📄 তাদের জন্য দোয়া করতেন
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো রোগীর কাছে গেলে বা কোনো রোগীকে তাঁর নিকট আনা হলে তিনি বলতেন:
'হে মানুষের প্রভু, তার কষ্ট দূর করে দিন, আপনিই শিফা দানকারী। আপনি ব্যতীত কেউই শিফা দান করতে পারে না। আপনি তাকে এমন শিফা দান করুন, যেন কোনো রোগ বাকি না থাকে।'¹
ফায়দা: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এখান থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে অসুস্থতার কারণে গুনাহ ক্ষমা করা হয় এবং সাওয়াব দান করা হয়, তা সত্ত্বেও রোগীর জন্য শিফার দোয়া কেন?' এর উত্তর হলো, দোয়া হচ্ছে ইবাদত, এটি গুনাহ ক্ষমা করা ও সাওয়াব প্রদান করার প্রতিবন্ধক নয়। কেননা, এ দুই প্রতিদান রোগের শুরু অবস্থায় এবং রোগের ওপর সবর করার কারণে অর্জিত হয়। আর যে দোয়া করে তার দোয়া কখনো ব্যর্থ হয় না। দুটি উপকারের কোনো একটি অবশ্যই সে অর্জন করে। হয়তো তার উদ্দেশ্য সফল হয়, নয়তো অন্য দিক দিয়ে তার কোনো উপকার সাধিত হয় কিংবা তার কোনো বিপদ দূর হয়ে যায়।²
আতা বিন রাবাহ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমাকে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, "আমি কি তোমাকে এক জান্নাতি মহিলা দেখাব না?" আমি বলি, "অবশ্যই দেখাবেন।” তিনি বলেন, "এই কৃষ্ণ বর্ণের মহিলাটি, যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলেছিল, "আমি অতর্কিত মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।" তিনি বললেন:
'তুমি যদি চাও, সবর করে জান্নাত লাভ করতে পারো। আর যদি চাও আরোগ্য লাভ করতে, আমি তোমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারি।'
সে বলল, "আমি সবর করব। তবে, আপনি দোয়া করুন, যেন লজ্জাস্থান না খোলে।"³
'আমি অতর্কিত মৃগীরোগে আক্রান্ত হই'- মৃগীরোগ দুই প্রকার: ১. ব্রেইনের স্নায়ুতে ত্রুটির কারণে সৃষ্ট রোগ। তার পরিচিত ও অপরিচিত বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ২. জিনের প্রভাবে সৃষ্ট। জিন মানুষের ওপর ভর করে তাকে নিয়ে খেলে। ফলে সে বিভ্রান্তের মতো উঠে, বসে, দৌড়ায়, এদিক-ওদিক গড়াগড়ি খায়, আরও অনেক ধরনের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে। কারণ যা-ই হোক, এ রোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন এক পরীক্ষা। এতে যে ধৈর্যধারণ করে, তার জন্য আল্লাহর কাছে অনেক বড় পুরস্কার রয়েছে।
'আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে'-মুসলমান মহিলার জন্য অনাত্মীয় পুরুষের সামনে লজ্জাস্থান খুলে যাওয়া অনেক কষ্টদায়ক। কিন্তু মৃগীরোগ রাস্তায়, বাজারে বা অন্য যেকোনো পাবলিক প্লেসে হঠাৎ আসতে পারে। এর ওপর রোগীর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। এ জন্য তিনি মৃগীরোগের কষ্টের ওপর সবর করলেও লজ্জাস্থান খুলে যাওয়ার ওপর ধৈর্য ধরতে রাজি হননি। অথচ এই সতর খুলে যাওয়া তার নাগালের বাইরে হওয়ায় শরিয়ত তাকে কোনোরূপ দোষারোপ করছে না। কী পুণ্যবতী ছিলেন সেই মহীয়সী।
'তিনি বললেন, 'আমি সবর করব'-তার সামনে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল- ১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দোয়া করবেন আর তিনি আরোগ্য লাভ করবেন। ২. তিনি সবর করবেন, বিনিময়ে তাকে জান্নাত দান করা হবে। তিনি কোনো রকম চিন্তাভাবনা না করে তাৎক্ষণিকভাবে অস্থায়ী সুস্থতার পরিবর্তে স্থায়ী জান্নাতকে বেছে নিলেন। এটিই প্রমাণ করে, তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি কী মজবুত ইমান ছিল এবং আল্লাহর রহমত ও প্রতিদানের প্রতি কীরূপ আগ্রহ ছিল! কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যাদের সামনে জান্নাতের নিয়ামতসমূহের আলোচনা করলে এমন ভাব দেখায় যেন এসবের প্রতি তাদের কোনো গুরুত্ব নেই এবং এ বিষয়ের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে মৃগীরোগের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে এবং দুনিয়ার বিপদাপদের ওপর সবর করার বিনিময়ে জান্নাত লাভের কথা বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিস থেকে আরও বোঝা যায়, কেউ যদি দুটি ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক কঠিন বিষয় সহ্য করার শক্তি রাখে, তাহলে তার জন্য সহজ বিষয়ের চেয়ে কঠিন বিষয়টাকে গ্রহণ করা উত্তম। এই হাদিস থেকে আরও প্রতীয়মান হয়, দোয়া ও আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়ার মাধ্যমে রোগের চিকিৎসা করা জাগতিক উপায়ে চিকিৎসা করার চেয়ে অধিক উপকারী ও কার্যকর। রোগ নিরাময়ে প্রকাশ্য ওষুধপাতির চেয়ে দোয়ার প্রভাব অনেক গুণ বেশি। তবে তার জন্য দুটি শর্ত রয়েছে- প্রথম শর্ত রোগীর জন্য-তার অন্তরে প্রকৃত বিশ্বাস থাকতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত চিকিৎসকের জন্য-তার ভেতর গভীর মনোযোগ, শক্তিশালী তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও ভরসা থাকতে হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।'⁴
উসমান বিন হানিফ (রা) থেকে বর্ণিত, দৃষ্টিশক্তিহীন এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, 'আমার সুস্থতার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। তিনি বললেন:
'তুমি চাইলে দোয়া করতে পারি। তবে তুমি যদি সবর করো, সেটাই তোমার জন্য ভালো হবে।'
তিনি বললেন, "আপনি দোয়া করুন।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভালোমতো অজু করে এ দোয়াটি পড়তে নির্দেশ দিলেন:
'হে আল্লাহ, আমি আপনার দরবারে প্রার্থনা করছি, রহমতের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসিলা নিয়ে আপনার প্রতি মনোযোগী হয়েছি। (হে নবি) আপনার অসিলায় আমি আমার এই প্রয়োজন আল্লাহর দরবারে পেশ করছি, যেন তিনি আমার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। হে আল্লাহ, আপনি আমার ব্যাপারে তাঁর সুপারিশ কবুল করুন।'⁵
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা:
হাদিসের অর্থ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সত্তাকে অসিলা বানানো নয়; বরং তাঁর দোয়াকে অসিলা বানানো উদ্দেশ্য। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অন্ধ ব্যক্তিটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার জন্য দোয়া করার আবেদন করলেন, যেভাবে সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁর নিকট বৃষ্টি প্রার্থনার দোয়া করতে আবেদন করতেন। তিনি যে বললেন, "রহমতের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসিলা নিয়ে আপনার প্রতি মনোযোগী হয়েছি।"-এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর দোয়া ও সুপারিশের অসিলায়। এ জন্যই হাদিসের শেষে বলা হয়েছে, "হে আল্লাহ, আপনি আমার ব্যাপারে তাঁর সুপারিশ কবুল করুন।"'⁶
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৫৬৭৫, সহিহু মুসলিম: ২১৯১।
২. ফাতহুল বারি: ১০/১৩২।
৩. সহিহুল বুখারি ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
৪. ফাতহুল বারি: ১০/১১৫।
৫. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৭৮।
৬. কাইদাতুন জালিলাহ ফিত তাওয়াসসুল ওয়াল অসিলাহ: ২/৩০০।
📄 তাদের অনুভূতির মূল্যায়ন করতেন এবং সুন্দর শব্দে সম্বোধন করতেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'আমাকে বনু ওয়াকিফের দৃষ্টিসম্পন্ন লোকটির নিকট নিয়ে চলো, আমি তাকে দেখব।' লোকটি অন্ধ ছিলেন।¹
সুফইয়ান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বনু ওয়াকিফ হলো আনসারদের একটি কবিলা।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে সূক্ষ্ম একটি শব্দ ব্যবহার করলেন, যেন তার অনুভূতিতে আঘাত না লাগে।
অন্ধকে দৃষ্টিসম্পন্ন বলার রহস্য: তাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধ লোকটিকে দৃষ্টিসম্পন্ন কেন বললেন, তার কারণ বের করতে আমরা গভীর চিন্তা-ফিকির করলাম। কারণ, আল্লাহ তাআলা কুরআনের মধ্যে অন্ধ ব্যক্তিকে অন্ধই বলেছেন। যেমন:
'অন্ধের জন্য দোষ নেই।'²
অন্য আয়াতে:
'তিনি ভ্রূকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ, তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল।'³
চিন্তা-ফিকির করে পেলাম, আল্লাহ তাআলা অন্ধত্বযুক্ত ব্যক্তিকে অন্ধ ব্যতীত অন্য নামেও অভিহিত করার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
'বস্তুত, চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'⁴
এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, অন্ধকে তার বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তি না থাকার কারণে অন্ধ বলা যেমন বৈধ, তেমনই তার অন্তর্দৃষ্টির কারণে তাকে দৃষ্টিসম্পন্ন বলাও বৈধ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠটাকে বেছে নিলেন। যদিও তাঁর জন্য তাকে অন্ধ বলারও অবকাশ ছিল।⁵
শুভ ও শালীন শব্দ প্রয়োগ করার আরেকটি উদাহরণ হলো: দংশিত ব্যক্তির জন্য সুস্থতার শুভ উদ্দেশ্য কামনা করে তাকে 'সালিম' বা সুস্থ বলা হয়।⁶ অনুরূপভাবে ধ্বংসশীল মরুভূমিকে মরুবাসীর জন্য সফলতা ও মুক্তির শুভউদ্দেশ্য কামনা করে 'মাফাজাহ' বা সফলতার স্থান বলা হয়।⁷
টিকাঃ
১. আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি ২০৮৫১।
২. সুরা আন-নুর: ৬১।
৩. সুরা আবাসা: ১-২।
৪. সুরা আল-হাজ: ৪৬।
৫. শারহু মুশকিলির আসার ১০/২১৯।
৬. ইবনে দুরাইক কৃত আল-ইশতিকাক: ১/৩৬।
৭. ইবনুল আনবারি কৃত আজ-জাহির ফি মাআনি কালিমাতিন নাস: ১/৩৩১।
📄 তাদের মনঃকষ্ট দূর করতে সচেষ্ট থাকতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আশ্বস্ত করতেন যে, শরীর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একটি কাঁটাওয়ালা বৃক্ষ থেকে মিসওয়াক সংগ্রহ করছিলেন। তাঁর উভয় পায়ের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত অংশটি খুব চিকন ছিল। ফলে বাতাস তাকে ফেলে দিচ্ছিল। তা দেখে উপস্থিত লোকজন হেসে উঠলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'কী ব্যাপার, তোমরা হাসছ কেন?'
তারা বললেন, "ওর চিকন জাং দেখে হাসছি।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'সেই সত্তার কসম খেয়ে বলছি-যার হাতে আমার প্রাণ, তার জাং দুটি (আমল পরিমাপের) পাল্লায় উহুদ পাহাড়ের চেয়ে ভারী হবে।'¹
আব্দুল্লাহ (রা)-এর দুর্বলতা ও রুগ্নতা তার জন্য ক্ষতিকর হয়নি। কেননা, ছিপছিপে জাংওয়ালা লোকটিকে আল্লাহ এমন ফজিলত দান করেছেন, যা আমল পরিমাপের পাল্লায় অনেক ভারী হবে। তিনি ছিলেন উন্নত আখলাক ও স্বচ্ছ আধ্যাত্মিকতায় অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিত্ব।
আব্দুর রহমান বিন ইয়াজিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'আমরা হুজাইফা (রা)-কে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দিতে অনুরোধ করলাম, যার আকার-আকৃতি, চালচলন, আচার-ব্যবহার ও স্বভাব-চরিত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্য আছে, আমরা তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব। হুজাইফা (রা) বললেন:
'আকার-আকৃতি, চালচলন, আচার-ব্যবহার ও স্বভাব-চরিত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্য রাখেন-এমন ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) ব্যতীত অন্য কাউকে আমি জানি না।'²
অন্য রিওয়ায়াতে এসেছে-
'হুজাইফা (রা) বলেন, "আচার-আচরণে ও চালচলনে ব্যক্তিদের মাঝে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনেক বেশি নিকটবর্তী হলেন ইবনে মাসউদ (রা)। তিনি আমাদের মাঝ হতে অন্তরাল হয়ে তাঁর ঘরে অবস্থান করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশ্বস্ত সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ভালোভাবে অবগত আছেন যে, ইবনে উম্মে আবদ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা) তাঁদের প্রত্যেকের তুলনায় আল্লাহ তাআলার বেশি নৈকট্যলাভকারী।"'³
