📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের রায় ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন

📄 তাদের রায় ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন


আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একদা আমরা কয়েকজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঘিরে বসা ছিলাম। আমাদের সাথে আবু বকর (রা) ও উমরও (রা) ছিলেন। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্য হতে উঠে চলে গেলেন এবং পুনরায় ফিরে আসতে এত বিলম্ব করলেন যে, এতে আমরা শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম, না জানি আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আবার কোনো বিপদে পড়লেন কি না। আমরা ঘাবড়ে গেলাম এবং উঠে বের হয়ে পড়লাম। অবশ্য সকলের মধ্যে আমিই প্রথম ভীত হয়ে পড়েছিলাম। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্ধানে আমি সকলের আগে বের হলাম। তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে আমি বনু নাজ্জার গোত্রের জনৈক আনসারির (রা) প্রাচীরবেষ্টিত বাগানের নিকট পৌঁছালাম। ভেতরে প্রবেশ করার জন্য তার চারদিকে দরোজা খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, বাইরের একটি কূপ হতে একটি ছোট নালা এসে বাগানের মধ্যে প্রবেশ করেছে।'

তিনি বলেন, 'আমি জড়োসড়ো হয়ে তাতে প্রবেশ করলাম এবং ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে পৌঁছালাম। তিনি (আমাকে তাঁর সামনে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে) বললেন, "আবু হুরাইরা (রা) নাকি!?" আমি বললাম, "জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।" তিনি বললেন, "কী ব্যাপার? (তুমি এখানে?)" আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি আমাদের মধ্যে বসা ছিলেন, হঠাৎ উঠে চলে আসলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আপনাকে ফিরে আসতে না দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে, (আল্লাহ না করুন) আমাদের হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আপনি কোনোরূপ বিপদের সম্মুখীন হলেন কি না। এ জন্য আমরা সকলেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং সকলের মধ্যে আমিই প্রথম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। অতঃপর (আপনাকে খোঁজ করতে করতে) এ বাগানের দিকে আসি এবং শিয়ালের ন্যায় খুব সরু হয়ে বাগানে প্রবেশ করি। আর অন্যরাও (আপনার খোঁজে) আমার পেছনে আসছে।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জুতোজোড়া আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “হে আবু হুরাইরা, (তুমি যে আমার কাছে এসেছ, তার প্রমাণস্বরূপ) আমার জুতোদুটি সাথে নিয়ে যাও! আর বাগানের বাইরে যাদের সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে, তাদের মধ্যে যারা সত্য ও দৃঢ় মনে সাক্ষ্য দেয় যে, "আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই", তাদেরকে তুমি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে দাও।"

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিদর্শন নিয়ে বাইরে আসার পর) প্রথমেই উমর (রা)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু হুরাইরা, এ জুতোজোড়া কার?” আমি বললাম, "এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর। তিনি এ জুতোজোড়া আমার হাতে দিয়ে বলেছেন, "যে ব্যক্তি সত্য ও দৃঢ় মনে এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি যেন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিই।"

এ কথা শোনামাত্রই উমর (রা) আমার বুকের ওপর এমন ঘুষি মারলেন যে, আমি চিত হয়ে পড়ে গেলাম। অতঃপর উমর (রা) আমাকে বললেন, "ফিরে যাও, হে আবু হুরাইরা!" তাই আমি কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে আসলাম।'

পেছনে ফিরে দেখি, উমরও (রা) আমার সাথে এসে পৌঁছেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাকে কাঁদতে দেখে) জিজ্ঞেস করলেন, "কী হলো, হে আবু হুরাইরা?"

আমি বললাম, "(এখান থেকে যাওয়ার পর) উমরের (রা) সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তখন আমি তাকে সেই কথা বললাম, যা নিয়ে আপনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। তা শুনে তিনি আমার বুকের ওপর এমন জোরে ঘুষি মারলেন যে, আমি চিত হয়ে পড়ে গেলাম। তারপর তিনি আমাকে ফিরে আসতে বললেন।"

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরকে (রা) বললেন, "হে উমর, এমন করলে কেন?" উমর (রা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! আপনি কি আপনার জুতোজোড়া দিয়ে আবু হুরাইরাকে (রা) এই বলে পাঠিয়েছেন-যে ব্যক্তি অন্তরের স্থির বিশ্বাসের সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই", তাকে যেন সে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ।” উমর (রা) বললেন, “(হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অনুগ্রহ করে) এরূপ বলবেন না। আমার আশঙ্কা হয় যে, (এমন কথা শুনে) পরবর্তী লোকেরা এর ওপর নির্ভর করে বসবে (আমল করা ছেড়ে দেবে)। সুতরাং তাদের যথাযথভাবে আমল করতে দিন।"

এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ঠিক আছে, তাদের আমল করতে দাও।"

লক্ষ করুন, উমর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার বিপরীত একটি প্রস্তাব পেশ করলেন আর সেটাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করে নিলেন।

উমর (রা)-এর উক্ত কর্ম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা বা প্রত্যাখ্যান ছিল না। তবে তিনি দেখতে পেলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কথা দিয়ে আবু হুরাইরাকে (রা) প্রেরণ করেছেন, তাতে মুসলমানদের জন্য অন্তরের প্রশান্তি ও সুসংবাদ ছাড়া অন্য কোনো কল্যাণ নেই। তদুপরি, এ কথা শুনে তারা (মুক্তিলাভের ব্যাপারে) অতিমাত্রায় ভরসাপ্রবণ হয়ে পড়ার এবং ভালো কর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রস্তাব পেশ করলেন যেন এই কথাটি গোপন রাখা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রস্তাবকে যথার্থ মনে করলেন এবং তা মেনে নিলেন।'

এই হাদিস থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হলো:
আলিম কর্তৃক তার ছাত্র-শিষ্য ও জিজ্ঞাসাকারীদের সাথে নিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা ও ফতোয়া প্রদানের মজলিস কায়িম করা।
বড় একটি দলের আলোচনা করার সময় প্রত্যেকের নাম না নিয়ে তাদের মধ্য থেকে বিশেষ কয়েকজনের নাম নিয়ে বাকিদের জন্য ইত্যাদি বা প্রমুখ বলে দেওয়া।
সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি খুব যত্নশীল ছিলেন এবং তাঁর প্রতি তাঁদের সম্মানবোধ অব্যক্ত মাত্রায় ছিল। আর প্রত্যাশিত জায়গায় তিনি আসতে দেরি করলে অস্বস্তিবোধ করতেন এবং ভীত হয়ে পড়তেন।
অনুসারীরা তাদের সর্দারের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকবে এবং তার উপকার সাধনে ও ক্ষতি দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
অপরের মালিকানাধীন জায়গায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা বৈধ, যদি দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব থাকার কারণে বা অন্য কোনো কারণে তাতে মালিকের নীরব অনুমতি থাকে। কেননা, আবু হুরাইরা (রা) প্রাচীরবেষ্টিত বাগানটিতে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য তাকে কোনোরূপ দোষারোপ করেননি।
এই বিধান কেবল মালিকানাধীন জায়গায় প্রবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কারও আসবাবপত্র ব্যবহার করা, কারও খানা খাওয়া, কারও ঘর থেকে নিজের বাড়িতে খানা নিয়ে আসা, কারও বাহনে আরোহণ করা ইত্যাদি বিষয়ে বিনা অনুমতিতে করতে পারবে, যদি জানা থাকে যে, এতে মালিক বিরক্ত হবে না।
যে ইমান চিরস্থায়ী জাহান্নামি হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তার জন্য অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকারোক্তি আবশ্যক।
বিশেষ কোনো প্রয়োজন বা উপকারিতা না থাকলে কিংবা ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে কিছু কিছু জ্ঞান গোপন রাখা বৈধ।
অনুসারী তার নেতা বা ইমামের সিদ্ধান্তের বিপরীত কোনো বিষয়ে কল্যাণ দেখতে পেলে অনুসৃতকে তা জানাতে পারবে এবং অনুসৃতের জন্যেও উচিত যে, অনুসারীর কথা যৌক্তিক ও উপকারী হলে তা মেনে নেওয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া।
এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে 'তোমার জন্য আমার মাতাপিতা কুরবান হোক' বলা বৈধ।

টিকাঃ
৬০২. সহিহু মুসলিম: ৩১।
৬০৩. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/২৩৮।
৬০৪. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/২৩৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বদর যুদ্ধে জনৈক সাহাবির পরামর্শে ছাউনি স্থাপন করেছিলেন

📄 বদর যুদ্ধে জনৈক সাহাবির পরামর্শে ছাউনি স্থাপন করেছিলেন


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরে পৌঁছে তাতে ছাউনি স্থাপন করলেন। তখন হুবাব বিন মুনজির (রা) বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এই জায়গাটা কি আপনি আল্লাহর নির্দেশেই বাছাই করেছেন, যার থেকে আমরা একচুল এদিক-ওদিক সরতে পারি না, না এটা আপনার নিজের রণকৌশলগত সিদ্ধান্ত?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এটা নেহাত একটা রণকৌশল এবং আমার নিজস্ব চিন্তা।'

