলে ব্যথিত হতেন

📄 চেহারা ও বেশভূষায় অভাবের ছাপ দেখলে ব্যথিত হতেন


জারির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা একবার শুরুর বেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় কিছু (প্রায়) নগ্নদেহ এবং নগ্নপদের লোক ডোরাকাটা চাদর জড়িয়ে¹ অথবা জীর্ণ আলখাল্লা পরে (কাঁধে) তলোয়ার ঝুলিয়ে আমাদের কাছে এল। তাদের অধিকাংশ বরং সবাই মুদার গোত্রের ছিল। তাদের অবয়বে ক্ষুধা ও অনাহারের ছাপ দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বাড়ির ভেতর গেলেন এবং বের হয়ে এসে বিলাল (রা)-কে আজান দিতে নির্দেশ দিলেন। বিলাল (রা) আজান দিলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাআতে নামাজ আদায় করে ভাষণ দিলেন এবং বললেন:
'হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট থেকে আপন আপন হক চেয়ে থাকো এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।'²
এবং সুরা হাশর থেকে একটি আয়াত পড়লেন:
'তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাকো।'³
"প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ দিনার, দিরহাম, কাপড়, এক সা' গম ও এক সা' খেজুর হতেও দান করো।” বলতে বলতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটুকু পর্যন্ত বললেন যে, "এক টুকরো খেজুর থাকলেও তা থেকে দান করো।” তখন একজন আনসারি সাহাবি (রা) একটি থলি নিয়ে আসলেন। (সেটি এত ভারী ছিল যে,) তার হাত তা বহন করতে অপারগ হওয়ার উপক্রম হচ্ছিল তা নয়, অপারগই হয়ে পড়েছিল। অতঃপর অপর সাহাবিগণও তার অনুসরণ করলেন। আমি সেখানে কাপড় ও খাদ্যের দুটি স্তূপ দেখতে পেলাম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মুবারক উজ্জ্বল ও তাঁকে প্রফুল্ল দেখতে পেলাম। এরপর তিনি বললেন:
'যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো উত্তম প্রথা চালু করবে, সে তার সাওয়াব তো পাবেই উপরন্তু ওই প্রথার ওপর আমলকারীর সমপরিমাণ সাওয়াবও পাবে। এবং এতে আমলকারীর সাওয়াবের পরিমাণ কিঞ্চিৎ পরিমাণও হ্রাস করা হবে না। আর যে ব্যক্তি খারাপ প্রথা প্রচলন করবে, তার জন্য তার গুনাহ তো রয়েছেই, উপরন্তু খারাপ প্রথার ওপর আমলকারীদের সমপরিমাণ গুনাহও সে পাবে। এতে আমলকারীদের গুনাহ থেকেও বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।'⁴
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনন্দিত হওয়ার কারণ হলো, তিনি দেখতে পেলেন যে, মুসলমানরা আল্লাহর আনুগত্য করতে, তাঁর পথে সম্পদ ব্যয় করতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ মান্য করতে, অভাবীদের অভাব ঘোচাতে এবং মুসলমানদের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে মুসলমানদেরও উচিত হলো, এ ধরনের কোনো কিছু দেখলে তারা যেন আনন্দিত হয় এবং প্রফুল্লতা প্রকাশ করে।'⁵
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
কল্যাণের কাজে অগ্রগামী হওয়া ও উত্তম প্রথা চালু করার প্রতি উৎসাহ প্রদান।
খারাপ প্রথা ও কুসংস্কার চালু করার ব্যাপারে সতর্কীকরণ।
উত্তম সুন্নাত বা প্রথা দুই প্রকার:
১. শরিয়তপ্রবর্তিত সুন্নাত বা প্রথা-যার আমল বাদ দেওয়া হয়েছিল, অতঃপর কেউ তা নতুনভাবে চালু করল। যেমন: রমাজানে জামাআত সহকারে তারাবি পড়া।
২. শরিয়তের নির্দেশ পালনে সবার অগ্রগামী হওয়া-যা দেখে অন্যরাও তার অনুসরণ করে। যেমন: হাদিসের ঘটনায় জনৈক আনসারি ব্যক্তি সাদাকা প্রদানে অগ্রগামী হয়েছেন এবং তাকে দেখে অন্যরাও তার পথ অনুসরণ করেছে।⁶

