📄 অনেক সময় বিপদগ্রস্তের দায়িত্ব ও অভিভাবকত্ব গ্রহণ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাইদ বিন হারিসা (রা)-এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করলেন এবং বললেন:
"জাইদ (রা) যদি নিহত হয় অথবা শহিদ হয়, তবে জাফর (রা) তোমাদের আমির হবে। সেও যদি নিহত হয় অথবা শহিদ হয়, তবে তোমাদের আমির হবে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)।"
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের ব্যাপারে সংবাদ আসলো। তখন তিনি লোকদের নিকট গিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বললেন:
"তোমাদের ভাইয়েরা শত্রুর মোকাবেলা করেছে। প্রথমে জাইদ (রা) পতাকা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং শহিদ হয়ে গেল। তারপর জাফর বিন আবু তালিব (রা) পতাকা হাতে তুলে নিয়ে কিতাল করতে করতে শহিদ হয়ে গেল। অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) পতাকা হাতে নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেল। একপর্যায়ে সেও শহিদ হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহর তরবারি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) পতাকা হাতে নিল এবং তার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করলেন।"
এরপর তিন দিন পর্যন্ত জাফর (রা)-এর পরিবারকে কাঁদতে ও শোক প্রকাশ করতে দিলেন। অতঃপর (তিন দিন পর) তাদের নিকট গিয়ে বললেন:
"আজকের পর থেকে অথবা আগামীকাল থেকে আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদবে না। আর আমার কাছে আমার ভাইয়ের ছেলেদের উপস্থিত করো।"
এরপর আমাদের ডাকা হলো। আমাদের চুল দেখে মনে হচ্ছিল যেন এগুলো পাখির সদ্যগজানো পালক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "নাপিতকে ডাকো।"
নাপিতকে ডেকে আনা হলো। আমাদের সকলের মাথা মুণ্ডন করা হলো।¹ এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
"মুহাম্মাদ বিন জাফর (রা) হচ্ছে আমাদের চাচা আবু তালিবের (রাহিমাহুল্লাহ) মতো। আর আব্দুল্লাহর (রা) অবয়ব ও চরিত্র আমার মতো।"
এতটুকু বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত উঁচু করে ধরে বললেন, "হে আল্লাহ আব্দুল্লাহকে (রা) পরিবারে জাফরের (রা) স্থলাভিষিক্ত করুন। তাকে ব্যবসায় বরকত দিন।” এ কথা তিনি তিনবার বললেন।
এরপর আমাদের মা এলেন। আমাদের এতিম হয়ে যাওয়ার কথা তুলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুঃখভারাক্রান্ত করে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তাদের অভাবের ব্যাপারে ভয় করছ? তবে শুনে নাও, দুনিয়া-আখিরাতে আমিই তাদের অভিভাবক।"²
টিকাঃ
১. জাফর (রা)-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রা) স্বামীর শোকে কাতর ছিলেন। তাই ছোট ছেলে-মেয়েদের মাথা চিরুনি করা, তাদের পরিপাটি রাখার প্রতি নজর দিতে পারেননি। ফলে তাদের মাথায় উকুন হয়ে যায়। তাই নাপিত ডেকে তাদের মাথা মুণ্ডন করে উকুন মুক্ত করা হয়।
২. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৫৩।
📄 বিধবা ও এতিমদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন
সাহল বিন সাদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুলের মাধ্যমে ইশারা করে ইরশাদ করেছেন:
'আমি ও এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে (এ দুই আঙুলের মতো পাশাপাশি) থাকব।'¹
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'বিধবা ও নিঃস্বদের (ভরণপোষণের) পেছনে যে মেহনত করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার যতদূর ধারণা, তিনি আরও বলেছেন) বিরামহীন নফল নামাজ আদায়কারীর মতো এবং প্রতিদিন রোজা রাখে এমন ব্যক্তির মতো।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫৩০৪।
২. সহিহুল বুখারি ৫৩৫৩, সহিহু মুসলিম: ২৯৮২।
📄 কষ্ট লাঘব করতে বিপদগ্রস্তকে অর্থ-সম্পদ দান করতেন
তায়িফ বিজয়ের পর মক্কাবাসীকে তিনি অনেক মাল দান করেছিলেন। যার ফলে আনসারদের মনে কিছুটা অসন্তোষভাবও এসেছিল।
আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের কিছু লোককে একত্র করে বললেন:
'কুরাইশরা সদ্য জাহিলিয়াত পরিত্যাগকারী এবং দুর্দশাগ্রস্ত। (যেমন: তাদের প্রিয়জনদের হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের দেশ জয় করা হয়েছে) তাই আমি তাদের অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করার ইচ্ছা করেছি।'¹
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৩৩৪।
📄 আল্লাহর রাস্তায় সমুদয় সম্পদ হারিয়ে ফেলেছে—এমন লোককে সান্ত্বনা দিতেন
সুহাইব রুমি (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর সাথে আবু বকর (রা)-ও বের হলেন। আমার তাঁর সাথে বের হওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কুরাইশের একদল যুবক আমাকে বাধা দিল। ওই রাতটি আমি একদম না বসে দাঁড়িয়ে থেকে কাটালাম। তারা বলল, "আল্লাহ তাআলা তাকে তার পেটের কল্যাণে তোমাদের থেকে নির্লিপ্ত রেখেছেন।” আমি তাদের কাছে কষ্টের অভিযোগ করিনি। অতঃপর তারা ঘুমিয়ে পড়লে আমি বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু যাত্রা শুরু করতেই কিছু লোক এসে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইল। আমি তাদের বললাম, "আমি যদি তোমাদের কয়েক আউন্স স্বর্ণ দিই, তোমরা কি আমার পথ ছেড়ে দেবে?" তারা সম্মত হলো, ফলে আমি তাদের সাথে মক্কায় ফিরে গেলাম। তারপর বললাম, "চৌকাঠের নিচে খনন করো, এখানে কয়েক আউন্স আছে; তারপর অমুক মেয়ের কাছে গিয়ে তার গহনা নিয়ে নাও।" এই বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবা থেকে রওনা দেওয়ার পূর্বেই আমি সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, "আবু ইয়াহইয়া, তোমার এ বিক্রি খুব লাভজনক হয়েছে।" আমি বললাম, "আমার পূর্বে তো আপনার কাছে কেউই আসেনি। তাহলে নিশ্চয় জিবরিল (আলাইহিস সালাম)-ই আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেছেন।" তখন আল্লাহ তাআলা সুহাইব (রা) সম্পর্কে আয়াত নাজিল করলেন-
'আর মানুষের মাঝে এক শ্রেণির লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।'¹-²
টিকাঃ
১. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৭।
২. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৫৭০৬।