📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের কারও কারও জন্য নিজের পিতামাতাকে উৎসর্গ করার কথা বলতেন

📄 তাদের কারও কারও জন্য নিজের পিতামাতাকে উৎসর্গ করার কথা বলতেন


সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য তাঁর তৃণীর থেকে তির বের করে বললেন:

ارْمِ فِدَاكَ أَبِي وَأُمِّي

"তোমার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক, তুমি তির নিক্ষেপ করতে থাকো।"'

এই বাক্যটি আরবরা উৎসাহ-উদ্দীপনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। অর্থাৎ যদি সম্ভব হতো, তবে তোমার জন্য আমি প্রিয় পিতামাতাকে কুবরান করতাম।

সহিহ মুসলিমে (রহ) সাদ (রা)-থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের দিন তার জন্য তাঁর পিতামাতাকে একত্র করে উল্লেখ করেছিলেন।'

তিনি বলেন, 'মুশরিকদের এক ব্যক্তি মুসলমানদের ওপর আগুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তির নিক্ষেপ করো। তোমার জন্য আমার মাতাপিতা কুবরান হোক।"

আমি তার উদ্দেশ্যে একটা তির বের করলাম, যাতে ফলা (ধারালো অংশটি) ছিল না। সেটা গিয়ে তার পাঁজরে লাগলে সে পড়ে গেল। এতে তার লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে গেল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে হাসলেন যে, আমি তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেলাম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাসার কারণ শত্রুর মৃত্যু; তার লজ্জাস্থান প্রকাশ পাওয়া নয়।

আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'খন্দক যুদ্ধের সময় আমি ও উমর বিন আবু সালামা (রা) কিল্লায় মহিলাদের সাথে ছিলাম। কখনো সে আমার জন্য পিঠ নিচু করে দিত, তখন আমি দেখতাম। আবার কখনো আমি তার জন্য পিঠ নিচু করে দিতাম, তখন সে দেখত।'

আমি দেখলাম, জুবাইর (রা) ঘোড়ায় চড়ে বনু কুরাইজার দিকে দুবার অথবা তিনবার গমন করলেন।'

অতঃপর যখন আমরা ফিরে আসলাম, তখন আমি তাকে বললাম, "আব্বু, আমি আপনাকে (বনু কুরাইজার দিকে) আসা-যাওয়া করতে দেখেছি।" তিনি বললেন, "তুমি কি আমাকে দেখেছ, হে বৎস?” আমি বললাম, "জি, দেখেছি।” তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, "কেউ যদি বনু কুরাইজার নিকট গিয়ে তাদের খবর আমাকে এনে দিত।"

তাঁর কথা শুনে সেখানে গেলাম। যখন ফিরে আসলাম, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য তাঁর পিতামাতাকে একত্রে উল্লেখ করে বললেন:

فَدَاكَ أَبِي وَأُمِّي

"তোমার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক।"'

নববি (রহ) বলেন, 'এখানে প্রকৃত কুরবানি উদ্দেশ্য নয়। এটা ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত একটি বাক্য মাত্র।'

এই হাদিস থেকে ইবনে জুবাইরের (রা) ফজিলত ও তীক্ষ্ণ মেধাশক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ, তিনি হিজরতের বছর মদিনায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর সঠিক মত অনুসারে খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হিজরি চতুর্থ বছরে। সুতরাং বর্ণিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। এই ছোট্ট বয়সেই তিনি পুরো ঘটনা স্মৃতিতে ধারণ করেছিলেন।'

টিকাঃ
৫৮৭. সহিহুল বুখারি: ৪০৫৫, সহিহু মুসলিম: ২৪১২।
৫৮৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৮৫।
৫৮৯. সহিহুল বুখারি: ৩৭২০, সহিহু মুসলিম: ২৫১৬।
৫৯০. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৮৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সাহাবিদের মৃত্যুতে তিনি মর্মাহত ও অশ্রুসিক্ত হতেন

