📄 বিপদগ্রস্তকে অপেক্ষাকৃত কঠিন বিপদের কথা বলে সান্ত্বনা দিতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও লোকদের মাঝখানের দরোজা খুলে অথবা পর্দা তুলে দেখলেন যে, লোকজন আবু বকর (রা)-এর পেছনে নামাজ পড়ছে। তিনি তাদের উক্ত অবস্থায় দেখে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং আশা করলেন যে, আল্লাহ যেন আবু বকর (রা)-কে তাদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করেন, যেভাবে তিনি তাদের দেখতে পেয়েছেন। এরপর তিনি বললেন:
'হে লোকসকল, কোনো লোকের ওপর অথবা কোনো মুমিনের ওপর বিপদ আসলে সে যেন অপরের ওপর আপতিত বিপদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে; বরং আমার ওপর আপতিত বিপদের কোনো কথা স্মরণ করে সান্ত্বনা লাভ করে। কেননা, আমার পরে আমার কোনো উম্মতের ওপর আমার বিপদের তুলনায় কঠিন বিপদ আপতিত হবে না।'¹
কবি বলেন:
'প্রতিটি বিপদে ধৈর্য ধরো এবং মনোবল অটুট রাখো। মনে রাখো, কোনো মানুষই এখানে চিরস্থায়ী থাকার জন্য আসেনি। বিপদের স্মরণ বিপদের সময় সান্ত্বনা দেয়। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর আপতিত বিপদের কথা স্মরণ করাই সবচেয়ে কার্যকর।'
টিকাঃ
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৫৯৯।
📄 বিপদের সময় কী পড়তে হবে, তা শিক্ষা দিতেন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
'আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, "নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।” তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হিদায়াতপ্রাপ্ত।'¹
উম্মে সালামা (রা) বলেন, "আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
'কোনো মুসলমান যখন বিপদে পতিত হয়, তখন সে যদি আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলে এবং এবং এ দোয়া পাঠ করে, "হে আল্লাহ, আমাকে বিপদে ধৈর্যধারণের সাওয়াব দান করুন এবং এর চেয়ে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দান করুন।” তবে আল্লাহ তাকে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দিয়ে ধন্য করবেন।"'
এরপর উম্মে সালামা (রা) বলেন, 'যখন আবু সালামা (রা)-এর মৃত্যু হলো, তখন আমি বললাম, "আবু সালামা (রা) থেকে উত্তম আর কে হতে পারে? তার পরিবারই প্রথম পরিবার, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হিজরত করেছিল।” কিন্তু তবুও আমি উক্ত দোয়া পাঠ করলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা আমাকে তার স্থলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দান করলেন।'²
টিকাঃ
১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫৫-১৫৭।
২. সহিহু মুসলিম: ৯১৮।
📄 বিপদের সময় নিজের ওপর বদদোয়া করতে নিষেধ করতেন
নিজের ও নিজের পরিবারের ওপর বদদোয়া করা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'তোমরা নিজেদের ওপর বদদোয়া কোরো না, তোমাদের সন্তানদের ওপর বদদোয়া কোরো না, তোমাদের খাদিমদের ওপর বদদোয়া কোরো না এবং তোমাদের ধনসম্পদের ওপর বদদোয়া কোরো না। কেননা, ওই সময়টি আল্লাহর পক্ষ হতে দোয়া কবুলের মুহূর্তও হতে পারে, ফলে তা কবুল হয়ে যাবে।'¹
বিপদের সময় নিজের জন্য বদদোয়া করা সর্বাবস্থায় তো নিষিদ্ধই, বিপদের সময় বিশেষভাবে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সালামা (রা)-এর নিকট আসলেন। তখন তার চোখদুটো খোলা ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে বললেন, "রুহ যখন চলে যায়, তখন চোখ তার দিকে তাকিয়ে থাকে।” এ কথা শুনে তার পরিবারের লোকেরা উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমরা নিজেদের জন্য অমঙ্গলজনক কোনো দোয়া কোরো না। কেননা, ফেরেশতাগণ তোমাদের কথার ওপর আমিন বলে থাকেন।'
অতঃপর তিনি বললেন:
'হে আল্লাহ, আবু সালামাকে ক্ষমা করে দিন, হিদায়াতপ্রাপ্তদের মধ্যে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিন এবং তার উত্তরাধিকারীদের মধ্য থেকে তার প্রতিনিধি নিযুক্ত করুন। হে রাব্বুল আলামিন, আমাদের ও তার গুনাহ ক্ষমা করে দিন। তার জন্য কবরকে প্রশস্ত করে দিন এবং তার কবরকে আলোকিত করে দিন।'²
হাদিস থেকে যা বোঝা যায়:
মৃত্যুর পর মৃতের চোখ বন্ধ করে দেওয়া মুসতাহাব। এর ওপর সকল মুসলমান ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ, মৃত ব্যক্তির চোখ খোলা থাকলে দৃশ্যটা খুব খারাপ ও ভয়ানক দেখায়।
মৃত্যুর পরপরই মৃত ও তার পরিবার-পরিজনের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা মুসতাহাব।³
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ৩০০৯, সুনানু আবি দাউদ: ১৫৩২।
২. সহিহু মুসলিম: ৯২০।
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৬/২২৩।
📄 বিলাপ করা এবং তাকদিরের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে নিষেধ করতেন
জাবির বিন আতিক (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ বিন সাবিত (রা)-কে রোগশয্যায় দেখতে আসলেন। তাকে রোগে কাহিল অবস্থায় পেলেন। তিনি তাকে ডাকলেন, কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্নালিল্লাহ পাঠ করলেন এবং বললেন, "হে আবু রাবি, তোমার ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালাই বাস্তবায়িত হলো।” মহিলারা তখন চিৎকার করে উঠল এবং কাঁদতে লাগল। জাবির বিন আতিক (রা) তাদের নিষেধ করতে লাগলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাদের ছেড়ে দাও (এভাবে কাঁদতে দাও)। যখন সময় আসবে, তখন যেন কোনো ক্রন্দনকারিণী ক্রন্দন না করে।” তারা বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, সময় আসার অর্থ কী?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যখন মৃত্যু হবে।” এ কথা শুনে তার কন্যা মৃত পিতাকে বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি আশা করেছিলাম আপনি শহিদ হবেন। কারণ, আপনি (জিহাদের) আসবাব প্রস্তুত করেছিলেন।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তার নিয়ত অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা তার জন্য সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তোমরা শহিদ হওয়া বলতে কী বোঝো?” তারা বললেন, "আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের ময়দানে) নিহত হওয়াকে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহর পথে নিহত হওয়া ছাড়াও আরও সাত প্রকারের শহিদ আছে: মহামারিতে মৃত ব্যক্তি শহিদ, পানিতে ডুবে মরা ব্যক্তি শহিদ, অভ্যন্তরীণ রোগে মৃত ব্যক্তি শহিদ, পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহিদ, যে পুড়ে মরেছে সে শহিদ, কোনো কিছু চাপা পড়ে যে মরেছে সে শহিদ এবং অন্তঃসত্ত্বায় মৃত মহিলা শহিদ।"¹
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যারা শোকে চেহারায় আঘাত করে, জামা ছিঁড়ে এবং জাহিলি যুগের মতো চিৎকার করে, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।'²
আবু মালিক আশআরি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'আমার উম্মতের মধ্যে জাহিলিয়াতের চারটি কুপ্রথা রয়ে গেছে, যেগুলো তারা পরিত্যাগ করবে না-১. বংশগৌরব। ২. অপর বংশকে তুচ্ছ করা। ৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা। ও ৪. উচ্চস্বরে বিলাপ। বিলাপকারী মহিলা যদি মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে, তবে কিয়ামতের দিন তাকে আলকাতরার জামা পরিয়ে, খোসপাঁচড়ার ওড়না জড়িয়ে ওঠানো হবে।'³
টিকাঃ
১. মুয়াত্তা মালিক: ৫৫২, সুনানুন নাসায়ি ১৮৫৪, সুনানু আবি দাউদ: ৩১১১।
২. সহিহুল বুখারি: ১২৯৭, সহিহু মুসলিম: ১০৩। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত।
৩. সহিহু মুসলিম: ৯৩৪।