📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের বোকামি ক্ষমা করতেন

📄 বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের বোকামি ক্ষমা করতেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ষমা ও সহনশীলতার অনুপম নুমনা পাওয়া যায় এই ঘটনায় :
'একদা সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো অভিযানে যাচ্ছিলেন। মারবা বিন কাইজি নামক জনৈক অন্ধ মুনাফিকের শস্যখেত হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তার দেওয়াল অতিক্রম করার সময় সে বলল, "হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তুমি যদি নবি হও (নবি হওয়ার দাবি করো), তবে তোমাকে আমার দেওয়াল অতিক্রম করার অনুমতি দেবো না।” একমুষ্টি মাটি নিয়ে সে বলল, "আল্লাহর কসম, আমি যদি জানতাম, এই মাটি শুধু তোমার ওপরই পড়বে, তখন আমি তা তোমার প্রতি ছুড়ে মারতাম।" তার এ ঔদ্ধত্য দেখে সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে ছেড়ে দাও। বেচারার কলব ও চোখ দুটোই অন্ধ।'¹
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার আদেশ দেননি। এমনকি, তাকে সামান্য কষ্টও দেননি। অথচ তখন মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। তাদের মাঝে জিহাদি জজবা ও উত্তেজনা তখন পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এর কারণ হলো, প্রতিবন্ধী ও দুর্বল শ্রেণির লোকদের ওপর শক্তি প্রদর্শন করা মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীর শান নয়।

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম ৩/৫৭, জাদুল মাআদ: ৩/১৭২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 প্রতিবন্ধীদের দেখে শিক্ষগ্রহণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন

📄 প্রতিবন্ধীদের দেখে শিক্ষগ্রহণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাহকে শিক্ষা দিয়েছেন, যখন কোনো প্রতিবন্ধী ও দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি চোখের সামনে পড়বে, তখন নিজের সুস্থতার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে।
উমর বিন খাত্তাব (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো বিপদগ্রস্তকে দেখে নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়বে, আল্লাহ তাকে ওই বিপদ থেকে মুক্ত রাখবেন-
'প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন, যে বিপদে তুমি পতিত হয়েছ এবং আমাকে তাঁর সৃষ্টির অনেকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।"'¹
'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন, যে বিপদে তুমি তুমি পতিত হয়েছ'- শুকরিয়া করার কারণ হলো, নিরাপত্তা দুর্দশার চেয়ে বড় নিয়ামত। কারণ, দুর্দশায় অস্থিরতা ও ফিতনার আশঙ্কা থাকে। তখন বিপদটি আরও বড় বিপদের রূপ নেয়। এ ছাড়াও আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন প্রিয়।
'আমাকে তাঁর সৃষ্টির অনেকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'-অর্থাৎ দ্বীন, দুনিয়া, হৃদয় ও দেহের দিক দিয়ে অনেকের ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।²
উলামায়ে কিরাম বলেন, 'এই দোয়া নিম্ন আওয়াজে পড়া উচিত, যেন বিপদগ্রস্ত লোক তা শুনতে না পায়।'³
তবে বিপদটা যদি দ্বীন-সম্পর্কিত হয়, যেমন: কেউ পাপিষ্ট ব্যক্তিকে পাপাচারে লিপ্ত দেখলে তখন দোয়াটি তার সামনে উচ্চ আওয়াজে পড়বে। এটা তাকে তিরস্কার করা ও মন্দকর্ম থেকে বাধা দেওয়ার পর্যায়ভুক্ত হবে।
আমাদের অবশ্যই জানতে হবে-প্রকৃত প্রতিবন্ধী হলো আল্লাহকে অস্বীকারকারী কাফির। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাকে কান, চোখ ও অন্তর দান করেছেন, যেন আল্লাহর প্রতি ইমান আনে, তাঁর ইবাদত করে এবং সিরাতে মুসতাকিমের ওপর চলে। কিন্তু সে সবকিছুকে বেকার করে দিয়ে সেই আল্লাহকে অস্বীকার করে বসেছে, যিনি তাকে যথার্থরূপে সৃষ্টি করেছেন; তাকে কান, চোখ ও অন্তর দান করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
'আর আমি সৃষ্টি করেছি দোজখের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না; তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না; আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফিল।'⁴
কাফিরের অবস্থাও ঠিক এমনই। তার কান, চোখ ও অন্তর সবই বেকার। এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে সে পশুর মতো পানাহার ও যৌনসংগম ছাড়া কিছুই করতে পারে না। পক্ষান্তরে মুমিন তার আল্লাহ-প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা ও বিবেককে কাজে লাগিয়ে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করে। তাই তো বলি, প্রকৃত অন্ধ সে নয়, যার দৃষ্টিশক্তি নেই। বরং প্রকৃত অন্ধ তো সে, যার মাঝে অন্তর্দৃষ্টি ও ইমান নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
'বস্তুত, চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'⁵
এ অন্ধত্ব দ্বীন সম্পর্কে অন্ধত্ব। সত্যকে দেখতে না পাওয়ার অন্ধত্ব। যেভাবে অন্ধ ব্যক্তি দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তু দেখতে পায় না, তেমনই অন্তর্দৃষ্টিহীন ব্যক্তি দ্বীনের সত্যতা দেখতে পায় না। পক্ষান্তরে যার চোখ অন্ধ, সে পার্থিব উপকার থেকে কিছুটা বঞ্চিত থাকলেও (দ্বীন গ্রহণ করলে) আখিরাতের সমূহ উপকার লাভকরতে পারে।⁶
'অন্তরে যদি মনুষ্যত্ব ও তাকওয়ার দৃষ্টি থাকে, তখন চোখের দৃষ্টিহীনতা কোনো সমস্যাই নয়।'
খোঁড়া ও অচল ব্যক্তি সেই ব্যক্তির চেয়ে হাজার গুণ বেশি উত্তম, যার হাত-পা সুস্থ ও সবল, কিন্তু তার সাহায্যে সে আল্লাহর নাফরমানি করে এবং শয়তানকে সহায়তা করে। আমরা যদি দৃষ্টিহীন ও ভদ্রতাহীন মানুষের মাঝে এবং হাত-পাবিহীন ও চরিত্রহীন মানুষের মাঝে তুলনা করি, তখন উভয়ের মাঝে অনেক বড় পার্থক্য দেখতে পাব। শারীরিক প্রতিবন্ধী এই ভেবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারে যে, আল্লাহ তাকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বানাননি, ইমান থেকে মাহরুম করেননি।

টিকাঃ
১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৪৩১।
২. তুফফাতুল আহওয়াজি: ৯/২৭৫।
৩. আল্লামা মুনাবি কৃত ফাইজুল কাদির: ৬/১৩০।
৪. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৭৯।
৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৬. তাফসিরুস সাদি: ১/৫৪০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00