📄 দুঃখবোধে শিথিলকারী খাবার দেখিয়ে দিতেন
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'তার পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে অনেক মহিলা তার পাশে একত্রিত হতেন। অতঃপর তার পরিবারের লোকজন ও বিশেষ ঘনিষ্ঠ মহিলাগণ ছাড়া বাকিরা চলে গেলে তিনি ডেগে তালবিনা (যবের আটা ও তার কুড়া দিয়ে তৈরি একপ্রকার ঝোলজাতীয় খাবার) পাকাতে নির্দেশ দিতেন। তারপর সারিদ (গোশতের মধ্যে রুটি টুকরো করে দিয়ে তৈরি খাবার) তৈরি করে তালবিনা তার ওপর ঢেলে দেওয়া হতো। এরপর তিনি বলতেন, "এটা থেকে আহার করো। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
'তালবিনা রোগীর অন্তর প্রশান্ত করে এবং দুঃখ কিছুটা প্রশমিত করে।'¹
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শোকাহত ও ব্যথিতদের জন্য তালবিনা খাওয়া মুসতাহাব।
তালবিনার উপকারিতা ড. জগলুল আন-নাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যবের স্যুপ (তালবিনা) শরীরের পিপাসা নিবারণ করে, পেশাব বৃদ্ধি করে, হজমশক্তি বাড়ায়, গলার খসখসে ভাব ও সর্দি-কাশি উপশম করে, শ্বাসকষ্ট নিরাময় করে, পাকস্থলী পরিষ্কার রাখে, মূত্রথলির বিভিন্ন রোগ দমন করে, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে এবং শরীরে শক্তি বর্ধন করে।'²
এ ছাড়াও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যব রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ১৯৭৫ সালে 'জার্নাল অব লিপিড রিসার্চ' কোলেস্টেরল কমানোয় যব ও অন্যান্য উদ্ভিদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমেরিকার কৃষিবিজ্ঞানীরা যব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, যবের মধ্যে এমন তিনটি উপাদান রয়েছে, যা রক্তের কোলেস্টেরল কমানোয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
ড. জগলুল আন-নাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করে যে, যবের মধ্যে যে রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, তা দেহকোষের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। ফলে মানুষ বিষণ্ণতা ও অবসাদগ্রস্ততা থেকে মুক্ত থাকে এবং হৃদয় প্রশান্ত ও স্থির থাকে। মানবদেহে রাসায়নিক ত্রুটির কারণেই বিষণ্ণতা ও অবসাদগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়। সুতরাং তার কার্যকরী প্রতিষেধক হলো, এমন খাদ্য গ্রহণ করা যা সেই ত্রুটিকে সংশোধন করে। যেমন: যবের স্যুপ-যা এ রোগের অনেক উপকারী ওষুধের কাজ করে।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৫৪১৭, সহিহু মুসলিম: ২২১৬।
২. আল-ইজাজুল ইলমি ফিস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ: ২/৯।
৩. শাইখ উসমান আল-খামিসের আল-মানহাজ ওয়েবসাইট থেকে।
📄 বিপদগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতেন
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো মহিলার কাছে সরাসরি যেতেন না। প্রয়োজন হলে তাদের স্বামীদের মাধ্যমে যেতেন। তবে উম্মে সুলাইম (রা)-এর ব্যতিক্রম-তিনি সরাসরি তার কাছে যেতেন। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
'আমি তার প্রতি করুণা করি, কারণ তার ভাই আমার সাথে (যুদ্ধ করতে গিয়ে) নিহত হয়েছে।'¹
উম্মে সুলাইম (রা)-এর নাম সাহলা বা রামিলা বা মুলাইকা বিনতে মিলহান আনসারি (রা)। তিনি আনাস বিন মালিক (রা)-এর মাতা। উপনামে প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণে তার মূল নাম নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। তার ভাই হারাম বিন মিলহান (রা) বিরে মাউনার যুদ্ধে নিহত হন। সে যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন না। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশক্রমে যেহেতু তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এ জন্য তিনি 'আমার সাথে' বলেছেন। অর্থাৎ 'আমার প্রেরিত লশকরের সাথে বা আমার নির্দেশ পালন করতে গিয়ে বা আমার আনুগত্য করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।'
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ভাই-বন্ধুদের মৃত্যুর পর তাদের ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা এবং তাদের পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সুলাইম (রা)-কে দেখতে যাওয়ার মাধ্যমে তার মনের ব্যথা উপশম করতেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, উম্মে সুলাইমের (রা) ভাই তাঁর নির্দেশক্রমে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যুর পর তার পরিবারের দেখাশোনা করতেন। আর এটি ছিল ভ্রাতৃত্বের দাবি আদায়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।²
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইতিপূর্বে কিতাবুল জিহাদে উম্মে সুলাইম (রা)-এর বোন উম্মে হারাম (রা)-এর আলোচনায় আমরা উল্লেখ করেছি যে, তারা দুজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ-সম্পর্কিত অথবা নসব-সম্পর্কিত খালা ছিলেন। সুতরাং তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাহরাম ছিলেন বিধায় তাদের সাথে একাকী মিলিত হওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সম্পূর্ণ বৈধ ছিল। এ জন্য তিনি এ দুজন মহিলার সাথে সরাসরি দেখা করতেন, যেখানে তিনি অন্য মহিলাদের নিকট সরাসরি না গিয়ে তাদের স্বামীদের নিকট যেতেন। উলামায়ে কিরাম বলেন, এ হাদিস মাহরাম মহিলার নিকট মাহরাম পুরুষের যাওয়ার বৈধতা প্রমাণ করে। সাথে সাথে গাইরে মাহরাম মহিলার নিকট যাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। সাক্ষাৎকারী পুরুষ নেককার হলেও। এ ছাড়াও ইতিপূর্বে গাইরে মাহরাম মহিলার সাথে একাকী মিলিত হওয়ার অবৈধতা সম্পর্কে একাধিক সহিহ ও প্রসিদ্ধ হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২৮৪৪, সহিহু মুসলিম: ২৪৫৫।
২. ফাতহুল বারি: ৬/৫১।
৩. ইমাম মুসলিম কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১০।
📄 বিপদে পরস্পরকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছেন
আমর বিন হাজম (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যেকোনো মুমিন ব্যক্তি তার ভাইয়ের বিপদে তাকে সান্ত্বনা দান করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন।'¹
টিকাঃ
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৬০১।
📄 সান্ত্বনা দেওয়ার সময় কী বলবে, তা শিখিয়ে দিয়েছেন
উসামা বিন জাইদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেয়ে আমাকে এই সংবাদ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পাঠালেন যে, তার ছেলে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে, সুতরাং তিনি যেন তার নিকট যান। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম জানিয়ে বলে পাঠালেন:
'যা নিয়ে নিয়েছেন তা একান্ত আল্লাহর, আর যা দান করেছেন তাও তাঁর। তাঁর কাছে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট একটা সময়সীমা আছে। সুতরাং সে যেন ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখে।'¹
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১২৮৪, সহিহু মুসলিম: ৯২৩।