📄 খাদিম অপছন্দ হলে জুলুম হওয়ার ভয়ে তাকে ছেড়ে দিতে বলতেন
আবু জার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'দাস-দাসীদের মধ্যে যার কাজকর্ম তোমাদের পছন্দ হয়, তাকে সেই মানের খাবার খাওয়াও, যেই মানের খাবার তোমরা খাও এবং সেই মানের পোশাক পরিধান করাও, যেই মানের পোশাক তোমরা পরিধান করো। আর তাদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো না লাগে, তাকে বিক্রি করে দাও এবং আল্লাহর মাখলুককে (অনর্থক) শাস্তি দিয়ো না।'¹
সুতরাং কোনো ড্রাইভার বা কর্মচারী যদি মনমতো না হয় বা তার সাথে কোনোভাবে মানিয়ে চলা সম্ভব না হয়, তবে তাকে বিদায় করে দেওয়া ভালো। এতে তার প্রতি অন্যায় ও তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে।
টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ৫১৬১।
📄 খাদিমকে কখনো মারধর করেননি
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো খাদিম বা স্ত্রীকে কখনো প্রহার করেননি।'¹
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ২৩২৮।
📄 অন্যদেরকেও মারধর করতে নিষেধ করতেন
আবু মাসউদ বদরি (রা) বলেন, 'একদা আমি আমার এক গোলামকে বেত দিয়ে পেটাচ্ছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলাম, "জেনে রাখো হে আবু মাসউদ!" রাগের কারণে শব্দটি আমি বুঝতে পারিনি। যখন তিনি আমার আরও কাছে চলে আসলেন, তখন বুঝতে পারলাম, এ তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই শব্দ। তিনি বলছিলেন, "জেনে রাখো হে আবু মাসউদ! জেনে রাখো হে আবু মাসউদ...!" আমি বেতটি হাত থেকে ফেলে দিলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন:
'জেনে রাখো হে আবু মাসউদ, এই গোলামের ওপর তুমি যে পরিমাণ শক্তি রাখো, আল্লাহ তাআলা তোমার ওপর তার চেয়ে অধিক শক্তি রাখেন।'
আমি বললাম, "আজকের পর থেকে আমি কোনো গোলামকে প্রহার করব না।"'
অপর বর্ণনায় এসেছে, 'আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর জন্য একে আজাদ করে দিলাম।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'যদি তুমি তা না করতে, তবে জাহান্নাম তোমাকে জ্বালিয়ে দিত অথবা (বললেন,) আগুন তোমাকে গ্রাস করত।'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে দাস-দাসীর প্রতি নম্রতা অবলম্বন, তাদের ক্ষমা করে দেওয়া ও রাগ সংবরণ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যেরূপ তাঁর বান্দাদের ওপর কর্তৃত্ব চালান, সেরূপ কর্তৃত্ব নিজের মালিকানাধীন দাস-দাসীর ওপর চালানোর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।'²
অধীনস্থ চাকর-বাকর ও শ্রমিকের ওপর জুলুম করা, তাদের গায়ে হাত তোলা, কটু কথা বলা বা অবজ্ঞা করা কোনো বাহাদুরি নয়। তাই তাদের প্রতি এ ধরনের কোনো জুলুম প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে সাথে সাথে আপনার ওপর আল্লাহর কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করুন।
বর্তমান সময়ে সমাজে অধীনস্থ চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের প্রতি যে রূঢ় আচরণ প্রকাশ পাচ্ছে, তা স্পষ্ট জুলুম। মানুষ ইনসাফ ও ন্যায় থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে এসব প্রকাশ পাচ্ছে। আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত শক্তিধর ও সাহসী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অধীনস্থ খাদিম ও স্ত্রী প্রভৃতির প্রতি কখনো অবজ্ঞা প্রদর্শন করেননি এবং কখনো তাদের প্রহার করেননি।
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৬৫৯।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৩০।
