📄 সান্ত্বনা দিয়ে বিপদগ্রস্তের কষ্ট সহনীয় করে তুলতেন
আসমা বিনতে উমাইস (রা) বলেন, 'যেদিন জাফর (রা) ও তাঁর সঙ্গীরা নিহত হলেন, সেদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে উপস্থিত হলাম। এর পূর্বে আমি চল্লিশটি চামড়া পাকা করলাম, আঠার তাল তৈরি করলাম এবং বাচ্চাদের গোসল করিয়ে তাদের মাথায় তেল মেখে দিলাম এবং তাদের পরিপাটি করে দিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "জাফরের (রা) বাচ্চাদের আমার কাছে আনো।” আমি তাদের নিয়ে এলাম। তিনি তাদের শুঁকলেন এবং তাঁর চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জাফর (রা) আর তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে কোনো খারাপ সংবাদ পেয়েছেন?" তিনি বললেন, "হাঁ, তারা আজ নিহত হয়েছে।” এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের লোকদের নিকট গিয়ে বললেন:
'জাফরের (রা) পরিবারের জন্যও খাবার তৈরি করো। কারণ, তারা পরিবারের কর্তার মৃত্যুর শোকে ব্যস্ত হয়ে আছে।'¹
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, 'তিনি বলেন, যখন জাফর (রা)-এর মরদেহ এসে পৌঁছাল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'জাফরের (রা) পরিবার-পরিজনের জন্য খাবার তৈরি করো, কারণ তারা শোকে অধীর হয়ে আছে।'²
মুবারকপুরি (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ চিন্তা ও শোকের কারণে তারা খাবারদাবার তৈরিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। খেতে না পেয়ে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে, যা তারা বুঝতেও পারবে না।' তিবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মৃতের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করা আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের জন্য মুসতাহাব।'³
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ২৬৫৪৬।
২. সুনানুত তিরমিজি: ৯৯৮, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৬১০।
৩. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৬৭।
📄 অনেক সময় বিপদগ্রস্তের দায়িত্ব ও অভিভাবকত্ব গ্রহণ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাইদ বিন হারিসা (রা)-এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করলেন এবং বললেন:
"জাইদ (রা) যদি নিহত হয় অথবা শহিদ হয়, তবে জাফর (রা) তোমাদের আমির হবে। সেও যদি নিহত হয় অথবা শহিদ হয়, তবে তোমাদের আমির হবে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)।"
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের ব্যাপারে সংবাদ আসলো। তখন তিনি লোকদের নিকট গিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বললেন:
"তোমাদের ভাইয়েরা শত্রুর মোকাবেলা করেছে। প্রথমে জাইদ (রা) পতাকা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং শহিদ হয়ে গেল। তারপর জাফর বিন আবু তালিব (রা) পতাকা হাতে তুলে নিয়ে কিতাল করতে করতে শহিদ হয়ে গেল। অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) পতাকা হাতে নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেল। একপর্যায়ে সেও শহিদ হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহর তরবারি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) পতাকা হাতে নিল এবং তার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করলেন।"
এরপর তিন দিন পর্যন্ত জাফর (রা)-এর পরিবারকে কাঁদতে ও শোক প্রকাশ করতে দিলেন। অতঃপর (তিন দিন পর) তাদের নিকট গিয়ে বললেন:
"আজকের পর থেকে অথবা আগামীকাল থেকে আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদবে না। আর আমার কাছে আমার ভাইয়ের ছেলেদের উপস্থিত করো।"
এরপর আমাদের ডাকা হলো। আমাদের চুল দেখে মনে হচ্ছিল যেন এগুলো পাখির সদ্যগজানো পালক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "নাপিতকে ডাকো।"
নাপিতকে ডেকে আনা হলো। আমাদের সকলের মাথা মুণ্ডন করা হলো।¹ এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
"মুহাম্মাদ বিন জাফর (রা) হচ্ছে আমাদের চাচা আবু তালিবের (রাহিমাহুল্লাহ) মতো। আর আব্দুল্লাহর (রা) অবয়ব ও চরিত্র আমার মতো।"
এতটুকু বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত উঁচু করে ধরে বললেন, "হে আল্লাহ আব্দুল্লাহকে (রা) পরিবারে জাফরের (রা) স্থলাভিষিক্ত করুন। তাকে ব্যবসায় বরকত দিন।” এ কথা তিনি তিনবার বললেন।
এরপর আমাদের মা এলেন। আমাদের এতিম হয়ে যাওয়ার কথা তুলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুঃখভারাক্রান্ত করে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তাদের অভাবের ব্যাপারে ভয় করছ? তবে শুনে নাও, দুনিয়া-আখিরাতে আমিই তাদের অভিভাবক।"²
টিকাঃ
১. জাফর (রা)-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রা) স্বামীর শোকে কাতর ছিলেন। তাই ছোট ছেলে-মেয়েদের মাথা চিরুনি করা, তাদের পরিপাটি রাখার প্রতি নজর দিতে পারেননি। ফলে তাদের মাথায় উকুন হয়ে যায়। তাই নাপিত ডেকে তাদের মাথা মুণ্ডন করে উকুন মুক্ত করা হয়।
২. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৫৩।
📄 বিধবা ও এতিমদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন
সাহল বিন সাদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুলের মাধ্যমে ইশারা করে ইরশাদ করেছেন:
'আমি ও এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে (এ দুই আঙুলের মতো পাশাপাশি) থাকব।'¹
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'বিধবা ও নিঃস্বদের (ভরণপোষণের) পেছনে যে মেহনত করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার যতদূর ধারণা, তিনি আরও বলেছেন) বিরামহীন নফল নামাজ আদায়কারীর মতো এবং প্রতিদিন রোজা রাখে এমন ব্যক্তির মতো।'²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫৩০৪।
২. সহিহুল বুখারি ৫৩৫৩, সহিহু মুসলিম: ২৯৮২।
📄 কষ্ট লাঘব করতে বিপদগ্রস্তকে অর্থ-সম্পদ দান করতেন
তায়িফ বিজয়ের পর মক্কাবাসীকে তিনি অনেক মাল দান করেছিলেন। যার ফলে আনসারদের মনে কিছুটা অসন্তোষভাবও এসেছিল।
আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের কিছু লোককে একত্র করে বললেন:
'কুরাইশরা সদ্য জাহিলিয়াত পরিত্যাগকারী এবং দুর্দশাগ্রস্ত। (যেমন: তাদের প্রিয়জনদের হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের দেশ জয় করা হয়েছে) তাই আমি তাদের অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করার ইচ্ছা করেছি।'¹
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৩৩৪।