📄 তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাদের আবদার রক্ষা করতেন
মাহমুদ বিন রাবি আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত-
'ইতবান বিন মালিক (রা)-যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আনসারগণের অন্যতম-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির হয়ে আরজ করলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেয়েছে। আমি আমার গোত্রের লোকদের নিয়ে নামাজ আদায় করি। কিন্তু বৃষ্টি হলে আমার ও তাদের বাসস্থানের নিম্নভূমিতে পানি জমে যাওয়াতে তা আর পার হয়ে তাদের মসজিদে পৌঁছাতে এবং তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করতে সমর্থ হই না। আর ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আপনি আমার ঘরে তাশরিফ এনে কোনো এক স্থানে নামাজ আদায় করেন এবং আমি সেই স্থানকে সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করে নিই।"' বর্ণনাকারী বলেন, 'তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ইনশাআল্লাহ, অচিরেই আমি তা করব।"'
ইতবান (রা) বলেন, 'পরদিন সূর্যোদয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা) (সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আরও কয়েকজন সাহাবি) আমার ঘরে তাশরিফ আনেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম। ঘরে প্রবেশ করে তিনি না বসেই জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার ঘরে কোন স্থানে নামাজ আদায় করা পছন্দ করো?” তিনি বলেন, "আমি তাঁকে ঘরের এক প্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করলাম।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং তাকবির বললেন। তখন আমরাও দাঁড়ালাম এবং কাতারবন্দী হলাম। তিনি দুই রাকআত নামাজ আদায় করলেন। তারপর সালাম ফিরালেন।'
তিনি (ইতবান রা) বলেন, 'আমরা তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য বসালাম এবং তাঁর জন্য তৈরি "খাজিরা" নামক খাবার তাঁর সামনে পেশ করলাম।' বর্ণনাকারী বলেন, 'ওই সময় মহল্লার কিছু লোক ঘরে ভিড় জমালেন। তখন উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলে উঠলেন, "মালিক বিন দুখাইশিন কোথায়?" অথবা বললেন, "ইবনে দুখশুন কোথায়?” তখন একজন জবাব দিলেন, "সে মুনাফিক। সে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে না।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এরূপ বলো না। তুমি কি দেখছ না যে, সে আল্লাহর সন্তোষ লাভের আশায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলেছে?" তখন সে ব্যক্তি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ভালো জানেন। আমরা তো মনে করি, মুনাফিকদের সাথেই তার যত সম্পর্ক ও কল্যাণকামিতা।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ তাআলা তো এমন ব্যক্তির প্রতি জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলে।"¹
খাজিরা: একপ্রকার খাদ্য। ইবনে কুতাইবা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই খাবার তৈরির পদ্ধতি হলো, গোশতকে ছোট ছোট করে কুটে বেশি করে ঝোল দিয়ে রান্না চড়ানো হয়, রান্না হওয়ার পর তাতে আটা ঢেলে দেওয়া হয়। গোশত না থাকলে তাকে "আছিদা" বলা হয়।'²
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
অন্ধের ইমামতি জায়িজ।
নিজের অসুস্থতা ও বিপদের সংবাদ দেওয়া যায়। এটা অধৈর্যসুলভ অভিযোগের পর্যায়ে পড়ে না।
মদিনাতে মসজিদে নববি ছাড়াও আরও অনেক মসজিদ ছিল।
বৃষ্টি, অন্ধকার ইত্যাদি সমস্যার কারণে মসজিদের জামাআতে না যাওয়ার অনুমতি আছে।
তুলনামূলক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তার নিম্নমানের ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেওয়া।
ওয়াদা দেওয়ার সময় ইনশাআল্লাহ বলা।
বাড়ির নির্দিষ্ট কোনো এক স্থানকে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করলে তা ওয়াকফ করা আবশ্যক নয়; যদিও তার নাম মসজিদ দেওয়া হোক।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো নফল নামাজ জামাআতসহকারে আদায় করেছেন।
দাওয়াতদাতার অসম্মতি না থাকলে দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার কিছু সঙ্গীকে সাথে নিয়ে যেতে পারবে।
আগন্তুকের ইমামতি মাকরুহ হওয়ার বিধান তখন প্রযোজ্য হবে না, যখন আগন্তুক সবচেয়ে বড় ইমাম হয়। অনুরূপভাবে ঘরওয়ালা অনুমতি দিলে ইমামতি মাকরুহ হবে না।
কোনো বড় ইমাম বা বড় আলিম কারও বাড়িতে গেলে তার পাড়া-প্রতিবেশী তার ঘরে একত্র হতে পারবে।
দলের মধ্য থেকে কেউ বিনা কারণে অনুপস্থিত থাকলে তার খোঁজ নেওয়া।
অন্তরের বিশ্বাস ব্যতীত কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তি ইমানের জন্য যথেষ্ট নয়।
একত্ববাদের বিশ্বাস নিয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করলে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে না।
একমাত্র আল্লাহর জন্য কৃত ইবাদত বান্দাকে মুক্তি দেবে, যদি তা আল্লাহ কবুল করেন।