হুবাব (রা) বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, জায়গাটি সুবিধার মনে হচ্ছে না। আপনি বরং সৈন্যদলকে এখান থেকে এগিয়ে নিয়ে যান। আমরা ওই কূপের নিকট গিয়ে ছাউনি স্থাপন করব, যা কুরাইশদের অতি নিকটে। এরপর আমরা সেই জায়গার আশপাশে যে কূপ আছে, সেগুলো বন্ধ করে দেবো। অতঃপর সেখানে একটি হাউজ তৈরি করে তাতে পানি ভরে রাখব। পরে যখন আমরা শত্রুদের সাথে লড়াই করব, তখন আমরা পানি পান করতে পারব, কিন্তু ওরা পারবে না।' এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ।'

এরপর তিনি সবাইকে নিয়ে উঠলেন এবং কুরাইশদের নিকটে অবস্থিত কূপের কাছে পৌঁছালেন আর সেখানে তাঁবু ফেললেন। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে অন্যান্য কূপ বন্ধ করে দেওয়া হলো। তিনি যে কূপের কাছে তাঁবু ফেললেন, তার কাছে একটি হাউজ তৈরি করে পানি ভরে রাখলেন এবং তাতে পানির পাত্র ফেলে রাখলেন।'

টিকাঃ
৬০৫. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৩/১৬৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 উহুদ যুদ্ধে নিজের রায় থেকে সরে সাহাবিদের রায় গ্রহণ করেছিলেন

📄 উহুদ যুদ্ধে নিজের রায় থেকে সরে সাহাবিদের রায় গ্রহণ করেছিলেন


আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর "জুল-ফাকার" নামক তলোয়ারটি বদর যুদ্ধে গনিমত হিসেবে পেয়েছিলেন। উহুদ যুদ্ধের দিন এটাকে জড়িয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন।'

উহুদের দিন মুশরিকরা যখন আক্রমণ করতে আসলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায় ছিল, তিনি মদিনায় থেকে তাদের মুকাবিলা করবেন। কিন্তু বদর যুদ্ধে শরিক ছিল না, এমন কতেক লোক বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাদেরকে তাদের ওখানে নিয়ে চলুন, উহুদেই আমরা তাদের সাথে লড়াই করব। এতে আমরা সেই ফজিলত লাভের আশা করছি, যা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ পেয়েছিলেন।"

তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বারবার এই অনুরোধ করতে থাকলে একপর্যায়ে তিনি বর্ম পরিধান করে নিলেন। কিন্তু যখন তিনি বর্ম পরিধান করলেন, তখন তারা লজ্জিত হয়ে পড়লেন এবং বললেন, ""ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এখানেই অবস্থান করুন। আপনার রায় অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।" তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

مَا يَنْبَغِي لِنَبِيَّ أَنْ يَضَعَ أَدَاتَهُ بَعْدَ أَنْ لَبِسَهَا، حَتَّى يَحْكُمَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ عَدُوِّهِ

"কোনো নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্য উচিত নয় যে, তিনি যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে তা শত্রু ও তার মাঝে আল্লাহ তাআলা ফয়সালা করে দেওয়ার পূর্বেই খুলে ফেলবেন।"

আয়িশা (রা)-এর ওপর অপবাদ আরোপের ঘটনায়ও তিনি সাহাবিদের (রা) সাথে পরামর্শ করেছিলেন।

আয়িশা (রা) বলেন, 'আমার সম্পর্কে যখন অপবাদ রটানো হচ্ছিল, অথচ এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না, এমন সময় একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রসঙ্গটি নিয়ে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। অতঃপর প্রথমে তিনি তাশাহুদ পাঠ করলেন এবং আল্লাহর যথাযথ হামদ ও সানা পাঠ করলেন। অতঃপর বললেন:

أَمَّا بَعْدُ: أَشِيرُوا عَلَيَّ فِي أُنَاسٍ أَبَنُوا أَهْلِي وَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ عَلَى أَهْلِي مِنْ سُوءٍ قَطُّ وَأَبَنُوا بِمَنْ وَاللهِ مَا عَلِمْتُ عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ قَطُّ وَلَا دَخَلَ بَيْتِي قَطُّ إِلَّا وَأَنَا حَاضِرٌ وَلَا غِبْتُ فِي سَفَرٍ إِلَّا غَابَ مَعِي

"হামদ ও সালাতের পর এইসব লোকের ব্যাপারে তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও, যারা আমার স্ত্রী সম্পর্কে অপবাদ রটাচ্ছে। অথচ আল্লাহর কসম, আমার স্ত্রীর ব্যাপারে কখনো মন্দ কিছু আমি জানি না। এরা এমন মানুষকে জড়িয়ে অপবাদ রটাচ্ছে, আল্লাহর কসম, তার সম্পর্কেও আমি মন্দ বলতে কখনো কিছু জানি না। আর আমার উপস্থিতি ব্যতীত সে আমার ঘরে কোনোদিন আসেনি। কোনো সফরে যাওয়ার কারণে আমি যখন অনুপস্থিত থেকেছি, সেও আমার সঙ্গেই অনুপস্থিত থেকেছে।"'