টিকাঃ
১. চাদরের মাঝে ছিদ্র করে মাথা ও হাত গলিয়ে তারা পরিধান করেছিল।
২. সুরা আন-নিসা, ৪: ১।
৩. সুরা আল-হাশর, ৫৯: ১৮।
৪. সহিহু মুসলিম: ১০১৭।
৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১০৩।
৬. ইবনে উসাইমিন কৃত শারহু রিয়াদিস সালিহিন ১/১৯৯। (কিছুটা পরিবর্তন করে উপস্থাপিত)

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অভাবগ্রস্তদের প্রতি অনুগ্রহ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন

📄 অভাবগ্রস্তদের প্রতি অনুগ্রহ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন


আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সেই সত্তার কসম-যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, ক্ষুধার জ্বালায় আমি আমার পেটকে মাটিতে রেখে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম। আর কোনো সময় ক্ষুধার জ্বালায় আমার পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম।'
সহিহ বুখারির আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিম্বর ও আয়িশা (রা)-এর কামরার মধ্যবর্তী স্থানে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যেত। আগন্তুকরা এসে (মৃগীরোগী) পাগল মনে করে আমার গর্দানে পা রাখত। অথচ আমার তিলমাত্র পাগলামি ছিল না। ক্ষুধার যন্ত্রণাই ছিল এর কারণ।'¹
'একদিন আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বের হওয়ার পথে বসে থাকলাম। আবু বকর (রা) যেতে লাগলে আমি কুরআনের একটা আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি (আমার অবস্থা বুঝতে পেরে) আমাকে পরিতৃপ্ত করে কিছু খাওয়াবেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন; কিছুই করলেন না। কিছুক্ষণ পর উমর (রা) যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। এবারেও আমি প্রশ্ন করলাম এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি আমাকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন। আমার কোনো ব্যবস্থা করলেন না। তার পরক্ষণে আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে দেখেই মুচকি হাসলেন এবং আমার প্রাণে কী অস্থিরতা বিরাজ করছে, আমার চেহারার অবস্থা দেখেই তিনি তা আঁচ করতে পারলেন। আমাকে বললেন, "হে আবু হির!” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি হাজির আছি।" তিনি বললেন, "আমার সঙ্গে আসো।” এ বলে তিনি চললেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইলেন এবং আমাকে ঢোকার অনুমতি দিলেন। তারপর তিনি ঘরের ভেতর গিয়ে একটি পেয়ালার মধ্যে কিছু পরিমাণ দুধ পেলেন। তিনি বললেন, "এ দুধ কোথা থেকে এসেছে?" পরিবারের লোকজন বললেন, "এটা আপনার জন্য অমুক পুরুষ অথবা (বললেন) অমুক মহিলা হাদিয়া পাঠিয়েছে।” তখন তিনি বললেন, "হে আবু হির!” আমি বললাম, "জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তুমি সুফফাবাসীদের কাছে গিয়ে তাদের আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো।"'
বর্ণনাকারী বলেন, 'সুফফাবাসীরা ছিলেন ইসলামের মেহমান। তাদের কোনো পরিবার ছিল না এবং তাদের কারও ওপর নির্ভরশীল হওয়ারও সুযোগ ছিল না। কোনো সাদাকা এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এর থেকে কিছুই তিনি গ্রহণ করতেন না। আর যখন কোনো হাদিয়া আসত, তখন তার কিছু অংশ তাদের দিয়ে দিতেন এবং নিজের জন্যও কিছু রাখতেন এবং এতে তাদের শরিক করতেন।'