📄 সাহাবিদের মৃত্যুতে তিনি মর্মাহত ও অশ্রুসিক্ত হতেন


আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতার যুদ্ধে জাইদ বিন হারিসা (রা)-কে সেনাপতি বানিয়ে প্রেরণ করলেন। অতঃপর তিনি বললেন:

إِنْ قُتِلَ زَيْدُ فَجَعْفَرُ، وَإِنْ قُتِلَ جَعْفَرُ فَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ

"জাইদ (রা) নিহত হলে জাফর (রা) সেনাপতি হবে, জাফর (রা) নিহত হলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) সেনাপতি হবে।"

আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেন, 'সেই যুদ্ধে তাদের দলে আমিও ছিলাম। আমরা জাফর বিন আবু তালিবকে (রা) তালাশ করলাম। তখন নিহতদের মাঝে তাকে পেলাম। তার শরীরে নব্বইয়ের অধিক তরবারি ও তিরের আঘাতের দাগ ছিল।'

আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিলেন। তখন তিনি বললেন:

أَخَذَ الرَّايَةَ زَيْدُ فَأُصِيبَ، ثُمَّ أَخَذَهَا جَعْفَرُ فَأُصِيبَ، ثُمَّ أَخَذَهَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ فَأُصِيبَ - وَإِنَّ عَيْنَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَتَدْرِفَانِ - ثُمَّ أَخَذَهَا خَالِدُ بْنُ الوَلِيدِ مِنْ غَيْرِ إِمْرَةٍ فَفُتِحَ لَهُ

“জাইদ (রা) পতাকা ধারণ করল, অতঃপর সে নিহত হলো। তারপর জাফর (রা) পতাকা হাতে তুলে নিল। একপর্যায়ে সেও নিহত হলো।

তারপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) পতাকা হাতে নিল, অতঃপর সেও নিহত হলো।-এ কথা বলার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। তার পর নেতৃত্ব ছাড়া খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) পতাকা হাতে নিল এবং তার হাতে বিজয় অর্জিত হলো।"'

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উসমান বিন মাজউন (রা)-এর মরদেহে চুম্বন করতে দেখেছি। তখন তাঁর কপোল বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতে দেখেছি।'

অপর বর্ণনায় আছে, 'তখন তাঁর চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল।'

মুত্তালিব বিন আব্দুল্লাহ (রহ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'যখন উসমান বিন মাজউন (রা) ইনতিকাল করলেন, তখন তাঁর মৃতদেহ আনা হলো এবং দাফন করা হলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে একটি পাথর আনতে বললেন। লোকটি পাথর বহনে সক্ষম হলেন না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরের কাছে গেলেন এবং তা ওঠানোর জন্য জামার হাতা গুটালেন।'

মুত্তালিব (রহ) বলেন, 'যে সাহাবি (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই ঘটনাটি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, "আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতের শুভ্রতার চমক এখনো অনুভব করি, যা তিনি জামার হাতা গুটানোর সময় প্রকাশ পেয়েছিল।"

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথরটি বহন করে এনে উসমান (রা)-এর মাথার দিকে রাখলেন। আর বললেন:

أَتَعَلَّمُ بِهَا قَبْرَ أَخِي، وَأَدْفِنُ إِلَيْهِ مَنْ مَاتَ مِنْ أَهْلِي

"এর মাধ্যমে আমি আমার ভাইয়ের কবর চিনতে পারব এবং আমার পরিবার থেকে কেউ মারা গেলে তাকে এর পাশে কবর দেবো।"'

উসমান বিন মাজউন (রা) তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধভাই ছিলেন। হাবশা ও মদিনা উভয় অঞ্চলে হিজরত করেছেন। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি জাহিলি যুগ থেকেই নিজের জন্য মদকে হারাম করে নিয়েছিলেন। হিজরতের পর মুহাজিরদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম মৃত্যুবরণ করেছিলেন। হিজরতের ত্রিশ মাসের মাথায় শাবান মাসে তার মৃত্যু হয়েছিল। তিনি আবিদ, মুজতাহিদ ও প্রথম সারির সাহাবিদের (রা) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।'

