📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সবরের পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন

📄 তাদের সবরের পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন


আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন:
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে কবরের পাশে বসে কাঁদছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং সবর করো।” মহিলাটি বলল, "আমার কাছ থেকে চলে যান। আপনার ওপর তো আমার মতো মুসিবত আসেনি।” সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারেনি (বিধায় এমন কথা বলেছে)। পরে তাকে বলা হলো, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরোজায় হাজির হলো। সেখানে কোনো পাহারাদার পেল না। সে আরজ করল, "আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সবর তো বিপদের প্রথম অবস্থাতেই।"'¹
খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এর অর্থ হলো, যে সবরের কারণে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি প্রশংসিত হয়, তা হচ্ছে সেই সবর, যা বিপদ আসার সাথে সাথে করা হয়। পরে সবর করলে তা প্রশংসিত সবর হবে না। কেননা, দিন কয়েক অতিবাহিত হলে এমনিতেই মানুষ সবর করতে শুরু করে।'² এ জন্যই বলা হয়, 'প্রত্যেক বিষয় ছোট অবস্থায় শুরু হয়ে পরে বড় হয়; কিন্তু মুসিবত বড় অবস্থায় শুরু হয়ে আস্তে আস্তে ছোট হয়।'
'কঠিন বিপদে আক্রান্ত হলে অস্থির হয়ে পড়ো না। কেননা, বিপদ স্থায়ী হয় না। অনেক বিপদ যুবক ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। বিপদের দিনসমূহ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জাগ্রত হয় না। সুতরাং সময়ের বিপদ ও দুর্দশার ওপর ধৈর্য ধরো। কারণ, তা শেষ হয়ে যাবে। বাকি থাকবে তার স্নিগ্ধতা ও নিরাপত্তা।'
জাইন বিন মুনির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মহিলাকে এই বলে উত্তর দেওয়ার ফায়দা হলো, তিনি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাকওয়া ও সবর অবলম্বনের নির্দেশ মানার জন্য এবং পূর্বের কথার অজুহাত পেশ করতে এলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জানিয়ে দিলেন, সবর প্রথম অবস্থাতেই করা উচিত ছিল। তাহলেই সবরের কারণে সাওয়াব দান করা হতো।'³
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিনয় এবং মূর্খদের প্রতি তাঁর কোমলতা।
বিপদগ্রস্তকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং তার কৈফিয়ত কবুল করা।
প্রত্যেককে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা বাধ্যতামূলক।
মর্যাদাবান ব্যক্তির সাথে অনিচ্ছায় বেয়াদবি হয়ে গেলে কৈফিয়ত পেশ করা।
বিচারকের জন্য বাসার দরোজায় এমন কাউকে রাখা উচিত নয়, যার কারণে সাধারণ মানুষের বিচার নিয়ে আসতে সমস্যা হয়। জনসাধারণ যেন সহজেই বিচারকের কাছে মুকাদ্দামা পেশ করতে পারে।
কেউ সৎ কাজের আদেশ করলে তা মানা উচিত, যদিও আদেশকারী অপরিচিত হয়।
বিপদের সময় অস্থিরতা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাকে সবরের সাথে সাথে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
নসিহত করার সময় কষ্ট সহ্য করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া চাই।

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১২৮৩, সহিহু মুসলিম: ৯২৬।
২. ফাতহুল বারি: ৩/১৫০।
৩. ফাতহুল বারি: ৩/১৫০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিপদগ্রস্তকে সবরের পুরস্কারের কথা জানিয়ে দিতেন