📄 গোলামকে প্রহার করার কাফফারা নির্ধারণ করেছেন তাকে স্বাধীন করে দেওয়া
আবু উমর (রা) বলেন, 'একদা আমি ইবনে উমর (রা)-এর কাছে গিয়ে দেখি, তিনি একটি গোলামকে আজাদ করে দিয়েছেন। এরপর তিনি জমিন থেকে একটি কাষ্ঠখণ্ড বা অন্য কিছু উঠিয়ে বললেন, "তাকে আজাদ করার মধ্যে এই বস্তুর সমতুল্য পুণ্যও নেই। তবে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
'যে ব্যক্তি স্বীয় গোলামকে চপেটাঘাত করল বা প্রহার করল, এর কাফফারা হলো তাকে আজাদ করে দেওয়া।'¹
উলামায়ে কিরাম বলেন, 'এই হাদিসে গোলামদের প্রতি নম্রতা অবলম্বন, তাদের সাথে উত্তম আচার-আচরণ এবং তাদের কষ্টদান থেকে বিরত থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। আর সকল মুসলমান এ ব্যাপারে একমত যে, গোলামকে প্রহার করার ফলে তাকে আজাদ করে দেওয়া ওয়াজিব নয়; বরং এটা মুসতাহাব। এর মাধ্যমে গোলামের ওপর জুলুম করার গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাওয়ার আশা করা যায়।'²
মুআবিয়া বিন সুয়াইদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি আমাদের এক গোলামকে চড় মেরে পালিয়ে গেলাম। অতঃপর জোহরের নামাজের কিছুক্ষণ পূর্বে ফিরে আসলাম এবং আব্বার পেছনে নামাজ আদায় করলাম। অতঃপর তিনি গোলাম ও আমাকে ডাকলেন। তারপর বললেন, "এর থেকে প্রতিশোধ নাও।” তখন সে আমাকে ক্ষমা করে দিল।'
এরপর তিনি বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে আমাদের বনু মুকাররিন গোত্রের কাছে কেবল একটি খাদিমা ছিল। আমাদের একজন তাকে চড় মেরে বসল। এই খবর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলে তিনি বললেন, "তাকে আজাদ করে দাও।” গোত্রের লোকেরা বলল, "সে ছাড়া আমাদের কোনো খাদিম নেই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাহলে তোমরা তার কাছ থেকে সেবা গ্রহণ করতে থাকো। তারপর যখনই তার (সেবা) থেকে অমুখাপেক্ষী হবে, তখনই তাকে মুক্ত করে দেবে।'³
'তার থেকে প্রতিশোধ নাও'- এই কথা গোলামের মনস্তুষ্টির জন্য বলেছেন। নাহলে সামান্য চপেটাঘাতের কারণে কিসাস বা বদলা নেওয়া ওয়াজিব হয় না। এ ক্ষেত্রে সাধারণত তাজির বা শাস্তি দেওয়া ওয়াজিব হয়। তবে মুসতাহাব হিসেবে তিনি গোলামকে কিসাস গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছেন।
এই হাদিসে দাস-দাসীর প্রতি নম্রতা ও বিনয় প্রদর্শনের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।⁴
লক্ষ করুন, সন্তান খাদিমের শরীরে আঘাত করার পরপরই বুঝতে পেরেছেন যে, এর কারণে তার পিতা তাকে অবশ্যই শাস্তি প্রদান করবেন। এ জন্য মারার সাথে সাথে তিনি পালিয়ে গেলেন। ফিরে আসলেন নামাজের সময়ে, যেন নামাজ পিতার নিকট তার পক্ষে সুপারিশ করে।
হিলাল বিন ইয়াসাফ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক বৃদ্ধ লোক (রাগের মাথায় চিন্তাভাবনা না করে) তড়িঘড়ি করে তার খাদিমার গালে চপেটাঘাত করে বসলেন। তখন সুয়াইদ বিন মুকাররিন (রা) তাকে বললেন, "আপনি কি মারার জন্য তার মূল্যবান চেহারা ছাড়া আর কিছুই পেলেন না? আমি বনু মুকাররিনের সাত সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের একজন সদস্য ছিলাম। আমাদের কাছে কেবল একটি খাদিমা ছিল। একদিন আমাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য তাকে চড় মারলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন আমাদের।'⁵
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৬৫৭।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১২৭।
৩. সহিহু মুসলিম: ১৬৫৮।
৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১২৮।
৫. সহিহু মুসলিম: ১৬৫৮।