(আবু হুরাইরা রা বলেন,) 'এ আদেশ শুনে আমার মনে কিছুটা হতাশা এল। মনে মনে ভাবলাম, এ সামান্য দুধ দ্বারা সুফফাবাসীর কী হবে? এ সামান্য দুধ আমার জন্যই যথেষ্ট হতো। এটা পান করে আমি শরীরে কিছুটা শক্তি পেতাম। তিনি যেহেতু ওদের ডাকার জন্য আমাকে পাঠাচ্ছেন, তাদের মাঝে দুধ বণ্টন করার দায়িত্বও আমাকে দেবেন। এতে আমি আর ভাগে দুধ পাওয়ার আশা নেই। যদিও প্রথমে ভেবেছিলাম, তৃপ্তিভরে আমি খেতে পারব। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ না মেনে উপায় নেই। তাই তাদের কাছে গিয়ে তাদের ডেকে আনলাম। তারা এসে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলে তিনি তাদের অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে আসন গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, "হে আবু হির!” আমি বললাম, "আমি হাজির ইয়া রাসুলাল্লাহ!" তিনি বললেন, "তুমি পেয়ালাটি নাও আর তাদের দাও।” আমি পেয়ালা নিয়ে একজনকে দিলাম। তিনি তা পরিতৃপ্ত হয়ে পান করে পেয়ালাটি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। আমি আরেকজনকে পেয়ালাটি দিলাম। তিনিও তৃপ্তিভরে পান করে পেয়ালাটি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। এমনকি আমি এভাবে সবাইকে তৃপ্তিভরে পান করিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছালাম। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়ালাটি নিজ হাতে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। আর বললেন, "আবু হির!” আমি বললাম, "লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ!” তিনি বললেন, "এখন তো আমি আর তুমি আছি।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি ঠিক বলেছেন।” তিনি বললেন, "এখন তুমি বসে পান করো।” তখন আমি বসে কিছু পান করলাম। তিনি বললেন, "তুমি আরও পান করো।” আমি আরও পান করলাম। তিনি বারবার আমাকে পান করার নির্দেশ দিতে লাগলেন (আর আমিও বারবার পান করতে লাগলাম)। এমনকি আমি বলতে বাধ্য হলাম যে, "আর না। যে সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীন নিয়ে পাঠিয়েছেন-তাঁর কসম খেয়ে বলছি, আমার পেটে আর পান করার মতো জায়গা নেই।” তিনি বললেন, "তাহলে আমাকে দাও।” আমি পেয়ালাটি তাঁকে দিলাম। তিনি আলহামদুলিল্লাহ বলে বাকি দুধ পান করলেন।'
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'তারপর আমি উমর (রা)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁকে পুরো ঘটনার বিবরণ শোনালাম আর বললাম, "আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে এর বন্দোবস্ত করেছেন, যিনি এ ব্যাপারে আপনার চেয়ে বেশি উপযুক্ত। আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে আয়াতটির পাঠ শুনতে চেয়েছি অথচ আমি আপনার চেয়ে তা ভালো পাঠ করতে পারি।” উমর (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, আপনাকে আপ্যায়ন করা আমার নিকট লাল বর্ণের উটের চেয়েও অধিক প্রিয়।"²
এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবগ্রস্তের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বুঝতে পারতেন এবং তাদের ক্ষুধার জ্বালা আঁচ করতে পারতেন। অতঃপর যথাসাধ্য সহানুভূতি দেখাতেন।
হাদিস থেকে শিক্ষা:
কওমের খাদিম যখন একটি পাত্র থেকে সবাইকে পান করাবে, তখন নিয়ম হলো, তার ডান পাশ থেকে পান করানো শুরু করবে। মাঝখানে কাউকে বাদ দিয়ে নিজের বন্ধুকে পান করাবে না। কেননা, এতে মেহমানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়।
এ হাদিসে একটি মহান মুজিজা উল্লেখিত হয়েছে-যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করে। তা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতে খানা ও পানীয় বৃদ্ধি পাওয়া।
পরিপূর্ণ পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করা বৈধ। কেননা, আবু হুরাইরা (রা) বলেছিলেন, 'পেটে আর জায়গা নেই।' আর তাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৌনসম্মতি প্রকাশ করেছেন। তবে পূর্ণ তৃপ্তিভরে আহার করাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়। কেননা, এতে ইবাদতে অলসতাসহ আরও বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভাব লুকানো এবং একান্ত প্রয়োজন হলে সরাসরি প্রকাশ না করে ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানো।