কোনো প্রকাশ্য মুসলমানকে তার বিভিন্ন কর্মের কারণে কেউ মুনাফিক বললে সে কাফির সাব্যস্ত হবে না। তাকে ফাসিকও বলা যাবে না। বরং ইতিবাচক ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাকে অবস্থার শিকার হিসেবে ধরা হবে।³
ফায়দা: ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি জায়গাকে নামাজের জন্য ঠিক করা আব্দুর রহমান বিন শিবিল (রা)-এর হাদিসের বিরোধী মনে হচ্ছে। যাতে বলা হয়েছে-
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি কাজ করতে নিষেধ করেছেন: নামাজের সিজদায় কাকের মতো ঠোকর মারতে, হিংস্র জন্তুর ন্যায় বাহুদ্বয় জমিনের ওপর বিছিয়ে দিতে এবং (মসজিদে) কোনো লোকের নামাজ পড়ার স্থান নির্দিষ্ট করে নিতে, যেমন উট আস্তাবলে স্থান নির্দিষ্ট করে নেয়।'⁴
উত্তর: হাদিসদ্বয়ের মধ্যে পরস্পর কোনো বিরোধ নেই। নামাজের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করার হাদিসটি ঘরের মধ্যে জায়গা নির্দিষ্ট করার বেলায় প্রযোজ্য এবং নিষিদ্ধ হওয়ার হাদিসটি মসজিদের বেলায় প্রযোজ্য। কারণ, মসজিদ আল্লাহর মালিকানাধীন। সেখানে কারও একক মালিকানা চলে না। এ ছাড়াও এর কারণে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, কেউ নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে জায়গা নির্দিষ্ট করে নিলে ওই ব্যক্তির আগে কেউ এসে ওই জায়গায় দাঁড়ালে স্বাভাবিকভাবে তার রাগ আসবে। এতে পরস্পর কথা কাটাকাটি ও মসজিদে শোরগোল সৃষ্টি হবে। অনেক সময় ঝগড়া ও মারামারিও সংঘটিত হতে পারে।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৪১৫, সহিহু মুসলিম: ১০৫২।
২. ফাতহুল বারি: ১/৫২১।
৩. ফাতহুল বারি: ১/৫২৩।
৪. সুনানু ইবনি মাজাহ ১৪২৯, সুনানু আবি দাউদ: ৮৬২, সুনানুন নাসায়ি: ১১১২।
📄 তাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের দিক দেখিয়ে দিতেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন:
'এক অন্ধ ব্যক্তি (আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম রা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে ধরে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো লোক নেই।” তারপর তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিজ ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। লোকটি চলে যেতে উদ্যত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডেকে বললেন, "তুমি কি নামাজের আজান শুনতে পাও?" তিনি বললেন, "হাঁ।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে তুমি আজানে সাড়া দেবে (জামাআতে হাজির হবে)।"'¹
এই হাদিস প্রমাণ করে, জামাআতে হাজির হওয়া ওয়াজিব। যদি ওয়াজিব না হতো, তবে ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-এর মতো অন্ধ লোকদের জামাআতে না আসার অবকাশ দেওয়া হতো।²
ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-এর হাদিস ও ইতবান বিন মালিক (রা)-এর হাদিসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। কারণ, ইতবান বিন মালিক (রা)-কে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-কে দেওয়া হয়নি। এর সমাধানকরণে কেউ কেউ বলেছেন, ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-এর বাড়ি মসজিদের নিকটবর্তী ছিল আর ইতবান বিন মালিক (রা)-এর বাড়ি অনেক দূরে ছিল। এ জন্যই ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি ইকামত শুনতে পেতেন। আবার এটাও হতে পারে যে, ইতবান (রা)-এর বাড়ির যে স্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়েছেন, ওই স্থানকে তিনি গতানুগতিক মসজিদে রূপান্তর করেছিলেন, তাতে যথারীতি আজান ও ইকামতের মাধ্যমে বাড়ির লোকজন ও আশপাশের লোকদের নিয়ে নামাজের জামাআত অনুষ্ঠিত হতো। সুতরাং বাড়ির মসজিদ হলেও সেটি নিয়মিত একটি জামাআতের মসজিদের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। পক্ষান্তরে, ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) নিজ বাড়িতে একাকী নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। ফলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। হাদিসদ্বয়ের মাঝে সমন্বয় সাধনে এই মতটিই অধিক যথার্থ মনে হয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।'³
অনুরূপভাবে বলা যায়, ইতবান (রা) একে তো দুর্বল দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন, তদুপরি তাকে পানি জমে যাওয়া একটি নিম্নভূমি অতিক্রম করে মসজিদে গমন করতে হতো। ফলে তাতে শুধু ক্ষতির আশঙ্কা ছিল তা নয়; বরং নিম্নভূমিটি অতিক্রম করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-এর বাড়ি থেকে মসজিদে যাওয়া সে তুলনায় অনেক সহজ ছিল।
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ৬৫৩।
২. আওনুল মাবুদ: ২/২৫৭।
৩. ইবনুল আনবারি কৃত ফাতহুল বারি: ২/৩৯২।
📄 তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত-
