📄 খাদিমদের সব ইচ্ছা পূরণ করতেন
রাবিআ বিন কাব আসলামি (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রাত্রি যাপন করলাম। তারপর অজু ও প্রয়োজন সারার জন্য পানি এনে দিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "চাও আমার কাছে।” আমি বললাম, "আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।” তিনি বললেন, "এ ছাড়া অন্য কিছু চাও।” আমি বললাম, "আমি এটাই চাই।” তিনি বললেন, "তাহলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তোমার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো।”'¹
রাবিআ (রা) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করতাম এবং সারা দিন তাঁর প্রয়োজন পূরণ করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতাম। এমনকি যখন তিনি ইশার নামাজ পড়ার পর বাড়িতে প্রবেশ করে দরোজায় দাঁড়াতেন, তখন আমি মনে মনে চাইতাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো প্রয়োজন দেখা দিক (যেন আমি তা পূরণ করতে পারি)। তবে তখন তাঁকে শুধু "সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" বলতে শুনতাম। এতে একসময় আমার বিরক্তি এসে যেত, ফলে আমি ফিরে আসতাম। অথবা আমার চোখ লেগে আসত, ফলে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।'
তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খিদমতের প্রতি আমার আগ্রহ অনুধাবন করতে পারতেন বিধায় একদিন তিনি আমাকে বললেন, "হে রাবিআ, আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব।” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি একটু ভেবে দেখি, তারপর আপনাকে এ ব্যাপারে জানাব।” এরপর আমি চিন্তাভাবনা করে বুঝতে পারলাম যে, দুনিয়া অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আখিরাতের সফলতা চাইব। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। অতঃপর তাঁর কাছে আসলে তিনি জানতে চাইলেন, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার কাছে আমি এটা চাই যে, আপনি আপনার প্রভুর কাছে আমার জন্য সুপারিশ করবেন, তিনি যেন আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।” তিনি বললেন, "হে রাবিআ, তোমাকে এটি কে শিখিয়ে দিয়েছে?” আমি বললাম, "সেই সত্তার কসম-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমাকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাবান আপনার মতো মহান ব্যক্তি যখন আমাকে বললেন, "আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব", তখন আমি চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, দুনিয়া যেহেতু অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়-তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আখিরাতের সফলতাই চাইব।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ হয়ে গেলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, "আমি তা করব, তবে অধিক সিজদার (অধিক নামাজ পড়ার) মাধ্যমে আমাকে সহযোগিতা করতে হবে।"²
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ৪৮৯।
২. মুসনাদু আহমাদ: ১৬১৪৩।
📄 চাকর-মজুরদের পারিশ্রমিক দ্রুত দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।'¹
অর্থাৎ কাজ শেষ হওয়ার পর কাজ করার ফলে তার শরীরে যে ঘাম এসেছে, তা শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তাকে পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দিতে হবে।²
টিকাঃ
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪৪৩।
২. হাশিয়াতুস সিনদি: ৫/১২৮।
📄 শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
'কিয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির লোকের প্রতিপক্ষ হব ১. যে ব্যক্তি আমার নামে কসম করে তা ভঙ্গ করে। ২. যে কোনো আজাদ মানুষকে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে। এবং ৩. যে মজুরকে খাটিয়ে তার পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার মজুরি দেয় না।'¹
ইবনে তিন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জালিমের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। তবে এই তিন শ্রেণির লোকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, তিনি এদের প্রতি অন্যদের তুলনায় বেশি কঠোর হবেন।'
'যে ব্যক্তি আমার নামে কসম করে তা ভঙ্গ করে'- অর্থাৎ কোনো অঙ্গীকার করে তা রক্ষা করার ব্যাপারে আল্লাহর নামে কসম খেল, কিন্তু অঙ্গীকার পূরণ করল না।
'যে মজুরকে খাটিয়ে তার পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার মজুরি দেয় না'-এটাও স্বাধীন ব্যক্তি বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করার অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সে বিনিময় ছাড়া তার থেকে উপকার আদায় করে নিয়েছে অথবা বিনিময় ছাড়া তাকে বেগার খাটিয়েছে। নিশ্চয় এটা শ্রমিককে গোলাম বানিয়ে তার মূল্য ভক্ষণ করার নামান্তর।²
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ২২২৭।
২. ফাতহুল বারি: ৬/৩৪৯।
📄 কিয়ামতের দিন খাদিমদের ওপর কৃত জুলুমের বদলা নেওয়া হবে
আয়িশা (রা) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে বসে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার কিছু গোলাম আছে। তারা আমার সাথে মিথ্যা বলে, আমার সাথে খিয়ানত করে। আমার নাফরমানি করে। (শাস্তিস্বরূপ) আমি এদের গালমন্দ করি এবং মারধর করি। সুতরাং আমার কাজটি কেমন?" তিনি বললেন:
'তোমার সঙ্গে তারা যে খিয়ানত করেছে, নাফরমানি করেছে এবং মিথ্যা বলেছে-আর তুমি এসবের জন্য তাদের যে শাস্তি দিয়েছ, তা হিসাব করা হবে। তোমার শাস্তি যদি তাদের অপরাধের সমপরিমাণ হয়ে থাকে, তবে তা বরাবর হয়ে গেল, তুমিও কিছু পাবে না এবং তোমার কোনো ক্ষতিও হবে না। আর তোমার শাস্তি যদি এদের অপরাধের চেয়ে কম পরিমাণের হয়, তবে অতিরিক্ত তোমার পাওনা থাকবে। আর তোমার শাস্তি যদি তাদের অপরাধের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তবে যা অতিরিক্ত হয়েছে, তোমার নিকট থেকে তার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।'
বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন লোকটি একপাশে সরে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি আল্লাহর কিতাব পাঠ করো না:
'আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।'¹
লোকটি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, এদের পৃথক করে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমার ও তাদের (কল্যাণের) জন্য অন্য কিছু ভাবতে পারছি না। আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, এদের সবাই স্বাধীন।"²
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'যে ব্যক্তি আপন গোলামকে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করল, কিয়ামত দিবসে তার ওপর এই মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু গোলাম যদি সত্যিই অপরাধী হয় (তবে অভিযোগকারী আর শাস্তি পাবে না)।'³
টিকাঃ
১. সুরা আল-আম্বিয়া: ৪৭।
২. সুনানুত তিরমিজি: ৩১৬৫।
৩. সহিহুল বুখারি: ৬৮৫৮, সহিহু মুসলিম: ১৬৬০।