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মৃত্যুর পর মুসলমানকে চুম্বন করা এবং তার জন্য (বিলাপ না করে) কান্না করা বৈধ।

ইবনে কুদামা (রহ) বলেন, 'কোনো পাথর বা কাঠখণ্ড দ্বারা কবরকে চিহ্নিত করাতে কোনো সমস্যা নেই। ইমাম আহমাদ (রহ) বলেন, "কোনো বস্তু দ্বারা কবরকে চিহ্নিত করে রাখতে কোনো অসুবিধা নেই। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান বিন মাজউন (রা)-এর কবরকে চিহ্নিত করে রেখেছিলেন।"'

নিকটাত্মীয়দের কবরসমূহ পাশাপাশি রাখা মুসতাহাব। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আমার পরিবার থেকে কেউ মারা গেলে তাকে এর (উসমান বিন মাজউন (রা)-এর কবর) পাশে কবর দেবো।' তারপর সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্তান ইবরাহিম (রা) ইনতিকাল করেন এবং তাকে তার পাশেই দাফন করা হয়।'

টিকাঃ
৫৯১. সহিহুল বুখারি: ৪২৬১।
৫৯২. সহিহুল বুখারি: ১২৪৬।
৫৯৩. সুনানু আবি দাউদ: ৩২০৬, সুনানুত তিরমিজি: ৯৮৯, সুনানু ইবনি মাজাহ ১৪৫৬।
৫৯৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩২০৬।
৫৯৫. আল-ইসাবা: ৪/৪৬১।
৫৯৬. আল-মুগনি: ২/১৯১।
৫৯৭. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৫/৪৫৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন

📄 তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন -وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ 'কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।'

ইবনে বাত্তাল (রহ) বলেন, 'পরামর্শ করা সুন্নাত। কেউই পরামর্শ থেকে অমুখাপেক্ষী নয়। যদি কেউ পরামর্শ থেকে অমুখাপেক্ষী হতো, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সর্বাধিক অমুখাপেক্ষী হতেন। কারণ, জিবরাইল (আ) আসমান থেকে সঠিক ও যথার্থ ফয়সালাটিই নিয়ে আসতেন।'

তবে পরামর্শের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি কেবল ইমামই প্রদান করবেন। অন্য কোনো ব্যক্তি তাতে শরিক থাকবে না। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ

"অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।"

এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে কেবল তাঁর সাথেই সম্পৃক্ত করেছেন।'

হাসান বসরি (রহ) বলেন, 'যেকোনো সম্প্রদায়ের সামনে কোনো বিষয় আসলে, তারা যদি পরস্পর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করেন।'

কবি বলেন:

الرأي قبل شجاعة الشجعان *** هو أول، وهي المحل الثاني فإذا هما اجتمعا لنفس حرة *** بلغت من العلياء كل مكان

'বাহাদুরের বাহাদুরি প্রদর্শনের পূর্বে পরামর্শ করতে হয়। পরামর্শ আগে, তারপর বাহাদুরি।

এ দুটি বিষয় যখন কোনো জানবাজ ব্যক্তির মাঝে একত্রিত হয়, তখন প্রতিটি ক্ষেত্রে তার উন্নতি সুনিশ্চিত।'

টিকাঃ
৫৯৮. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৫৯।
৫৯৯. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৫৯।
৬০০. ইবনে বাত্তাল (রহ) কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৫/৩৩৪।
৬০১. ইবনে হিব্বান (রহ) রচিত রওজাতুল উকালা: ১/১৯২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের রায় ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন

📄 তাদের রায় ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন


আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একদা আমরা কয়েকজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঘিরে বসা ছিলাম। আমাদের সাথে আবু বকর (রা) ও উমরও (রা) ছিলেন। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্য হতে উঠে চলে গেলেন এবং পুনরায় ফিরে আসতে এত বিলম্ব করলেন যে, এতে আমরা শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম, না জানি আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আবার কোনো বিপদে পড়লেন কি না। আমরা ঘাবড়ে গেলাম এবং উঠে বের হয়ে পড়লাম। অবশ্য সকলের মধ্যে আমিই প্রথম ভীত হয়ে পড়েছিলাম। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্ধানে আমি সকলের আগে বের হলাম। তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে আমি বনু নাজ্জার গোত্রের জনৈক আনসারির (রা) প্রাচীরবেষ্টিত বাগানের নিকট পৌঁছালাম। ভেতরে প্রবেশ করার জন্য তার চারদিকে দরোজা খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, বাইরের একটি কূপ হতে একটি ছোট নালা এসে বাগানের মধ্যে প্রবেশ করেছে।'

তিনি বলেন, 'আমি জড়োসড়ো হয়ে তাতে প্রবেশ করলাম এবং ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে পৌঁছালাম। তিনি (আমাকে তাঁর সামনে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে) বললেন, "আবু হুরাইরা (রা) নাকি!?" আমি বললাম, "জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।" তিনি বললেন, "কী ব্যাপার? (তুমি এখানে?)" আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি আমাদের মধ্যে বসা ছিলেন, হঠাৎ উঠে চলে আসলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আপনাকে ফিরে আসতে না দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে, (আল্লাহ না করুন) আমাদের হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আপনি কোনোরূপ বিপদের সম্মুখীন হলেন কি না। এ জন্য আমরা সকলেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং সকলের মধ্যে আমিই প্রথম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। অতঃপর (আপনাকে খোঁজ করতে করতে) এ বাগানের দিকে আসি এবং শিয়ালের ন্যায় খুব সরু হয়ে বাগানে প্রবেশ করি। আর অন্যরাও (আপনার খোঁজে) আমার পেছনে আসছে।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জুতোজোড়া আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “হে আবু হুরাইরা, (তুমি যে আমার কাছে এসেছ, তার প্রমাণস্বরূপ) আমার জুতোদুটি সাথে নিয়ে যাও! আর বাগানের বাইরে যাদের সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে, তাদের মধ্যে যারা সত্য ও দৃঢ় মনে সাক্ষ্য দেয় যে, "আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই", তাদেরকে তুমি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে দাও।"

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিদর্শন নিয়ে বাইরে আসার পর) প্রথমেই উমর (রা)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু হুরাইরা, এ জুতোজোড়া কার?” আমি বললাম, "এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর। তিনি এ জুতোজোড়া আমার হাতে দিয়ে বলেছেন, "যে ব্যক্তি সত্য ও দৃঢ় মনে এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি যেন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিই।"

এ কথা শোনামাত্রই উমর (রা) আমার বুকের ওপর এমন ঘুষি মারলেন যে, আমি চিত হয়ে পড়ে গেলাম। অতঃপর উমর (রা) আমাকে বললেন, "ফিরে যাও, হে আবু হুরাইরা!" তাই আমি কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে আসলাম।'

পেছনে ফিরে দেখি, উমরও (রা) আমার সাথে এসে পৌঁছেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাকে কাঁদতে দেখে) জিজ্ঞেস করলেন, "কী হলো, হে আবু হুরাইরা?"

আমি বললাম, "(এখান থেকে যাওয়ার পর) উমরের (রা) সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তখন আমি তাকে সেই কথা বললাম, যা নিয়ে আপনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। তা শুনে তিনি আমার বুকের ওপর এমন জোরে ঘুষি মারলেন যে, আমি চিত হয়ে পড়ে গেলাম। তারপর তিনি আমাকে ফিরে আসতে বললেন।"

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরকে (রা) বললেন, "হে উমর, এমন করলে কেন?" উমর (রা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! আপনি কি আপনার জুতোজোড়া দিয়ে আবু হুরাইরাকে (রা) এই বলে পাঠিয়েছেন-যে ব্যক্তি অন্তরের স্থির বিশ্বাসের সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই", তাকে যেন সে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ।” উমর (রা) বললেন, “(হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অনুগ্রহ করে) এরূপ বলবেন না। আমার আশঙ্কা হয় যে, (এমন কথা শুনে) পরবর্তী লোকেরা এর ওপর নির্ভর করে বসবে (আমল করা ছেড়ে দেবে)। সুতরাং তাদের যথাযথভাবে আমল করতে দিন।"

এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ঠিক আছে, তাদের আমল করতে দাও।"

লক্ষ করুন, উমর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার বিপরীত একটি প্রস্তাব পেশ করলেন আর সেটাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করে নিলেন।

উমর (রা)-এর উক্ত কর্ম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা বা প্রত্যাখ্যান ছিল না। তবে তিনি দেখতে পেলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কথা দিয়ে আবু হুরাইরাকে (রা) প্রেরণ করেছেন, তাতে মুসলমানদের জন্য অন্তরের প্রশান্তি ও সুসংবাদ ছাড়া অন্য কোনো কল্যাণ নেই। তদুপরি, এ কথা শুনে তারা (মুক্তিলাভের ব্যাপারে) অতিমাত্রায় ভরসাপ্রবণ হয়ে পড়ার এবং ভালো কর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রস্তাব পেশ করলেন যেন এই কথাটি গোপন রাখা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রস্তাবকে যথার্থ মনে করলেন এবং তা মেনে নিলেন।'

এই হাদিস থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হলো:
আলিম কর্তৃক তার ছাত্র-শিষ্য ও জিজ্ঞাসাকারীদের সাথে নিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা ও ফতোয়া প্রদানের মজলিস কায়িম করা।
বড় একটি দলের আলোচনা করার সময় প্রত্যেকের নাম না নিয়ে তাদের মধ্য থেকে বিশেষ কয়েকজনের নাম নিয়ে বাকিদের জন্য ইত্যাদি বা প্রমুখ বলে দেওয়া।
সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি খুব যত্নশীল ছিলেন এবং তাঁর প্রতি তাঁদের সম্মানবোধ অব্যক্ত মাত্রায় ছিল। আর প্রত্যাশিত জায়গায় তিনি আসতে দেরি করলে অস্বস্তিবোধ করতেন এবং ভীত হয়ে পড়তেন।
অনুসারীরা তাদের সর্দারের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকবে এবং তার উপকার সাধনে ও ক্ষতি দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
অপরের মালিকানাধীন জায়গায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা বৈধ, যদি দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব থাকার কারণে বা অন্য কোনো কারণে তাতে মালিকের নীরব অনুমতি থাকে। কেননা, আবু হুরাইরা (রা) প্রাচীরবেষ্টিত বাগানটিতে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য তাকে কোনোরূপ দোষারোপ করেননি।
এই বিধান কেবল মালিকানাধীন জায়গায় প্রবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কারও আসবাবপত্র ব্যবহার করা, কারও খানা খাওয়া, কারও ঘর থেকে নিজের বাড়িতে খানা নিয়ে আসা, কারও বাহনে আরোহণ করা ইত্যাদি বিষয়ে বিনা অনুমতিতে করতে পারবে, যদি জানা থাকে যে, এতে মালিক বিরক্ত হবে না।
যে ইমান চিরস্থায়ী জাহান্নামি হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তার জন্য অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকারোক্তি আবশ্যক।
বিশেষ কোনো প্রয়োজন বা উপকারিতা না থাকলে কিংবা ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে কিছু কিছু জ্ঞান গোপন রাখা বৈধ।
অনুসারী তার নেতা বা ইমামের সিদ্ধান্তের বিপরীত কোনো বিষয়ে কল্যাণ দেখতে পেলে অনুসৃতকে তা জানাতে পারবে এবং অনুসৃতের জন্যেও উচিত যে, অনুসারীর কথা যৌক্তিক ও উপকারী হলে তা মেনে নেওয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া।
এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে 'তোমার জন্য আমার মাতাপিতা কুরবান হোক' বলা বৈধ।

টিকাঃ
৬০২. সহিহু মুসলিম: ৩১।
৬০৩. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/২৩৮।
৬০৪. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/২৩৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00