নিজের এবং নিজের পরিবার-পরিজন ও খাদিমের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহানুভবতা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় অনেক সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দারিদ্র্যপীড়িত ছিলেন।
কঠিন অভাবের সময়েও প্রকাশ্যে হাতপাতা থেকে বিরত থাকা এবং নিজ স্বার্থের ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আবু হুরাইরা (রা)-এর অতুলনীয় ফজিলত।
নিমন্ত্রিত ব্যক্তিও নিমন্ত্রণকারীর অনুমতি ব্যতীত তার বাড়িতে প্রবেশ করবে না।³
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'তিনটি দিন আমার এমন কাটল যে আমি কিছুই খেতে পাইনি। আমি সুফফার দিকে যাওয়ার মনস্থ করলাম। (অত্যধিক দুর্বলতায়) আমি বারবার টলে পড়ছিলাম। বাচ্চাকাচ্চারা চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, "আবু হুরাইরা পাগল হয়ে গেছে।” এরপর আমি উচ্চস্বরে "বরং তোমরাই পাগল" বলতে বলতে সুফফায় পৌঁছালাম।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক গামলা সারিদ আনা হলে তিনি সুফফাবাসীকে ডেকে আনলেন এবং তারা খানা শুরু করলেন। ঘটনাক্রমে আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। আমি ইতিউতি করতে লাগলাম যেন তারা আমাকে ডাকেন। কিন্তু গামলার তলায় অল্প কিছু অবশিষ্ট রেখে তারা সবাই খানা শেষ করে উঠে গেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশিষ্ট খাদ্য একত্র করে একটি লুকমা তৈরি করলেন। সেটাকে আঙুলের ওপর নিয়ে আমাকে বললেন, "বিসমিল্লাহ বলে এটা আহার করো।” আল্লাহর শপথ করে বলছি, ওই একটি লুকমা খেয়েই আমি সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়ে গেলাম।'⁴
এই হাদিসে আবু হুরাইরা (রা) গরিব সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তা হলো, যখন কোনো সাদাকা আসত, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এর থেকে কিছুই তিনি গ্রহণ করতেন না। আর যখন কোনো হাদিয়া আসত, তখন তার কিছু অংশ তাদের দিয়ে দিতেন এবং নিজের জন্যও কিছু রাখতেন এবং এতে তাদের শরিক করতেন।
সালমান (রা)-এর ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে, সালমান (রা) বলেন, 'আমি কিছু জিনিস জমা করে সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে রওনা হলাম। তিনি তখন কুবায় অবস্থান করছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, "আমি খবর পেয়েছি যে, আপনি একজন ভালো মানুষ এবং আপনার সাথে কতিপয় অভাবগ্রস্ত সঙ্গী আছে। আর আমার কাছে কিছু সাদাকার মাল আছে, আমার মনে হয়েছে আপনারাই এর উপযুক্ত হকদার।” সালমান ফারসি (রা) বলেন, "আমি তা (সাদাকার মাল) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে রাখলাম। তখন তিনি সঙ্গীদের বললেন, "আহার করো।” কিন্তু তিনি হাত গুটিয়ে রাখলেন। তা থেকে আহার করেননি। আমি মনে মনে বললাম, "(নবুওয়াতের) একটি প্রমাণ পেলাম।” অতঃপর তাঁর কাছ থেকে চলে আসলাম এবং আরও কিছু জিনিস জমা করলাম। ততদিনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় চলে গিয়েছেন। অতঃপর তাঁর কাছে এসে বললাম, "আমি দেখলাম যে, আপনি সাদাকা খান না; তাই আপনার সমীপে এগুলো হাদিয়া দিচ্ছি।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে খেলেন এবং সঙ্গীদেরও তাঁর সাথে খাওয়ার নির্দেশ দিলে তাঁরাও তাঁর সাথে খেলেন। তখন আমি মনে মনে বললাম, "(নবুওয়াতের) দুটি প্রমাণ পেলাম...।'⁵