আল্লাহর নিকট সুন্দর আকৃতি ও সুদর্শন চেহারা দিয়ে মানুষকে মাপা হবে না; বরং উত্তম গুণাবলি ও আমলের মাধ্যমে পরিমাপ করা হবে। ইবনে মাসউদ (রা) খাটো ও ছিপছিপে গড়নের লোক ছিলেন।
জাইদ বিন ওয়াহাব (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি উমর বিন খাত্তাব (রা)-এর সাথে বসা ছিলাম, তখন সেখানে ইবনে মাসউদ (রা) আগমন করলেন। খাটো হওয়ার কারণে উপস্থিত লোকজনের মাঝে তাকে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। তাঁকে দেখে উমর (রা) হাসলেন। অতঃপর উমর (রা) তাঁর সাথে প্রফুল্ল চিত্তে কথা বললেন। একটি বিষয়ের ওপর পরস্পর বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে দুজনে হাসাহাসি করলেন। অতঃপর তিনি চলে গেলেন। উমর (রা) তাঁর যাত্রাপথে তাকিয়ে রইলেন। দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যাওয়ার পর বললেন:
'লোকটি ইলম ও জ্ঞানে ভরপুর একটি পাত্র।'⁴
টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ৩৯৯১।
২. সহিহুল বুখারি: ৩৭৬২।
৩. সুনানুত তিরমিজি: ৩৮০৭।
৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৩৬।
📄 তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাদের আবদার রক্ষা করতেন
মাহমুদ বিন রাবি আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত-
'ইতবান বিন মালিক (রা)-যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আনসারগণের অন্যতম-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির হয়ে আরজ করলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেয়েছে। আমি আমার গোত্রের লোকদের নিয়ে নামাজ আদায় করি। কিন্তু বৃষ্টি হলে আমার ও তাদের বাসস্থানের নিম্নভূমিতে পানি জমে যাওয়াতে তা আর পার হয়ে তাদের মসজিদে পৌঁছাতে এবং তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করতে সমর্থ হই না। আর ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আপনি আমার ঘরে তাশরিফ এনে কোনো এক স্থানে নামাজ আদায় করেন এবং আমি সেই স্থানকে সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করে নিই।"' বর্ণনাকারী বলেন, 'তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ইনশাআল্লাহ, অচিরেই আমি তা করব।"'
ইতবান (রা) বলেন, 'পরদিন সূর্যোদয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা) (সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আরও কয়েকজন সাহাবি) আমার ঘরে তাশরিফ আনেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম। ঘরে প্রবেশ করে তিনি না বসেই জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার ঘরে কোন স্থানে নামাজ আদায় করা পছন্দ করো?” তিনি বলেন, "আমি তাঁকে ঘরের এক প্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করলাম।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং তাকবির বললেন। তখন আমরাও দাঁড়ালাম এবং কাতারবন্দী হলাম। তিনি দুই রাকআত নামাজ আদায় করলেন। তারপর সালাম ফিরালেন।'
তিনি (ইতবান রা) বলেন, 'আমরা তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য বসালাম এবং তাঁর জন্য তৈরি "খাজিরা" নামক খাবার তাঁর সামনে পেশ করলাম।' বর্ণনাকারী বলেন, 'ওই সময় মহল্লার কিছু লোক ঘরে ভিড় জমালেন। তখন উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলে উঠলেন, "মালিক বিন দুখাইশিন কোথায়?" অথবা বললেন, "ইবনে দুখশুন কোথায়?” তখন একজন জবাব দিলেন, "সে মুনাফিক। সে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে না।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এরূপ বলো না। তুমি কি দেখছ না যে, সে আল্লাহর সন্তোষ লাভের আশায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলেছে?" তখন সে ব্যক্তি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ভালো জানেন। আমরা তো মনে করি, মুনাফিকদের সাথেই তার যত সম্পর্ক ও কল্যাণকামিতা।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ তাআলা তো এমন ব্যক্তির প্রতি জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলে।"¹