📄 বিপদগ্রস্তকে সবরের পুরস্কারের কথা জানিয়ে দিতেন


কুররা বিন ইয়াস (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন, তখন সাহাবিদের অনেকে তাঁর কাছে এসে বসতেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অল্পবয়স্ক একটি ছেলে ছিল। তিনি ছেলেটিকে পিঠের ওপর করে নিয়ে আসতেন এবং নিজের সামনে বসাতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তাকে কি ভালোবাসো?” তিনি বললেন, "আমি তাকে যে পরিমাণ ভালোবাসি, সে পরিমাণ আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসুন।” একদিন ছেলেটি মৃত্যুবরণ করল। এরপর থেকে তিনি মজলিসে উপস্থিত হতে পারতেন না। কেননা, মজলিসে সন্তানের কথা মনে পড়ত আর তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়তেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে না দেখে জিজ্ঞেস করলেন, "অমুক ব্যক্তিকে কেন দেখছি না?” সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি তার যে ছোট ছেলেটিকে দেখতেন, তার মৃত্যু হয়েছে।” পরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছেলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তাঁকে জানালেন, ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে। তিনি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন:
'হে অমুক, তোমার কাছে কোনটি পছন্দনীয়-ছেলেটির মাধ্যমে তোমার পার্থিব জীবন সুখময় করা, না কাল কিয়ামতের দিন তুমি জান্নাতের যে দরোজা দিয়েই প্রবেশ করবে, তাকে সেখানে উপস্থিত হয়ে তোমার জন্য দরোজা খুলে দিতে পাওয়া?'
তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, বরং সে আমার পূর্বে জান্নাতের দরোজায় গিয়ে আমার জন্য দরোজা খুলে দেবে, এটাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।” তিনি বললেন, "তাহলে তা-ই তোমার জন্য হবে।” তখন অন্য এক ব্যক্তি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এই সংবাদ কি বিশেষভাবে তার জন্য, না আমাদের সবার জন্য?" তিনি বললেন, "বরং তোমাদের সবার জন্য।"¹
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, "দুনিয়াতে আমার মুমিন বান্দার কোনো নিঃস্বার্থ আপনজনকে যখন আমি মৃত্যু দান করি, আর সে (তার ওপর ধৈর্য ধরে) প্রতিদানের আশা রাখে, তখন আমার কাছে জান্নাতই তার একমাত্র প্রতিদান।"'²
'নিঃস্বার্থ আপনজন'-যেমন: সন্তান, ভাই ও সকল প্রিয়জন।
আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'পৃথিবীর কোনো প্রিয়জন মারা যাওয়ার পর যখন মুমিন ধৈর্যধারণ করে, সাওয়াবের আশা রাখে এবং আল্লাহ যা বলতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা-ই বলে-তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কোনো পুরস্কার দিয়ে সন্তুষ্ট হন না।'³
মুআজ বিন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'সেই সত্তার শপথ-যার হাতে আমার প্রাণ, গর্ভপাত হওয়া মা যদি সন্তান-বিয়োগের কষ্টে সাওয়াবের আশা রাখে, তবে ওই সন্তান তার নাড়ি ধরে তাকে জান্নাতে টেনে নিয়ে যাবে।'⁴
শুরাইহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি যখন কোনো বিপদে পড়ি, তখন চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি-
১. যখন বিপদ অধিকতর কঠিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হালকা হয়।
২. যখন বিপদের ওপর সবর করার তাওফিকপ্রাপ্ত হই।
৩. যখন ইন্নালিল্লাহ পড়ার তাওফিকপ্রাপ্ত হই, কারণ এর মাধ্যমে সাওয়াবের আশা করা যায়।
৪. যখন বিপদটি আমার দ্বীনের ওপর না হয়।'⁵

টিকাঃ
১. সুনানুন নাসায়ি ২০৮৮, মুসনাদু আহমাদ: ১৫১৬৮।
২. সহিহুল বুখারি: ৬৪২৪।
৩. সুনানুন নাসায়ি: ১৮৭১।
৪. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৬০৯।
৫. শুআবুল ইমান: ৯৯৮০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিতেন

📄 তাদের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিতেন


আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'মুমিনের জীবনে যত বিপদ আসে, প্রতিটি বিপদের বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করা হয়। এমনটি কাঁটা ফুটলেও।'¹
উম্মুল আলা (রা) বলেন, 'আমি অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে আসলেন। তখন তিনি বললেন:
'হে আলার মা, সুসংবাদ গ্রহণ করো, কেননা আগুন যেভাবে সোনা-রুপার ময়লা দূর করে দেয়, তদ্রূপ মহান আল্লাহ রোগের দ্বারা মুমিনের গুনাহসমূহ দূর করে দেন।'²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৫৬৪০, সহিহু মুসলিম: ২৫৭২।
২. সুনানু আবি দাউদ: ২৬৮৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের পুরস্কারের সুসংবাদ শোনাতেন

📄 তাদের পুরস্কারের সুসংবাদ শোনাতেন


আবু সাইদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'মুসলমানের ওপর যে সকল যাতনা, রোগব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এসবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।'¹
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর শরীরে হাত বুলালাম এবং বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার তো খুব জ্বর!" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ, আমি এমন কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হই, যা তোমাদের দুজনের হয়ে থাকে।” আমি বললাম, "এটা কি এ জন্য যে, আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'হাঁ, ব্যাপারটি এমনই। কেননা, মুসলমান যখন বিপদে আক্রান্ত হয়, চাই একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়া কিংবা আরও ক্ষুদ্র কোনো বিপদই হোক না কেন, এর দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মুছে দেন, যেভাবে গাছ থেকে পাতাগুলো ঝরে যায়।'²

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫৬৪২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৩।
২. সহিহুল বুখারি ৫৬৪৮, সহিহু মুসলিম: ২৫৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00