📄 মুসলমানকে জানিয়ে দিতেন, অসুস্থতায় কাটলেও দীর্ঘ জীবন নিয়ামত
দীর্ঘ জীবন মুমিনের জন্য মঙ্গলজনক। কারণ, জীবন দীর্ঘ হলে নেক আমলের পরিমাণও বেশি হয়। এ সম্পর্কে আবু বাকরা (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জানতে চাইলেন, "সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?" তিনি উত্তরে বললেন:
'যার বয়স বেশি হয় এবং আমল উত্তম হয়।'
অতঃপর জানতে চাইলেন, "সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি কে?" তিনি বললেন:
'যার বয়স বেশি হয় এবং আমল মন্দ হয়।'¹
সুতরাং কোনো মুসলমান দুর্দশাগ্রস্ত হলে বা রোগাক্রান্ত হলে সে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করবে না, যেন নেক আমলের ধারা বন্ধ হয়ে না যায়।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুর কামনা না করে। কেননা, হয়তো সে সৎকর্মশীল হবে; ফলে তার সৎকর্ম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশা আছে। অথবা সে মন্দ-কর্মশীল হবে, তখন সে তাওবা-ইসতিগফার করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার সম্ভাবনা আছে।'²
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে-
'তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা না করে এবং তা আসার পূর্বেই তাকে না ডাকে। কেননা, মৃত্যুর পর আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়; আর মুমিনের বয়স তার জন্য কেবল উপকারই বৃদ্ধি করে।'³
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে সৎকর্মশীলকে তার সৎকর্মকে আরও বাড়ানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং মন্দকর্মশীলকে মন্দকর্মের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। যেন বলেছেন, 'যে সৎকর্ম করে তার উচিত, মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করে আপন সৎকর্মের ওপর অটল থাকা এবং তাকে আরও সমৃদ্ধ করা। আর যে ব্যক্তি মন্দকর্ম করে তার উচিত, মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করা এবং মন্দকর্ম থেকে ফিরে আসা, যেন মন্দকর্মের ওপর তার মৃত্যু না হয়।'⁴
টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৩০।
২. সহিহুল বুখারি: ৭২৩৫।
৩. সহিহু মুসলিম: ২৬৮২।
৪. ফাতহুল বারি: ১৩/২২২।
📄 অস্থির হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে মৃত স্বজনের চেহারা না দেখতে বলেছেন
সাফিয়্যা (রা)-কে তার ভাই হামজা (রা)-এর মৃতদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি।
উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, আবু জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, 'উহুদের দিন এক মহিলা যুদ্ধে নিহতদের দেখতে দৌড়ে আসলেন। তিনি নিহতদের দেখতে পান, তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করলেন এবং বললেন, "মহিলাটিকে থামাও, মহিলাটিকে থামাও।” জুবাইর (রা) বলেন, "আমি চিনতে পারলাম, মহিলাটি আমার মাতা সাফিয়্যা (রা)। আমি দ্রুত তার দিকে ছুটে গেলাম এবং নিহতদের নিকট যাওয়ার পূর্বেই তাকে ধরে ফেললাম। তিনি বেশ শক্তিশালী মহিলা ছিলেন। আমার বক্ষে শক্ত একটা আঘাত করে বললেন, "সর সামনে থেকে!" আমি বললাম, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে রুখতে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।” এ কথা শুনে তিনি থেমে গেলেন এবং দুটি কাপড় বের করে বললেন, "এ কাপড়দুটি আমার ভাই হামজা (রা)-এর জন্য এনেছি। আমি শুনেছি, সে নিহত হয়েছে। সুতরাং কাপড়দুটি দিয়ে তাকে কাফন দাও।” আমরা কাপড়দুটি দিয়ে তাকে কাফন পরানোর জন্য নিয়ে এলাম। এসে দেখতে পেলাম, তার পাশে আরেক আনসারি সাহাবির (রা) লাশ। তার সাথেও তা-ই ঘটেছে, যা হামজা (রা)-এর সাথে ঘটেছে। আমরা হামজা (রা)-কে দুই কাপড়ে কাফন দিয়ে আনসারি সাহাবিকে (রা) কাফনবিহীন রাখতে চরম লজ্জা অনুভব করলাম। কাজেই একটি হামজা (রা)-কে এবং অপরটি আনসারি সাহাবিকে (রা) পরানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কাপড়দুটি একটি অপরটির চেয়ে বড় ছিল। সুতরাং যার জন্য যেটা মাপে খাটে, তাকে সেটাতেই কাফন দেওয়া হলো।"'¹
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'উহুদের দিন (যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামজা (রা)-এর নিকট এসে দেখতে পেলেন, তাঁর লাশ বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। তখন তিনি বললেন:
'যদি সাফিয়্যার (রা) মনে কষ্টবোধ না হতো, তবে আমি তাঁর লাশ এভাবেই ছেড়ে রাখতাম। হিংস্র জন্তুরা এসে তা খেয়ে ফেলত, ফলে কিয়ামতের দিন তিনি এদের পেট থেকে উত্থিত হতেন।'
অতঃপর তিনি সাদা-কালো ডোরাকাটা একটি চাদর আনালেন এবং তাতেই হামজা (রা)-এর কাফন দিলেন। চাদরটি এত ছোট ছিল যে, মাথার দিকে টানলে তাঁর দুই পা খুলে যেত আর পায়ের দিকে টানলে মাথা খুলে যেত।'²
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামজা (রা)-এর লাশ কাফন-দাফন না করে বিকৃত অবস্থায় রেখে দেওয়ার ইচ্ছা এ জন্য পোষণ করেছিলেন যে, যেন তাঁর প্রতিদান পূর্ণাঙ্গ হয় এবং পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তাঁর পুরো শরীর আল্লাহর পথে ব্যস্ত থাকে। অথবা এ বলে তিনি এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন যে, কাফিররা তাঁর শরীরকে বিকৃত করার কারণে তাঁর আজাব রহিত হয়ে গেছে। ফলে তাঁকে দাফন করা এবং না করা উভয়ই সমান।³
