📄 খাদ্য ও বস্ত্রে খাদিম ও মালিকের মাঝে সমতা রক্ষার কথা বলেছেন
মারুর বিন সুয়াইদ (রা) বলেন, 'রাবজায় (এলাকার নাম) আবু জার (রা)-এর সাথে আমার দেখা হলো। তখন তার গায়ে একসেট পোশাক (লুঙ্গি ও চাদর) পরিহিত ছিল এবং তার গোলামের শরীরেও একই মানের পোশাক ছিল। আমি এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "একবার আমি এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলাম এবং আমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'আবু জার, তুমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছ? তুমি তো এমন ব্যক্তি, যার মধ্যে এখনো জাহিলি যুগের স্বভাব রয়ে গেছে। জেনে রাখো, তোমাদের দাস-দাসী তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। তাই যার অধীনে তার কোনো ভাই থাকবে, সে যেন নিজে যা খায়, তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরে, তাকে তা-ই পরায়। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিয়ো না, যা তাদের জন্য খুব কষ্টকর। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সাহায্য করবে।'¹
'সে যেন নিজে যা খায়, তাকে তা-ই খাওয়ায়'- অর্থাৎ নিজে যে মানের খাবার খায়, সে একই মানের খাবার তাদের খাওয়ায়।²
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই হাদিসে মালিক যে মানের খাবার খায় এবং যে মানের পোশাক পরিধান করে, গোলামকেও সে একই মানের খাবার ও পোশাক পরিধান করার যে নির্দেশ এসেছে, এ ব্যাপারে সকল মুসলমান একমত যে, তা মুসতাহাব, ওয়াজিব নয়। আবু জার (রা) মুসতাহাবের ওপর আমল করেছেন। কারণ, মালিকের ওপর ওয়াজিব হলো, ব্যক্তি ও শহরের নিয়মনীতি অনুযায়ী গোলাম ও খাদিমদের জন্য পরিমিত খাবার ও মানসম্মত পোশাকের ব্যবস্থা করা। তা মালিকের খাবার ও পোশাকের চেয়ে নিম্নমানের হোক বা উচ্চমানের হোক। সুতরাং কোনো মালিক যদি দুনিয়াবিমুখতা বা কৃপণতাবশত তার সমকক্ষদের চেয়ে নিম্নমানের খাবার খায় বা পোশাক পরিধান করে, তখন খাদিম ও গোলামদের সম্মতি ব্যতীত তাদের জন্যও অনুরূপ নিম্নমানের পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করা জায়িজ হবে না।'³
হাদিস থেকে শিক্ষা:
দাস-দাসী ও চাকর-বাকরদের গালিগালাজ করা এবং তাদেরকে তাদের মা-বাবা সম্পর্কে লজ্জা দেওয়া নিষেধ।
মা-বাবা সম্পর্কে কাউকে লজ্জা দেওয়া নিষেধ এবং এটি একটি জাহিলি স্বভাব।
কোনো মুসলমানের মাঝে জাহিলি স্বভাব থাকা উচিত নয়।
দাস-দাসী, খাদিম-খাদিমা ও চাকর-বাকরদের প্রতি অনুগ্রহ করা এবং তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করার প্রতি উৎসাহ।
কোনো মুসলমানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেখানো ও তাকে অবজ্ঞা করা যাবে না।
সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধের গুরুত্ব।
দাস ও খাদিমদের সাথেও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে।⁴
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩০, সহিহু মুসলিম: ১৬৬১।
২. ফাতহুল বারি: ৫/১৭৪।
৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৩৩।
৪. ফাতহুল বারি: ৫/১৭৫, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৩৩।
📄 সামর্থ্যের অধিক কাজ চাপিয়ে দিতে নিষেধ করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
'অন্ন ও বস্ত্র গোলামের অধিকার। আর তার ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে।'¹
নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উলামায়ে কিরাম এই ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, গোলাম বা চাকরকে তার সাধ্যের অধিক কাজ ও দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি একান্তই তার প্রয়োজন হয়, তবে নিজে অথবা অন্য কারও মাধ্যমে তার সাহায্য করা আবশ্যক।'²
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ১৬৬২।
২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৩৩।
📄 অসুস্থ কাফির খাদিমকেও দেখতে যেতেন
আনাস (রা) বলেন, 'এক ইহুদি বালক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করত। একদিন সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার শিয়রে বসে বললেন, "ইসলাম কবুল করো।” বালকটি তার পাশে থাকা পিতার দিকে তাকালে তিনি বললেন, "আবুল কাসিমের কথা মেনে নাও।” তখন বালকটি মুসলমান হয়ে গেল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বলতে বলতে সেখান থেকে বের হলেন:
'সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেমে মুক্তি দিয়েছেন।'¹
এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খাদিমদের দেখতে যাওয়া এবং তাদের দাওয়াত দিয়ে কল্যাণের পথে নিয়ে আসার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ১৩৫৬।
📄 খাদিমের জানাজা পড়তে না পারলে কবর জিয়ারত করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, 'জনৈক হাবশি মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিতেন। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে না পেয়ে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, "তিনি মারা গেছেন।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা আমাকে এ ব্যাপারে অবহিত করতে পারতে না?" বর্ণনাকারী বলেন, "আসলে তার মৃত্যুকে তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করেননি বলে সাহাবিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে ব্যাপারে অবহিত করেননি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমাকে তার কবরের নিকট নিয়ে চলো।” সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁকে তার কবরে নিয়ে গেলেন। তিনি তার জানাজা পড়লেন। অতঃপর বললেন:
"এই কবরসমূহ তার বাসিন্দাদের জন্য অন্ধকারচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু আমি তাদের জানাজা পড়ার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের কবরসমূহকে আলোকিত করে দিয়েছেন।"¹
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'তিনি সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নিয়ে বের হলেন, তারপর তার কবরের নিকট দাঁড়িয়ে তাকবির বললেন। মানুষজন তাঁর পেছনে ছিলেন। তারপর তিনি তার জন্য দোয়া করে ফিরে আসলেন।'²
এই মহান নেতার অবস্থা দেখুন! তিনি মসজিদ ঝাড়ু দেওয়া একজন মহিলার অনুপস্থিতি লক্ষ করেছেন। কী মহান সেই নেতা! কত সুন্দর তাঁর আদর্শ!
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
উম্মাহর প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দয়া ও কোমলতা, তাদের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া, তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করা এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ নিয়ে চিন্তা করা।
খাদিম বা বন্ধু অনুপস্থিত থাকলে তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা।
দোয়ার মাধ্যমে উপকারের বিনিময় প্রদান করা।
ভালো মানুষদের জানাজায় অংশগ্রহণের প্রতি উৎসাহ।
সদ্য দাফনকৃত মৃত ব্যক্তির কবরে জানাজা পড়া ওই ব্যক্তির জন্য মুসতাহাব, যে তার জানাজা পড়েনি।
মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা।
টিকাঃ
১. সহিহু মুসলিম: ৯৬৫।
২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৫৩৩।