খাজিরা: একপ্রকার খাদ্য। ইবনে কুতাইবা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই খাবার তৈরির পদ্ধতি হলো, গোশতকে ছোট ছোট করে কুটে বেশি করে ঝোল দিয়ে রান্না চড়ানো হয়, রান্না হওয়ার পর তাতে আটা ঢেলে দেওয়া হয়। গোশত না থাকলে তাকে "আছিদা" বলা হয়।'²
হাদিসে লক্ষণীয় বিষয়:
অন্ধের ইমামতি জায়িজ।
নিজের অসুস্থতা ও বিপদের সংবাদ দেওয়া যায়। এটা অধৈর্যসুলভ অভিযোগের পর্যায়ে পড়ে না।
মদিনাতে মসজিদে নববি ছাড়াও আরও অনেক মসজিদ ছিল।
বৃষ্টি, অন্ধকার ইত্যাদি সমস্যার কারণে মসজিদের জামাআতে না যাওয়ার অনুমতি আছে।
তুলনামূলক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তার নিম্নমানের ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেওয়া।
ওয়াদা দেওয়ার সময় ইনশাআল্লাহ বলা।
বাড়ির নির্দিষ্ট কোনো এক স্থানকে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করলে তা ওয়াকফ করা আবশ্যক নয়; যদিও তার নাম মসজিদ দেওয়া হোক।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো নফল নামাজ জামাআতসহকারে আদায় করেছেন।
দাওয়াতদাতার অসম্মতি না থাকলে দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার কিছু সঙ্গীকে সাথে নিয়ে যেতে পারবে।
আগন্তুকের ইমামতি মাকরুহ হওয়ার বিধান তখন প্রযোজ্য হবে না, যখন আগন্তুক সবচেয়ে বড় ইমাম হয়। অনুরূপভাবে ঘরওয়ালা অনুমতি দিলে ইমামতি মাকরুহ হবে না।
কোনো বড় ইমাম বা বড় আলিম কারও বাড়িতে গেলে তার পাড়া-প্রতিবেশী তার ঘরে একত্র হতে পারবে।
দলের মধ্য থেকে কেউ বিনা কারণে অনুপস্থিত থাকলে তার খোঁজ নেওয়া।
অন্তরের বিশ্বাস ব্যতীত কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তি ইমানের জন্য যথেষ্ট নয়।
একত্ববাদের বিশ্বাস নিয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করলে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে না।
একমাত্র আল্লাহর জন্য কৃত ইবাদত বান্দাকে মুক্তি দেবে, যদি তা আল্লাহ কবুল করেন।
কোনো প্রকাশ্য মুসলমানকে তার বিভিন্ন কর্মের কারণে কেউ মুনাফিক বললে সে কাফির সাব্যস্ত হবে না। তাকে ফাসিকও বলা যাবে না। বরং ইতিবাচক ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাকে অবস্থার শিকার হিসেবে ধরা হবে।³
ফায়দা: ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি জায়গাকে নামাজের জন্য ঠিক করা আব্দুর রহমান বিন শিবিল (রা)-এর হাদিসের বিরোধী মনে হচ্ছে। যাতে বলা হয়েছে-
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি কাজ করতে নিষেধ করেছেন: নামাজের সিজদায় কাকের মতো ঠোকর মারতে, হিংস্র জন্তুর ন্যায় বাহুদ্বয় জমিনের ওপর বিছিয়ে দিতে এবং (মসজিদে) কোনো লোকের নামাজ পড়ার স্থান নির্দিষ্ট করে নিতে, যেমন উট আস্তাবলে স্থান নির্দিষ্ট করে নেয়।'⁴
উত্তর: হাদিসদ্বয়ের মধ্যে পরস্পর কোনো বিরোধ নেই। নামাজের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করার হাদিসটি ঘরের মধ্যে জায়গা নির্দিষ্ট করার বেলায় প্রযোজ্য এবং নিষিদ্ধ হওয়ার হাদিসটি মসজিদের বেলায় প্রযোজ্য। কারণ, মসজিদ আল্লাহর মালিকানাধীন। সেখানে কারও একক মালিকানা চলে না। এ ছাড়াও এর কারণে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, কেউ নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে জায়গা নির্দিষ্ট করে নিলে ওই ব্যক্তির আগে কেউ এসে ওই জায়গায় দাঁড়ালে স্বাভাবিকভাবে তার রাগ আসবে। এতে পরস্পর কথা কাটাকাটি ও মসজিদে শোরগোল সৃষ্টি হবে। অনেক সময় ঝগড়া ও মারামারিও সংঘটিত হতে পারে।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি ৪১৫, সহিহু মুসলিম: ১০৫২।
২. ফাতহুল বারি: ১/৫২১।
৩. ফাতহুল বারি: ১/৫২৩।
৪. সুনানু ইবনি মাজাহ ১৪২৯, সুনানু আবি দাউদ: ৮৬২, সুনানুন নাসায়ি: ১১১২।