📄 আল্লাহর রাস্তায় সমুদয় সম্পদ হারিয়ে ফেলেছে—এমন লোককে সান্ত্বনা দিতেন
সুহাইব রুমি (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর সাথে আবু বকর (রা)-ও বের হলেন। আমার তাঁর সাথে বের হওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কুরাইশের একদল যুবক আমাকে বাধা দিল। ওই রাতটি আমি একদম না বসে দাঁড়িয়ে থেকে কাটালাম। তারা বলল, "আল্লাহ তাআলা তাকে তার পেটের কল্যাণে তোমাদের থেকে নির্লিপ্ত রেখেছেন।” আমি তাদের কাছে কষ্টের অভিযোগ করিনি। অতঃপর তারা ঘুমিয়ে পড়লে আমি বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু যাত্রা শুরু করতেই কিছু লোক এসে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইল। আমি তাদের বললাম, "আমি যদি তোমাদের কয়েক আউন্স স্বর্ণ দিই, তোমরা কি আমার পথ ছেড়ে দেবে?" তারা সম্মত হলো, ফলে আমি তাদের সাথে মক্কায় ফিরে গেলাম। তারপর বললাম, "চৌকাঠের নিচে খনন করো, এখানে কয়েক আউন্স আছে; তারপর অমুক মেয়ের কাছে গিয়ে তার গহনা নিয়ে নাও।" এই বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবা থেকে রওনা দেওয়ার পূর্বেই আমি সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, "আবু ইয়াহইয়া, তোমার এ বিক্রি খুব লাভজনক হয়েছে।" আমি বললাম, "আমার পূর্বে তো আপনার কাছে কেউই আসেনি। তাহলে নিশ্চয় জিবরিল (আলাইহিস সালাম)-ই আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেছেন।" তখন আল্লাহ তাআলা সুহাইব (রা) সম্পর্কে আয়াত নাজিল করলেন-
'আর মানুষের মাঝে এক শ্রেণির লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।'¹-²
টিকাঃ
১. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৭।
২. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৫৭০৬।
📄 আর্থিকভাবে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাদাকা দিতে নির্দেশ করতেন
আবু সাইদ খুদরি (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় এক ব্যক্তি ফল ব্যবসায় চরম মার খেলেন। এতে তার কর্জ অনেক বেড়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'ওকে সাদাকা দাও।'
লোকজন তাকে সাদাকা দান করলেন, কিন্তু তা তার পুরো ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট হয়নি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাওনাদারদের বললেন:
'যা পেয়েছ, তা নিয়ে নাও। এর চেয়ে বেশি পাবে না।'¹
অর্থাৎ এই মুহূর্তে এগুলো ছাড়া আপাতত আর পাবে না। আর যতদিন তার সচ্ছলতা আসছে না, তোমাদের জন্য তাকে ঋণ আদায়ে চাপ দেওয়া বৈধ নয়।²
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৫৫৬।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/২১৭।
📄 সুসংবাদ শুনিয়ে তাদের বিপদ সহনীয় করে তুলতেন
আনাস বিন মালিক (রা) উম্মে রাবি বিনতে বারা (রা) বর্ণনা করেন, 'হারিসা বিন সুরাকা (রা)-এর মাতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর নবি, আমাকে হারিসার ব্যাপারে সংবাদ দিন (হারিসা বদরের যুদ্ধে এক অজ্ঞাত তিরের আঘাতে নিহত হয়েছিলেন), সে যদি জান্নাতে থাকে, তাহলে আমি সবর করব; আর যদি তা না হয়, তাহলে আমি তার জন্য খুব কাঁদব।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'কী বলো এসব? বোকা হয়ে গেছ নাকি তুমি? জান্নাত কি ওই একটাই আছে? জান্নাত অনেক রয়েছে, আর সে জান্নাতুল ফিরদাওসের মধ্যে রয়েছে।'¹
হাফিজ ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এটি বিলাপ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বের ঘটনা। কারণ, বিলাপ নিষিদ্ধ হয়েছিল উহুদ যুদ্ধের পরে, আর এটি বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা।'²
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি বললেন, "কী হে জাবির, তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে যে?” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, উহুদ যুদ্ধে আমার পিতা শহিদ হয়ে গেছেন এবং পরিবার-পরিজন ও ঋণ রেখে গেছেন।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আল্লাহ তাআলা তোমার পিতার সাথে কীভাবে মিলিত হয়েছেন, আমি কি তোমাকে সেই সুসংবাদ দেবো না?'