'এক মহিলার বুদ্ধিতে কিছুটা ত্রুটি ছিল। তিনি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার সাথে আমার প্রয়োজন আছে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে অমুকের মা, তুমি যেকোনো গলি দেখে নাও, (তুমি ডাক দিলে সেখানে) আমি তোমার কাজ করে দেবো।” তারপর তিনি কোনো পথে মহিলাটির সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ করে তাকে প্রয়োজনমুক্ত করে দিলেন।'¹
(তিনি কোনো পথে মহিলাটির সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ করলেন) হাদিসের এই অংশের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তিনি চলার পথে মহিলাটির জন্য দাঁড়ালেন, যেন তার প্রয়োজন পূরণ করে দিতে পারেন এবং গোপনে তাকে সমাধান শুনিয়ে দিতে পারেন। এটা গাইরে মাহরাম মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বনের পর্যায়ে পড়ে না। কেননা, এই সাক্ষাৎ সংঘটিত হয়েছে মানুষের চলার পথে। মানুষজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মহিলাটিকে দেখতে পাচ্ছিল। শুধু তাদের কথা শোনা যাচ্ছিল না এই যা! কারণ, মহিলার উক্ত ব্যাপারটি প্রকাশ করার মতো ছিল না। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।'²
এই ঘটনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহনশীলতা ও বিনয়ের প্রমাণ বহন করে এবং প্রয়োজনগ্রস্তদের প্রয়োজন পূরণে তাঁর অতুলনীয় ধৈর্যের সাক্ষ্য দেয়।
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২৩২৬।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহিল মুসলিম: ১৫/৮৩।
📄 অন্ধ ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সতর্ক করেন
একাধিক মুফাসসির উল্লেখ করেছেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কুরাইশের এক শীর্ষস্থানীয় লোকের সাথে কথা বলছিলেন এবং তার ইসলাম গ্রহণের আশা করছিলেন। তখনই সেখানে ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) আগমন করলেন। তিনি ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এসেই তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে একটি বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলেন এবং উত্তর জানতে খুব পীড়াপীড়ি করলেন। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ লোকটার হিদায়াতের আশা করছিলেন বিধায় তিনি চাইছিলেন ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক, যাতে তিনি লোকটার সাথে স্থিরমনে কথা বলতে পারেন। ফলে ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)-এর আচরণে তাঁর ভ্রূকুঞ্চিত হলো এবং তিনি মুখ ফিরিয়ে লোকটার প্রতি মনোনিবেশ করলেন। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করলেন:
'তিনি ভ্রূকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ, তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল। আপনি কি জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো (তার আত্মিক পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জিত হতো), অথবা উপদেশ গ্রহণ করত এবং উপদেশ তার উপকার হতো (এই উপকার তাকে হারাম কর্ম থেকে বিরত রাখত)। পরম্ভ যে বেপরোয়া, আপনি তার চিন্তায় মশগুল (যেন সে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়)। সে শুদ্ধ না হলে আপনার কোনো দোষ নেই (তার পরিশুদ্ধি না হলে আপনি জবাবদিহির সম্মুখীন হবেন না)। যে আপনার কাছে দৌড়ে আসলো এমতাবস্থায় যে, সে ভয় করে (অর্থাৎ আপনার কথার দ্বারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে আসলো), আপনি তাকে অবজ্ঞা করলেন।'¹
সেদিন থেকে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নির্দেশ দিলেন, কাউকে যেন বিশেষভাবে ভীতিপ্রদর্শন না করেন। বরং উপদেশদান ও ভীতিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে অভিজাত বংশ ও নিম্ন বংশ, ধনী ও গরিব, মনিব ও গোলাম, পুরুষ ও মহিলা, ছোট ও বড়-সবার মাঝে যেন সমতা বিধান করেন। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সিরাতে মুসতাকিমের ওপর পরিচালিত করবেন। তাঁর কাছেই আছে চূড়ান্ত প্রজ্ঞা ও অকাট্য দলিল।²
এর পর থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সম্মান করতেন।
আয়িশা (রা) বলেন:
"'আবাসা' সুরাটি ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছিল। তিনি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলতে লাগলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে সঠিক পথ-নির্দেশ দান করুন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মুশরিকদের শীর্ষস্থানীয় এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিল। তাই তিনি তাকে উপেক্ষা করে অন্য একজনের দিকে মনোযোগী হয়ে লোকটিকে বলেছিলেন, "আপনি আমার বক্তব্যে দোষের কিছু দেখেছেন কি?" লোকটি বলেছিল, "না।” এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুরাটি নাজিল হয়।"³
টিকাঃ
১. সুরা আবাসা, ৮০: ১-১০।
২. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/৫৬৮।
৩. সুনানুত তিরমিজি: ৩৩৩১।