📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন

📄 তাদের জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন


আবু মুসা আশআরি (রা) থেকে বর্ণিত যে, 'তিনি একদিন ঘরে অজু করে বের হলেন এবং (মনে মনে স্থির করলেন যে,) আমি আজ সারা দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কাটাব, তাঁকে ছেড়ে কোথাও যাব না।'

তিনি মসজিদে গিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খবর নিলেন। সাহাবিগণ (রা) বললেন, "তিনি এদিকে বেরিয়ে গেছেন।" তিনি বলেন, "আমিও ওই পথ ধরে তাঁর অনুগমন করলাম। তাঁর খোঁজে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলাম। যেতে যেতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরিস কূপের (বাগানে) প্রবেশ করলেন। আমি তার দরোজার নিকট বসে পড়লাম। দরোজাটি খেজুরের শাখা দিয়ে তৈরি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর প্রয়োজন (ইসতিনজা) সেরে অজু করলেন, তখন আমি তাঁর নিকটে দাঁড়ালাম এবং দেখতে পেলাম, তিনি আরিস কূপের কিনারার বাঁধের মাঝখানে বসে হাঁটু পর্যন্ত পা'দুটি খুলে কূপের ভেতরে ঝুলিয়ে রেখেছেন।'

আমি তাঁকে সালাম দিলাম এবং ফিরে এসে দরোজায় বসে রইলাম এবং মনে মনে স্থির করে নিলাম যে, আজ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দারোয়ানরূপে (পাহারাদারের) দায়িত্ব পালন করব।'

এ সময় আবু বকর (রা) এসে দরোজায় ধাক্কা দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি কে?” তিনি বললেন, "আবু বকর (রা)।" আমি বললাম, “থামুন (আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসি)!" আমি গিয়ে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর (রা) ভেতরে আসার অনুমতি চাইছেন।' তিনি বললেন:

ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ

"তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।"

আমি ফিরে এসে আবু বকরকে (রা) বললাম, "ভেতরে আসুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন।" তখন তিনি আল্লাহর হামদ পাঠ করলেন।'

আবু বকর (রা) ভেতরে আসলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডানপাশে কূপের কিনারায় বসে দু'পায়ের কাপড় হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ন্যায় কূপের ভেতরে পা ঝুলিয়ে বসে পড়লেন।'

আমি ফিরে এসে (দরোজার পাশে) বসে পড়লাম। আমি যখন ঘর থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন আমার ভাই অজু করছিল। তারও আমার সাথে মিলিত হওয়ার কথা ছিল। তাই আমি (মনে মনে) বলতে লাগলাম, "আল্লাহ যদি তার কল্যাণ চান, তবে তাকে নিয়ে আসুন!"

এমন সময় এক ব্যক্তি দরোজা নাড়তে লাগলেন। আমি বললাম, “কে?” তিনি বললেন, "আমি উমর বিন খাত্তাব (রা)।" আমি বললাম, "অপেক্ষা করুন (আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসি)।" তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে সালাম পেশ করে আরজ করলাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, উমর বিন খাত্তাব (রা) (ভেতরে আসার) অনুমতি চাইছেন।" তিনি বললেন:

ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ

"তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।"

আমি এসে তাঁকে বললাম, "ভেতরে আসুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন।" তিনি আল্লাহর হামদ পাঠ করলেন। অতঃপর ভেতরে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বামপাশে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় উঠিয়ে কূপের ভেতরে পা ঝুলিয়ে দিয়ে বসে গেলেন।'

আমি আবার ফিরে আসলাম এবং বলতে থাকলাম, "আল্লাহ যদি আমার ভাইয়ের কল্যাণ চান, তবে যেন তাকে নিয়ে আসেন।"

এরপর আরেক ব্যক্তি এসে দরোজা নাড়তে লাগলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কে?" তিনি বললেন, "আমি উসমান বিন আফফান (রা)।" আমি বললাম, "থামুন (আমি অনুমতি নিয়ে আসছি)।" তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে গিয়ে জানালাম। তিনি বললেন:

ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ، عَلَى بَلْوَى تُصِيبُهُ

"তাকে ভেতরে আসতে বলো এবং তাকেও জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে দাও। তবে (দুনিয়াতে তার ওপর) কঠিন পরীক্ষা হবে।"