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ১৪২১।
২. সুনানুত তিরমিজি: ১০১৬।
৩. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৮৩।
📄 সান্ত্বনা দিয়ে বিপদগ্রস্তের কষ্ট সহনীয় করে তুলতেন
আসমা বিনতে উমাইস (রা) বলেন, 'যেদিন জাফর (রা) ও তাঁর সঙ্গীরা নিহত হলেন, সেদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে উপস্থিত হলাম। এর পূর্বে আমি চল্লিশটি চামড়া পাকা করলাম, আঠার তাল তৈরি করলাম এবং বাচ্চাদের গোসল করিয়ে তাদের মাথায় তেল মেখে দিলাম এবং তাদের পরিপাটি করে দিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "জাফরের (রা) বাচ্চাদের আমার কাছে আনো।” আমি তাদের নিয়ে এলাম। তিনি তাদের শুঁকলেন এবং তাঁর চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জাফর (রা) আর তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে কোনো খারাপ সংবাদ পেয়েছেন?" তিনি বললেন, "হাঁ, তারা আজ নিহত হয়েছে।” এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের লোকদের নিকট গিয়ে বললেন:
'জাফরের (রা) পরিবারের জন্যও খাবার তৈরি করো। কারণ, তারা পরিবারের কর্তার মৃত্যুর শোকে ব্যস্ত হয়ে আছে।'¹
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, 'তিনি বলেন, যখন জাফর (রা)-এর মরদেহ এসে পৌঁছাল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'জাফরের (রা) পরিবার-পরিজনের জন্য খাবার তৈরি করো, কারণ তারা শোকে অধীর হয়ে আছে।'²
মুবারকপুরি (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ চিন্তা ও শোকের কারণে তারা খাবারদাবার তৈরিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। খেতে না পেয়ে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে, যা তারা বুঝতেও পারবে না।' তিবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মৃতের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করা আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের জন্য মুসতাহাব।'³
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ২৬৫৪৬।
২. সুনানুত তিরমিজি: ৯৯৮, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৬১০।
৩. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৬৭।
📄 অনেক সময় বিপদগ্রস্তের দায়িত্ব ও অভিভাবকত্ব গ্রহণ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাইদ বিন হারিসা (রা)-এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করলেন এবং বললেন:
"জাইদ (রা) যদি নিহত হয় অথবা শহিদ হয়, তবে জাফর (রা) তোমাদের আমির হবে। সেও যদি নিহত হয় অথবা শহিদ হয়, তবে তোমাদের আমির হবে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)।"
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের ব্যাপারে সংবাদ আসলো। তখন তিনি লোকদের নিকট গিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বললেন:
"তোমাদের ভাইয়েরা শত্রুর মোকাবেলা করেছে। প্রথমে জাইদ (রা) পতাকা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং শহিদ হয়ে গেল। তারপর জাফর বিন আবু তালিব (রা) পতাকা হাতে তুলে নিয়ে কিতাল করতে করতে শহিদ হয়ে গেল। অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) পতাকা হাতে নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেল। একপর্যায়ে সেও শহিদ হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহর তরবারি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) পতাকা হাতে নিল এবং তার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করলেন।"
এরপর তিন দিন পর্যন্ত জাফর (রা)-এর পরিবারকে কাঁদতে ও শোক প্রকাশ করতে দিলেন। অতঃপর (তিন দিন পর) তাদের নিকট গিয়ে বললেন:
"আজকের পর থেকে অথবা আগামীকাল থেকে আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদবে না। আর আমার কাছে আমার ভাইয়ের ছেলেদের উপস্থিত করো।"
এরপর আমাদের ডাকা হলো। আমাদের চুল দেখে মনে হচ্ছিল যেন এগুলো পাখির সদ্যগজানো পালক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "নাপিতকে ডাকো।"
নাপিতকে ডেকে আনা হলো। আমাদের সকলের মাথা মুণ্ডন করা হলো।¹ এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
"মুহাম্মাদ বিন জাফর (রা) হচ্ছে আমাদের চাচা আবু তালিবের (রাহিমাহুল্লাহ) মতো। আর আব্দুল্লাহর (রা) অবয়ব ও চরিত্র আমার মতো।"
এতটুকু বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত উঁচু করে ধরে বললেন, "হে আল্লাহ আব্দুল্লাহকে (রা) পরিবারে জাফরের (রা) স্থলাভিষিক্ত করুন। তাকে ব্যবসায় বরকত দিন।” এ কথা তিনি তিনবার বললেন।
এরপর আমাদের মা এলেন। আমাদের এতিম হয়ে যাওয়ার কথা তুলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুঃখভারাক্রান্ত করে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তাদের অভাবের ব্যাপারে ভয় করছ? তবে শুনে নাও, দুনিয়া-আখিরাতে আমিই তাদের অভিভাবক।"²
টিকাঃ
১. জাফর (রা)-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রা) স্বামীর শোকে কাতর ছিলেন। তাই ছোট ছেলে-মেয়েদের মাথা চিরুনি করা, তাদের পরিপাটি রাখার প্রতি নজর দিতে পারেননি। ফলে তাদের মাথায় উকুন হয়ে যায়। তাই নাপিত ডেকে তাদের মাথা মুণ্ডন করে উকুন মুক্ত করা হয়।
২. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৫৩।