টিকাঃ
৬০৬. মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৫৮৮।
৬০৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩১৮০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সাহাবিদের দুঃখ-কষ্টের খেয়াল রাখতেন

📄 সাহাবিদের দুঃখ-কষ্টের খেয়াল রাখতেন


এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ (রা) ইসলামের জন্য অনেক দুঃসহ কষ্ট সহ্য করেছেন। বিশেষ করে যাঁরা একদম শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা কঠিন দুঃখ-দুর্দশাময় একটি জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। এই যেমন মুসআব বিন উমাইর (রা)। তিনি পার্থিব ভোগবিলাস ও চাকচিক্য পরিত্যাগ করে এবং মমতাময়ী মা ও পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি হিজরত করেছিলেন।

মুহাম্মদ বিন কাব কুরাজি (রহ) বলেন, 'আলিকে (রা) বলতে শুনেছেন এমন এক ব্যক্তি আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, আলি বিন আবু তালিব (রা) বলেন, "আমি এক শীতের দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘর থেকে বের হলাম। এর পূর্বে আমি একটি লোমহীন চামড়া নিয়ে তা মাঝামাঝি কেটে গলায় ঢুকালাম এবং খেজুরের পাতা দিয়ে কোমরে শক্ত করে বাঁধলাম। তখন আমি খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে কোনো খাবার থাকলে আমি খেয়ে নিতাম। আমি খাবারের সন্ধানে বের হলাম। জনৈক ইহুদির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সে চরকির সাহায্যে বাগানে পানি সেচ করছিল। আমি প্রাচীরের একটি ছিদ্র দিয়ে তাকে দেখলাম। সে বলল, "হে বেদুইন, কী চাও? প্রতি বালতির বিনিময়ে তুমি একটি খেজুর পাবে-আমাকে পানি তুলে দেবে?" আমি বললাম, “ঠিক আছে। দরোজা খোলো, আমি ভেতরে আসি।" সে দরোজা খুললে আমি ভেতরে গেলাম। সে আমাকে বালতি দিল। প্রতি বালতি পানি তুলতেই সে আমাকে একটি করে খেজুর দিতে লাগল। এভাবে আমার মুঠি খেজুরে ভরে গেল। তারপর বালতি রেখে দিয়ে তাকে বললাম, "আমার যথেষ্ট হয়েছে।" এরপর খেজুর খেয়ে পানি পান করলাম এবং মসজিদে চলে এলাম। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেলাম।'

আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। এমন সময় চামড়ার তালিযুক্ত একটি ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়ে মুসআব বিন উমাইর (রা) এসে আমাদের সামনে হাজির হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বর্তমান করুণ অবস্থা দেখে এবং তাঁর পূর্বের সচ্ছল অবস্থার কথা মনে করে কেঁদে ফেললেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

كَيْفَ بِكُمْ إِذَا غَدًا أَحَدُكُمْ فِي حُلَّةٍ وَرَاحَ فِي حُلَّةٍ وَوُضِعَتْ بَيْنَ يَدَيْهِ صَحْفَةٌ وَرُفِعَتْ أُخْرَى وَسَتَرْتُمْ بُيُوتَكُمْ كَمَا تُسْتَرُ الكَعْبَةُ؟

"সে সময় তোমাদের কী অবস্থা হবে, যখন তোমাদের কেউ সকালে এক জোড়া পোশাক পরবে আর বিকেলে পরবে আরেক জোড়া। আর তার সামনে খাদ্যভর্তি একটি পেয়ালা রাখা হবে আর অন্যটি উঠিয়ে নেওয়া হবে। তোমরা তোমাদের ঘরগুলো এমনভাবে পর্দায় ঢেকে রাখবে, যেভাবে কাবা ঘরকে গিলাফে ঢেকে রাখা হয়?"

সাহাবিগণ (রা) আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমরা তো তখন বর্তমানের চাইতে অনেক ভালো থাকব। বিপদাপদ ও অভাব-অনটন হতে নিরাপদ থাকব। ফলে ইবাদত-বন্দেগির জন্য যথেষ্ট অবসর পাব।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

لأَنْتُمُ اليَوْمَ خَيْرٌ مِنْكُمْ يَوْمَئِذٍ

"না, সেদিনের তুলনায় তোমরা আজ অনেক ভালো আছ।"'

টিকাঃ
৬০৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৭২, ২৪৭৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00