📄 তাদের জন্য সব বিষয় সহজ করে দিতেন
জাইদ বিন সাবিত (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দিয়ে ওহির এই অংশটুকু লেখান (لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ..) : মুমিন ঘরে বসে থাকে আর যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, তারা সমান নয় ...।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাকে দিয়ে এই আয়াতটি লেখাচ্ছিলেন, তখন ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) সেখানে এলেন। তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সামর্থ্য থাকলে আমি অবশ্যই জিহাদ করতাম।” তিনি অন্ধ ছিলেন। তারপর আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওহি নাজিল করলেন। তখন তাঁর উরু ছিল আমার উরুর ওপর। তাঁর উরু মুবারক আমার এতটা ভারী অনুভূত হলো-আমার আশঙ্কা হলো যে, আমার উরু থেঁতলে যাবে। তারপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো (অর্থাৎ ওহি অবতরণ শেষ হলো)। আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন : (غَيْرَ أَوْلِي الضَّرَرِ) - “যাদের কোনো ওজর নেই।”'¹
বিশেষ বিশেষ সমস্যাগ্রস্তদের জন্য বিধান কিছুটা সহজ করে আল্লাহ ইরশাদ করেন:
'অন্ধের জন্য, খোঁড়ার জন্য ও রুণের জন্য কোনো অপরাধ নেই এবং যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুগত্য করবে, তাকে তিনি জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন।'²
সুতরাং জিহাদের বাধ্যবাধকতা তাদের জন্য আর প্রযোজ্য রইল না। তবে তাদের কেউ স্বেচ্ছায় জিহাদ করতে চাইলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারণ করতেন না।
বনু সালামার কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, 'আমর বিন জামুহ (রা) মারাত্মক পর্যায়ের খোঁড়া ছিলেন। তার সিংহের মতো চারজন ছেলে ছিলেন, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিভিন্ন অভিযানে শরিক হতেন। উহুদ যুদ্ধের ডাক এলে তার সন্তানরা তাকে যুদ্ধে যেতে বাধা দিতে চাইল। তারা বললেন, "আল্লাহ তাআলা আপনাকে সামর্থ্য দেননি।” তখন তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, "আমার ছেলেরা আমাকে এই অভিযান ও আপনার সাথে বের হতে বাধা দিচ্ছে। অথচ আল্লাহর কসম, আমি আমার এই খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতের দিকে এগোতে চাই।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তোমাকে আল্লাহ তাআলা অপারগ করেছেন, সুতরাং তোমার ওপর জিহাদ করা বাধ্যতামূলক নয়।'
আর তার ছেলেদের বললেন:
'তাকে বাধা না দিলে তোমাদের কোনো সমস্যা হবে না। হয়তো আল্লাহ তাআলা তাকে শাহাদাত নসিব করবেন।'
অতঃপর তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলেন এবং উহুদ যুদ্ধে শহিদ হলেন।'³
আবু কাতাদাহ (রা) বর্ণনা করেন, 'আমর বিন জামুহ (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি যদি আল্লাহর পথে কিতাল করে শহিদ হয়ে যাই, তখন জান্নাতে সুস্থ পা (তিনি খোঁড়া ছিলেন) নিয়ে চলতে পারব?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ।” অতঃপর উহুদের দিনে তিনি তার ভাইপো ও গোলামসহ শহিদ হয়ে গেলেন। এরপর তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি যেন তোমাকে সুস্থ পা নিয়ে জান্নাতে বিচরণ করতে দেখছি।"'⁴
অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা সমাজের লোকদেরকে তাদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। কারণ, সমাজ যদি খাওয়া-দাওয়া ও মেলামেশা করার ক্ষেত্রে তাদের এড়িয়ে চলে, তখন তারা মানসিকভাবে কষ্ট পাবে। এ জন্য তাদের সাথে মেলামেশা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
'অন্ধের জন্য দোষ নেই, খঞ্জের জন্য দোষ নেই, রোগীর জন্য দোষ নেই এবং তোমাদের নিজেদের জন্যও দোষ নেই যে, তোমরা আহার করবে তোমাদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতাদের গৃহে... '⁵
ইবনে জারির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণের বিভিন্ন মত রয়েছে। কারও মতে, এই আয়াতে মুসলমানদেরকে অন্ধ, খোঁড়া, রোগী ইত্যাদি শ্রেণির সাথে খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কারণ, মুসলমানরা তাদের সাথে খাওয়া থেকে বিরত থাকত এই ভেবে যে, তাদের সাথে খেলে তাদের অংশের খানাও খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনে নিষেধ করেছেন:
'হে ইমানদারগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়, তা বৈধ।'⁶-⁷
জাহহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবুওয়াতের পূর্বে মদিনাবাসী অন্ধ ও রোগীদের সাথে একসাথে বসে খাবার খেত না। কেউ কেউ বলত, তাদের সাথে ময়লা-আবর্জনা ও ঘৃণিত বিষয় থাকে (তাই তাদের সাথে খাওয়া যাবে না)। আর কেউ বলত, 'অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ ব্যক্তির মতো পূর্ণভাবে খাবার খেতে পারে না, খোঁড়া ব্যক্তি খাওয়া-দাওয়ার সময়কার ভিড় সহ্য করতে পারে না এবং অন্ধ ব্যক্তি ভালো খাবার দেখতে পায় না (এ জন্য তাদের সাথে একসাথে খেলে খাবারের পরিমাণে তারতম্য হয়ে তাদের ওপর জুলুম হতে পারে)। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন:
'তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।'⁸
অর্থাৎ অসুস্থ, অন্ধ ও খোঁড়াদের সাথে একসাথে খেতে কোনো সমস্যা নেই।⁹
টিকাঃ
১. এই অংশটুকু নাজিল হওয়ার পর পুরো আয়াতটি দাঁড়ালো - (লা ইয়াসতাউইল কায়িদুনা মিনাল মুমিনিনা গাইরু উলিল দারারি ওয়াল মুজাহিদুন ফি সাবিলিল্লাহ) 'যেসব ইমানদার অক্ষম নয়, অথচ ঘরে বসে থাকে, তারা এবং নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকারীরা সমান হতে পারে না ...।' (অনুবাদক)
২. সহিহুল বুখারি: ২৮৩২, সহিহু মুসলিম: ১৮৯৮।
৩. সুরা আল-ফাতহ, ৪৮: ১৭।
৪. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৪/৪০।
৫. মুসনাদু আহমাদ: ২২৬০।
৬. সুরা আন-নুর: ৬১।
৭. সুরা আন-নিসা: ২৯।
৮. তাফসিরু ইবনি জারির: ১৯/২১৯।
৯. সুরা আন-নুর: ৬১।
১০. তাফসিরু ইবনি জারির: ১৯/২১৯।
📄 তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতেন
উহুদ যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার বাইরে গিয়ে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, না মদিনার ভেতর থেকে তাদের প্রতিহত করবে-এ ব্যাপারে পরামর্শ করলেন। অতঃপর এক হাজার সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নিয়ে মদিনার বাইরে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন মদিনায় যারা অবশিষ্ট ছিলেন, তাদের নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব অর্পণ করলেন আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা)-এর কাঁধে।¹
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিকবার আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা)-কে মদিনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেছিলেন, যেন তিনি মদিনার লোকদের নিয়ে ইমামতি করেন।
আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-কে দুবার মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন, যেন তিনি লোকদের নিয়ে নামাজ পড়েন। অথচ তিনি ছিলেন অন্ধ।'²
টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনি হিশাম ২/৬৩।
২. সুনানু আবি দাউদ: ২৯৩১, মুসনাদু আহমাদ: ১১৯৩৫।
📄 রমাজান মাসে আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুমকে দ্বিতীয় আজানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'বিলাল (রা) রাতে আজান দেয়। তাই (সে আজান দিলেও) তোমরা খানাপিনা করতে পারবে, যতক্ষণ না ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) আজান দেয়।' অতঃপর ইবনে উমর (রা) বলেন, 'তিনি (ইবনে উম্মে মাকতুম রা) ছিলেন অন্ধ। এবং তিনি তখনই আজান দিতেন, যখন তাকে বলা হতো, "ফজর হয়েছে, ফজর হয়েছে।”'¹
আয়িশা (রা) বলেন, 'ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য আজান দিতেন। আর তিনি ছিলেন অন্ধ।'²
আরেক রিওয়ায়াতে আছে, 'ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুয়াজ্জিন ছিলেন। আর তিনি ছিলেন অন্ধ।'³
প্রতিবন্ধীদের শক্তি কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া দেখুন। একজন অন্ধ ব্যক্তি আজান দিয়েছেন, ইমামতি করেছেন এবং ইমারতের শাসনভার সামলেছেন।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৬১৭, সহিহু মুসলিম ১০৯২।
২. সহিহু মুসলিম: ৩৮১।
৩. সুনানু আবি দাউদ: ৫৩৫।
📄 তাদের কষ্ট দেওয়া ব্যাপারে সতর্ক করতেন
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যে নিজের পিতাকে গালি দেয়, সে অভিশপ্ত; যে নিজের মাতাকে গালি দেয়, সে অভিশপ্ত; যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য পশু জবাই করে, সে অভিশপ্ত; যে জমিনের চিহ্ন ও সীমা পরিবর্তন করে, সে অভিশপ্ত; যে অন্ধকে ভুল পথ দেখায়, সে অভিশপ্ত; যে জন্তুর সাথে ব্যভিচার করে, সে অভিশপ্ত এবং যে লুত (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায়ের মতো কাজ (সমকামিতা) করে, সে অভিশপ্ত।'¹
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৭৫।