আমি বললাম, "অবশ্যই দেবেন ইয়া রসুলাল্লাহ!” তিনি বললেন:
"আল্লাহ তাআলা কখনো কারও সাথে তার পর্দার অন্তরাল ব্যতীত (সরাসরি) কথা বলেননি, কিন্তু তিনি তোমার পিতাকে জীবন দান করে তার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। তাকে তিনি বললেন:
'তুমি আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, আমি তোমাকে তা দান করব।' সে বলল, "হে আমার রব, আপনি আমাকে জীবন দান করুন, যাতে আমি আবার আপনার রাস্তায় শহিদ হতে পারি।” আল্লাহ তাআলা বললেন, "আমার পক্ষ থেকে আগে থেকেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে আছে যে, তারা আবার (দুনিয়ায়) ফিরে যাবে না। এ প্রসঙ্গে আয়াত অবতীর্ণ হয় "আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদের তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।"³-⁴
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৬৫৫০।
২. ফাতহুল বারি: ৬/২৭।
৩. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৬৯।
৪. সুনানুত তিরমিজি: ৩০১০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯০।
📄 দুঃখবোধে শিথিলকারী খাবার দেখিয়ে দিতেন
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'তার পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে অনেক মহিলা তার পাশে একত্রিত হতেন। অতঃপর তার পরিবারের লোকজন ও বিশেষ ঘনিষ্ঠ মহিলাগণ ছাড়া বাকিরা চলে গেলে তিনি ডেগে তালবিনা (যবের আটা ও তার কুড়া দিয়ে তৈরি একপ্রকার ঝোলজাতীয় খাবার) পাকাতে নির্দেশ দিতেন। তারপর সারিদ (গোশতের মধ্যে রুটি টুকরো করে দিয়ে তৈরি খাবার) তৈরি করে তালবিনা তার ওপর ঢেলে দেওয়া হতো। এরপর তিনি বলতেন, "এটা থেকে আহার করো। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
'তালবিনা রোগীর অন্তর প্রশান্ত করে এবং দুঃখ কিছুটা প্রশমিত করে।'¹
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শোকাহত ও ব্যথিতদের জন্য তালবিনা খাওয়া মুসতাহাব।
তালবিনার উপকারিতা ড. জগলুল আন-নাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যবের স্যুপ (তালবিনা) শরীরের পিপাসা নিবারণ করে, পেশাব বৃদ্ধি করে, হজমশক্তি বাড়ায়, গলার খসখসে ভাব ও সর্দি-কাশি উপশম করে, শ্বাসকষ্ট নিরাময় করে, পাকস্থলী পরিষ্কার রাখে, মূত্রথলির বিভিন্ন রোগ দমন করে, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে এবং শরীরে শক্তি বর্ধন করে।'²
এ ছাড়াও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যব রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ১৯৭৫ সালে 'জার্নাল অব লিপিড রিসার্চ' কোলেস্টেরল কমানোয় যব ও অন্যান্য উদ্ভিদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমেরিকার কৃষিবিজ্ঞানীরা যব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, যবের মধ্যে এমন তিনটি উপাদান রয়েছে, যা রক্তের কোলেস্টেরল কমানোয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
ড. জগলুল আন-নাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করে যে, যবের মধ্যে যে রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, তা দেহকোষের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। ফলে মানুষ বিষণ্ণতা ও অবসাদগ্রস্ততা থেকে মুক্ত থাকে এবং হৃদয় প্রশান্ত ও স্থির থাকে। মানবদেহে রাসায়নিক ত্রুটির কারণেই বিষণ্ণতা ও অবসাদগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়। সুতরাং তার কার্যকরী প্রতিষেধক হলো, এমন খাদ্য গ্রহণ করা যা সেই ত্রুটিকে সংশোধন করে। যেমন: যবের স্যুপ-যা এ রোগের অনেক উপকারী ওষুধের কাজ করে।'³
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৫৪১৭, সহিহু মুসলিম: ২২১৬।
২. আল-ইজাজুল ইলমি ফিস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ: ২/৯।
৩. শাইখ উসমান আল-খামিসের আল-মানহাজ ওয়েবসাইট থেকে।