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৭৩২৪।
২. সহিহুল বুখারি: ৫৩৭৫, ৬৪৫২; সুনানুত তিরমিজি: ২৪৭৭।
৩. ফাতহুল বারি: ১১/২৮৯।
৪. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৬৫৩৩ (শাইখ আলবানি হাদিসটিকে জইফ বলেছেন। তালিকাতুল হিসান: ৬৪৯৯)
৫. মুসনাদু আহমাদ: ২৩২২৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সম্ভ্রান্ত সাহাবিদেরকে নিঃস্বদের সাহায্য করার নির্দেশ দিতেন

📄 সম্ভ্রান্ত সাহাবিদেরকে নিঃস্বদের সাহায্য করার নির্দেশ দিতেন


ইবনে সিরিন (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধ্যাবেলা সুফফাবাসীদেরকে সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মাঝে বণ্টন করে দিতেন। কেউ একজন নিয়ে যেতেন, কেউ দুজন, কেউ তিনজন... এভাবে দশজন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কথা বর্ণিত আছে।'¹
হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এভাবে সবাই নিয়ে যাওয়ার পর যারা থেকে যেতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিজের ঘরে নিয়ে যেতেন এবং ঘরে যা আছে, তা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।'²
ইয়াইশ বিন তিখফা গিফারি (রা) বলেন, 'আমার পিতা আসহাবে সুফফার সদস্য ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে আসহাবে সুফফার লোকদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কেউ একজন, কেউ দুজন... এভাবে সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো। অবশেষে আমরা পাঁচজন রয়ে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "চলো।” আমরা তাঁর সাথে আয়িশা (রা)-এর ঘরে গেলাম। তিনি বললেন, "আয়িশা, আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করো।” তিনি হাশিশা (আটার তৈরি একপ্রকারের খাদ্য, যেটার সাথে খেজুর বা গোশত মিশিয়ে দেওয়া হয়) পরিবেশন করলেন এবং আমরা খেলাম। অতঃপর তিনি কবুতরের মতো সামান্য হায়সা (খেজুর, ময়দা, পনির ও ঘিয়ের মিশেলে তৈরি একপ্রকার খাবার) নিয়ে আসলেন আর আমরা খেলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আয়িশা, এবার আমাদের পান করাও।” তিনি একটি বড় পাত্রে দুধ নিয়ে আসলেন আর আমরা পান করলাম। অতঃপর তিনি দুধভর্তি একটি ছোট পেয়ালা নিয়ে আসলেন আর আমরা তা পান করলাম।³ অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা চাইলে এখানে রাত কাটাতে পারো অথবা মসজিদে ফিরে যেতে পারো।” আমরা বললাম, "আমরা বরং মসজিদেই ফিরে যাই।"'⁴

টিকাঃ
১. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ২৭১৫৪।
২. শুআবুল ইমান: ১০৩৩৩।
৩. কবুতরের মতো বলার দ্বারা হায়সার পরিমাণ কম হওয়া উদ্দেশ্য।
৪. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৭৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00