আমি এসে বললাম, "ভেতরে আসুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন; তবে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে।"

তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন, অতঃপর বললেন, "আল্লাহই সাহায্যকারী।"

তিনি ভেতরে এসে দেখলেন, কূপের কিনারায় খালি জায়গা নেই। তাই তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে অপর এক স্থানে বসে পড়লেন।'

সাইদ বিন মুসাইয়িব (রহ) বলেছেন, 'আমি এর দ্বারা (পরবর্তীকালে) তাঁদের কবর এরূপ হবে এই অর্থ করছি।'

হাদিস থেকে বোঝা যায়:
ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে কারও মুখোমুখি প্রশংসা করা বৈধ।
আবু বকর (রা), উমর (রা) ও উসমান (রা)-এর ফজিলত এবং তাঁরা জান্নাতি হওয়ার প্রমাণ। পাশাপাশি আবু মুসা আশআরি (রা)-এর ফজিলতও প্রমাণিত হয়।
উসমান (রা)-এর মতো অবস্থার সম্মুখীন হলে 'আল্লাহই সাহায্যকারী' বলা মুসতাহাব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি মুজিজা। কারণ, তিনি উসমান (রা)-এর বিপদ এবং প্রথম সারির তিন সাহাবির (রা) ইমান ও হিদায়াতের ওপর অটল থাকার হুবহু ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।

অনুরূপভাবে নির্দিষ্টসংখ্যক সাহাবির (রা) ব্যাপারে তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। যেমন: 'দশজন সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবির (রা) হাদিস' নামে প্রসিদ্ধ হাদিসটিতে স্পষ্ট ভাষায় কয়েকজনের নাম বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

أَبُو بَكْرٍ فِي الْجَنَّةِ، وَعُمَرُ فِي الْجَنَّةِ، وَعُثْمَانُ فِي الْجَنَّةِ، وَعَلِيٌّ فِي الْجَنَّةِ وَطَلْحَةُ فِي الْجَنَّةِ، وَالزُّبَيْرُ بْنُ الْعَوَّامِ فِي الْجَنَّةِ، وَسَعْدُ بْنُ مَالِكٍ فِي الجَنَّةِ، وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ فِي الْجَنَّةِ، سَعِيدُ بْنُ زَيْدِ فِي الْجَنَّةِ

'আবু বকর (রা) জান্নাতি, উমর (রা) জান্নাতি, উসমান (রা) জান্নাতি, আলি (রা) জান্নাতি, তালহা (রা) জান্নাতি, জুবাইর বিন আওয়াম (রা) জান্নাতি, সাদ বিন মালিক (রা) জান্নাতি, আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) জান্নাতি এবং সাইদ বিন জাইদ (রা) জান্নাতি।'

আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

الْحَسَنُ، وَالْحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الْجَنَّةِ

'হাসান (রা) ও হুসাইন (রা) জান্নাতি যুবকদের নেতা।'

আরেক হাদিসে ইরশাদ করেছেন:

أُرِيتُ الْجَنَّةَ فَرَأَيْتُ امْرَأَةَ أَبِي طَلْحَةَ، ثُمَّ سَمِعْتُ خَشْخَشَةً أَمَانِي فَإِذَا بِلَالُ

'আমাকে জান্নাত দেখানো হয়েছে। সেখানে আমি আবু তালহার (রা) স্ত্রীকে দেখেছি। অতঃপর আমার সামনে একজনের পায়ের খসখস আওয়াজ শুনতে পেলাম, হঠাৎ দেখি সে বিলাল (রা)।'

এভাবে হাদিসের মধ্যে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিদের (রা) সংখ্যা অনেক রয়েছে। তাঁদের সবার নাম বলে দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয় বিধায় সবার নাম উল্লেখ করা হয়নি।

টিকাঃ
৬১৭. সহিহুল বুখারি ৩৬৭৪, সহিহু মুসলিম: ২৪০৩।
৬১৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৭০।
৬১৯. সুনানু আবি দাউদ: ৪২৪৯, সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৪৮, সুনানু ইবনি মাজাহ ১৩৪। সাইদ বিন জাইদ (রা) থেকে বর্ণিত।
৬২০. সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৬৮। আবু সাইদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত।
৬২১. সহিহুল বুখারি: ৩৬৭৯;, সহিহু মুসলিম: ২৪৫৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00